বাংলাদেশে এনজিও নিবন্ধন: আইনি ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা

by tahmidrahman1995@gmail.com | Sep 8, 2026 | Regulatory & Compliance

Current framework checked 8 September 2026. Requirements and administrative practice should be verified with the relevant authority before action.

বাংলাদেশে সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একটি এনজিও বা অলাভজনক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া। সোসাইটি, ট্রাস্ট বা কোম্পানি লিমিটেড বাই গ্যারান্টি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিক কাঠামো নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষ করে বিদেশি অনুদান গ্রহণের ক্ষেত্রে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধন এবং নিয়মিত কমপ্লায়েন্স বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। এই নিবন্ধটি নিবন্ধনের বর্তমান আইনি রূপরেখা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহ ব্যাখ্যা করে।

বাংলাদেশে অলাভজনক সংস্থা গঠনের ক্ষেত্রে চারটি প্রধান আইনি কাঠামো রয়েছে। প্রথমত, Societies Registration Act, 1860-এর অধীনে সমিতি গঠন, যা সাধারণত সাহিত্যিক বা দাতব্য উদ্দেশ্যে হয়। দ্বিতীয়ত, Trusts Act, 1882-এর অধীনে দাতব্য ট্রাস্ট, যেখানে নির্দিষ্ট সম্পত্তির মাধ্যমে জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালিত হয়।

তৃতীয়ত, Companies Act, 1994-এর অধীনে ‘কোম্পানি লিমিটেড বাই গ্যারান্টি’ (সেকশন ২৮ লাইসেন্স)। এটি একটি কর্পোরেট সত্তা হিসেবে আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য। চতুর্থত, স্থানীয় সমাজকল্যাণমূলক কাজের জন্য Voluntary Social Welfare Agencies (Registration and Control) Ordinance, 1961-এর অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তরের (DSS) নিবন্ধন। প্রতিটি কাঠামোর নিজস্ব আইনি দায়বদ্ধতা রয়েছে, যা সংস্থার লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন করা উচিত।

সোসাইটি এবং ট্রাস্ট নিবন্ধন প্রক্রিয়া

সোসাইটি নিবন্ধনের জন্য ১৮৬০ সালের আইন অনুযায়ী ন্যূনতম সাতজন সদস্য মিলে একটি ‘মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন’ তৈরি করেন। এটি আরজেএসসি বা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে আবেদন করতে হয়। নিবন্ধনের পর সংস্থাটি একটি পৃথক আইনি সত্তা হিসেবে নিজস্ব নামে সম্পত্তি ধারণ করতে পারে।

অন্যদিকে, ট্রাস্ট গঠনের ক্ষেত্রে ১৮৮২ সালের ট্রাস্ট আইন প্রযোজ্য। এখানে একজন ‘সেটলার’ নির্দিষ্ট সম্পত্তি জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে ট্রাস্টিদের হাতে ন্যস্ত করেন। একটি ‘ট্রাস্ট ডিড’ প্রস্তুত করে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নিবন্ধিত করতে হয়। ট্রাস্টের ক্ষেত্রে ট্রাস্টিদের দায়বদ্ধতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। উভয় ক্ষেত্রেই কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট ও সভা পরিচালনা করা বাঞ্ছনীয়।

কোম্পানি লিমিটেড বাই গ্যারান্টি

পেশাদার কর্পোরেট কাঠামোতে অলাভজনক কার্যক্রমের জন্য ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের অধীনে ‘কোম্পানি লিমিটেড বাই গ্যারান্টি’ একটি আদর্শ বিকল্প। এখানে সদস্যদের দায়বদ্ধতা সীমাবদ্ধ থাকে এবং কোনো মুনাফা সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা যায় না।

এই প্রক্রিয়ায় আরজেএসসি থেকে নাম ছাড়পত্র নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেকশন ২৮ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়। লাইসেন্স প্রাপ্তির পর আরজেএসসি থেকে ইনকর্পোরেশন সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। এই কাঠামো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে অধিকতর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তবে এর কমপ্লায়েন্স এবং রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কিছুটা বেশি হতে পারে।

এনজিও বিষয়ক ব্যুরো এবং বিদেশি অনুদান

বাংলাদেশে কোনো দেশি বা বিদেশি এনজিও যদি দেশের বাইরে থেকে অনুদান গ্রহণ করতে চায়, তবে তাদের জন্য NGO Affairs Bureau (NGOAB) বা এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এটি Foreign Donations (Voluntary Activities) Regulation Act, 2016 দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

ব্যুরোর নিবন্ধনের জন্য ‘এফডি-১’ ফর্মে আবেদন করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় সংস্থার গঠনতন্ত্র, কার্যনির্বাহী কমিটির বিবরণ এবং দাতা সংস্থার অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হয়। আবেদনের পর গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সদস্যদের ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন করা হয়। নিবন্ধন প্রাপ্তির পর প্রতিটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য ‘এফডি-৬’ ফর্মে অনুমোদন নিতে হয়। ব্যুরো নিয়মিতভাবে সংস্থার অডিট রিপোর্ট তদারকি করে থাকে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধন

স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম বা কমিউনিটি ভিত্তিক উন্নয়ন কাজের জন্য ১৯৬১ সালের ‘ভলান্টারি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার এজেন্সিস (রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল) অর্ডিন্যান্স’ গুরুত্বপূর্ণ। এই আইনের অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তর (DSS) অলাভজনক সংস্থাগুলোকে নিবন্ধন প্রদান করে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সংস্থার একটি সুনির্দিষ্ট গঠনতন্ত্র থাকতে হয় এবং স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এই নিবন্ধনের আওতায় সংস্থাগুলো সরকারি অনুদানের জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন থাকলেও যদি সংস্থাটি বিদেশি অনুদান গ্রহণ করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অধীনে পুনরায় নিবন্ধিত হতে হবে।

নিবন্ধন পরবর্তী আইনি বাধ্যবাধকতা

একটি এনজিও নিবন্ধিত হওয়ার পর তার আইনি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করতে হয়। প্রতি বছর একটি নিবন্ধিত অডিট ফার্মের মাধ্যমে আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করাতে হয়। সোসাইটি বা কোম্পানির ক্ষেত্রে বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) আয়োজন এবং কার্যবিবরণী জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

ট্যাক্স কমপ্লায়েন্সের অংশ হিসেবে সংস্থার একটি টিআইএন (TIN) গ্রহণ এবং প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়। বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে ব্যুরোর কাছে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। আইনগত কোনো ত্রুটি বা আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়লে কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। তাই আইনি ঝুঁকি এড়াতে পেশাদার পরামর্শ গ্রহণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশে এনজিও নিবন্ধন কি বাধ্যতামূলক?

হ্যাঁ, বাংলাদেশে কোনো অলাভজনক সংস্থা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা আইনি চুক্তি করতে হলে প্রচলিত আইনের অধীনে নিবন্ধন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে বিদেশি তহবিল ব্যবহারের জন্য এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধন ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কত সময় লাগে এবং খরচ কত?

নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সময় এবং খরচ সংস্থার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে। এছাড়া পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের ওপর ভিত্তি করে সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে। বর্তমান ফি এবং সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট বা পেশাদার আইনি পরামর্শদাতার সহায়তা নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশে এনজিও বা অলাভজনক সংস্থা নিবন্ধন এবং নিয়মিত আইনি কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতায় আমাদের বিশেষজ্ঞ টিমের সহায়তা নিতে পারেন। বিস্তারিত তথ্যের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: https://trw.co/contact/

সতর্কীকরণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়। এনজিও নিবন্ধনের নিয়মাবলী এবং প্রশাসনিক পদ্ধতি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বর্তমান নির্দেশিকা যাচাই করা এবং বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

Sources