চেক ডিজঅনার মামলা ২০২৬: নোটিশ, সময়সীমা, শাস্তি, জামিন ও আপিলের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

by Barrister Tahmidur Rahman | Oct 21, 2026 | Criminal Law, Insights | 0 comments

TRW Insight / বাংলাদেশ

চেক ডিজঅনার মামলা জেতা-হারা নির্ভর করে তারিখ আর কাগজে। কখন নোটিশ দেবেন, কোন আদালতে যাবেন, শাস্তি, জামিন ও আপিল কীভাবে চলে — ২০২৬ সালের আইনে পাওনাদার ও চেকদাতার ব্যবহারিক নির্দেশিকা।

হালনাগাদ ২১ অক্টোবর ২০২৬আইনি বিশ্লেষণবাংলাদেশ22 মিনিটে পড়া

চেক ডিজঅনার মামলা: ২০২৬ সালে আইন কী বলে

চেক ডিজঅনার মামলা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলার একটি, অথচ এর বেশির ভাগ হারে বা ঝুলে থাকে ছোট ছোট নিয়ম না মানার কারণে। চেক ফেরত এলেই অপরাধ হয় না; আইনে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে চেক জমা, লিখিত লিগ্যাল নোটিশ, পরিশোধের সুযোগ এবং এক মাসের মধ্যে নালিশ — এই চারটি ধাপ ঠিকঠাক পার হলে তবেই এনআই অ্যাক্ট (Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৩৮ ধারার অপরাধ পূর্ণ হয়।[1] একটি ধাপ বাদ পড়লে পাওনা যত স্পষ্টই হোক, মামলা টেকে না।

এই লেখায় পাওনাদার ও চেকদাতা দুই পক্ষের জন্য ১৩৮, ১৩৮ক, ১৪০ ও ১৪১ ধারার শর্ত, সময়সীমা, নোটিশের নমুনা, আদালত, কাগজপত্র, শাস্তি, জামিন, আপিল, আপস এবং সিকিউরিটি চেক ও ব্ল্যাংক চেক নিয়ে উচ্চ আদালতের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের দুটি বড় পরিবর্তন — পাঁচ লাখ টাকার বেশি চেকের মামলা যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে যাওয়া এবং তিন লাখ টাকা পর্যন্ত চেকের অভিযোগ মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার তফসিলে আসা — দুটিই এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

চেক ডিজঅনার মামলা — ব্যাংকের চেক ও স্বাক্ষরের কলম
চেক ফেরত আসার দিন থেকেই সময়ের হিসাব শুরু

সারসংক্ষেপ: চেক অপর্যাপ্ত তহবিল বা ব্যাংকের সঙ্গে নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে ফেরত এলে, প্রাপক ব্যাংকের তথ্য পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত নোটিশ দেবেন; চেকদাতা নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে টাকা না দিলে পরের এক মাসের মধ্যে নালিশ করতে হবে। সাজা সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, চেকের অঙ্কের তিনগুণ পর্যন্ত জরিমানা বা উভয়ই। দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করতে চেকের অঙ্কের অন্তত ৫০ শতাংশ আগে জমা দিতে হয়।

মূল বিষয়: ২০২৬ সালের ৬৫ নং আইনে ১৪১(গ) ধারা বদলেছে: চেকের অঙ্ক পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে মামলার বিচার হবে মেট্রোপলিটন যুগ্ম দায়রা জজ বা যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে, বাকি সব মামলা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। আর তিন লাখ টাকা পর্যন্ত চেকের অভিযোগ এখন আইনগত সহায়তা আইনের মধ্যস্থতা-তফসিলে, যা সরকার প্রজ্ঞাপন দিলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাধ্যতামূলক হয়।[2] [3]

এক নজরে

০১

ছয় মাসে জমা

চেকের তারিখ থেকে ছয় মাস বা চেকের মেয়াদ, যেটি আগে শেষ হয়, তার মধ্যে ব্যাংকে উপস্থাপন করতে হবে।

০২

৩০ দিনে নোটিশ

ব্যাংক থেকে চেক ফেরতের তথ্য পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেকদাতাকে লিখিত দাবি-নোটিশ দিতে হবে।

০৩

৩০ দিন পরিশোধের সুযোগ

নোটিশ হাতে পাওয়ার দিন থেকে চেকদাতা ৩০ দিন সময় পান; এর মধ্যে টাকা দিলে অপরাধ হয় না।

০৪

এক মাসে নালিশ

পরিশোধের সময় শেষ হওয়ার পর এক মাসের মধ্যে লিখিত নালিশ না করলে আদালত মামলা আমলে নিতে পারে না।

০৫

আপিলে ৫০% জমা

সাজার বিরুদ্ধে আপিলের আগে বিচারিক আদালতে চেকের অঙ্কের অন্তত অর্ধেক জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

সূচিপত্র

কখন চেক ফেরত আসা অপরাধ: ১৩৮ ধারার উপাদান

১৩৮(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিজের ব্যাংক হিসাবের ওপর অন্য কাউকে টাকা দেওয়ার জন্য চেক কাটলেন, আর সেই চেক ব্যাংক অপরিশোধিত অবস্থায় ফেরত দিল — হয় হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায়, নয়তো ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিতে নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায়। তখন চেকদাতা অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন।[1] আইনের ভাষা এই দুটি কারণের কথাই বলে। তাই ব্যাংকের ফেরত-স্লিপে (ডিজঅনার স্লিপ বা রিটার্ন মেমো) ঠিক কোন কারণ লেখা আছে, তা প্রথম দিনেই দেখে নিন।

তিনটি শর্ত পূরণ না হলে অপরাধ নেই

শর্তাংশ অনুযায়ী তিনটি শর্ত পূরণ না হলে ধারাটি প্রযোজ্য নয়: (ক) চেক লেখার তারিখ থেকে ছয় মাস বা চেকের মেয়াদ, যেটি আগে শেষ হয়, তার মধ্যে ব্যাংকে উপস্থাপন; (খ) ফেরতের তথ্য পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে প্রাপক বা যথাযথ ধারক (holder in due course) কর্তৃক লিখিত নোটিশে টাকা দাবি; এবং (গ) নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেকদাতার টাকা পরিশোধে ব্যর্থতা।[1] হাইকোর্ট বিভাগ রেবা বেগম মামলায় (১২ আগস্ট ২০২৫) বলেছেন, এই শর্তগুলো এবং ১৩৮(১ক) ও ১৪১(খ) ধারা একসঙ্গে পূরণ করতে হবে; একটির ঘাটতিতেই দণ্ড বাতিল হয়ে যায়।[8]

২০০০ সালের সংশোধন: দেনা আর আলাদা উপাদান নয়

শুরুতে ১৩৮ ধারায় শর্ত ছিল, চেকটি কোনো দেনা বা দায় পরিশোধের জন্য দেওয়া হতে হবে। ২০০০ সালের সংশোধনী আইনে সেই শব্দগুলো ও ব্যাখ্যা বাদ দেওয়া হয়, জরিমানা দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ করা হয় এবং ১৩৯ ধারা বিলুপ্ত হয়।[1] আপিল বিভাগ মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বনাম রাষ্ট্র (২০১৭) মামলায় বলেছেন, আইনসভা শব্দগুলো ইচ্ছা করেই বাদ দিয়েছে। ফলে চেকটি জামানত, অগ্রিম না পোস্ট-ডেটেড হিসেবে দেওয়া — এই বিরোধ সাক্ষ্য নিয়ে বিচারে নিষ্পত্তি হবে, শুরুতেই নয়।[7] সিকিউরিটি চেক ও ব্ল্যাংক চেক নিয়ে বিরোধ নিচে আলাদা করে আলোচনা করা হয়েছে।

কে মামলা করতে পারেন

১৪১(ক) ধারা অনুযায়ী আদালত কেবল প্রাপক বা যথাযথ ধারকের লিখিত নালিশের ভিত্তিতে মামলা আমলে নিতে পারে; পুলিশ নিজে থেকে এই অপরাধের মামলা নেয় না।[1]

সময়সীমা: ছয় মাস, ৩০ দিন, ৩০ দিন, এক মাস

এনআই অ্যাক্টের চেকের মামলায় সবচেয়ে বড় ফাঁদ সময়ের হিসাব। প্রতিটি সময় আলাদা ঘটনা থেকে গোনা শুরু হয়, এবং একটির ভুল পরেরটিকে নষ্ট করে দেয়। নিচের সারণিতে পুরো ধারাবাহিকতা দেখানো হলো; মোবাইলে পাশে সরিয়ে দেখুন।

চেক ডিজঅনারের সময়সীমা এক নজরে
ধাপসময়সীমাগণনা শুরুআইনি ভিত্তিনা মানলে
ব্যাংকে চেক জমাছয় মাস বা চেকের মেয়াদ, যেটি আগে শেষচেকে লেখা তারিখধারা ১৩৮(১) শর্তাংশ (ক)১৩৮ ধারার মামলা হবে না
লিগ্যাল নোটিশ৩০ দিনব্যাংক থেকে ফেরতের তথ্য পাওয়ার দিনশর্তাংশ (খ) ও ধারা ১৩৮(১ক)মামলার ভিত্তি নষ্ট
চেকদাতার পরিশোধ৩০ দিননোটিশ হাতে পাওয়ার দিনশর্তাংশ (গ)এর আগে নালিশ অপরিপক্ব
নালিশ দায়েরএক মাসপরিশোধের ৩০ দিন শেষ হওয়ার দিনধারা ১৪১(খ)আদালত আমলে নিতে পারে না
আপিলতামাদি আইন অনুযায়ী; দেরিতে মওকুফ চাওয়া যায়রায়ের তারিখধারা ১৩৮ক ও তামাদি আইনের ধারা ৫৫০% জমা ছাড়া আপিল চলে না

চেক উপস্থাপনের মেয়াদ

চেকের তারিখ থেকে ছয় মাস, অথবা চেকের গায়ে লেখা মেয়াদ এর চেয়ে কম হলে সেই মেয়াদের মধ্যে চেক ব্যাংকে জমা দিতে হবে।[1] আপিল বিভাগ আলাউদ্দিন মামলায় পোস্ট-ডেটেড চেককে তার তারিখ পর্যন্ত বিল অব এক্সচেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন; তাই ছয় মাস গোনা শুরু হয় চেকে লেখা তারিখ থেকে।[7] মেয়াদ পেরোনো চেক জমা দিয়ে ফেরত এলে ১৩৮ ধারার মামলা হয় না; তখন দেওয়ানি পথই ভরসা।

নোটিশের ৩০ দিন কখন শুরু

৩০ দিন গোনা হয় চেকের তারিখ বা জমার তারিখ থেকে নয়, বরং প্রাপক যেদিন ব্যাংক থেকে চেক ফেরতের তথ্য পান, সেদিন থেকে।[1] বাস্তবে এটি সাধারণত ফেরত-স্লিপ হাতে পাওয়ার দিন। স্লিপটি কবে, কীভাবে পেলেন — খাম, ইমেইল বা ব্যাংকের রসিদ — সংরক্ষণ করুন। আমাদের পরামর্শ: স্লিপ পাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই নোটিশ পাঠান।

পরিশোধের ৩০ দিন এবং নালিশের এক মাস

চেকদাতা নোটিশ হাতে পাওয়ার দিন থেকে ৩০ দিন সময় পান। এই সময় শেষ হলেই মামলার কারণ (cause of action) উদ্ভূত হয়, আর ১৪১(খ) ধারা অনুযায়ী তার এক মাসের মধ্যে লিখিত নালিশ করতে হয়।[1] ৩০ দিন শেষের আগে নালিশ অপরিপক্ব হিসেবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে; এক মাস পেরোলে আদালত মামলা আমলে নিতে পারে না। তাই নোটিশ প্রাপ্তির তারিখটি প্রমাণযোগ্য হওয়া জরুরি।

বিলম্ব মওকুফ: কোথায় চলে, কোথায় চলে না

১৪১ ধারা ফৌজদারি কার্যবিধি সত্ত্বেও এক মাসের সীমাকে আদালতের আমলে নেওয়ার ওপর সরাসরি বাধা হিসেবে রেখেছে।[1] নালিশ দায়েরে দেরি মাফ পাওয়ার ভরসায় কখনো বসে থাকবেন না। তবে দণ্ডের পর আপিলে দেরি হলে তামাদি আইনের ৫ ধারায় মওকুফ চাওয়া যায়: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হাইকোর্ট বিভাগ এক রিকশাচালকের ২,৫৯৬ দিনের বিলম্ব মওকুফ করেছেন, যিনি দণ্ডের খবর দেরিতে জেনে ৫০ শতাংশ জমা দিয়েছিলেন।[11]

মধ্যস্থতায় ব্যয়িত সময়

আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে যুক্ত ২১খ(৪) ধারা বলে, মামলাপূর্ব মধ্যস্থতায় ব্যয়িত সময় তামাদির মেয়াদ গণনায় বাদ যাবে।[3] এই সুবিধা ১৪১ ধারার এক মাসের সীমায় খাটবে কিনা, তা এখনো পরীক্ষিত নয়; তাই মধ্যস্থতায় দ্রুত আবেদন করুন।

লিগ্যাল নোটিশ: কী লিখবেন, কীভাবে পাঠাবেন

পুরো মামলার ভিত্তি এই লিগ্যাল নোটিশ। আইনে নির্দিষ্ট ফরম নেই; শর্ত হলো লিখিতভাবে চেকের টাকা দাবি করা।[1] তবে প্রতিটি তথ্য যেন পরে কাগজ দিয়ে প্রমাণ করা যায়।

নোটিশে যা অবশ্যই থাকবে

  • প্রাপকের পূর্ণ নাম-ঠিকানা, এবং আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠালে মক্কেলের নির্দেশে পাঠানো হচ্ছে — এই উল্লেখ।
  • চেকদাতার পূর্ণ নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, বসবাস বা ব্যবসার সাধারণ বা সর্বশেষ জানা ঠিকানা; কোম্পানি হলে নিবন্ধিত কার্যালয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালকদের নাম।
  • চেক নম্বর, তারিখ, অঙ্কে ও কথায় টাকার পরিমাণ, ব্যাংক ও শাখার নাম, হিসাব নম্বর।
  • জমার তারিখ, ফেরতের তারিখ, ফেরত-স্লিপে লেখা কারণ এবং ফেরতের তথ্য পাওয়ার তারিখ।
  • নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেকের টাকা পরিশোধের স্পষ্ট দাবি, পরিশোধের পদ্ধতিসহ।
  • টাকা না দিলে ১৩৮ ও ১৪১ ধারায় নালিশ এবং দেওয়ানি প্রতিকার নেওয়া হবে — এই সতর্কবার্তা।

নোটিশের নমুনা কাঠামো

এটি খসড়ার দিকনির্দেশনা, হুবহু ফরম নয়। শিরোনাম: "নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী আইনি নোটিশ — প্রাপ্তিস্বীকারপত্রসহ রেজিস্টার্ড ডাকযোগে"। এরপর সূত্র নম্বর ও তারিখ; প্রাপকের নাম-ঠিকানা; মক্কেলের নির্দেশের উল্লেখ; সংক্ষেপে লেনদেন ও চেকের বিবরণ; জমা ও ফেরতের তারিখ; ৩০ দিনে পরিশোধের দাবি; না দিলে মামলার কথা; অন্য দাবির অধিকার সংরক্ষণ; এবং আইনজীবীর নাম, সনদ নম্বর ও স্বাক্ষর।

শুধু চেকের টাকা দাবি করুন

আইনি দাবি হলো "উক্ত টাকা", অর্থাৎ চেকের অঙ্ক।[1] সুদ বা খরচ একই দাবিতে মেশালে চেকদাতা বলতে পারেন, কত দিলে নোটিশ মানা হতো তা অস্পষ্ট ছিল। এগুলো আলাদা অনুচ্ছেদে সংরক্ষিত রাখুন; চেকের বাকি টাকার জন্য ১৩৮(৩) ধারায় দেওয়ানি অধিকার এমনিতেই অটুট থাকে।[1]

পাঠানোর তিন পদ্ধতি

১৩৮(১ক) ধারায় নোটিশ জারির তিনটি পদ্ধতি আছে: (ক) সরাসরি চেকদাতার হাতে দেওয়া; (খ) তাঁর বাংলাদেশে বসবাস বা ব্যবসার সাধারণ বা সর্বশেষ জানা ঠিকানায় প্রাপ্তিস্বীকারপত্রসহ (এডি) রেজিস্টার্ড ডাকে পাঠানো; অথবা (গ) বহুল প্রচারিত দৈনিক বাংলা জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ।[1] হাইকোর্ট বিভাগ জানুয়ারি ২০২৬-এ মো. দেলোয়ার হোসেন (টিটু) মামলায় বলেছেন, পদ্ধতিগুলো বিকল্প; যেকোনো একটিতে জারি হলেই দায়িত্ব পূরণ হয়।[9] তবে অন্তত একটি আইনি পদ্ধতিতে জারি অপরিহার্য।[8]

এডি কার্ড ও জারির প্রমাণ

রেবা বেগম মামলায় অভিযোগপত্রে ১৩৮(১ক) অনুযায়ী নোটিশ পাঠানোর কোনো বর্ণনা ছিল না এবং কোনো এডি প্রমাণ হয়নি; ফলে মামলার কারণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে হাইকোর্ট বিভাগ দণ্ড বাতিল করেন এবং জমা দেওয়া ৫০ শতাংশ ফেরতের নির্দেশ দেন।[8] তাই রেজিস্ট্রির রসিদ ("এডি" চিহ্নসহ), ফেরত আসা এডি কার্ড, ফেরত খাম, হাতে দেওয়ার স্বাক্ষরিত রসিদ এবং পত্রিকার পূর্ণ পৃষ্ঠা — সব যত্ন করে রাখুন, আর নালিশে জারির পদ্ধতি ও তারিখ স্পষ্ট লিখুন।

ইমেইল, এসএমএস বা হোয়াটসঅ্যাপ কি যথেষ্ট?

না। ১৩৮(১ক) ধারার তিন পদ্ধতির মধ্যে ইলেকট্রনিক মাধ্যম নেই, এবং ২০২৬ সালের সংশোধনী শুধু ১৪১(গ) ধারা বদলেছে।[1] [2] ইমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো কপি চেকদাতা যে দাবি জানতেন, তার সহায়ক প্রমাণ হতে পারে; কিন্তু রেজিস্টার্ড ডাকের বিকল্প নয়। বিস্তারিত ইংরেজিতে পড়তে দেখুন আমাদের চেক ডিজঅনার লিগ্যাল নোটিশ গাইড।

চেক ডিজঅনার মামলা — রেজিস্টার্ড ডাকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর খাম
এডিসহ রেজিস্টার্ড ডাক জারির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ

ধাপে ধাপে চেক ডিজঅনার মামলা দায়েরের নিয়ম

নিচের ধাপগুলো পাওনাদারের জন্য আমাদের অনুসৃত কর্মপদ্ধতি; প্রতিটি ধাপের তারিখ লিখে রাখুন।

ধাপ 01

ফেরত-স্লিপ সংরক্ষণ

ব্যাংকের ফেরত-স্লিপ কবে পেলেন তা লিখে রাখুন; এই দিন থেকে নোটিশের ৩০ দিন গোনা শুরু।

ধাপ 02

নোটিশ পাঠান

এক সপ্তাহের মধ্যে এডিসহ রেজিস্টার্ড ডাকে এবং সম্ভব হলে হাতে দিয়ে চেকের টাকা দাবি করুন।

ধাপ 03

জারির প্রমাণ জোগাড়

রেজিস্ট্রি রসিদ, এডি কার্ড, ফেরত খাম বা পত্রিকার পাতা এক ফাইলে রাখুন।

ধাপ 04

৩০ দিন অপেক্ষা

নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে পুরো ৩০ দিন শেষ হতে দিন; আংশিক পরিশোধ লিখিতভাবে নথিভুক্ত করুন।

ধাপ 05

আদালত বা মধ্যস্থতা ঠিক করুন

চেক পাঁচ লাখের বেশি হলে যুগ্ম দায়রা জজ, তিন লাখ পর্যন্ত হলে জেলার মধ্যস্থতা প্রজ্ঞাপন যাচাই করুন।

ধাপ 06

এক মাসে নালিশ

পরিশোধের সময় শেষের এক মাসের মধ্যে জারির পদ্ধতি ও তারিখসহ লিখিত নালিশ দাখিল করুন।

ধাপ 07

জবানবন্দি ও সমন

আদালত বাদীকে পরীক্ষা করে আসামির বিরুদ্ধে সমন বা প্রসেস ইস্যু করেন।

ধাপ 08

সাক্ষ্য ও রায়

মূল চেক, স্লিপ ও নোটিশ প্রমাণ করুন; রায়ের পর জরিমানার টাকা আদায়ে পদক্ষেপ নিন।

কোন আদালতে মামলা হবে: পাঁচ লাখ টাকার সীমা

নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৬৫ নং আইন), যা ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে, ১৪১(গ) ধারা প্রতিস্থাপন করেছে। চেকের অভিহিত মূল্য পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে মেট্রোপলিটন যুগ্ম দায়রা জজ বা যুগ্ম দায়রা জজের চেয়ে নিম্নতর কোনো আদালত বিচার করতে পারবে না; অন্য সব মামলার বিচার করবে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত। একই আইনে ২০২৬ সনের ৩৪ নং অধ্যাদেশ রহিত হয়েছে এবং তার অধীনে নেওয়া পদক্ষেপ সংরক্ষিত আছে।[2] ঠিক পাঁচ লাখ টাকার চেক আইনের ভাষায় "বেশি" নয়, তাই তা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেই যাবে।

তিন লাখ টাকা পর্যন্ত চেক: আগে মধ্যস্থতা

আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৪৫ নং আইন, ১০ এপ্রিল ২০২৬) নতুন তফসিলের ৭ নম্বর ক্রমিকে রেখেছে "অনধিক তিন লক্ষ টাকা মূল্যমান চেকের ক্ষেত্রে" ১৩৮ ধারার চেক ডিজঅনার সম্পর্কিত অভিযোগ। ২১খ ধারা অনুযায়ী তফসিলভুক্ত বিরোধে সংক্ষুব্ধ পক্ষকে প্রথমে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার আবেদন করতে হবে; ব্যর্থ হলে আদালতে যাওয়া যাবে, তবে নির্ধারিত প্রতিবেদন দাখিল বাধ্যতামূলক।[3] এই বিধান কার্যকর হয় সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনে যে তারিখ ও এলাকা ঠিক করে, সেখান থেকে।[3] তাই ছোট চেকের নালিশের আগে সংশ্লিষ্ট জেলার প্রজ্ঞাপন যাচাই করুন। মধ্যস্থতা কীভাবে চলে, তা জানতে পড়ুন বাংলাদেশে মধ্যস্থতা ও লিগ্যাল এইড বিষয়ক লেখা।

যে কাগজপত্র নিয়ে আইনজীবীর কাছে আসবেন

  • মূল চেক এবং ব্যাংকের মূল ফেরত-স্লিপ; উভয়ের দুই পাশের ফটোকপি।
  • লিগ্যাল নোটিশের অফিস কপি, রেজিস্ট্রি রসিদ, এডি কার্ড বা ফেরত খাম, পত্রিকায় প্রকাশ হলে পূর্ণ পৃষ্ঠা।
  • লেনদেনের প্রমাণ: চুক্তিপত্র, টাকা দেওয়ার রসিদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চালান বা বিল, এসএমএস ও ইমেইল।
  • বাদী ও সাক্ষীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং চেকদাতার সঠিক ঠিকানা।
  • প্রতিষ্ঠান বাদী হলে বোর্ড রেজল্যুশন বা ক্ষমতাপত্র; চেকদাতা কোম্পানি হলে পরিচালকদের তথ্য।
  • আংশিক পরিশোধ হয়ে থাকলে তার হিসাব ও রসিদ।

নালিশ দাখিলের পর কী হয়

নালিশের পর আদালত বাদীকে শপথে পরীক্ষা করে (ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারা) এবং অভিযোগ আমলে নেওয়ার মতো হলে আসামির বিরুদ্ধে প্রসেস ইস্যু করে (২০৪ ধারা)।[4] এরপর অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্য, জেরা ও যুক্তিতর্ক শেষে রায় হয়; শুনানির দিনে বাদীর অনুপস্থিতি মামলার ক্ষতি করে।

খরচ কেমন হতে পারে

আইনজীবীর ফির কোনো সরকারি নির্ধারিত হার নেই; মামলার অঙ্ক ও জটিলতা অনুযায়ী তা ঠিক হয়। অন্য খাতগুলো হলো নোটিশ ও রেজিস্টার্ড ডাক, প্রয়োজনে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, কোর্ট ফি ও শুনানির আনুষঙ্গিক খরচ। চেকদাতার জন্য বড় খরচটি আসে রায়ের পর, কারণ আপিল করতে চেকের অঙ্কের অর্ধেক আগে জমা দিতে হয়।[1]

কোম্পানির চেক: পরিচালকদের দায় (ধারা ১৪০)

চেকদাতা কোম্পানি হলে, অপরাধের সময় যিনি কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ও কোম্পানির কাছে দায়ী ছিলেন, তিনি এবং কোম্পানি — উভয়ই দোষী বলে গণ্য হবেন। তবে তিনি প্রমাণ করতে পারলে রেহাই পাবেন যে অপরাধটি তাঁর অজ্ঞাতে ঘটেছে বা তিনি প্রতিরোধে যথাযথ সতর্কতা নিয়েছিলেন। কোনো পরিচালক বা কর্মকর্তার সম্মতি, যোগসাজশ বা অবহেলা প্রমাণিত হলে তিনিও দায়ী। এই ধারায় "কোম্পানি" বলতে অংশীদারি ফার্মও বোঝায়, আর ফার্মের ক্ষেত্রে "পরিচালক" মানে অংশীদার।[1] তাই নোটিশ কোম্পানির নিবন্ধিত ঠিকানায় এবং যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন, তাঁদের প্রত্যেককে আলাদাভাবে পাঠান।

চেক ডিজঅনার মামলার শাস্তি ও আদালতের সাম্প্রতিক দৃষ্টিভঙ্গি

১৩৮(১) ধারায় শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, অথবা চেকের অঙ্কের তিনগুণ পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড।[1] এটি সর্বোচ্চ সীমা; প্রকৃত সাজা আদালত মামলার তথ্য, পাওনার পরিমাণ ও পরিশোধের আচরণ দেখে ঠিক করেন।

জরিমানার টাকা কে পান

১৩৮(২) ধারা অনুযায়ী জরিমানা আদায় হলে, আদায়কৃত অঙ্কের মধ্য থেকে চেকের অভিহিত মূল্য পর্যন্ত টাকা ধারককে দেওয়া হবে। আর ১৩৮(৩) ধারা বলে, চেকের পুরো বা আংশিক টাকা আদায় না হলে ধারক দেওয়ানি আদালতে দাবি প্রতিষ্ঠার অধিকার রাখেন।[1] অর্থাৎ ফৌজদারি দণ্ড আর টাকা আদায় এক জিনিস নয়;

কারাদণ্ডের বদলে টাকা: ২০২৬ সালের রায়

হাইকোর্ট বিভাগ ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দেলোয়ার হোসেন মামলায় দণ্ড বহাল রেখেও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বদলে ১২ লাখ টাকা চেকের অঙ্ক পরিশোধের দণ্ড দেন, বাকি টাকা দুই মাসে জমার নির্দেশ দেন এবং খেলাপে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারায় আদায়ের পথ খোলা রাখেন।[9] ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখে আরেকটি একক বেঞ্চ বরিশালের এক গরু ব্যবসায়ীর ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড বাতিল করে পাঁচ লাখ টাকার জরিমানা বহাল রাখেন এবং বলেন, মামলার মূল উদ্দেশ্য চেকের অর্থ আদায় নিশ্চিত করা, চেকদাতাকে কারাগারে পাঠানো নয়।[12] তবে টাকা না দিলে কারাদণ্ডের ঝুঁকি থেকেই যায়।

চেক ডিজঅনার মামলা — আদালতের হাতুড়ি ও আইনের বই
উচ্চ আদালত কারাদণ্ডের চেয়ে টাকা আদায়ে জোর দিচ্ছেন

চেক ডিজঅনার মামলায় জামিন: সমন থেকে ওয়ারেন্ট

নোটিশ পেয়েই গ্রেপ্তারের ভয় পাওয়ার কারণ নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির দ্বিতীয় তফসিলে "অন্যান্য আইনের অপরাধ" অংশে বলা আছে, দুই বছরের কম কারাদণ্ড বা শুধু জরিমানাযোগ্য অপরাধে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার করতে পারে না, প্রথমে সাধারণত সমন ইস্যু হয় এবং অপরাধটি জামিনযোগ্য।[4] ১৩৮ ধারার সর্বোচ্চ সাজা এক বছর, তাই এই শ্রেণিতেই পড়ে।[1]

সমন, ওয়ারেন্ট ও আত্মসমর্পণ

নালিশ আমলে নেওয়ার পর আদালত আসামিকে সমন পাঠান। সমন পেয়েও হাজির না হলে আদালত সমনের পরিবর্তে বা সঙ্গে ওয়ারেন্ট দিতে পারেন (কার্যবিধির ৯০ ধারা), এবং পলাতক থাকলে হুলিয়া জারির পথও আছে (৮৭ ধারা)।[4] ওয়ারেন্ট জারি হলে দেরি না করে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাওয়াই নিরাপদ। জামিনযোগ্য অপরাধে জামিনের বিধান কার্যবিধির ৪৯৬ ধারায়; আদালত সাধারণত মুচলেকা ও জামিনদারের শর্তে জামিন দেন।[4] আত্মসমর্পণ ও জামিনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন সিএমএম আদালতে জামিন ও ওয়ারেন্ট রিকল বিষয়ক লেখায়।

সাজার পর জামিন

সাজা হয়ে গেলে পরিস্থিতি বদলায়। এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে কার্যবিধির ৪২৬(২ক) ধারায় বিচারিক আদালত আপিল দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত জামিন দিতে পারেন, এবং সেই সময় দণ্ড স্থগিত থাকে। কিন্তু আপিল বিভাগ পূবালী ব্যাংক বনাম চৌধুরী শামীম হামিদ (১১ জুন ২০২৪) মামলায় স্পষ্ট করেছেন, ৫০ শতাংশ জমা ছাড়া আপিলই চলে না, তাই টাকা জোগাড়ের জন্য এক মাসের জামিন দেওয়া হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ বাতিল হয়েছে। জমা দিলে বিচারিক আদালত জামিন দিতে পারবেন।[6]

আসামির আইনি প্রতিরক্ষা

  • চেক ছয় মাস বা মেয়াদের মধ্যে উপস্থাপিত হয়নি।
  • নোটিশ ৩০ দিনের মধ্যে পাঠানো হয়নি, বা আইনি তিন পদ্ধতির কোনোটিতে জারি হয়নি; এডি প্রমাণিত নয়।[8]
  • নালিশ পরিশোধের ৩০ দিন শেষ হওয়ার আগে, বা তার পর এক মাস পেরিয়ে দাখিল হয়েছে।
  • ভুল আদালতে বিচার হচ্ছে — পাঁচ লাখের সীমা বিবেচনা করুন।[2]
  • চেকটি পাওনার চেয়ে বেশি অঙ্কে বসানো, জোর করে বা প্রতারণায় নেওয়া, অথবা দায় আগেই পরিশোধিত — এগুলো সাক্ষ্য দিয়ে বিচারে প্রমাণ করতে হয়।[7]
  • কোম্পানির ক্ষেত্রে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন না বা যথাযথ সতর্কতা নিয়েছিলেন।[1]

শুরুতেই মামলা বাতিলের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে ৫৬১ক ধারার আবেদন সীমিত ক্ষেত্রে সফল হয়; কখন এটি কাজে লাগে তা জানতে দেখুন আমাদের ৫৬১ক কোয়াশমেন্ট প্র্যাকটিস।

আপিল ও ৫০ শতাংশ জমার নিয়ম (ধারা ১৩৮ক)

১৩৮ক ধারা বলে, ফৌজদারি কার্যবিধিতে যা-ই থাকুক, ১৩৮(১) ধারার সাজার বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলবে না, যদি না আপিল দায়েরের আগে যে আদালত সাজা দিয়েছে, সেই আদালতে ডিজঅনার হওয়া চেকের অঙ্কের অন্তত ৫০ শতাংশ জমা দেওয়া হয়।[1] হিসাব হয় চেকের অঙ্কে, জরিমানার অঙ্কে নয়। আপিল বিভাগ পূবালী ব্যাংক মামলায় বলেছেন, ৫০ শতাংশ জমা আর আপিল পরস্পরনির্ভর, এবং এই পূর্বশর্ত সাধারণ আইন প্রয়োগ করে শিথিল করা যায় না।[6]

জমার টাকা কোথায় যায়

আপিল বা রিভিশনে আসামি জিতলে টাকা ফেরত পান: রেবা বেগম মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ জমা দেওয়া ৫০ শতাংশ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।[8] দণ্ড বহাল থাকলে আদালত চালানে জমা টাকা বাদীকে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন, যেমন দেলোয়ার হোসেন মামলায়।[9] আপিলের আদালত ও রিভিশনের বিস্তারিত ইংরেজিতে দেখুন চেক মামলার আপিল গাইডে।

আপস ও নিষ্পত্তি

পাওনাদারের আসল লক্ষ্য টাকা, আর চেকদাতার লক্ষ্য কারাদণ্ড এড়ানো — তাই চেকের মামলার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান প্রায়ই আপস। নোটিশের ৩০ দিনের মধ্যে চেকের টাকা দিলে অপরাধই পূর্ণ হয় না।[1] পরে টাকা পরিশোধ হলে উচ্চ আদালত কারাদণ্ডের বদলে অর্থদণ্ডে সীমিত রাখার নজির দেখিয়েছেন।[9] [12] আংশিক টাকা নিলে লিখে রাখুন বাকিটা দাবিকৃত থাকছে, আর পূর্ণ পরিশোধের আগে মূল চেক হাতছাড়া করবেন না। ফৌজদারি মামলায় আপসের সাধারণ নিয়ম জানতে পড়ুন ফৌজদারি মামলায় আপস।

সিকিউরিটি চেক মামলা: জামানতের চেকেও দায়

ঋণ, ভাড়া বা বাকিতে মালের জামানত হিসেবে চেক নেওয়া প্রচলিত। অনেক চেকদাতা মনে করেন, "এটা তো শুধু সিকিউরিটি চেক ছিল" — এটুকুই প্রতিরক্ষা। আপিল বিভাগ আলাউদ্দিন মামলায় এই ধারণা নাকচ করে বলেছেন, ঋণের জামানত হিসেবে দেওয়া পোস্ট-ডেটেড চেক আর অন্য চেকের মধ্যে ১৩৮ ধারা কোনো পার্থক্য করে না; জামানত হিসেবে দেওয়া চেকে দায় প্রমাণিত হলে, চেক পূরণ করে জমা দেওয়া হলে চেকদাতা ফৌজদারি দায় এড়াতে পারেন না।[7]

তাহলে প্রতিরক্ষা কোথায়

সিকিউরিটি চেক মামলায় লড়াই লেবেল নিয়ে নয়, পাওনা নিয়ে: চেক জমার দিন কত বকেয়া ছিল, দায় আগেই শোধ হয়েছিল কিনা, আর অঙ্কটি অনুমতির বাইরে বসানো কিনা। আপিল বিভাগ বলেছেন, প্রকৃত দায়ের চেয়ে বেশি অঙ্ক বসানো প্রতারণার উপাদান, তবে সেটি বিচারিক আদালতে সাক্ষ্য নিয়ে নির্ধারণযোগ্য তথ্যগত প্রশ্ন।[7] তাই ঋণ পরিশোধের রসিদ, স্টেটমেন্ট, চুক্তি এবং চেক ফেরত চেয়ে লেখা চিঠি সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

ব্যাংক ঋণ ও দ্বৈত মামলা

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত দেশে ৩,২৪,৮০৪টি চেক ডিজঅনারের মামলা বিচারাধীন ছিল, যার সঙ্গে প্রায় ৪,৫০,০০০ কোটি টাকা জড়িত; এর মধ্যে প্রায় ১,৭৬,০০০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করা।[13] ঋণ আদায়ে অর্থঋণ মামলার পাশাপাশি সিকিউরিটি চেক দিয়ে ফৌজদারি মামলা চলতে পারে কিনা, তা নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের ২০২২ ও ২০২৫ সালের রায় আপিল বিভাগ স্থগিত করেছেন। সর্বশেষ ১২ অক্টোবর ২০২৬ অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আরও তিনটি মামলায় হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ স্থগিত করেছেন; ফলে আপাতত দুটি মামলা একসঙ্গে চলতে পারে।[13] [14] অর্থঋণ আদালতের দিক জানতে দেখুন অর্থঋণ আদালত বিষয়ক লেখা।

সিকিউরিটি চেক দেওয়ার আগে ও পরে

  • সম্ভব হলে চেকের বদলে ব্যাংক গ্যারান্টি, বন্ধক বা ব্যক্তিগত গ্যারান্টি দিন।
  • চেকে প্রাপক, অঙ্ক এবং সম্ভব হলে তারিখ লিখে দিন; কোন দায়ের জামানত, কখন জমা দেওয়া যাবে এবং পরিশোধের পর ফেরত দিতে হবে — এসব লিখিত রসিদে রাখুন।
  • দায় শেষ হলে লিখিতভাবে সিকিউরিটি চেক ফেরত চান এবং পাঠানোর প্রমাণ রাখুন।
  • বিস্তারিত নজির ও কৌশল ইংরেজিতে পড়ুন আমাদের সিকিউরিটি চেক গাইডে।

ব্ল্যাংক চেক মামলা: অপব্যবহার হলে করণীয়

স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক হারিয়ে যাওয়া, জোর করে নেওয়া বা ইচ্ছেমতো অঙ্ক বসিয়ে মামলা করা — ব্ল্যাংক চেক নিয়ে এমন অভিযোগ নতুন নয়। হাইকোর্ট বিভাগ মো. নুরুল হাকিম বনাম রাষ্ট্র (১১ জুন ২০২৩) মামলায় ১.৮ কোটি টাকার চেকের মামলা বাতিল করেন, কারণ নথিতে প্রমাণিত হয় যে চেকটি আসামি পূরণ করেননি এবং কোনো প্রতিদান ছিল না। ওই মামলায় আসামি লিজের জামানত হিসেবে ব্ল্যাংক চেক দিয়েছিলেন, চেক জোর করে নেওয়ার অভিযোগে থানায় জিডি করেছিলেন এবং র‍্যাবের কাছেও অভিযোগ দিয়েছিলেন।[10]

জিডি ও প্রমাণ সংরক্ষণ

নুরুল হাকিম মামলা দেখায়, সময়মতো তৈরি কাগজই শেষ পর্যন্ত বাঁচায়।[10] চেকবই বা স্বাক্ষরিত পাতা হারালে বা কেউ আটকে রাখলে দেরি না করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করুন, ব্যাংককে লিখিতভাবে জানান, এবং যাঁর কাছে চেক আছে তাঁকে ফেরত চেয়ে রেজিস্টার্ড ডাকে চিঠি দিন। কাকে কোন চেক দিয়েছেন তার রেজিস্টার ও লেনদেনের মেসেজ সংরক্ষণ করুন। ওই রায়ে আদালত পরামর্শও দিয়েছেন, নালিশের সঙ্গে বাদী হলফনামা দিতে পারেন যে চেকটি আসামি নিজে পূরণ করেছেন।[10]

পাল্টা আইনি পদক্ষেপ

অঙ্ক বা তারিখ অনুমতি ছাড়া বসানো হলে এবং প্রতারণার উদ্দেশ্য থাকলে দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারা (অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের শাস্তি) ও ৪২০ ধারা (প্রতারণা ও অসাধুভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরে প্ররোচনা) অনুযায়ী আলাদা অভিযোগের প্রশ্ন আসে।[5] তবে মনে রাখবেন, শুধু দেওয়ানি মামলা বা পাল্টা অভিযোগ করলেই ১৩৮ ধারার মামলা থেমে যায় না; ব্ল্যাংক চেকের প্রতিরক্ষা মূল মামলার বিচারেই সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হয়।[7] সবচেয়ে নিরাপদ নিয়ম একটাই: কখনো ব্ল্যাংক চেক স্বাক্ষর করে দেবেন না।

চেক ডিজঅনার মামলা — জামানতের চুক্তিপত্র ও কাগজপত্র যাচাই
সিকিউরিটি ও ব্ল্যাংক চেকের লড়াই জেতে কাগজে

যে ভুলগুলো মামলা নষ্ট করে

  • ফেরতের তথ্য পাওয়ার ৩০ দিন পর লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো, বা শুধু সাধারণ ডাক, কুরিয়ার বা ইমেইলে পাঠানো।
  • এডি কার্ড, রেজিস্ট্রি রসিদ বা ফেরত খাম হারিয়ে ফেলা; নোটিশ ও রসিদের তারিখে অমিল।[8]
  • পাঁচ লাখ টাকার বেশি চেকে ভুল আদালতে মামলা, বা তিন লাখ পর্যন্ত চেকে প্রজ্ঞাপিত এলাকায় মধ্যস্থতা এড়িয়ে যাওয়া।[2] [3]
  • চেকদাতা হিসেবে নোটিশ উপেক্ষা করা — ৩০ দিনই অপরাধ ঠেকানোর শেষ সুযোগ।

ঢাকায় চেক ডিজঅনার আইনজীবীর ভূমিকা

অভিজ্ঞ আইনজীবী প্রথম দিনেই তারিখ মেলান, নোটিশ দুই পদ্ধতিতে পাঠান, সঠিক আদালত বা মধ্যস্থতা বাছেন এবং জারির প্রমাণ নালিশে যুক্ত করেন। চেকদাতার পক্ষে তিনি নোটিশের ত্রুটি, এখতিয়ার ও প্রকৃত পাওনা যাচাই করে প্রতিরক্ষা, জামিন ও আপসের পরিকল্পনা করেন। TRW ব্যাংক, কোম্পানি, ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি — উভয় পক্ষকেই চেকের মামলায় পরামর্শ দেয়; আমাদের ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স লিটিগেশন টিম বড় অঙ্কের মামলা পরিচালনা করে। ইংরেজিতে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের জন্য দেখুন Cheque dishonour in Bangladesh।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

চেক ফেরত এলে কত দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ দিতে হবে?

ব্যাংক থেকে চেক ফেরতের তথ্য পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেকদাতাকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে।[1]

নোটিশ পাওয়ার পর চেকদাতা কত দিন সময় পান?

নোটিশ হাতে পাওয়ার দিন থেকে ৩০ দিন। এর মধ্যে চেকের টাকা পরিশোধ করলে ১৩৮ ধারার অপরাধ পূর্ণ হয় না।[1]

চেক ডিজঅনার মামলা কত দিনের মধ্যে করতে হয়?

চেকদাতার ৩০ দিনের পরিশোধের সময় শেষ হওয়ার পর এক মাসের মধ্যে আদালতে লিখিত নালিশ করতে হবে; এরপর আদালত মামলা আমলে নিতে পারে না।[1]

হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমেইলে নোটিশ পাঠালে চলবে?

শুধু এতে চলবে না। আইনে স্বীকৃত পদ্ধতি তিনটি: হাতে দেওয়া, এডিসহ রেজিস্টার্ড ডাক এবং বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিকে প্রকাশ। ইমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপ সহায়ক প্রমাণ হিসেবে পাশাপাশি পাঠাতে পারেন।[1] [8]

পাঁচ লাখ টাকার বেশি চেকের মামলা কোন আদালতে হবে?

২০২৬ সনের ৬৫ নং আইন অনুযায়ী মেট্রোপলিটন যুগ্ম দায়রা জজ বা যুগ্ম দায়রা জজের চেয়ে নিম্নতর নয় এমন আদালতে; পাঁচ লাখ বা তার কম হলে মেট্রোপলিটন বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে।[2]

চেক ডিজঅনারের সাজা কী?

সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, চেকের অঙ্কের তিনগুণ পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড। আদায়কৃত জরিমানা থেকে চেকের অঙ্ক পর্যন্ত টাকা ধারক পান।[1]

চেকের মামলায় কি গ্রেপ্তার হতে পারি? জামিন পাওয়া যায়?

অপরাধটি জামিনযোগ্য এবং প্রথমে সাধারণত সমন যায়; পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার করে না। সমন উপেক্ষা করলে ওয়ারেন্ট হতে পারে, তখন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে হয়।[4]

আপিল করতে কত টাকা জমা দিতে হয়?

সাজা দেওয়া আদালতে চেকের অঙ্কের অন্তত ৫০ শতাংশ, আপিল দায়েরের আগে। আপিল বিভাগ বলেছেন, এই শর্ত শিথিল করা যায় না।[1] [6]

সিকিউরিটি চেক দিয়ে কি মামলা হয়?

হ্যাঁ। আপিল বিভাগ বলেছেন, জামানতের পোস্ট-ডেটেড চেক আর অন্য চেকের মধ্যে ১৩৮ ধারা পার্থক্য করে না; তবে চেক জমার দিন প্রকৃত পাওনা ছিল কিনা, তা বিচারে বিবেচ্য।[7]

ছোট অঙ্কের চেকে কি আগে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক?

তিন লাখ টাকা পর্যন্ত চেকের অভিযোগ আইনগত সহায়তা আইনের তফসিলে আছে। সরকার যে এলাকায় প্রজ্ঞাপন দিয়েছে, সেখানে আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার আবেদন করতে হবে।[3]

সূত্র তালিকা

প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র

উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।

  1. Negotiable Instruments Act 1881, Chapter XVII (sections 138 to 141)
  2. নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৬৫ নং আইন)
  3. আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৪৫ নং আইন): ধারা ২১খ, ২১গ ও তফসিল
  4. Code of Criminal Procedure 1898 (sections 87, 90, 200, 204, 426, 496 and Schedule II)
  5. Penal Code 1860 (sections 406 and 420)
  6. আপিল বিভাগ, পূবালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম চৌধুরী শামীম হামিদ, ফৌজদারি লিভ পিটিশন ১০৫৯-১০৬১/২০২৪ (১১ জুন ২০২৪)
  7. আপিল বিভাগ, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বনাম রাষ্ট্র, ফৌজদারি আপিল ১১-১৭/২০১৭ ও সংশ্লিষ্ট পিটিশন
  8. হাইকোর্ট বিভাগ, রেবা বেগম বনাম রাষ্ট্র, ফৌজদারি রিভিশন ২৮৪/২০২২ (১২ আগস্ট ২০২৫)
  9. হাইকোর্ট বিভাগ, মো. দেলোয়ার হোসেন (টিটু) বনাম রাষ্ট্র, ফৌজদারি রিভিশন ৩৯২১/২০২৫ (২৬ জানুয়ারি ২০২৬)
  10. হাইকোর্ট বিভাগ, মো. নুরুল হাকিম বনাম রাষ্ট্র, ফৌজদারি বিবিধ মামলা ৪২৩৯৩/২০২২ (১১ জুন ২০২৩)
  11. হাইকোর্ট বিভাগ, মো. আশরাফুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র, ফৌজদারি রুল ৪৮ (কন-এ)/২০২৫ (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
  12. বাংলা ট্রিবিউন, জুলাই ২০২৬ — চেক ডিজঅনার মামলার মূল উদ্দেশ্য অর্থ আদায়, কারাদণ্ড নয়: হাইকোর্ট
  13. The Business Standard, 4 January 2026 — Borrowers face jail even after losing assets as banks pursue dual legal action
  14. Dhaka Tribune, 12 October 2026 — Attorney general: loan recovery, cheque dishonour cases can proceed simultaneously

TRW-এর সহায়তা

তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে

চেক ফেরত এসেছে, নোটিশ পেয়েছেন বা মামলায় সমন-ওয়ারেন্ট এসেছে? সময় পেরোনোর আগে তারিখ ও কাগজপত্র যাচাই করিয়ে নিন। দেখুন আমাদের ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স লিটিগেশন প্র্যাকটিস, অথবা সরাসরি TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

Message TRW on WhatsApp