অর্থ ঋণ আদালত ২০২৬: ব্যাংক ঋণ মামলা, জারি, সিআইবি ও জামিনদারের দায়

by Barrister Tahmidur Rahman | Oct 21, 2026 | Banking & Finance, Insights | 0 comments

TRW Insight / বাংলাদেশ

ব্যাংক ঋণ খেলাপি হলে সিআইবি তালিকা, মামলা, নিলাম ও দেওয়ানি আটক একের পর এক আসে। প্রতিটি ধাপের সময়সীমা ও জমার শর্ত জানলে ঋণগ্রহীতা ও জামিনদার সম্পদ রক্ষা ও আপসের সেরা সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন।

হালনাগাদ ২১ অক্টোবর ২০২৬আইনি বিশ্লেষণবাংলাদেশ22 মিনিটে পড়া

অর্থ ঋণ আদালত: ২০২৬ সালে ব্যাংক ঋণ মামলার পূর্ণ চিত্র

ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণ শোধ না হলে শেষ পর্যন্ত বিরোধটি গড়ায় অর্থ ঋণ আদালত পর্যন্ত। ২০০৩ সালের অর্থ ঋণ আদালত আইন এই বিশেষ আদালতকে ব্যাংকের ঋণ আদায়ের মামলায় একচ্ছত্র এখতিয়ার দিয়েছে, প্রায় প্রতিটি ধাপে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক করেছে এবং আপিলের আগে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা জমা চেয়েছে। ব্যাংকের জন্য এটি দ্রুত আদায়ের হাতিয়ার; ঋণগ্রহীতা, জামিনদার বা বন্ধকদাতার জন্য একটি সময়সীমা পার হয়ে যাওয়া মানে বাড়ি, কারখানা বা জমি হারানোর ঝুঁকি।[1]

এই লেখায় একসঙ্গে পাবেন পুরো চিত্র: ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করলে কী হয়, খেলাপি ঋণের নিয়ম ও সিআইবি রিপোর্ট, মামলা দায়ের থেকে লিখিত জবাব, মধ্যস্থতা, ডিক্রি, জারি মামলা ও নিলাম, দেওয়ানি কারাদণ্ড ও তথাকথিত "জামিন", আপিলের জমার শর্ত, ঋণের জামিনদারের দায় এবং ২০২৫–২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সুবিধা।

অর্থ ঋণ আদালত — ব্যাংক ঋণের কাগজপত্র ও আইনি নোটিশ পর্যালোচনা
খেলাপি ঋণের প্রতিটি ধাপে সময়সীমা চলতে থাকে

সারসংক্ষেপ: ব্যাংক ঋণ খেলাপি হলে নাম ওঠে সিআইবিতে, নতুন ঋণ বন্ধ হয়, আর ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ আদালতে মামলা করে। বিবাদী উপস্থিতির ৪০ দিনের মধ্যে লিখিত জবাব দেন, তারপর মামলা যায় বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতায়। ডিক্রির এক বছরের মধ্যে জারি মামলা করতে হয়; তাতে নিলাম, ব্যাংকের নামে মালিকানা এবং সর্বোচ্চ ছয় মাসের দেওয়ানি আটক হতে পারে। আপিল করতে ডিক্রির ৫০ শতাংশ এবং রিভিশনে ৭৫ শতাংশ জমা দিতে হয়।

মূল বিষয়: দেওয়ানি আটক ফৌজদারি গ্রেপ্তার নয়, তাই এখানে প্রচলিত অর্থে জামিন হয় না। আইন মুক্তির পথ নিজেই ঠিক করে দিয়েছে: অপরিশোধিত ডিক্রির ২৫ শতাংশ নগদ জমা দিয়ে বাকি টাকা ৯০ দিনের মধ্যে দেওয়ার মুচলেকা, অথবা পুরো টাকা পরিশোধ।

এক নজরে

০১

খেলাপির সংজ্ঞা

মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বা সুদ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ছয় মাস পরও অপরিশোধিত থাকলে ব্যাংক কোম্পানি আইনে ঋণগ্রহীতা খেলাপি।

০২

সিআইবি রিপোর্ট

এক টাকার ঋণও এখন সিআইবিতে যায়; খেলাপি তালিকাভুক্ত হলে কোনো ব্যাংক নতুন ঋণ দিতে পারে না।

০৩

৪০ দিনের জবাব

উপস্থিতির ৪০ দিনের মধ্যে লিখিত জবাব; খরচ জমা দিয়ে আর মাত্র ২০ দিন বাড়ানো যায়।

০৪

জারি ও আটক

ডিক্রির এক বছরের মধ্যে জারি মামলা; নিলাম ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের দেওয়ানি আটক।

০৫

জামিনদারের দায়

চুক্তি আইনের ধারা ১২৮ অনুযায়ী জামিনদারের দায় মূল ঋণগ্রহীতার দায়ের সমবিস্তৃত।

সূচিপত্র

ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করলে কী হয়: ধাপে ধাপে পরিণতি

কিস্তি বকেয়া পড়ার দিন থেকেই আইনি ঘড়ি চলতে শুরু করে। প্রথম ধাপ শ্রেণীকরণ। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইএমএফের শর্ত পূরণে নিয়ম কড়া করেছে, যা ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর: এখন যেকোনো ধরনের ঋণ তিন মাস বা ৯০ দিন বকেয়া থাকলেই শ্রেণীকৃত হয়। তিন থেকে ছয় মাস বকেয়া হলে নিম্নমান, ছয় থেকে বারো মাসে সন্দেহজনক এবং বারো মাস বা তার বেশি হলে মন্দ বা ক্ষতিজনক ঋণ। কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য আগের দীর্ঘ মেয়াদের সুবিধা বাতিল হয়েছে।[5]

শ্রেণীকৃত ঋণ, ঋণখেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি

শ্রেণীকৃত ঋণ ব্যাংকের হিসাবের একটি শ্রেণি মাত্র। আইনগত ঋণখেলাপি হওয়ার শর্ত ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ধারা ৫(গগ)-এ: ঋণ, তার অংশ বা সুদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ছয় মাস পরও অপরিশোধিত থাকলে ঋণগ্রহীতা খেলাপি। কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, ২০ শতাংশের বেশি শেয়ারধারী বা তার ঋণের জামিনদারকেও এই উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ধরা হয়।[4] ২০২৩ সালের সংশোধনী এর ওপর "ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি" নামে আরেকটি সংকীর্ণ শ্রেণি যোগ করেছে: সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও শোধ না করা, জালিয়াতি বা মিথ্যা তথ্যে ঋণ নেওয়া, ঋণের টাকা অন্য কাজে লাগানো, কিংবা ব্যাংকের লিখিত অনুমতি ছাড়া জামানত সরিয়ে ফেলা।[4]

কোন পরিণতি কখন আসে

  • নতুন ঋণ বন্ধ: ধারা ২৭কক অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংক খেলাপির তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায় এবং কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে নতুন ঋণ দিতে পারে না।[4]
  • মামলা: একই ধারা অনুযায়ী ব্যাংককে খেলাপির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা করতে হয়, যার মূল পথ অর্থ ঋণ মামলা।[4]
  • পরিচালকের সীমাবদ্ধতা: ধারা ২৭ক অনুযায়ী ঋণগ্রহীতা কোম্পানির পরিচালক ঋণদাতা ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া পদত্যাগ বা শেয়ার হস্তান্তর করতে পারেন না।[4]
  • ইচ্ছাকৃত খেলাপির কঠোর শাস্তি: শুনানির পর তালিকা চূড়ান্ত হলে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, ট্রেড লাইসেন্স ও কোম্পানি নিবন্ধনে বাধা, ব্যাংকের পরিচালক হওয়ায় অযোগ্যতা এবং দুই মাসের নোটিশে টাকা না দিলে ফৌজদারি মামলা। চূড়ান্ত হওয়ার বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে আপিল করা যায়।[4]

অর্থাৎ সাধারণ খেলাপি আর ইচ্ছাকৃত খেলাপি আলাদা আইনি অবস্থা। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা কেবল চূড়ান্তভাবে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষিত ব্যক্তির ওপর প্রযোজ্য। খেলাপির পুরো আইনি পরিণতি ও নির্বাচনে অযোগ্যতার বিষয়টি আমাদের ইংরেজি বিশ্লেষণ loan defaulter in Bangladesh-এ বিস্তারিত আছে।

খেলাপি ঋণের নিয়ম ও সিআইবি রিপোর্ট

সিআইবি বা ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিভাগ, যেখানে দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণগ্রহীতার তথ্য জমা দেয়।[9] কোনো ব্যাংক ঋণ মঞ্জুর, নবায়ন বা সীমা বাড়ানোর আগে সিআইবি রিপোর্ট দেখে। ফলে এক ব্যাংকে খেলাপি হলে সারা ব্যাংকব্যবস্থায় ঋণপত্র, ঋণসীমা ও গ্যারান্টি সুবিধা আটকে যেতে পারে।

২০২৩–২০২৬ সালে সিআইবির নিয়মে যা বদলেছে

২০২৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আগে ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি ঋণের তথ্য সিআইবিতে দিতে হতো; এখন এক টাকার ঋণও জানাতে হয় এবং প্রতি মাসে প্রতিটি ঋণের মান হালনাগাদ করতে হয়।[8] ২০২৫ সালের মার্চের সার্কুলারে মাসিক তথ্য পরের মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে আপলোড, আপলোড করা তথ্য ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সংশোধন এবং অসন্তোষজনক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ব্যাংককে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে।[9] ব্যাংক ইচ্ছাকৃত খেলাপি চূড়ান্ত করলে সিআইবিতে সেই তথ্যও যায়।[4] ঋণগ্রহীতার জন্য এর অর্থ পরিষ্কার: ব্যাংক যা জানায়, সিআইবি রিপোর্ট তা-ই দেখায়, এবং ভুল সংশোধনের দায়ও প্রথমত সেই ব্যাংকের।

ভুল সিআইবি রিপোর্ট সংশোধনের উপায়

ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ নয়, আপনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা জামিনদার নন, অথবা ঋণ পরিশোধের পরও নাম রয়ে গেছে, এমন ক্ষেত্রে প্রথমে রিপোর্টকারী ব্যাংকের শাখা ও প্রধান কার্যালয়ে লিখিত আপত্তি দিন, সঙ্গে পরিশোধের রসিদ, দায়মুক্তি সনদ বা অন্য প্রমাণ। ব্যাংক তথ্য সংশোধন করে সিআইবিতে হালনাগাদ পাঠালে তবেই রেকর্ড বদলায়। পরে নতুন করে সিআইবি রিপোর্ট তুলে মিলিয়ে নিন। ব্যাংক সাড়া না দিলে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ এবং প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবতে হয়।

সিআইবি নিয়ে আদালতের পথ কতটা খোলা

দেওয়ানি মামলা করে সিআইবিতে নাম পাঠানো ঠেকানোর পথ সংকীর্ণ। ২০২৫ সালের ১ জুন হাইকোর্ট বিভাগ জনতা ব্যাংকের একটি মামলায় বলেছে, সিআইবিতে তথ্য দেওয়া একটি আইনগত দায়িত্ব, তাই তালিকাভুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা ও নিষেধাজ্ঞা চেয়ে করা মামলা টেকে না।[14] অন্যদিকে রিট এখতিয়ার বহুল ব্যবহৃত: ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে জামিনদারদের নাম সিআইবি থেকে স্থগিত চেয়ে ৭৪৮টি রিট হয় এবং ৫৫৪টিতে নাম স্থগিত হয়।[10] তবে স্থগিতাদেশ অন্তর্বর্তী, তাতে দেনা কমে না, সুদ চলতেই থাকে।

সিআইবি ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার বাস্তব পথ

সিআইবি থেকে নাম মোছার আলাদা কোনো আবেদন নেই। পুরো টাকা পরিশোধ, বোর্ড অনুমোদিত আপস বা এক্সিট, কিংবা পুনঃতফসিল করে হিসাব নিয়মিত করা, এই তিন পথেই অবস্থা বদলায়। পুনঃতফসিলকৃত ঋণ বিশেষ উল্লেখিত হিসাবে থাকে; কিস্তি খেলাপ করলে আবার শ্রেণীকৃত হয়।[7] টাকা দেওয়ার সময় লিখিত দায়মুক্তি বা আপসপত্র, জামানত ও জামিনদারের অব্যাহতি এবং সিআইবিতে হালনাগাদ পাঠানোর লিখিত নিশ্চয়তা নিন।

অর্থ ঋণ আদালত — সিআইবি রিপোর্ট ও ক্রেডিট ইতিহাস যাচাই
সিআইবি রিপোর্ট ব্যাংকের পাঠানো তথ্যই দেখায়

অর্থ ঋণ আদালতে মামলা: এখতিয়ার ও মামলার আগে জামানত বিক্রি

আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায়ের প্রতিটি মামলা, বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি বা ফোরক্লোজারের মামলাসহ, কেবল এই আদালতেই দায়ের ও নিষ্পত্তি হবে। বিচার পর্যায়ে টাকার কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই। "আর্থিক প্রতিষ্ঠান" বলতে বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি বোঝায়, আর "ঋণ" বলতে অগ্রিম, ওভারড্রাফট, শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ, গ্যারান্টি ও ঋণপত্রও অন্তর্ভুক্ত।[1] বিচারক হন যুগ্ম জেলা জজ। আইনের ধারা ২০ অনুযায়ী আইনে বলা পথ ছাড়া অন্য কোনো আদালত এই কার্যধারা বা ডিক্রি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না।[1]

ধারা ১২: মামলার আগে জামানত বিক্রি

বন্ধক বা দায়বদ্ধ সম্পত্তি বিক্রির ক্ষমতা থাকলে ব্যাংককে আগে সেই সম্পত্তি বিক্রি করতে হবে বা বিক্রির চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে হবে, তারপর মামলা। বিক্রির বিজ্ঞপ্তি অন্তত ১৫ দিন আগে জাতীয় বাংলা দৈনিকে দিতে হয়। ব্যাংক এই ধাপ বাদ দিলেও মামলা খারিজ হয় না, তবে ধারা ১২(৬) অনুযায়ী আদালত সম্পত্তির ঘোষিত বা সাব-রেজিস্ট্রারের প্রতিবেদনে নির্ধারিত মূল্য দাবি থেকে বাদ দেবে এবং সম্পত্তির মালিকানা ব্যাংকে বর্তাবে।[1] বিবাদীর জন্য এটি প্রায়ই সবচেয়ে মূল্যবান প্রাথমিক আবেদন, যদিও বাজারমূল্যের তুলনায় ব্যাংকের মূল্যায়ন কম হলে হিসাব কষে নিতে হয়।

মামলার প্রক্রিয়া: সমন, লিখিত জবাব ও একতরফা ডিক্রি

ব্যাংক হলফনামাসহ আরজি দাখিল করে; তাতে আসল, সুদ, দণ্ডসুদ, চার্জ ও প্রতিটি জমার তফসিল এবং বন্ধকি সম্পত্তির বিবরণ থাকতে হয়। তৃতীয় পক্ষ বন্ধকদাতা ও জামিনদারকে বিবাদী করা বাধ্যতামূলক। সমন জারিকারক ও রেজিস্ট্রি ডাকে যায়; ১৫ দিনের মধ্যে জারি না হলে জাতীয় বাংলা দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয় এবং সেটিই বৈধ জারি ধরা হয়।[1] তাই অনেকে প্রথম জানতে পারেন পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি বা জারি মামলার নোটিশ থেকে।

লিখিত জবাব: ৪০ দিনের কঠোর সময়সীমা

ধারা ১০ অনুযায়ী উপস্থিতির ৪০ দিনের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে হয়। ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা খরচ আগে জমা দিলে আদালত আরও ২০ দিন দিতে পারে; এর পর মামলা একতরফা চলে। ধারা ৯ অনুযায়ী জবাবে স্বীকৃত দাবি আলাদা অনুচ্ছেদে লিখতে হয় এবং প্রতিটি বিরোধিত অঙ্ক কারণসহ দেখাতে হয়। ধারা ১৮ অনুযায়ী জবাবে দায় সমন্বয় (সেট-অফ) বা পাল্টা দাবি করা যায় না।[1] "সমস্ত দাবি অস্বীকার" ধরনের ঢালাও জবাব সবচেয়ে ক্ষতিকর ভুল।

একতরফা ডিক্রি বাতিল: ১০ শতাংশ জমা

ধারা ১৯ অনুযায়ী একতরফা ডিক্রির তারিখ বা তা জানার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বাতিলের আবেদন করতে হয় এবং ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রির ১০ শতাংশ জমা দিতে হয়। জমা হলে মামলা পুনরুজ্জীবিত হয়, না হলে আবেদন খারিজ।[1] কবে ডিক্রির কথা জানলেন, তার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। জবাব তৈরির কৌশল নিয়ে আমাদের ইংরেজি নির্দেশিকা how to defend a bank suit in Bangladesh বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়।

মামলার ধাপগুলো এক নজরে

ধাপ 01

খেলাপি ও নোটিশ

কিস্তি বকেয়া হলে ঋণ শ্রেণীকৃত হয়, সিআইবিতে তথ্য যায় এবং ব্যাংক দাবিনামা পাঠায়।

ধাপ 02

জামানত বিক্রি

বিক্রির ক্ষমতা থাকলে ব্যাংক মামলার আগে বন্ধকি বা দায়বদ্ধ সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করে।

ধাপ 03

আরজি ও সমন

হলফনামাসহ আরজি দাখিল; ১৫ দিনে সমন জারি না হলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি।

ধাপ 04

লিখিত জবাব

উপস্থিতির ৪০ দিনের মধ্যে, খরচ দিয়ে আরও ২০ দিন; স্বীকৃত ও বিরোধিত অঙ্ক আলাদা।

ধাপ 05

মধ্যস্থতা

জবাবের পর বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা ৬০ দিন, প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন।

ধাপ 06

রায় ও ডিক্রি

আপস না হলে শুনানি ও ডিক্রি; মোট দাবি আসলের ২০০ শতাংশের বেশি নয়।

ধাপ 07

জারি ও নিলাম

ডিক্রির এক বছরের মধ্যে জারি মামলা, নিলাম, মালিকানা হস্তান্তর বা দেওয়ানি আটক।

ধাপ 08

আপিল

৫০ শতাংশ জমা দিয়ে আপিল, ৭৫ শতাংশ জমা দিয়ে রিভিশন।

যে আত্মপক্ষ সমর্থন কাজে আসে

  • হিসাব যাচাই: মঞ্জুরিপত্র, বিতরণ ও স্টেটমেন্ট ধরে হিসাব পুনর্গঠন করুন; বেআইনি দণ্ডসুদ ও মূলধনে রূপান্তরিত সুদ চিহ্নিত করুন।
  • ২০০ শতাংশের সীমা: ধারা ৪৭ অনুযায়ী মোট দাবি আসলের ২০০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারে না।[1]
  • আত্মসাৎ: ধারা ১৮(১) অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের নিজের কর্মকর্তার আত্মসাৎ করা টাকা ঋণ হিসেবে আদায়যোগ্য নয়।[1]
  • জামানতের মূল্য: বিক্রির ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিক্রি না করে মামলা হলে ধারা ১২(৬)-এর আবেদন।[1]
  • জামিনদারের অব্যাহতি: চুক্তি আইনের ধারা ১৩৩ থেকে ১৪১-এর ঘটনা, যা নিচে আলাদাভাবে আলোচিত।[3]

মধ্যস্থতা ও আপস: মামলা মেটানোর সেরা সুযোগ

লিখিত জবাব দাখিলের পর আদালত মামলাটি ধারা ২২ অনুযায়ী মধ্যস্থতায় পাঠাবে। পক্ষগণের আইনজীবীরা সম্মতিতে মামলায় নিযুক্ত নন এমন একজন আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার বা উপযুক্ত অন্য কাউকে মধ্যস্থতাকারী করেন; ১০ দিনের মধ্যে নাম না দিলে আদালত নিয়োগ দেয়। মধ্যস্থতা ৬০ দিনে শেষ করতে হয়, প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন। আলোচনা গোপনীয় ও সাক্ষ্য হিসেবে অগ্রহণযোগ্য। আপস হলে আদালতের আদেশ চূড়ান্ত, তার বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিশন চলে না, এবং বাদী পুরো কোর্ট ফি ফেরতের সনদ পায়।[1]

আপসের অন্য সুযোগ ও কিস্তি

মধ্যস্থতা ব্যর্থ হলেও পথ বন্ধ নয়: রায়ের আগে আদালতের অনুমতিতে ধারা ২৩, জারি পর্যায়ে ধারা ৩৮, আপিল বা রিভিশনে ধারা ৪৪ক এবং যেকোনো পর্যায়ে ধারা ৪৫-এর আপস। ব্যাংকের বোর্ডকে ধারা ২৪ অনুযায়ী আপসের ক্ষমতা অর্পণ করতে হয়, আর ৫ কোটি টাকার বেশি দাবির আপসে ধারা ২৫ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদন লাগে। ধারা ৪৯ অনুযায়ী আদালত এক বছরে চার কিস্তি, বা ডিক্রিদারের সম্মতিতে তিন বছরে বারো কিস্তি দিতে পারে; একটি কিস্তি খেলাপ হলে পুরো বাকি টাকা একসঙ্গে দেয়।[1] আদালত-সংযুক্ত মধ্যস্থতার সাধারণ কাঠামো জানতে দেখুন court-annexed mediation in Bangladesh।

অর্থ ঋণ আদালত — মধ্যস্থতায় ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার আপস আলোচনা
মধ্যস্থতা মামলা মেটানোর সবচেয়ে সাশ্রয়ী সুযোগ

ডিক্রি, সুদ ও ২০০ শতাংশের সীমা

ধারা ৪৭ অনুযায়ী চুক্তিতে যা-ই থাকুক, আদালতে উত্থাপিত মোট দাবি আসলের ওপর ২০০ শতাংশের বেশি হতে পারে না: ১০০ টাকা আসলে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। এই সীমা সাপেক্ষে ধারা ৫০(১) অনুযায়ী মামলা পর্যন্ত বৈধভাবে আরোপিত সুদ আদালত কমাতে পারে না।[1] অর্থাৎ যুক্তি হতে হবে "সুদ বেআইনি বা মঞ্জুরিপত্র ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপন্থী", কেবল "সুদ বেশি" নয়।

মামলা দায়ের থেকে আদায় পর্যন্ত ধারা ৫০(২) অনুযায়ী সরল সুদ: ডিক্রি চ্যালেঞ্জ না করলে বার্ষিক ১২ শতাংশ, আপিল বা রিভিশন করলে ১৬ শতাংশ, আপিল বিভাগে গেলে ১৮ শতাংশ, যদি না উচ্চ আদালত ডিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলায়।[1] প্রতিটি চ্যালেঞ্জের তাই একটি সুদ-মূল্য আছে।

নন-ফোরক্লোজার মামলার ডিক্রিও বন্ধকি সম্পত্তির ওপর প্রাথমিক ফোরক্লোজার ডিক্রি হিসেবে কাজ করে। নিলামে সম্পত্তি বিক্রি হয়ে গেলে ডিক্রি ও বিক্রি চূড়ান্ত হয় এবং ঋণগ্রহীতা খালাসের অধিকার হারান।[1]

জারি মামলা ও নিলাম: ডিক্রি থেকে আদায়

ডিক্রি মানেই টাকা নয়। আদায়ের জন্য ব্যাংককে একই অর্থ ঋণ আদালতে আলাদা জারি মামলা (অর্থজারি মামলা) করতে হয়। ধারা ২৮ অনুযায়ী তামাদি আইন যা-ই বলুক, ডিক্রির এক বছরের মধ্যে জারি মামলা করতে হবে; পরবর্তী জারি মামলা আগেরটির নিষ্পত্তির এক বছরের মধ্যে, এবং প্রথমটির ছয় বছর পর আর কোনো জারি মামলা নয়।[1] দেরিতে করা জারি মামলা সরাসরি নাকচযোগ্য, তাই বিবাদীর প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত তারিখ। ধারা ৩১ অনুযায়ী আপিল বা রিভিশন দায়েরে জারি আপনাআপনি স্থগিত হয় না; সুনির্দিষ্ট স্থগিতাদেশ লাগে।[1]

ধারা ৩৩: নিলাম ও ব্যাংকের নামে মালিকানা

আদালত অন্তত ১৫ দিনের নোটিশে জাতীয় বাংলা দৈনিক, আদালতের নোটিশ বোর্ড ও স্থানীয় ঢোল শহরতের মাধ্যমে সিলমোহরকৃত দরপত্র আহ্বান করে। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দরে ২০ শতাংশ, ৫০ লাখ পর্যন্ত ১৫ শতাংশ এবং তার বেশি দরে ১০ শতাংশ জামানত দিতে হয়। নিলামে বিক্রি না হলে সম্পত্তি দখলসহ ডিক্রিদারে বর্তায়; ডিক্রিদার ধারা ৩৩(৭) অনুযায়ী মালিকানার সনদ চাইতে পারে, যা নিবন্ধন ফি ছাড়াই দলিল হিসেবে কাজ করে। দখল দেওয়ার আগে আদালতকে নিশ্চিত হতে হয় সম্পত্তিটি প্রকৃত মালিকই বন্ধক দিয়েছিলেন।[1]

তৃতীয় পক্ষের দাবি ও পাওনা ক্রোক

ক্রোক করা সম্পত্তিতে তৃতীয় পক্ষ দাবি করলে ধারা ৩২ অনুযায়ী ডিক্রির ১০ শতাংশ জামানত দিতে হয়; বিলম্বের উদ্দেশ্যে দাবি করা হলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ধারা ৩৬ অনুযায়ী দায়িকের কাছে টাকা পাওনা এমন যেকোনো ব্যক্তি, ব্যাংক বা বিমা প্রতিষ্ঠানকে সেই টাকা আদালতে জমার নির্দেশ দেওয়া যায়।[1] সাধারণ দেওয়ানি জারির পদ্ধতি জানতে দেখুন execution case in Bangladesh।

অর্থ ঋণ আদালতে জামিন ও দেওয়ানি কারাদণ্ড

"অর্থ ঋণ মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হয়েছে, জামিন নেব কীভাবে?" এটি আমাদের কাছে আসা সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলোর একটি। উত্তর বুঝতে হলে আগে জানতে হবে এটি কী ধরনের আটক। ধারা ৩৪ অনুযায়ী ডিক্রিদারের দরখাস্তে অর্থ ঋণ আদালত ডিক্রির টাকা আদায়ে বাধ্য করতে দায়িককে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য দেওয়ানি কারাগারে আটক রাখতে পারে।[2] এটি কোনো অপরাধের শাস্তি নয়, টাকা আদায়ের চাপ। তাই ফৌজদারি মামলার মতো জামিনের আবেদন এখানে চলে না; মুক্তির শর্ত আইনেই লেখা।

কখন আটক করা যায়

  • নিলাম আগে: সাধারণত অন্তত একবার নিলাম হয়ে তাতে ডিক্রির টাকা আদায় না হলে আটকাদেশ দেওয়া যায়; কোনো কারণে নিলাম করা সম্ভব না হলে সরাসরি গ্রেপ্তার ও আটক করা যায়।[2]
  • কোম্পানি বা ফার্ম: দায়িক কোম্পানি বা অংশীদারি কারবার হলে তা গঠনকারী ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত ও যৌথভাবে আটকযোগ্য; তবে ঋণ নেওয়ার পরে সেই পদে আসা ব্যক্তি নন।[2]
  • অব্যাহতি: মৃত ঋণগ্রহীতার উত্তরাধিকারী এবং ১৮ বছরের কম বয়সী কাউকে আটক করা যায় না।[2]

মুক্তির উপায়: ২৫ শতাংশ ও মুচলেকা

আটক ব্যক্তি পুরো টাকা দিলে আদালত মুক্তির আদেশ দেবে; না দিলে ছয় মাস পূর্ণ হলে মুক্তি। এর আগেই মুক্তি পাওয়া যায় অপরিশোধিত ডিক্রির ২৫ শতাংশ নগদ জমা দিয়ে এবং বাকি টাকা ৯০ দিনের মধ্যে দেওয়ার মুচলেকা দিয়ে। মুচলেকা ভাঙলে আবার গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ ছয় মাসের নতুন আটক হতে পারে। পূর্ণ মেয়াদ খাটা ব্যক্তিকে একাধিক জারি মামলাতেও আর আটক করা যায় না, কিন্তু আটক থাকলে দেনা মাফ হয় না।[2] বাস্তবে "জামিন" বলতে মানুষ এই ২৫ শতাংশ জমা ও মুচলেকার পথটিকেই বোঝান।

ফৌজদারি মামলায় জামিন কোথায় প্রাসঙ্গিক

ঋণসংক্রান্ত বিরোধে সত্যিকারের ফৌজদারি ঝুঁকি আসে অন্য পথে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি চূড়ান্ত হওয়ার পর দুই মাসের নোটিশে টাকা না দিলে ব্যাংক ধারা ২৭খ অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা করতে পারে, এবং তা অর্থ ঋণ মামলার পাশাপাশি চলে।[4] জামানত হিসেবে দেওয়া চেক ডিজঅনার হলে এনআই অ্যাক্ট (Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ধারা ১৩৮-এর মামলাও হয়। এসব ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির জামিন ও আগাম জামিনের নিয়ম প্রযোজ্য। দেখুন cheque dishonour in Bangladesh ও anticipatory bail in Bangladesh।

আপিল, রিভিশন ও রিট: আগে টাকা জমা

ধারা ৪১ অনুযায়ী ৫০ লাখ টাকার বেশি ডিক্রির আপিল ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে, কম হলে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা জজ আদালতে। বিবাদীকে ডিক্রির ৫০ শতাংশ ব্যাংকে বা আদালতে জামানত হিসেবে জমা দিয়ে তার প্রমাণ আপিলের সঙ্গে দিতে হয়, নইলে আপিল গ্রহণযোগ্য নয়; ধারা ১৯-এর ১০ শতাংশ এর সঙ্গে সমন্বয় হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আপিল করলে কিছুই জমা দিতে হয় না। আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিশনে মোট ৭৫ শতাংশ জমা লাগে।[1]

রিট দায়েরে কোনো জমা নির্ধারিত নেই, কিন্তু ধারা ৫০(৪) অনুযায়ী যিনি জমা দিয়ে আপিল করতে পারতেন অথচ রিট করেছেন, সেই রিট খারিজ হলে বার্ষিক ২৫ শতাংশ সুদ প্রযোজ্য।[1] এখতিয়ারহীনতা বা অন্তর্বর্তী আদেশের মতো ব্যতিক্রম ছাড়া রিট ঝুঁকিপূর্ণ; দেখুন writ petitions in Bangladesh।

অর্থ ঋণ মামলার মূল সময়সীমা ও জমার শর্ত
ধাপধারাসময়সীমাজমা বা শর্ত
লিখিত জবাবধারা ১০উপস্থিতির ৪০ দিন + ২০ দিনবাড়তি সময়ে ২,০০০–৫,০০০ টাকা খরচ
একতরফা ডিক্রি বাতিলধারা ১৯ডিক্রি বা জানার ৩০ দিন১৫ দিনের মধ্যে ১০ শতাংশ
মধ্যস্থতাধারা ২২৬০ দিন + ৩০ দিনসফল হলে কোর্ট ফি ফেরত
জারি মামলাধারা ২৮ডিক্রির এক বছরপ্রথমটির ছয় বছর পর আর নয়
দেওয়ানি আটকধারা ৩৪সর্বোচ্চ ছয় মাস২৫ শতাংশ জমা ও ৯০ দিনের মুচলেকায় মুক্তি
আপিলধারা ৪১৩০ বা ৬০ দিনডিক্রির ৫০ শতাংশ
রিভিশনধারা ৪২—মোট ৭৫ শতাংশ

ঋণের জামিনদারের দায়: চুক্তি আইন ও বাস্তবতা

বন্ধু, আত্মীয় বা ব্যবসায়িক অংশীদারের ঋণে সই করা অনেকের কাছেই আনুষ্ঠানিকতা মনে হয়। আইন তা মনে করে না। চুক্তি আইন ১৮৭২-এর ধারা ১২৮ অনুযায়ী, চুক্তিতে ভিন্ন কিছু না থাকলে জামিনদারের দায় মূল ঋণগ্রহীতার দায়ের সমবিস্তৃত।[3] অর্থাৎ ব্যাংক চাইলে অর্থ ঋণ আদালতে একই মামলায় ঋণগ্রহীতা ও জামিনদার দুজনের বিরুদ্ধেই ডিক্রি নিতে পারে। আইনের ধারা ৬(৫) জামিনদার ও তৃতীয় পক্ষ বন্ধকদাতাকে বিবাদী করা বাধ্যতামূলক করেছে; ডিক্রি যৌথ ও পৃথকভাবে কার্যকর, তবে জারিতে আগে মূল ঋণগ্রহীতার সম্পত্তি থেকে আদায়ের চেষ্টা করতে হয়।[1]

ঝুঁকিটা কাগুজে নয়। ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার সাতটি অর্থ ঋণ আদালতে বিচারাধীন ৩১,৩০৯টি মামলার মধ্যে ১০,২১১টিতে জামিনদারেরা সহ-বিবাদী, যেখানে জড়িত প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা।[10] ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে জামিনদারের নামও সিআইবিতে ওঠে।[10]

২০২৬ সালের অভিন্ন ব্যক্তিগত গ্যারান্টি ফরম

২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারির বিআরপিডি-১ সার্কুলার নং ০১ অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে একটি অভিন্ন ব্যক্তিগত গ্যারান্টি ফরম ব্যবহার করতে হয়। গ্যারান্টিটি অপ্রত্যাহারযোগ্য ও শর্তহীন, প্রথম দাবির সাত কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধযোগ্য এবং আংশিক পরিশোধের পরও বহাল থাকে।[6] সময় বাড়ানো বা শর্ত বদলানোর পরও গ্যারান্টি টিকে থাকে কেবল জামিনদারের পূর্বসম্মতি নেওয়া থাকলে, আর পরিবর্তন লিখিত দলিলে দুই পক্ষের সইয়ে হতে হয়।[6]

জামিনদারের অধিকার ও অব্যাহতি

  • অব্যাহতির ঘটনা: জামিনদারের সম্মতি ছাড়া চুক্তির শর্ত পরিবর্তন (ধারা ১৩৩), মূল ঋণগ্রহীতাকে অব্যাহতি (ধারা ১৩৪), বা তাকে সময় দেওয়া বা আপস করা (ধারা ১৩৫) জামিনদারকে মুক্ত করতে পারে; তবে শুধু মামলা না করা অব্যাহতি নয় (ধারা ১৩৭)।[3]
  • জামানতের সুবিধা: ব্যাংকের কাছে থাকা সব জামানতের সুবিধা জামিনদার পান; সম্মতি ছাড়া ব্যাংক জামানত হারালে সেই মূল্য পর্যন্ত জামিনদার মুক্ত হন (ধারা ১৪১)।[3]
  • টাকা দিলে কী পান: পরিশোধের পর জামিনদার পাওনাদারের সব অধিকার লাভ করেন (ধারা ১৪০), এবং ধারা ১৪৫ অনুযায়ী ন্যায্যভাবে পরিশোধিত টাকা মূল ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে আদায় করতে পারেন।[3] এই আইনেও পরিশোধকারী তৃতীয় পক্ষ ডিক্রিটি নিজে কার্যকর করার অধিকার পান।[1]

জামিনদারের প্রতিরক্ষার মূল প্রশ্ন তাই তথ্যগত: প্রতিটি নবায়ন, সীমাবৃদ্ধি ও পুনঃতফসিলে কি আপনার লিখিত সম্মতি নেওয়া হয়েছিল? মূল মেয়াদি ঋণের গ্যারান্টি নতুন বা পুনর্গঠিত সুবিধাকে আপনাআপনি ঢাকে না। মঞ্জুরিপত্রের পুরো শৃঙ্খল চেয়ে নিন এবং প্রতিটি অব্যাহতির ঘটনা জবাবে আলাদাভাবে লিখুন।

অর্থ ঋণ আদালত — ঋণের জামিনদারের গ্যারান্টি চুক্তিতে স্বাক্ষর
জামিনদারের সই মানে মূল ঋণগ্রহীতার সমান দায়

ব্যাংক মামলা থেকে সুরক্ষার উপায়: পুনঃতফসিল, এক্সিট ও আপস

বেশির ভাগ ঋণগ্রহীতার জন্য বাস্তব মুক্তির পথ মামলায় জেতা নয়, বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতির আওতায় ঋণ নিয়মিত করা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের বিশেষ নীতিতে বিনিময় হার, জ্বালানি সংকটসহ নিয়ন্ত্রণের বাইরের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসার শ্রেণীকৃত ঋণ সর্বোচ্চ ১০ বছরে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়; ন্যূনতম ডাউন পেমেন্ট বকেয়ার ২ শতাংশ, তিন বা তার বেশিবার পুনঃতফসিলকৃত হলে এক শতাংশ বেশি। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও অবৈধভাবে নেওয়া ঋণ এই সুবিধা পায় না, এবং তিনটি মাসিক বা একটি ত্রৈমাসিক কিস্তি না দিলে ঋণ আবার শ্রেণীকৃত হয়।[7]

২০২৬ সালের এককালীন এক্সিট ও সুদ মওকুফ

২৯ জুন ২০২৬-এর নির্দেশনায় ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে মন্দ বা ক্ষতিজনক শ্রেণিতে থাকা ঋণগ্রহীতা ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আসল পরিশোধ করলে ব্যাংকের বোর্ড আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফ করতে পারে। শর্ত হলো, অন্য সব দায়ও একসঙ্গে শোধ করতে হবে এবং কৃষি ও কুটির-ক্ষুদ্র শিল্পের স্বল্পমেয়াদি ঋণ অগ্রাধিকার পাবে।[11] বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য ৩১ আগস্ট ২০২৬-এর সার্কুলারে ১,০০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের বিশেষ পুনঃতফসিল দেওয়া হয়েছে; আবেদনের শেষ দিন ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর, আর ডাউন পেমেন্ট পাওয়ার পর ব্যাংককে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।[12]

মামলা চলাকালে আপস করলে যা লিখিয়ে নেবেন

মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় পুনঃতফসিল বা এক্সিট হলে চুক্তিতে স্পষ্ট লিখুন: অর্থ ঋণ মামলা ও জারি মামলার কী হবে, জামিনদার ও বন্ধকি সম্পত্তি কবে মুক্ত হবে, জমা টাকা কোন খাতে সমন্বয় হবে এবং সিআইবি কবে হালনাগাদ হবে। মধ্যস্থতা পর্যায়ে আপস করলে কোর্ট ফি ফেরতও পাওয়া যায়।[1] মনে রাখবেন, প্রতিটি সুবিধা ব্যাংকের বোর্ডের সিদ্ধান্ত, অধিকার হিসেবে দাবি করা যায় না।[11]

অর্থ ঋণ মামলার আইনজীবীর ভূমিকা ও ২০২৬ সালের সংস্কার

অর্থ ঋণ মামলায় ভালো আইনজীবীর কাজ মূলত তিনটি: প্রতিটি সময়সীমা দিনক্ষণসহ লিপিবদ্ধ রাখা, ব্যাংকের হিসাব ভেঙে ২০০ শতাংশের সীমা ও বেআইনি চার্জ বের করা, এবং মধ্যস্থতায় বোর্ড অনুমোদনযোগ্য বাস্তব প্রস্তাব তৈরি করা। পাশাপাশি চেক মামলা, রিট, সিআইবি ও পুনঃতফসিল একসঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। ঢাকার আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগে অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক হিসাব বোঝার দক্ষতা এখানে অপরিহার্য।

সংস্কারের দিক থেকে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৩ সালের আইন প্রতিস্থাপনে একটি খসড়া অধ্যাদেশ তৈরি করে, যাতে আপিল আদালত, আদায় কর্মকর্তা এবং খেলাপির জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট স্থগিতের প্রস্তাব ছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আইন মন্ত্রণালয় নতুন আইনের প্রস্তাব নাকচ করে লক্ষ্যভিত্তিক সংশোধনী প্রস্তুতের কথা বলে, যার জন্য নয় সদস্যের কমিটি কাজ করছে।[13] ২১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ২০০৩ সালের আইনটিই বলবৎ; এখানে বর্ণিত জমা, সুদ ও জারির নিয়ম অপরিবর্তিত।

ইংরেজিতে পূর্ণাঙ্গ আইনি বিশ্লেষণের জন্য দেখুন Artha Rin Adalat Ain 2003। TRW ঋণগ্রহীতা, জামিনদার, তৃতীয় পক্ষ মালিক ও ব্যাংকের পক্ষে কাজ করে আমাদের ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স লিটিগেশন প্র্যাকটিস এবং রিস্ট্রাকচারিং ও ইনসলভেন্সি প্র্যাকটিসের মাধ্যমে। আরজি, ডিক্রি বা সিআইবি রিপোর্ট পর্যালোচনা করাতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করলে কি জেল হয়?

সাধারণ খেলাপিতে ফৌজদারি সাজা হয় না, তবে জারি মামলায় নিলাম ব্যর্থ হলে ধারা ৩৪ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ছয় মাসের দেওয়ানি আটক হতে পারে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি বা চেক ডিজঅনারের ক্ষেত্রে আলাদা ফৌজদারি মামলা হতে পারে।[2] [4]

কখন একজন ঋণগ্রহীতা ঋণখেলাপি হন?

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা ৫(গগ) অনুযায়ী ঋণ বা সুদ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ছয় মাস পরও অপরিশোধিত থাকলে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ৯০ দিন বকেয়া হলেই ঋণ শ্রেণীকৃত হয়।[4] [5]

লিখিত জবাব দেওয়ার সময়সীমা কত?

উপস্থিতির ৪০ দিন; ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা খরচ জমা দিলে আরও ২০ দিন। এরপর মামলা একতরফা নিষ্পত্তি হয়।[1]

অর্থ ঋণ মামলায় মধ্যস্থতা কি বাধ্যতামূলক?

হ্যাঁ। লিখিত জবাবের পর ধারা ২২ অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যস্থতা, প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন। আপস হলে আদেশ চূড়ান্ত এবং কোর্ট ফি ফেরত হয়।[1]

আপিল করতে কত টাকা জমা দিতে হয়?

ডিক্রির ৫০ শতাংশ; রিভিশনে মোট ৭৫ শতাংশ। একতরফা ডিক্রি বাতিলে ১০ শতাংশ, যা পরে আপিলের জমায় সমন্বয় হয়।[1]

জারি মামলা কত দিনের মধ্যে করতে হয়?

ডিক্রির এক বছরের মধ্যে; পরবর্তী মামলা আগেরটির নিষ্পত্তির এক বছরের মধ্যে, এবং প্রথমটির ছয় বছর পর আর নয়।[1]

দেওয়ানি আটক থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী?

পুরো টাকা পরিশোধ, অথবা অপরিশোধিত ডিক্রির ২৫ শতাংশ নগদ জমা দিয়ে বাকি টাকা ৯০ দিনের মধ্যে দেওয়ার মুচলেকা। মুচলেকা ভাঙলে আবার আটক হতে পারে।[2]

জামিনদার কি ঋণগ্রহীতার সমান দায়ী?

চুক্তিতে ভিন্ন কিছু না থাকলে হ্যাঁ, চুক্তি আইনের ধারা ১২৮ অনুযায়ী দায় সমবিস্তৃত। তবে জারিতে আগে মূল ঋণগ্রহীতার সম্পত্তি থেকে আদায়ের চেষ্টা করতে হয়।[1] [3]

ভুল সিআইবি রিপোর্ট কীভাবে সংশোধন করব?

প্রমাণসহ রিপোর্টকারী ব্যাংকে লিখিত আপত্তি দিন; ব্যাংক সংশোধিত তথ্য পাঠালে রেকর্ড বদলায়। ২০২৫ সালের সার্কুলার অনুযায়ী ব্যাংককে আপলোড করা তথ্য ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সংশোধন করতে হয়।[9]

২০২৬ সালে কি অর্থ ঋণ আদালত আইন সংশোধন হয়েছে?

২১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত হয়নি। জানুয়ারিতে নতুন আইনের খসড়া নাকচ হয়েছে এবং একটি কমিটি লক্ষ্যভিত্তিক সংশোধনী তৈরি করছে।[13]

সূত্র তালিকা

প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র

উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।

  1. অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ (২০০৩ সনের ৮ নং আইন), সংশোধিত — বাংলাদেশ আইন (bdlaws)
  2. Artha Rin Adalat Ain 2003, ধারা ৩৪ (দেওয়ানী আটকাদেশ) — বাংলাদেশ আইন (bdlaws)
  3. Contract Act 1872, sections 126–147 (indemnity and guarantee) — Laws of Bangladesh
  4. Bank Company Act 1991, as amended in 2023, sections 5, 27Ka, 27KaKa, 27Kha — Laws of Bangladesh
  5. The Daily Star, 27 November 2024 — BB tightens loan classification rules to meet IMF conditions
  6. Bangladesh Bank — BRPD-1 Circular No. 01, 4 January 2026: uniform Personal Guarantee Form
  7. The Daily Star, 16 September 2025 — Fresh loan rescheduling policy for troubled businesses
  8. বিডিনিউজ২৪, ১২ অক্টোবর ২০২৩ — সিআইবির নিয়ম পরিবর্তনের সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক নেই: কেন্দ্রীয় ব্যাংক
  9. টিবিএস বাংলা, ৫ মার্চ ২০২৫ — সিআইবিতে তথ্য দিতে ব্যর্থতার কারণ সন্তোষজনক না হলে ৫ লাখ টাকা জরিমানা
  10. The Business Standard, 5 October 2025 — Over 10,000 loan guarantors face default cases
  11. টিবিএস বাংলা (বিবিসি বাংলা), ১ জুলাই ২০২৬ — খেলাপি ঋণ কমাতে সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত, এই সুবিধা কারা পাবে?
  12. The Financial Express, 31 August 2026 — BB extends policy support application deadline, expands debt restructuring
  13. The Financial Express, 19 January 2026 — Law ministry turns down draft Money Loan Court Act
  14. Supreme Court of Bangladesh, High Court Division — First Miscellaneous Appeal No. 92 of 2024 (Janata Bank, CIB), judgment of 1 June 2025

TRW-এর সহায়তা

তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে

TRW অর্থ ঋণ মামলা, জারি ও নিলাম, আপিল ও রিট, সিআইবি সংশোধন, পুনঃতফসিল ও জামিনদারের প্রতিরক্ষায় ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংক উভয় পক্ষকে পরামর্শ দেয়। দেখুন আমাদের ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স লিটিগেশন প্র্যাকটিস, অথবা আপনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

Message TRW on WhatsApp