TRW Insight / বাংলাদেশ
পরিবারের ভেতরে জমি বা বাড়ি দেওয়ার সবচেয়ে সাশ্রয়ী পথ হেবা, কিন্তু দখল হস্তান্তর, খতিয়ান ও নিবন্ধনের একটি ভুলেই দান টেকে না। ২০২৬ সালের নতুন আজীবন ভোগস্বত্বের বিধান এবং প্রবাস থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির নিয়ম জেনে নিলে সম্পত্তি ও সম্পর্ক দুটোই সুরক্ষিত থাকে।
হেবা দলিল: ২০২৬ সালে পারিবারিক দানের পূর্ণ চিত্র
পরিবারের ভেতরে জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ি দেওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত আইনি পথ হেবা দলিল। মুসলিম আইনে হেবা মানে জীবদ্দশায় বিনা মূল্যে নিজের সম্পত্তি অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া; একসময় মুখের কথায় আর দখল বুঝিয়ে দিলেই তা পূর্ণ হতো। এখন স্থাবর সম্পত্তির হেবা রেজিস্ট্রি না করলে আইনের চোখে মালিকানাই বদলায় না, আর নিকটাত্মীয়দের মধ্যে হেবার ঘোষণাপত্র নিবন্ধনের ফি মাত্র ১০০ টাকা।[1] তবু হেবা নিয়ে মামলার শেষ নেই, কারণ কাগজে সব ঠিক থাকলেও দখল হস্তান্তর না হলে বা দাতার খতিয়ান হালনাগাদ না থাকলে পুরো দান প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই লেখায় একসঙ্গে পাবেন হেবার তিন শর্ত, হেবা-বিল-এওয়াজ, রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৭৮ক অনুযায়ী ১০০ টাকার ফি ও কারা নিকটাত্মীয়, প্রয়োজনীয় কাগজ ও খরচ, হেবা বাতিলের নিয়ম, হেবা ও উইলের পার্থক্য, হেবার পর নামজারি এবং সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সংসদে পাস হওয়া আজীবন ভোগস্বত্ব রেখে দানের নতুন বিধান। শেষ অংশে আছে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২: সাধারণ ও অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার, রেজিস্ট্রেশন, বিক্রির জন্য পাওয়ার এবং প্রবাস থেকে দূতাবাসের মাধ্যমে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি পাঠানোর পুরো পথ।

সারসংক্ষেপ: বৈধ হেবার জন্য দাতার ঘোষণা, গ্রহীতার গ্রহণ এবং দখল হস্তান্তর লাগে; ১ জুলাই ২০০৫ থেকে স্থাবর সম্পত্তির হেবা রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনি এবং আপন ভাই-বোনের মধ্যে হেবার নিবন্ধন ফি সম্পত্তির মূল্য যা-ই হোক ১০০ টাকা। দখল বুঝিয়ে দেওয়ার পর হেবা কেবল আদালতের ডিক্রিতে বাতিল হতে পারে। প্রবাসে থাকলে দূতাবাসে সম্পাদিত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সত্যায়িত আমমোক্তারনামায় দেশে কাজ সারা যায়।
মূল বিষয়: রেজিস্ট্রি হেবা দলিল নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে দখল দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগ নভেম্বর ২০২৫-এ বলেছে, রেজিস্ট্রি বিক্রয় দলিলের মতো রেজিস্ট্রি হেবায় দখল হস্তান্তরের কোনো অনুমান চলে না; দখলের প্রমাণ না থাকায় দুটি হেবা-বিল-এওয়াজ দলিল প্রতারণামূলক ঘোষণার রায় বহাল থেকেছে।[4]
এক নজরে
তিন শর্ত
দাতার ঘোষণা, গ্রহীতার প্রকাশ্য বা নীরব গ্রহণ এবং দখল হস্তান্তর; তিনটি পূর্ণ হলে হেবা সম্পূর্ণ।
রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক
রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১৭(১)(কক) অনুযায়ী হেবার ঘোষণাপত্র রেজিস্ট্রি না হলে মালিকানা হস্তান্তর হয় না।
১০০ টাকা ফি
ধারা ৭৮ক অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়দের মধ্যে হেবায় সম্পত্তির মূল্য যা-ই হোক নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা।
আজীবন ভোগস্বত্ব
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংসদে পাস হওয়া সংশোধনী দাতাকে মালিকানা দিয়েও আজীবন বসবাস ও ভোগের সুযোগ দিয়েছে।
প্রবাস থেকে পাওয়ার
দূতাবাসে সম্পাদন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন, কালেক্টরের স্ট্যাম্প, তারপর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস।
সূচিপত্র
হেবা কী এবং কেন হেবা দলিল রেজিস্ট্রি করতে হয়
হেবা আরবি শব্দ, অর্থ দান। মুসলিম আইনে হেবা হলো কোনো বিনিময় ছাড়া, স্বেচ্ছায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে নিজের সম্পত্তির মালিকানা অন্যকে দিয়ে দেওয়া। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২-এর ধারা ১২২ দানের যে সংজ্ঞা দেয়, তাতেও মূল কথা একই: বিনা প্রতিদানে স্বেচ্ছায় স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তর।[6] পার্থক্য হলো, মুসলমানদের হেবা তাঁদের ব্যক্তিগত আইনে চলে, আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের দান চলে মূলত সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ও উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫ অনুযায়ী।[7]
দাতা পুরো সম্পত্তিই হেবা করতে পারেন; উইলের মতো এক-তৃতীয়াংশের সীমা এখানে নেই। গ্রহীতা আত্মীয়, অনাত্মীয় এমনকি ভিন্ন ধর্মের মানুষও হতে পারেন, আর মুসলিম নারী নিজের সম্পত্তি পুরুষের মতোই হেবা করতে পারেন।[7]
মৌখিক হেবা থেকে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন
হানাফি আইনে হেবার জন্য লিখিত দলিল বা রেজিস্ট্রেশন অপরিহার্য ছিল না; দখল দিলেই দান সম্পূর্ণ হতো।[6] ২০০৪ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ধারা ১৭(১)-এ "মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) অনুযায়ী হেবার ঘোষণা" বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রিযোগ্য দলিলের তালিকায় যুক্ত হয়, যা ১ জুলাই ২০০৫ থেকে কার্যকর।[1] [4] একই ধারার দফা (ক) স্থাবর সম্পত্তির যেকোনো দানপত্রকেও রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক করেছে।
রেজিস্ট্রি না করার ফল গুরুতর। ধারা ৪৯ অনুযায়ী যে দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক, তা রেজিস্ট্রি না হলে স্থাবর সম্পত্তিতে কোনো অধিকার, স্বত্ব বা স্বার্থ সৃষ্টি, ঘোষণা বা হস্তান্তর করতে পারে না।[1] অর্থাৎ ২০০৫ সালের পর স্ট্যাম্পে লেখা অরেজিস্ট্রি হেবানামা বা "মুখে দিয়ে দিয়েছি" ধরনের দাবি দিয়ে জমির মালিকানা প্রমাণ করা যায় না। ২০০৫ সালের আগের মৌখিক হেবার দাবি এখনো আদালতে ওঠে, তবে তা প্রমাণ করতে হয় দখল ও সাক্ষ্য দিয়ে।
বৈধ হেবার তিন শর্ত: ঘোষণা, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তর
হেবা বৈধ হতে তিনটি উপাদান লাগে: দাতার পক্ষ থেকে দানের ঘোষণা, গ্রহীতার পক্ষ থেকে বা তাঁর হয়ে প্রকাশ্য বা নীরব গ্রহণ এবং দাতার পক্ষ থেকে দখল হস্তান্তর। তিনটি পূর্ণ হলে দান সম্পূর্ণ হয়।[6] হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৫ সালের একটি রায়ে একই তিন উপাদানের কথা বলে দখল হস্তান্তরকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে।[4]
দাতার ঘোষণা
দাতাকে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের এবং সম্পত্তির প্রকৃত মালিক হতে হয়, আর ঘোষণা হতে হয় স্বেচ্ছায়, চাপ বা প্রতারণা ছাড়া। দলিলে স্পষ্ট লিখুন যে দাতা কোনো বিনিময় ছাড়া, স্নেহ-ভালোবাসা থেকে, এখনই মালিকানা দিচ্ছেন। হেবা ভবিষ্যতের কোনো অনিশ্চিত ঘটনার ওপর ঝুলিয়ে রাখা যায় না; শর্ত জুড়ে দিলে শর্তটি বাতিল হয়, দান টিকে থাকে।[6] তাই "আমার মৃত্যুর পর পাবে" ধরনের ভাষা হেবা নয়, সেটি উইলের দিকে যায়।
গ্রহীতার গ্রহণ
গ্রহীতা নিজে বা তাঁর পক্ষে কেউ দান গ্রহণ করবেন। গ্রহীতা নাবালক হলে তাঁর অভিভাবক হেবা গ্রহণ করেন।[7] রেজিস্ট্রি অফিসে গ্রহীতার উপস্থিতি, দলিলে গ্রহণের বিবরণ এবং পরে নামজারির আবেদন, সবই গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে।
দখল হস্তান্তর
দখল না দিলে হেবা অসম্পূর্ণ থাকে, এবং দখল দেওয়ার আগ পর্যন্ত দাতা যেকোনো সময় দান প্রত্যাহার করতে পারেন।[6] বাস্তবে সমস্যা হয় যখন বাবা সন্তানকে বাড়ি হেবা করে নিজেই সেখানে থাকেন, ভাড়া তোলেন এবং খাজনা দেন। নভেম্বর ২০২৫-এর রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ পরিবারের সদস্য বলে গঠনমূলক দখল অনুমান করার যুক্তি গ্রহণ করেনি, কারণ দখল হস্তান্তরের কোনো মৌখিক বা দালিলিক প্রমাণ ছিল না।[4]
তাই রেজিস্ট্রির সঙ্গে সঙ্গে দখলের প্রমাণ তৈরি করুন: দলিলে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার ঘোষণা, ভাড়াটিয়াদের লিখিত নোটিশ, গ্রহীতার নামে নামজারি ও খাজনার দাখিলা, বিদ্যুৎ-গ্যাস বা হোল্ডিং ট্যাক্সের নাম পরিবর্তন। দাতা যদি সত্যিই আজীবন বাড়িতে থাকতে চান, তবে ২০২৬ সালের নতুন আজীবন ভোগস্বত্বের পদ্ধতি বেশি নিরাপদ, যা নিচে আলোচনা করা হয়েছে।
হেবা-বিল-এওয়াজ: বিনিময়ের বিপরীতে হেবা
হেবা-বিল-এওয়াজ মানে এমন দান, যার বিপরীতে গ্রহীতা দাতাকে কিছু একটা ফেরত দেন। নিখাদ হেবা বিনিময়হীন, তাই এওয়াজ যুক্ত হলে দলিলের চরিত্র বদলে যায় এবং তা আর সাধারণ হেবার সব নিয়মে চলে না।
অগ্রক্রয় বা প্রিএমশনের প্রশ্নে হাইকোর্ট বিভাগ ডিসেম্বর ২০২৪-এ বলেছে, বিক্রির জন্য টাকার প্রতিদান লাগে, তাই হেবা-বিল-এওয়াজ বিক্রয়ের সংজ্ঞায় পড়ে না। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ধারা ৯৬-এ সহ-অংশীদার হওয়ার তিনটি পথ (উত্তরাধিকার, ক্রয় ও সংলগ্ন জমি) স্বীকৃত; হেবা-বিল-এওয়াজের মাধ্যমে অংশ পাওয়া ব্যক্তি সেই হিসেবে অগ্রক্রয়ের মামলা করার অধিকারী হননি।[5]
অন্যদিকে নভেম্বর ২০২৫-এর রায়ে বিরোধ ছিল দুটি হেবা-বিল-এওয়াজ দলিল নিয়ে, আর আদালত হেবার মৌলিক শর্ত, বিশেষ করে দখল হস্তান্তরের প্রমাণ না থাকায় দলিল দুটি বাতিলের রায় বহাল রেখেছে।[4] শিক্ষা হলো, শিরোনামে এওয়াজ লিখলেই হেবা দলিল সুরক্ষিত হয় না। এওয়াজ কী, কবে দেওয়া হলো এবং দখল কীভাবে হস্তান্তর হলো, সবই দলিলে ও বাস্তবে প্রমাণযোগ্য রাখতে হবে। ধারা ৭৮ক-এর ১০০ টাকার সুবিধা "হেবার ঘোষণা"-র জন্য; এওয়াজসহ দলিলে কোন ফি প্রযোজ্য, তা দলিল লেখার আগেই সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে নিশ্চিত হয়ে নিন।[1]

হেবা দলিল রেজিস্ট্রেশন: ধারা ৭৮ক ও ১০০ টাকার ফি
রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৭৮ক(খ) অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়দের মধ্যে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী হেবার ঘোষণা রেজিস্ট্রির ফি সম্পত্তির মূল্য নির্বিশেষে ১০০ টাকা।[1] সাধারণ বিক্রয় দলিলে মূল্যের শতাংশ হারে যে নিবন্ধন ফি ও কর গুনতে হয়, তার তুলনায় এটি বড় ছাড়।
কারা নিকটাত্মীয় হিসেবে গণ্য
ধারা ৭৮ক যে সম্পর্কগুলোর নাম দিয়েছে, শুধু সেগুলোতেই ১০০ টাকার ফি প্রযোজ্য:[1]
- স্বামী ও স্ত্রী;
- বাবা-মা ও সন্তান;
- দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনি;
- আপন ভাই ও আপন ভাই, আপন বোন ও আপন বোন, এবং আপন ভাই ও আপন বোন।
আইনে "আপন" (full) শব্দটি আছে, তাই সৎভাই বা বৈমাত্রেয় বোন, চাচা-ভাতিজা, মামা-ভাগ্নে, শ্বশুর-জামাই বা পুত্রবধূ এই তালিকায় পড়েন না। এমন আত্মীয়কে হেবা করা যায়, দানও বৈধ, কিন্তু ১০০ টাকার বিশেষ ফি মিলবে না; সাধারণ হারে ফি ও কর দিতে হবে।[1] সম্পর্ক প্রমাণে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ, ওয়ারিশ সনদ বা প্রয়োজনে কাবিননামা সঙ্গে রাখুন এবং দলিলে সম্পর্কটি স্পষ্ট লিখুন।
মোট খরচ কত হয়
নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা হলেও আনুষঙ্গিক খরচ আছে। যুগান্তরের নভেম্বর ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত খরচের মধ্যে আছে ১,০০০ টাকার স্ট্যাম্প শুল্ক, ১০ পৃষ্ঠার হলফনামার জন্য ৩০০ টাকা, ই-ফি ১০০ টাকা, প্রতি ৩০০ শব্দের পৃষ্ঠায় এন-ফি ২৪ টাকা ও এনএন-ফি ৩৬ টাকা এবং নোটিশ আবেদনে ১০ টাকার কোর্ট ফি।[8] হার বাজেটের সঙ্গে বদলাতে পারে, তাই দলিল লেখককে দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বশেষ তালিকা মিলিয়ে নিন। অন্যান্য দলিলের ফি ও করের তুলনামূলক হিসাব আছে আমাদের property registration fees in Bangladesh গাইডে।
সময়সীমা ও ধারা ৫২ক-এর কাগজপত্র
উইল ছাড়া অন্য দলিল সাধারণত সম্পাদনের তিন মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রির জন্য দাখিল করতে হয়।[1] ধারা ৫২ক বিক্রয় দলিলের মতো দানপত্র ও হেবার ঘোষণাপত্রেও প্রযোজ্য: সাব-রেজিস্ট্রার তখনই রেজিস্ট্রি করবেন, যখন দলিলে সর্বশেষ খতিয়ান, সম্পত্তির ধরন ও মূল্য, চৌহদ্দিসহ নকশা, গত ২৫ বছরের মালিকানার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং দাতার হলফনামা থাকবে যে তিনি আগে সম্পত্তিটি অন্য কাউকে হস্তান্তর করেননি ও তাঁর বৈধ স্বত্ব আছে।[1]
জানুয়ারি ২০২৬-এ জারি হওয়া নিবন্ধন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬ ধারা ৫২ক-এর আওতায় হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ব্যক্তিগত আইনের দানপত্রও যুক্ত করে, "বিক্রেতা" শব্দে দাতাকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং ডিজিটাল দাখিল ও ই-রেজিস্ট্রেশনের জন্য নতুন ধারা ৭৭ক যোগ করে।[10] ই-রেজিস্ট্রেশনের বিধিমালা গেজেটে আসার কথা; দলিল দাখিলের আগে আপনার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কোন পদ্ধতি চালু আছে, তা জেনে নিন।
দাতার খতিয়ান ও খাজনা: হেবার আগের শর্ত
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর ধারা ৬(৩) একটি বড় শর্ত যোগ করেছে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ধারা ১৪৩ বা ১৪৪ অনুযায়ী হালনাগাদ খতিয়ান নিজের নামে না থাকলে এবং হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের প্রমাণ দেখাতে না পারলে কেউ জমি বিক্রয়, দান, হেবা বা অন্যভাবে হস্তান্তর করতে, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে বা দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারবেন না।[2]
অর্থাৎ বাবা যদি দাদার কাছ থেকে উত্তরাধিকারে জমি পেয়ে নিজের নামে নামজারি না করে থাকেন, তবে সন্তানকে হেবা করার আগে তাঁকে নিজের নামজারি সারতে হবে এবং চলতি বছরের খাজনা দিতে হবে। উত্তরাধিকারের অংশ ঠিক করতে আমাদের inheritance law in Bangladesh এবং succession certificate গাইড দুটি কাজে লাগবে।
হেবা করার নিয়ম: ধাপে ধাপে
ঢাকায় হোক বা জেলা সদরে, একই ক্রমে কাজ করলে দলিল রেজিস্ট্রিও সহজ হয়, পরে চ্যালেঞ্জের ঝুঁকিও কমে।
খতিয়ান ও খাজনা ঠিক করুন
দাতার নামে হালনাগাদ খতিয়ান ও চলতি বছরের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা নিশ্চিত করুন; না থাকলে আগে নামজারি।
সম্পর্কের প্রমাণ জোগাড়
জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ বা ওয়ারিশ সনদে দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক প্রমাণ করুন, যাতে ১০০ টাকার ফি প্রযোজ্য হয়।
দলিলের খসড়া
দানের ঘোষণা, গ্রহণ, দখল হস্তান্তর, তফসিল, নকশা ও ২৫ বছরের মালিকানার বিবরণসহ খসড়া তৈরি করুন।
হলফনামা ও স্ট্যাম্প
দাতার হলফনামা যে সম্পত্তি আগে হস্তান্তর হয়নি, এবং নির্ধারিত স্ট্যাম্প ও ফি প্রস্তুত রাখুন।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সম্পাদন
দাতা, গ্রহীতা ও সাক্ষীরা উপস্থিত হয়ে সই ও টিপসই দিন; সম্পাদনের তিন মাসের মধ্যে দাখিল করুন।
দখল বুঝিয়ে দিন
চাবি, ভাড়াটিয়াদের নোটিশ, ইউটিলিটি ও হোল্ডিং ট্যাক্সে নাম বদল করে দখলের প্রমাণ তৈরি করুন।
ই-নামজারি
রেজিস্ট্রির পর mutation.land.gov.bd-তে হেবা সূত্রে নামজারির আবেদন করে গ্রহীতার নামে খতিয়ান ও খাজনা চালু করুন।
দাতা অসুস্থ বা বয়স্ক হলে সম্পাদনের সময় তাঁর মানসিক সক্ষমতা ও স্বেচ্ছা সম্মতির প্রমাণ, যেমন চিকিৎসকের সনদ ও নিরপেক্ষ সাক্ষী, রেখে দিন।

হেবা দলিল বাতিলের নিয়ম
দখল হস্তান্তরের আগে দাতা নিজেই হেবা প্রত্যাহার করতে পারেন। দখল দেওয়ার পর হেবা কেবল আদালতের ডিক্রিতে বাতিল হতে পারে, এবং বাতিলের অধিকার শুধু দাতার; তাঁর ওয়ারিশরা দাতার মৃত্যুর পর এই অধিকার পান না।[6] দাতা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে একতরফা বাতিলনামা রেজিস্ট্রি করলেই সম্পূর্ণ হেবা উল্টে যায় না।
যেসব হেবা আর বাতিল করা যায় না
দখল হস্তান্তরের পরও কয়েকটি ক্ষেত্রে আদালতও হেবা বাতিল করতে পারে না:[6]
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হেবা;
- গ্রহীতা যদি দাতার নিষিদ্ধ স্তরের আত্মীয় হন, অর্থাৎ যাঁদের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ, যেমন সন্তান, ভাই-বোন;
- গ্রহীতার মৃত্যু হলে;
- সম্পত্তি হারিয়ে বা ধ্বংস হয়ে গেলে, অথবা তৃতীয় পক্ষের হাতে চলে গেলে;
- সম্পত্তির মূল্য বেড়ে গেলে বা এমনভাবে বদলে গেলে যে আর চেনা যায় না।
বাস্তবে পরিবারের ভেতরে করা বেশির ভাগ হেবা, যেমন সন্তান বা স্ত্রীকে দেওয়া হেবা, দখল দেওয়ার পর কার্যত অপ্রত্যাহারযোগ্য। ঠিক এই ফাঁক পূরণ করতেই ২০২৬ সালের আজীবন ভোগস্বত্বের বিধান আনা হয়েছে।
প্রতারণা, চাপ বা জাল দলিলের ক্ষেত্রে
দাতার সই বা টিপসই প্রতারণা, ভয় দেখিয়ে বা জাল করে নেওয়া হলে প্রশ্নটি বাতিলের নয়, দলিল অবৈধ ঘোষণার। তখন দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিল ও ঘোষণামূলক মামলা করতে হয়, প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞাসহ। এখানে প্রমাণের ভার অভিযোগকারীর, আর রেজিস্ট্রি দলিলের পক্ষে নিয়মিততার অনুমান কাজ করে, তাই দেরি করা চলবে না। বিস্তারিত পদ্ধতি আছে আমাদের deed cancellation suit in Bangladesh বিশ্লেষণে। দখলের প্রমাণ না থাকলে হেবা নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে, যা নভেম্বর ২০২৫-এর রায়ে স্পষ্ট।[4]
হেবা ও উইলের পার্থক্য
হেবা ও উইল (অসিয়ত) দুটোই সম্পত্তি পরিকল্পনার হাতিয়ার, কিন্তু আইনি ফল একেবারে আলাদা। হেবা জীবদ্দশায় কার্যকর হয়, উইল কার্যকর হয় মৃত্যুর পর। মুসলিম আইনে উইলে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি দেওয়া যায়; এর বেশি দিলে ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া তা বৈধ নয় এবং ওয়ারিশরা আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। হেবায় এমন কোনো সীমা নেই।[7]
উইল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক নয়; রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১৮ ও ২৭ অনুযায়ী ইচ্ছা করলে যেকোনো সময় উইল রেজিস্ট্রি বা জমা রাখা যায়।[1] মৌখিক উইলও মুসলিম আইনে বৈধ, তবে লিখিত ও সাক্ষীযুক্ত উইল প্রমাণে অনেক শক্তিশালী।[7] হেবা ও উইল কখন কোনটি বেছে নেবেন, তার ইংরেজি বিশ্লেষণ পাবেন hiba, gift and will registration গাইডে।
| পদ্ধতি | কার্যকর কবে | পরিমাণের সীমা | রেজিস্ট্রি | মূল বিষয় |
|---|---|---|---|---|
| হেবা | জীবদ্দশায়, দখল হস্তান্তরে | পুরো সম্পত্তি দেওয়া যায় | স্থাবর সম্পত্তিতে বাধ্যতামূলক | নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ফি ১০০ টাকা |
| হেবা-বিল-এওয়াজ | জীবদ্দশায় | পুরো সম্পত্তি দেওয়া যায় | বাধ্যতামূলক | এওয়াজ ও দখলের প্রমাণ জরুরি |
| উইল (অসিয়ত) | মৃত্যুর পর | সম্মতি ছাড়া এক-তৃতীয়াংশ | ঐচ্ছিক | ওয়ারিশরা সীমা ছাড়ালে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন |
| আজীবন ভোগস্বত্বসহ দান | নিবন্ধিত দলিলে, দাতার ভোগ আজীবন | নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কে | স্থাবর সম্পত্তিতে নিবন্ধিত দলিল | পরিবর্তন শুধু যৌথ সম্মতি বা জেলা জজের আদেশে |
হেবার পর নামজারি
হেবা দলিল রেজিস্ট্রির পর গ্রহীতার নামে খতিয়ান হালনাগাদ না করলে খাজনা দাতার নামেই থাকে, আর পরের বিক্রি বা হেবায় ধারা ৬(৩)-এর শর্ত পূরণ হয় না।[2] তাই রেজিস্ট্রির পরপরই ই-নামজারি করুন।
আবেদন হয় mutation.land.gov.bd-তে। ফরমে জমি অর্জনের ধরন হিসেবে দান বা হেবা বেছে নিন, বিভাগ থেকে মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর দিন এবং আবেদনকারীর ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদ, সর্বশেষ খাজনার দাখিলা ও রেজিস্ট্রি দলিলের স্ক্যান কপি আপলোড করুন।[9] সরকারি খরচ মোট ১,১৭০ টাকা: আবেদনের সময় ৭০ টাকা এবং মঞ্জুরের পর খতিয়ান প্রস্তুতের জন্য ১,১০০ টাকা ডিসিআর ফি।[9]
সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস আবেদন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তদন্তে পাঠায়, সরেজমিন প্রতিবেদনের পর মঞ্জুর হলে গ্রহীতার নামে নতুন খতিয়ান তৈরি হয়। নির্ধারিত সময় মহানগরে ৪৫ কর্মদিবস ও অন্যত্র ৩০ কর্মদিবস, আর ই-নামজারির লক্ষ্য প্রায় ২৮ দিন।[9] নামজারি, আপত্তি ও আপিলের বিস্তারিত আছে আমাদের land mutation in Bangladesh গাইডে।
আজীবন ভোগস্বত্ব রেখে দান: ২০২৬ সালের নতুন আইন
বহু বছর ধরে একটি অভিযোগ ছিল: বাবা-মা সন্তানকে বাড়ি হেবা করার পর সন্তান তাঁদের বের করে দেন বা ভরণপোষণ দেন না, অথচ সম্পূর্ণ হেবা আর ফেরানো যায় না। এই প্রেক্ষাপটে সরকার সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ সংশোধনের প্রস্তাব আনে। প্রস্তাবিত পর্যায়ের বিশ্লেষণ আছে আমাদের proposed usufruct gift (hiba) law 2026 লেখায়; প্রস্তাবটি এখন আর শুধু প্রস্তাব নেই।
সংসদে পাস ও মূল বিধান
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের উত্থাপিত ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬ সংশোধিত আকারে ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়। এটি আইনে নতুন ধারা ১২২ক ও ১২২খ যুক্ত করেছে।[11] মূল বিধানগুলো:[11]
- দাতা নিজের জন্য আজীবন ভোগস্বত্ব রেখে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দান করতে পারবেন, এবং এটি একটি স্বতন্ত্র হস্তান্তর পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হবে।
- প্রযোজ্য সম্পর্ক: বাবা-মা থেকে সন্তান, দাদা-দাদি বা নানা-নানি থেকে নাতি-নাতনি, উল্টো দিকেও, এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।
- স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে হস্তান্তর হতে হবে নিবন্ধিত দলিলে।
- দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতা মারা গেলে সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে যাবে, কিন্তু দাতার আজীবন ভোগস্বত্ব বহাল থাকবে।
- নিবন্ধনের পর এই দান সাধারণভাবে অপরিবর্তনীয়; তবে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য প্রকৃত প্রয়োজনে দুই পক্ষের সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলে পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে।
- কোনো পক্ষ নাবালক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অসুস্থ বা আইনগতভাবে অক্ষম হলে জেলা জজ অনুসন্ধান ও নোটিশের পর আদেশ দেবেন।
প্রচলিত হেবার ওপর প্রভাব
বিলেই বলা আছে, এই পদ্ধতি প্রচলিত দান, মুসলিম আইনের হেবা বা অন্য স্বীকৃত হস্তান্তরের বৈধতাকে প্রভাবিত করবে না; আইনমন্ত্রী সংসদে বলেছেন এটি ধারা ১২২ক-এর উপধারা ৪-এ স্পষ্ট করা হয়েছে এবং বিধানটি সব ধর্মাবলম্বীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।[11] অর্থাৎ এটি ঐচ্ছিক বিকল্প: চাইলে সাধারণ হেবা, চাইলে আজীবন ভোগস্বত্বসহ দান। বিরোধী দল শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মত নেওয়ার দাবি জানায় এবং জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে ওয়াকআউট করে।[11]
লক্ষ করার বিষয়, হানাফি আইনেও মূল সম্পত্তিতে জীবনস্বত্ব বৈধ না হলেও সম্পত্তির আয় বা ভোগের ওপর জীবনস্বত্ব বৈধ বলে স্বীকৃত।[6] নতুন পদ্ধতি সেই ধারণাকে বিধিবদ্ধ কাঠামো দিয়েছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতি, গেজেট প্রকাশ ও কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং ১০০ টাকার ফি এই দলিলে প্রযোজ্য কি না, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস তা কীভাবে প্রয়োগ করছে, দলিল করার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২: মূল কাঠামো
হেবা, বিক্রি বা নামজারির কাজে দাতা বা মালিক নিজে উপস্থিত থাকতে না পারলে আমমোক্তারনামা দরকার হয়। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ (২০১২ সনের ৩৫ নং আইন) ১ জুলাই ২০১৩ থেকে কার্যকর এবং এটি ১৮৮২ সালের পুরোনো আইন রহিত করেছে।[3] ধারা ৭ অনুযায়ী প্রতিনিধির কাজের ফলে সৃষ্ট দায় মালিকের ওপর এমনভাবে বর্তায়, যেন মালিক নিজেই কাজটি করেছেন।[3] তাই ক্ষমতার বিবরণ যত সুনির্দিষ্ট, ঝুঁকি তত কম।
সাধারণ, বিশেষ ও অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার
আইন দুই ধরনের পাওয়ার স্বীকার করে। অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার হলো স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি, বিক্রয়ের চুক্তি (বায়নানামা) সই, ঋণের জন্য বন্ধক এবং মূল্যের বিনিময়ে জমি উন্নয়নের ক্ষমতা। এর বাইরে সব পাওয়ারই সাধারণ পাওয়ার।[3] "বিশেষ পাওয়ার" আইনের আলাদা শ্রেণি নয়, এটি চর্চার শব্দ: একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য সীমিত ক্ষমতা, যেমন একটি নির্দিষ্ট দলিল রেজিস্ট্রি অফিসে দাখিল করা। বিশেষ উদ্দেশ্যটি যদি জমি বিক্রি হয়, তবে নাম যা-ই হোক, পাওয়ারটি আইনত অপ্রত্যাহারযোগ্য।
সাধারণ পাওয়ার দিয়ে ভাড়া তোলা, খাজনা দেওয়া, নামজারির আবেদন, মামলা পরিচালনা বা ব্যাংকের কাজ করানো যায়। মনে রাখুন, হেবা দাতার নিজের স্নেহজাত ঘোষণা; প্রবাসী দাতা যদি অ্যাটর্নির মাধ্যমে হেবার দলিল সম্পাদন বা দাখিল করাতে চান, তবে পাওয়ারে সেই নির্দিষ্ট হেবার সম্পত্তি, গ্রহীতা ও ক্ষমতা স্পষ্ট লিখুন, এবং খসড়া আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাচাই করুন।
রেজিস্ট্রেশন ও প্রয়োজনীয় কাগজ
ধারা ৬ অনুযায়ী অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক এবং এতে রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৫২ক প্রযোজ্য। দলিলে মালিকের উদ্দেশ্য ও প্রতিনিধির দায়িত্ব, ক্ষমতা ও কাজ স্পষ্ট লিখতে হবে, আর উভয় পক্ষের পাসপোর্ট সাইজের ছবি স্থায়ীভাবে সংযুক্ত করে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি দিতে হবে।[3] জমির ক্ষেত্রে ধারা ৬(৩)-এর খতিয়ান ও খাজনার শর্তও খাটে, কারণ হালনাগাদ খতিয়ান ছাড়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদনই নিষিদ্ধ।[2] রাজউকের প্লট ও ফ্ল্যাটে মার্চ ২০২৩ থেকে অ্যাটর্নি নিয়োগ বা বাতিলে রাজউকের পূর্বানুমোদন লাগে।[12]
বিক্রির জন্য অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার
অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার মালিক মত বদলালেই ফেরানো যায় না। ধারা ৪ অনুযায়ী মেয়াদ শেষের আগে কোনো পক্ষ মারা গেলে বা অক্ষম হলে অধিকার ও দায় তাঁর ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীর ওপর বর্তায়। জমি উন্নয়নের পাওয়ারে নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে; উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলে বা কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ৩০ দিনের রেজিস্ট্রি ডাক নোটিশে বাতিল করা যায়, আর মেয়াদ বাড়ানো যায় কেবল নিবন্ধিত চুক্তিতে।[3] ক্রেতা হিসেবে অ্যাটর্নির কাছ থেকে জমি কিনলে রেজিস্ট্রি পাওয়ারটি দেখুন, তাতে বিক্রি ও মূল্য গ্রহণের ক্ষমতা আছে কি না যাচাই করুন এবং বাতিলের কোনো রেজিস্ট্রি দলিল আছে কি না খোঁজ নিন। বিক্রয় দলিলের বিস্তারিত যাচাই আছে আমাদের sale deed in Bangladesh গাইডে।
সাধারণ পাওয়ারের অবসান ও বিরোধ
ধারা ১১ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কাজ শেষ হলে, মেয়াদ ফুরালে বা বিষয়বস্তু বিনষ্ট হলে পাওয়ার শেষ হয়; সাধারণ পাওয়ার মালিকের মৃত্যু, দেউলিয়াত্ব বা মানসিক অক্ষমতাতেও শেষ হয়। মালিক ৩০ দিনের নোটিশ রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠিয়ে সাধারণ পাওয়ার বাতিল করতে পারেন, নোটিশের আগে করা কাজ বৈধ থাকে।[3] সরল বিশ্বাসে অ্যাটর্নিকে টাকা দেওয়া ক্রেতার প্রতিকার ধারা ১০ রক্ষা করে।[3] রেজিস্ট্রি পাওয়ার নিয়ে বিরোধে ধারা ১৩ আগে আপসের চেষ্টা, তারপর নোটিশ দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করেছে; মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ না হলে তবেই আদালতে মামলা।[3]
বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: দূতাবাসের পথ
প্রবাসীদের জন্য দেশে জমি হেবা, বিক্রি বা নামজারির সবচেয়ে বাস্তব উপায় দূতাবাসে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি। আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী মালিক বিদেশে থাকলে রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৩৩(১)(গ) প্রযোজ্য, এবং সম্পাদনের সময় মালিক নিজে সই করে প্রতিনিধির সংযুক্ত ছবি শনাক্ত করবেন। দলিল প্রথম দেশে আসার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সত্যায়ন করবে, তারপর কালেক্টর স্ট্যাম্প আইন অনুযায়ী স্ট্যাম্প দেবেন এবং একটি কপি সাব-রেজিস্ট্রারকে পাঠাবেন, যা ১ নম্বর বহিতে লিপিবদ্ধ থাকবে।[3]
দূতাবাসে কী লাগে
লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদাহরণ নিলে: সরকার নির্ধারিত তফসিল-ক, ফরম-৩ ছকে পূরণ করা কিন্তু সই না করা পাওয়ার, সব সম্পাদনকারীর সশরীরে উপস্থিতি ও কনস্যুলার কর্মকর্তার সামনে সই-টিপসই, বাংলাদেশি নাগরিকত্বের প্রমাণ, প্রতিনিধির জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, প্রত্যেকের এক কপি রঙিন ছবি এবং খতিয়ান, নামজারি বা হালনাগাদ দাখিলার মতো সম্পত্তির কাগজ লাগে।[13] সম্পত্তি মৃত বাবা-মায়ের নামে থাকলে ওয়ারিশ সনদ ও মৃত্যুসনদ চাওয়া হয়। সই করার দুই মাস বা ৬০ দিনের মধ্যে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতি-সত্যায়নের জন্য জমা দিতে হয়।[13] প্রতিটি মিশনের ফি ও তালিকা আলাদা, তাই সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নিন।
২০২৫ সালের বিধিমালা সংশোধন
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালা ২০১৫ (গেজেট ২৩ জুলাই ২০১৫) ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ সংশোধিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশি পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক নয়: "নো ভিসা রিকোয়ার্ড" স্টিকারসহ বিদেশি পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়েও চলে। নতুন উপবিধি অনুযায়ী বিদেশে সম্পাদিত ও সত্যায়িত পাওয়ার কপিসহ সত্যায়নের ছয় মাসের মধ্যে দেশে পাঠাতে হবে।[12]
দেশে পৌঁছানোর পর সময়সীমা
রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ২৬ অনুযায়ী বিদেশে সম্পাদিত দলিল দেশে পৌঁছানোর ছয় মাসের মধ্যে দাখিল হলে রেজিস্ট্রির জন্য গ্রহণ করা যায়।[1] সরকারি দপ্তরের দেরিতে এই সময় পার হলে কী হয়, তার উদাহরণ মো. শাহ আলম বনাম বাংলাদেশ সরকার (রিট পিটিশন ৩৮৯০/২০২৫): যুক্তরাষ্ট্রে সম্পাদিত পাওয়ার ফেব্রুয়ারি ২০২৩-এ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়, ট্রেজারিতে স্ট্যাম্প হয় জুলাই ২০২৩-এ, আর সাব-রেজিস্ট্রার তা সময়বাধিত বলে নেননি। হাইকোর্ট বিভাগ ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ বলেছে, প্রশাসনিক দেরি বৈধ অধিকার নষ্ট করতে পারে না, এবং সময়সীমার আপত্তি ছাড়াই এক মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রির নির্দেশ দিয়েছে।[14]
তবু প্রতিটি ধাপের রসিদ ও তারিখ রাখুন এবং স্ট্যাম্প হওয়ামাত্র দাখিল করুন। স্ট্যাম্প শুল্কের হার, অ্যাপোস্টিল প্রসঙ্গ ও জাল পাওয়ারের প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত ইংরেজি বিশ্লেষণ আছে আমাদের power of attorney in Bangladesh গাইডে। প্রবাস থেকে পারিবারিক সম্পত্তির কাজে আমাদের ক্রস-বর্ডার পারিবারিক বিষয়ক প্র্যাকটিস সহায়তা করে।
হেবা ও পাওয়ার নিয়ে যে ভুলগুলো এড়াবেন
- দখল না দেওয়া: রেজিস্ট্রি হেবায় দখলের অনুমান নেই; দখলের প্রমাণ না থাকলে দলিল বাতিল হতে পারে।[4]
- খতিয়ান হালনাগাদ না করা: দাতার নামে নামজারি ও খাজনা না থাকলে হেবা রেজিস্ট্রিই আটকে যায়।[2]
- ভুল আত্মীয়কে নিকটাত্মীয় ধরা: সৎভাই বা ভাতিজা ধারা ৭৮ক-এর তালিকায় নেই; ১০০ টাকার ফি মিলবে না।[1]
- মৃত্যুর পরের শর্ত জুড়ে দেওয়া: ভবিষ্যৎ শর্তে হেবা হয় না; শর্ত বাতিল হয়ে দান টিকে থাকে।[6]
- একতরফা বাতিলনামা: দখল দেওয়ার পর হেবা বাতিল হয় শুধু আদালতের ডিক্রিতে, আর পরিবারের ভেতরের বেশির ভাগ হেবা একেবারেই বাতিলযোগ্য নয়।[6]
- প্রবাসের পাওয়ার ফেলে রাখা: সত্যায়নের ছয় মাসের মধ্যে দেশে পাঠানো ও পৌঁছানোর ছয় মাসের মধ্যে দাখিল, দুটো সময়সীমাই চলে।[12] [1]
পরিবারের সম্পত্তি পরিকল্পনা, হেবা বা উইলের খসড়া, হেবা নিয়ে মামলা কিংবা প্রবাস থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভুল একবার রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে শোধরানো কঠিন ও ব্যয়বহুল। আমাদের উত্তরাধিকার ও সাকসেশন প্ল্যানিং প্র্যাকটিস দলিল সম্পাদনের আগেই কাগজ যাচাই করে দেয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হেবা দলিল কী?
মুসলিম আইন অনুযায়ী জীবদ্দশায় বিনা মূল্যে সম্পত্তি দানের রেজিস্ট্রি ঘোষণাপত্র। রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১৭(১)(কক) অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির হেবার ঘোষণা রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক।[1]
বৈধ হেবার শর্ত কী কী?
হেবার রেজিস্ট্রেশন ফি কত?
চাচা বা মামাকে হেবা করলেও কি ১০০ টাকা ফি?
না। হেবা বৈধ হবে, কিন্তু চাচা, মামা, সৎভাই বা পুত্রবধূ ধারা ৭৮ক-এর তালিকায় নেই, তাই সাধারণ হারে ফি ও কর দিতে হবে।[1]
মৌখিক হেবা কি এখন বৈধ?
হেবা দলিল কি বাতিল করা যায়?
দখল দেওয়ার আগে দাতা প্রত্যাহার করতে পারেন; পরে কেবল আদালতের ডিক্রিতে। স্বামী-স্ত্রী বা নিষিদ্ধ স্তরের আত্মীয়কে দেওয়া হেবা, গ্রহীতার মৃত্যু বা সম্পত্তি হস্তান্তরিত হলে বাতিল চলে না।[6]
হেবা ও উইলের মূল পার্থক্য কী?
হেবার পর নামজারিতে কত খরচ?
ই-নামজারির সরকারি খরচ মোট ১,১৭০ টাকা: আবেদনে ৭০ টাকা ও মঞ্জুরের পর ১,১০০ টাকা ডিসিআর ফি।[9]
আজীবন ভোগস্বত্বের নতুন আইন কি হেবা বাতিল করেছে?
না। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাস হওয়া সংশোধনী একটি ঐচ্ছিক নতুন পদ্ধতি যোগ করেছে; প্রচলিত দান ও মুসলিম আইনের হেবা অপরিবর্তিত থাকছে।[11]
সূত্র তালিকা
প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র
উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।
- Registration Act 1908 (sections 17, 18, 23, 26, 27, 33, 49, 52A and 78A) — Laws of Bangladesh
- ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ৩৬ নং আইন), ধারা ৬ — বাংলাদেশ আইন (bdlaws)
- পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ (২০১২ সনের ৩৫ নং আইন) — বাংলাদেশ আইন (bdlaws)
- High Court Division, Md Nur Alam Nantu v Most Shamsun Nahar, First Appeal No 2 of 2021 (23 November 2025)
- High Court Division, Md Rahim Uddin Gain v Md Mozibar Rahman Molla, Civil Revision No 2184 of 2017 (10 December 2024)
- The Daily Star, Law and Our Rights, 21 August 2010 — How to make gift of immovable property?
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ৩০ জুলাই ২০২৫ — সম্পত্তির উইল ও হেবার মধ্যে পার্থক্য কী
- যুগান্তর, ১৩ নভেম্বর ২০২৫ — হেবা দলিলের সরকার নির্ধারিত রেজিস্ট্রি খরচ কত?
- যুগান্তর, ১৮ আগস্ট ২০২৬ — ই-নামজারি: অনলাইনে আবেদন ও খরচ
- প্রথম আলো, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ — দলিল নিবন্ধনব্যবস্থা ডিজিটাল করতে নিবন্ধন আইন সংশোধন, চালু হচ্ছে ই-রেজিস্ট্রেশন
- বাংলা ট্রিবিউন, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — আজীবন ভোগস্বত্ব রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিল পাস
- bdnews24.com, 7 November 2025 — Revised Power of Attorney rules allow overseas Bangladeshis to manage property without passport
- Bangladesh High Commission, London — Power of Attorney requirements
- High Court Division, Md Shah Alam v Government of Bangladesh, Writ Petition No 3890 of 2025 (7 December 2025)
TRW-এর সহায়তা
তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে
TRW হেবা ও উইলের খসড়া, পারিবারিক সম্পত্তি পরিকল্পনা, হেবা বাতিল বা প্রতিরক্ষার মামলা, নামজারি এবং প্রবাস থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদনে পরামর্শ দেয়। দেখুন আমাদের উত্তরাধিকার ও সাকসেশন প্ল্যানিং প্র্যাকটিস, অথবা আপনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।