TRW Insight / বাংলাদেশ
আইআরসি বা ইআরসি ছাড়া ব্যাংক এলসি খোলে না, কাস্টমস চালান ছাড়ে না। ২০২৩ সালের নিবন্ধন আদেশ, নতুন আমদানি নীতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের সার্কুলার জানলে আমদানি রপ্তানি শুরু করা যায় ঝামেলা ছাড়াই।
আমদানি রপ্তানি লাইসেন্স ২০২৬: আইআরসি, ইআরসি ও এলসির আইনি কাঠামো
বাংলাদেশে আমদানি রপ্তানি ব্যবসা শুরু করতে চাইলে প্রথম আইনি প্রশ্নটি পণ্য বা ক্রেতা নয়, বরং নিবন্ধন। আমদানি ও রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৫০-এর অধীনে জারি হওয়া আদেশ অনুযায়ী আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর (সিসিআইঅ্যান্ডই) থেকে আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) বা রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি) না নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান নিজের নামে পণ্য আনতে বা পাঠাতে পারে না। ব্যাংক এলসি খুলবে না, কাস্টমস চালান ছাড়বে না, আর নগদ প্রণোদনার দাবিও টিকবে না।
এই লেখায় একসঙ্গে পুরো পথটি দেখানো হয়েছে: ১৯৫০ সালের আইন ও আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও ইনডেন্টর (নিবন্ধন) আদেশ, ২০২৩; আইআরসি ও ইআরসির ধরন, কাগজপত্র, সরকারি ফি ও নবায়ন; ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিআইএন ও বিআইএনের পূর্বশর্ত; ধাপে ধাপে রপ্তানি ব্যবসা শুরু; ব্যাংকে এলসি খোলার নিয়ম, ২০২৫–২০২৬ সালের এলসি মার্জিন নীতি ও ইউসিপি ৬০০-এর মূল কথা; নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯ ও রপ্তানি নীতি; এবং যেসব ভুলে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন।

সারসংক্ষেপ: আমদানির জন্য আইআরসি এবং রপ্তানির জন্য ইআরসি সিসিআইঅ্যান্ডই থেকে অনলাইনে নিতে হয়। আবেদনের আগে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিআইএন ও আয়কর রিটার্নের প্রমাণ, ব্যাংক সনদ এবং চেম্বার বা বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ লাগে; আমদানি-রপ্তানির জন্য বিআইএনও বাধ্যতামূলক। ২০২৩ সালের আদেশ অনুযায়ী আইআরসির ফি আমদানিসীমা অনুযায়ী ৫,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা, ইআরসির ফি ১০,০০০ টাকা; সনদ এক বছর বহাল থাকে এবং পাঁচ বছর পর্যন্ত নবায়ন করা যায়। এরপর ব্যাংকে এলসি খোলা, কাস্টমসে ঘোষণা এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে চার মাসের মধ্যে রপ্তানিমূল্য দেশে আনার শর্ত মানতে হয়।
মূল বিষয়: নিবন্ধন সনদের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৬০ দিন আগে অনলাইনে ফরম-৩ দিয়ে নবায়নের আবেদন করতে হয়। দেরি হলে বিলম্ব ফি লাগে, আর মেয়াদোত্তীর্ণ সনদে ব্যাংক নতুন আমদানি বা রপ্তানির কাগজ প্রক্রিয়া করে না। একাধিক বছরের জন্য একসঙ্গে নবায়ন করলে প্রতিবছরের ঝামেলা এড়ানো যায়।[2]
এক নজরে
মূল আইন
আমদানি ও রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৫০ সরকারকে গেজেট আদেশে আমদানি-রপ্তানি নিষিদ্ধ, সীমিত বা লাইসেন্সনির্ভর করার ক্ষমতা দেয়।
নিবন্ধন আদেশ ২০২৩
আইআরসি, ইআরসি ও ইনডেন্টিং সনদের যোগ্যতা, কাগজপত্র, ফি, মেয়াদ, নবায়ন, স্থগিত ও বাতিলের নিয়ম ঠিক করে।
ফি ও নবায়ন
আইআরসি ৫,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা, ইআরসি ১০,০০০ টাকা; সনদ এক বছর বহাল, নবায়ন পাঁচ বছর পর্যন্ত।
এলসি ও মার্জিন
ন্যূনতম নগদ মার্জিনের বাধ্যবাধকতা উঠে গেছে; মার্জিন এখন ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্ক ও ঝুঁকি মূল্যায়নের বিষয়।
নতুন আমদানি নীতি
আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯ এলসি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে আমদানির মূল্যসীমা তুলে দিয়েছে।
সূচিপত্র
আমদানি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আইনি ভিত্তি
বাংলাদেশে বৈদেশিক বাণিজ্য একটি মাত্র আইনে চলে না; কয়েকটি স্তর একসঙ্গে কাজ করে। সবার নিচে আছে আমদানি ও রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৫০। এর ধারা ৩(১) সরকারকে সরকারি গেজেটে আদেশ জারি করে নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানি বা রপ্তানি নিষিদ্ধ, সীমিত বা নিয়ন্ত্রণ করার এবং লাইসেন্সের আবেদন, মঞ্জুর ও বাতিলের পদ্ধতি ঠিক করার ক্ষমতা দেয়। এমন আদেশের আওতাভুক্ত পণ্য কেবল লাইসেন্সের শর্ত মেনেই আনা-নেওয়া যায়, এবং কাস্টমস আইনে সেগুলো নিষিদ্ধ বা সীমিত পণ্য হিসেবে গণ্য হয়।[1]
এই ক্ষমতা থেকেই আসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল: আমদানি নীতি আদেশ, রপ্তানি নীতি এবং আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও ইনডেন্টর (নিবন্ধন) আদেশ। তার ওপরে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার ঠিক করে কীভাবে মূল্য পরিশোধ হবে ও রপ্তানিমূল্য দেশে আসবে। শেষ স্তরে কাস্টমস আইন, ২০২৩ বন্দরে পণ্যের প্রবেশ ও বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ করে; বিস্তারিত জানতে পড়ুন আমাদের কাস্টমস আইন বিষয়ক বিশ্লেষণ (ইংরেজি)।
শাস্তি ও মামলা
আইন, এর অধীনে জারি করা আদেশ বা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে ধারা ৫ অনুযায়ী এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে; কাস্টমস আইনের বাজেয়াপ্তি ও জরিমানা এর বাইরে আলাদাভাবে চলে। ধারা ৬ অনুযায়ী আদালত কেবল কাস্টমস কর্মকর্তা বা প্রধান নিয়ন্ত্রক কিংবা তাঁর লিখিতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগে মামলা আমলে নিতে পারে, আর প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের নিচের কোনো আদালত এর বিচার করতে পারে না।[1] অর্থাৎ একটি ভুল চালান একসঙ্গে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, কাস্টমস ও বৈদেশিক মুদ্রা আইনের তিনটি আলাদা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও ইনডেন্টর (নিবন্ধন) আদেশ, ২০২৩
দীর্ঘদিন চলা ১৯৮১ সালের নিবন্ধন আদেশ বাতিল করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৯৫০ সালের আইনের ধারা ৩(১)-এর ক্ষমতাবলে নতুন আদেশ জারি করেছে। আদেশটি এসআরও নং ৩২৬-আইন/২০২৩, ২৯ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে প্রণীত এবং ৩ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখের গেজেটে প্রকাশিত।[2] বাংলাদেশ ব্যাংক এখন অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত করতে বলে যে প্রত্যেক আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক এই ২০২৩ সালের আদেশের অধীনে নিবন্ধিত বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত।[6] [7]
কে নিবন্ধন নেবেন
পণ্য বা সেবা আমদানি, রপ্তানি কিংবা বিদেশি সরবরাহকারীর পক্ষে ইনডেন্টর হিসেবে কাজ করার আগে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধনকারী কর্তৃপক্ষ প্রধান নিয়ন্ত্রক বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। আদেশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা আছে: একই মালিক বা একই পরিবারের সদস্যদের একাধিক ব্যবসা থাকলেও সাধারণত একটিই নিবন্ধন মেলে; অন্য প্রতিষ্ঠানের পণ্যের ম্যানেজিং বা প্রসেসিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন পায় না; আর বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কোম্পানী আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিগমিত হয়ে বাংলাদেশে ব্যবসাস্থল রাখতে হয়।[2]
আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি): ধরন ও যোগ্যতা
আমদানি নিবন্ধন সনদ তিন ধরনের: শিল্প আইআরসি, বাণিজ্যিক আইআরসি এবং বহুজাতিক আইআরসি। সবগুলোর আবেদন ফরম-১ অনুযায়ী অনলাইনে প্রধান নিয়ন্ত্রকের কাছে নির্ধারিত ফিসহ দাখিল করতে হয়।[2] কোনটি নেবেন তা নির্ভর করে আপনি কী আনবেন তার ওপর।
শিল্প বনাম বাণিজ্যিক আইআরসি
নিজের কারখানায় ব্যবহারের জন্য কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ বা মূলধনি যন্ত্রপাতি আনলে শিল্প আইআরসি লাগে। তৈরি পণ্য এনে বাজারে বিক্রি করলে বাণিজ্যিক আইআরসি। শিল্প আইআরসির জন্য সাধারণ কাগজের বাইরে অগ্নি লাইসেন্স, স্পনসরিং বিনিয়োগ সংস্থার নিবন্ধনের কপি এবং এইচএস কোডসহ কাঁচামালের তালিকা লাগে।[2] ভুল ধরনের আইআরসি নিয়ে কাঁচামাল এনে বাজারে বিক্রি করা নিবন্ধন বাতিলের পরিষ্কার কারণ।
একক আইআরসির প্রস্তাব
যে প্রতিষ্ঠান শিল্প ও বাণিজ্যিক দুই ধরনের আমদানিই করে, তাকে এখন একই টিআইএনের অধীনে দুটি আলাদা আইআরসি রাখতে হয়। এই দ্বৈততা দূর করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৪ জুলাই ২০২৬ একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, যাতে সিসিআইঅ্যান্ডই, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিডা ও এফবিসিসিআই রয়েছে। প্রস্তাবটি এখনো অনুমোদিত হয়নি, তাই আপাতত দুটি সনদের নিয়মই প্রযোজ্য।[3]
রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি) ও ইনডেন্টিং সনদ
রপ্তানি নিবন্ধন সনদও তিন ধরনের: সাধারণ রপ্তানি, প্রকৌশল বা ইনডেন্টিং সেবা রপ্তানি এবং বহুজাতিক ইআরসি; আবেদন ফরম-২ অনুযায়ী।[2] নিজের নামে বিদেশি ক্রেতার কাছে চালান পাঠান এমন যেকোনো প্রস্তুতকারক, ট্রেডিং রপ্তানিকারক বা বায়িং হাউসের ইআরসি লাগে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি সার্কুলার অনুযায়ী প্রতিটি রপ্তানিকারক নিবন্ধিত কি না, তা নিশ্চিত করার দায় ব্যাংকের, তাই সনদ ছাড়া ব্যাংক রপ্তানির কাগজ নেবে না।[7] রপ্তানির আইনি কাঠামো নিয়ে গভীর আলোচনা আছে আমাদের রপ্তানি আইন বিষয়ক বিশ্লেষণে (ইংরেজি)।
ইনডেন্টরদের বাড়তি শর্ত
বিদেশি সরবরাহকারীর একমাত্র এজেন্ট, ডিলার বা পরিবেশক হিসেবে কাজ করলে ইনডেন্টর হিসেবে নিবন্ধন লাগে। এর জন্য এজেন্সি চুক্তি এবং বাংলাদেশ ইনডেন্টিং এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ দাখিল করতে হয়। নতুন বিদেশি সরবরাহকারী যুক্ত করলে অনুমতি নিয়ে তালিকাভুক্ত করতে হয়।[2]

আবেদনের ফরম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আইআরসি ও ইআরসি দুই ক্ষেত্রেই আবেদন অনলাইনে হয়: নতুন আইআরসির জন্য ফরম-১, ইআরসির জন্য ফরম-২ এবং নবায়নের জন্য ফরম-৩। আদেশের সংযুক্তিতে প্রতিটি সেবার কাগজের তালিকা দেওয়া আছে।[2] প্রায় সব শ্রেণিতে যা লাগে:
- হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স; কোম্পানির ক্ষেত্রে নিবন্ধন সনদ ও ফরম-১২, অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত অংশীদারি দলিল।
- ই-টিআইএন সনদ ও সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র।
- মালিক, অংশীদার বা পরিচালকদের জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা পাসপোর্ট।
- যে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন হবে তার সনদ।
- স্বীকৃত চেম্বার অব কমার্স বা সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের হালনাগাদ সদস্যপদ সনদ।
শিল্প আইআরসিতে এর সঙ্গে অগ্নি লাইসেন্স, বিনিয়োগ সংস্থার নিবন্ধন ও কাঁচামালের তালিকা; বহুজাতিক শ্রেণিতে যৌথ উদ্যোগ বা সমমানের চুক্তি; আর ইনডেন্টিংয়ে এজেন্সি চুক্তি ও সংগঠনের সদস্যপদ লাগে।[2] সব কাগজে প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা হুবহু এক রাখুন; বানানের অমিলই আবেদন ফেরত আসার সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
পূর্বশর্ত: ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিআইএন ও বিআইএন
নিবন্ধন সনদের আবেদন করার আগেই তিনটি মৌলিক কাগজ প্রস্তুত থাকতে হয়। কোম্পানি হিসেবে ব্যবসা করতে চাইলে প্রথমে আরজেএসসিতে নিবন্ধন করুন; ধাপগুলো আছে আমাদের কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন নির্দেশিকায়।
ট্রেড লাইসেন্স
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসার ধরন হিসেবে আমদানি, রপ্তানি বা ইনডেন্টিং উল্লেখ থাকা জরুরি। ঠিকানা যেন কার্যালয়ের প্রকৃত ঠিকানা হয়, কারণ নিবন্ধিত স্থানে ব্যবসা না থাকা সনদ স্থগিত বা বাতিলের একটি ঘোষিত কারণ।[2] লাইসেন্সের ফি ও নবায়ন নিয়ে দেখুন আমাদের ট্রেড লাইসেন্স বিশ্লেষণ (ইংরেজি)।
ই-টিআইএন ও আয়কর রিটার্ন
প্রতিষ্ঠানের নামে ই-টিআইএন এবং সর্বশেষ রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ আবেদনের অংশ।[2] নতুন প্রতিষ্ঠান হলে টিআইএন নেওয়ার পরপরই রিটার্ন জমার পরিকল্পনা করুন, কারণ নবায়নের সময়ও হালনাগাদ রিটার্নের প্রমাণ চাওয়া হয়।
বিআইএন বা ভ্যাট নিবন্ধন
টার্নওভার যত কমই হোক, আমদানি বা রপ্তানি করতে গেলে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) লাগবে বলে এনবিআরের ভ্যাট নির্দেশিকা স্পষ্ট করে দিয়েছে।[4] তা ছাড়া ১ জুলাই ২০২৫ থেকে আমদানি-রপ্তানির শুল্কায়নে সিসিআইঅ্যান্ডই ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোসহ ১৯টি সংস্থার সনদ, লাইসেন্স ও পারমিট বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে অনলাইনে দাখিল বাধ্যতামূলক।[5]
আমদানি রপ্তানি নিবন্ধন সনদের ফি ২০২৬
২০২৩ সালের আদেশের তফসিলে ফি নির্ধারিত। আইআরসির ফি নির্ভর করে বার্ষিক আমদানিসীমার ওপর; যত বেশি সীমা, তত বেশি ফি। নিচের সারণিতে প্রতিটি ধাপের নিবন্ধন ও নবায়ন ফি দেখানো হলো।[2]
| বার্ষিক আমদানিসীমা | নিবন্ধন ফি | নবায়ন ফি |
|---|---|---|
| ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত | ৫,০০০ | ৩,০০০ |
| ৫ লাখের বেশি থেকে ২৫ লাখ | ১০,০০০ | ৬,০০০ |
| ২৫ লাখের বেশি থেকে ৫০ লাখ | ২৪,০০০ | ১৬,০০০ |
| ৫০ লাখের বেশি থেকে ১ কোটি | ৪০,০০০ | ১৫,০০০ |
| ১ কোটির বেশি থেকে ৫ কোটি | ৫০,০০০ | ২২,০০০ |
| ৫ কোটির বেশি থেকে ২০ কোটি | ৬০,০০০ | ২৪,০০০ |
| ২০ কোটির বেশি থেকে ৫০ কোটি | ৭০,০০০ | ২৮,০০০ |
| ৫০ কোটির বেশি থেকে ১০০ কোটি বা তদূর্ধ্ব | ৮০,০০০ | ৩২,০০০ |
ইআরসি ও বিলম্ব ফি
সাধারণ ইআরসি ও বহুজাতিক ইআরসির নিবন্ধন ফি ১০,০০০ টাকা এবং নবায়ন ফি ৭,০০০ টাকা। ইনডেন্টিং সেবার ইআরসিতে নিবন্ধন ৫০,০০০ টাকা ও নবায়ন ২৫,০০০ টাকা। মেয়াদ পেরিয়ে নবায়ন করলে বিলম্ব ফি লাগে: ১ থেকে ৩ বছর দেরিতে আমদানিকারকের ২,০০০, রপ্তানিকারকের ১,০০০ ও ইনডেন্টরের ২,০০০ টাকা; ৪ থেকে ৫ বছরে যথাক্রমে ৫,০০০, ৪,০০০ ও ৫,০০০ টাকা; ৬ বছর বা তার বেশি হলে ২৫,০০০, ১০,০০০ ও ২৫,০০০ টাকা।[2]
একটি বিষয় লক্ষ করুন: গেজেটের তফসিলে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা সীমার নবায়ন ফি ১৫,০০০ টাকা, যা তার আগের ধাপের ১৬,০০০ টাকার চেয়ে কম। পরিশোধের আগে সিসিআইঅ্যান্ডইর অনলাইন ব্যবস্থায় দেখানো অঙ্কটি মিলিয়ে নিন এবং সরকারি ফির সঙ্গে প্রযোজ্য ভ্যাটও হিসাবে রাখুন।
সনদের মেয়াদ, নবায়ন, স্থগিত ও বাতিল
আদেশের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী নিবন্ধন ইস্যুর তারিখ থেকে এক বছর বহাল থাকে এবং নবায়নযোগ্য। অনুচ্ছেদ ৮ অনুযায়ী মেয়াদ শেষের অন্তত ৬০ দিন আগে অনলাইনে ফরম-৩, কাগজপত্র ও ফিসহ নবায়নের আবেদন করতে হয়, আর প্রধান নিয়ন্ত্রক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করতে পারেন। নবায়ন প্রত্যাখ্যান করলে কারণ লিখে আবেদনকারীকে জানাতে হয়।[2]
কোন কারণে সনদ বাতিল হয়
প্রধান নিয়ন্ত্রক সনদ স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন যদি আইন বা আদেশ ভঙ্গ হয়; মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ লঙ্ঘিত হয়; আমদানি বা রপ্তানিতে ওভার বা আন্ডার ইনভয়েসিং হয়; প্রতারণার মাধ্যমে নিবন্ধন নেওয়া হয়; নিবন্ধিত ঠিকানায় ব্যবসা না থাকে; কিংবা মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া হয়। স্থগিত বা বাতিলের আগে শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ দিতে হয়, বাতিল সনদ আর পুনর্বহাল হয় না, এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৯৭৭ সালের রিভিউ, আপিল ও রিভিশন আদেশের অধীনে প্রতিকার চাওয়া যায়।[2] কারণ দর্শানোর নোটিশ পেলে লিখিত, তথ্যনির্ভর জবাব দিন এবং আপিলের অধিকার সংরক্ষণ করুন।
ধাপে ধাপে রপ্তানি ব্যবসা শুরু
রপ্তানি ব্যবসা শুরু করা মানে কেবল ইআরসি নেওয়া নয়। পণ্যটি রপ্তানিযোগ্য কি না, কোন সংগঠনের সদস্যপদ লাগবে, কোন ব্যাংক ও কোন পরিশোধ পদ্ধতি বেছে নেবেন এবং কীভাবে রপ্তানিমূল্য দেশে আনবেন, সবই শুরুতে ঠিক করতে হয়। নিচের ধাপগুলো আমরা নতুন রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কাজ করার সময় যে ক্রমে চলি, তারই সারাংশ।
প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ঠিক করুন
একক মালিকানা, অংশীদারি না কোম্পানি তা চূড়ান্ত করুন; কোম্পানি হলে আগে আরজেএসসি নিবন্ধন নিন।
মৌলিক নিবন্ধন নিন
আমদানি বা রপ্তানি উল্লেখসহ ট্রেড লাইসেন্স, প্রতিষ্ঠানের ই-টিআইএন ও বিআইএন সংগ্রহ করুন।
ব্যাংক ও সংগঠন বাছুন
অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকে হিসাব খুলে ব্যাংক সনদ নিন এবং চেম্বার বা খাতভিত্তিক সংগঠনের সদস্য হন।
আইআরসি বা ইআরসির আবেদন
সিসিআইঅ্যান্ডইর অনলাইন ব্যবস্থায় সঠিক শ্রেণি ও আমদানিসীমা বেছে ফরম, কাগজ ও ফি জমা দিন।
পণ্য ও বাজার যাচাই
এইচএস কোড, রপ্তানি বা আমদানি নীতির তালিকা, ইপিবির সনদ ও গন্তব্য দেশের শর্ত মিলিয়ে নিন।
চুক্তি ও পরিশোধ পদ্ধতি
ইনকোটার্মস, এলসি বা চুক্তিভিত্তিক পরিশোধ, ইউসিপি ৬০০ ও সালিশি ধারা লিখিত চুক্তিতে রাখুন।
চালান ও কাস্টমস
এলসি বা ইএক্সপি ফরম, সিঙ্গেল উইন্ডোতে সনদ দাখিল এবং বিল অব এন্ট্রি বা বিল অব এক্সপোর্ট সম্পন্ন করুন।
মূল্য প্রত্যাবাসন ও নবায়ন
চার মাসের মধ্যে রপ্তানিমূল্য আনুন, প্রণোদনার দাবি করুন এবং মেয়াদ শেষের ৬০ দিন আগে সনদ নবায়ন করুন।
পণ্য যাচাই ও রপ্তানি নীতি
প্রথমে আট অঙ্কের এইচএস কোড নির্ধারণ করে রপ্তানি নীতির নিষিদ্ধ ও শর্তসাপেক্ষ তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নিন। বর্তমান রপ্তানি নীতি ২০২৪–২০২৭ মেয়াদের, যেখানে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে ১১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য রাখা হয়েছে এবং এলডিসি উত্তরণের পর নগদ প্রণোদনার বিকল্প খোঁজার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।[14] শর্তসাপেক্ষ পণ্যে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা সনদ ছাড়া চালান পাঠালে ১৯৫০ সালের আইনে তা অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়।[1]
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও খাতভিত্তিক সংগঠন
রপ্তানি প্রণোদনা ও বাজার সুবিধার অনেকটাই রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) হয়ে আসে। ইপিবি জিএসপি সনদ ও বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক উৎস সনদ দেয় এবং টেক্সটাইল ও নন-টেক্সটাইল পণ্যের নিবন্ধন করে। ১ মার্চ ২০২৫ থেকে জিএসপি সনদের ফি ৬০০ টাকা, টেক্সটাইল পণ্য নিবন্ধন ৭,৫০০ টাকা (নবায়ন ৪,০০০) এবং নন-টেক্সটাইল পণ্য নিবন্ধন ৫,০০০ টাকা (নবায়ন ৩,০০০), প্রতিটির সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট।[12] চেম্বার বা নিজের খাতের বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ নিবন্ধন সনদের আবেদনেরও অংশ, তাই রপ্তানি ব্যবসা শুরুর সময়েই সঠিক সংগঠন বেছে নিন।[2]
নগদ প্রণোদনা ২০২৬–২৭
নতুন রপ্তানি ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাবে নগদ প্রণোদনা প্রায়ই নির্ণায়ক। বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ জুলাই ২০২৬-এর সার্কুলারে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত জাহাজীকরণের জন্য ৪৩টি পণ্য ও সেবা খাতে ০.৩০ থেকে ১০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা বহাল রেখেছে। যেমন হস্তশিল্পে ৬ শতাংশ, সফটওয়্যার ও আইটিইএসে ৬ শতাংশ, ফ্রিল্যান্সারদের ২.৫০ শতাংশ এবং পোশাকের নতুন বাজারে ২ শতাংশ। দাবি নিষ্পত্তির আগে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানিমূল্য প্রত্যাবাসন, বৈদেশিক মুদ্রা বিধি মানা এবং ব্যাংকের নিয়োজিত বহিঃনিরীক্ষকের নিরীক্ষা শেষ হওয়া বাধ্যতামূলক।[11]
ইএক্সপি ফরম ও চার মাসের নিয়ম
যেকোনো রপ্তানি ব্যবসায় প্রতিটি চালান ইএক্সপি ফরমে ঘোষণা করতে হয়, যা সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন এক্সপোর্ট মনিটরিং সিস্টেমে তৈরি হয়। রপ্তানিমূল্য প্রত্যাবাসনের নির্ধারিত সময় চার মাস; ২০২৬ সালের রপ্তানি সার্কুলারটি জারির তারিখ থেকে এক বছর বহাল থাকবে।[7] চার মাস পেরিয়ে গেলে নগদ প্রণোদনা তো হারাবেনই, বৈদেশিক মুদ্রা আইনের ঝুঁকিও তৈরি হবে।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি
আপনার রপ্তানি ব্যবসা যদি আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে পণ্য বানানোর ওপর নির্ভর করে, তাহলে শুল্কমুক্ত সুবিধার জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স নেওয়া প্রায় অপরিহার্য, আর কাঁচামালের অর্থায়ন সাধারণত মাস্টার এলসির বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসিতে হয়। লাইসেন্সের শর্ত, বন্ড অডিট ও অপব্যবহারের শাস্তি নিয়ে দেখুন আমাদের বন্ডেড ওয়্যারহাউস বিশ্লেষণ (ইংরেজি)।

আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে এলসি খোলার নিয়ম
ঋণপত্র বা এলসি (Letter of Credit) হলো আমদানিকারকের ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিদেশি বিক্রেতাকে দেওয়া লিখিত অঙ্গীকার: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্তমতো দলিল জমা দিলে ব্যাংক মূল্য পরিশোধ করবে। বিক্রেতা ক্রেতার দেউলিয়াত্বের ঝুঁকির বদলে কেবল নিজের দলিল ঠিক রাখার ঝুঁকি নেন, আর ক্রেতা নিশ্চিত হন যে চালানের দলিল ছাড়া টাকা যাবে না।
ব্যাংকের শর্ত ও যোগ্যতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ আগস্ট ২০২৬-এর এফইপিডি-১ সার্কুলার নং ৩০ অনুযায়ী এলসি খুলতে পারেন কেবল সিসিআইঅ্যান্ডইতে নিবন্ধিত বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত আমদানিকারক। ব্যাংক কেবল নিজের হিসাবধারী এবং ওই ব্যবসায় পরিচিত গ্রাহকের জন্য এলসি খোলে, আর গ্রাহকের বাংলাদেশে শনাক্তযোগ্য ব্যবসাস্থল থাকতে হয়। এলসি খোলার আগে দৃঢ় ক্রয়াদেশ দেওয়া ও গৃহীত হওয়ার দালিলিক প্রমাণ চাওয়া হয়।[6]
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- প্রোফর্মা ইনভয়েস বা ইনডেন্ট, যেখানে পণ্যের পূর্ণ বিবরণ, একক মূল্য, পরিমাণ, ইনকোটার্মস অনুযায়ী পরিবহন খরচ এবং আট অঙ্কের এইচএস কোড থাকবে; সঠিক এইচএস কোড ছাড়া ব্যাংক আমদানি শুরুই করতে পারে না।
- ব্যাংকের এলসি আবেদন ফরম ও ঋণ সুবিধার দলিল, সঙ্গে হালনাগাদ আইআরসি।
- পরিশোধের জন্য নিবন্ধন নম্বরসহ আইএমপি ফরম।
- বিদেশি সরবরাহকারীর প্রোফর্মায় ৩০,০০০ মার্কিন ডলার বা স্থানীয় এজেন্টের ইনডেন্টে ৪০,০০০ ডলারের বেশি হলে সরবরাহকারীর ক্রেডিট রিপোর্ট, যা ১২ মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।
উপরের প্রতিটি শর্ত ২০২৬ সালের আমদানি সার্কুলারে নির্ধারিত।[6] বাস্তবে সিএফআর বা সিপিটি শর্তে আমদানিতে ব্যাংক বিমার কভার নোটও চায়। পণ্য আসার পর প্রতিটি পরিশোধের চার মাসের মধ্যে কাস্টমস-সত্যায়িত বিল অব এন্ট্রি জমা না দিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া নতুন এলসি খোলা বন্ধ হয়ে যায়।[6] এলসির পূর্ণাঙ্গ আইনি বিশ্লেষণ আছে আমাদের লেটার অব ক্রেডিট নির্দেশিকায় (ইংরেজি)।
এলসির প্রকারভেদ
দেখামাত্র পরিশোধযোগ্য সাইট এলসি বাণিজ্যিক আমদানিতে সবচেয়ে প্রচলিত। মেয়াদি বা ইউজেন্স এলসিতে পরে পরিশোধ হয়; সার্কুলার অনুযায়ী শিল্পের কাঁচামালে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন বা নগদ রূপান্তর চক্র, যেটি আগে আসে, যন্ত্রাংশে ৩৬০ দিন, জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ১৮০ দিন এবং মূলধনি যন্ত্রপাতিতে তিন বছর।[6] রপ্তানিমুখী শিল্পে মাস্টার এলসির বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়। এলসি হস্তান্তরযোগ্য হবে কেবল তখনই, যখন তাতে স্পষ্টভাবে "transferable" লেখা থাকে।[13]
এলসি মার্জিন: বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫–২০২৬ সালের নীতি
এলসি মার্জিন হলো এলসি খোলার সময় ব্যাংকে জমা রাখা নগদ অর্থ বা সমমানের জামানত। ডলার সংকটের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক এটিকে আমদানি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল; সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ কিছু পণ্যে শতভাগ মার্জিন বাধ্যতামূলক করা হয়।[9] ২০২৫ সাল থেকে উল্টো দিকে যাত্রা শুরু হয়।
ধাপে ধাপে শিথিলতা
১১ নভেম্বর ২০২৫-এ রমজানকে সামনে রেখে চাল, গম, পেঁয়াজ, ডাল, ভোজ্যতেল, ছোলা, মটর, মসলা ও খেজুর আমদানিতে ন্যূনতম মার্জিনের বাধ্যবাধকতা ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তুলে নিয়ে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে মার্জিন নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হয়।[9] এরপর ১৬ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি ফল আমদানিতে ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে চলা শতভাগ নগদ মার্জিনের শর্ত প্রত্যাহার করে মার্জিনের হার ব্যাংকের বিবেচনায় ছেড়ে দেয়।[10]
এখন মার্জিন কে ঠিক করে
২০২৬ সালের আমদানি সার্কুলারে সাধারণ আমদানির জন্য কোনো ন্যূনতম মার্জিন নির্ধারণ নেই।[6] ফলে মার্জিন এখন দরকষাকষির বিষয়: ব্যাংক আপনার লেনদেনের ইতিহাস, জামানত ও নগদ প্রবাহ দেখে হার ঠিক করবে। নতুন আমদানিকারকের উচিত ব্যাংকের সঙ্গে আগেই লিখিত ঋণসীমা ও মার্জিনের হার চূড়ান্ত করা।
ইউসিপি ৬০০: এলসির আন্তর্জাতিক নিয়ম
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে আমদানি এলসি খোলার সময় প্রচলিত ইউসিপি অনুসরণ করতে হয়, যা বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের ইউসিপি ৬০০ (Uniform Customs and Practice for Documentary Credits)।[6] ইউসিপি ৬০০-এর যে কয়েকটি অনুচ্ছেদ প্রতিদিনের কাজে সবচেয়ে বেশি লাগে:
- অনুচ্ছেদ ৩: এলসিতে উল্লেখ না থাকলেও তা অপরিবর্তনীয় (irrevocable)।
- অনুচ্ছেদ ৪ ও ৫: এলসি বিক্রয়চুক্তি থেকে আলাদা লেনদেন, এবং ব্যাংক পণ্য নয়, কেবল দলিল নিয়ে কাজ করে।
- অনুচ্ছেদ ১৪(খ): দলিল পরীক্ষা করতে প্রতিটি ব্যাংক সর্বোচ্চ পাঁচ ব্যাংকিং দিন পায়।
- অনুচ্ছেদ ১৪(গ): মূল পরিবহন দলিল জাহাজীকরণের ২১ দিনের মধ্যে এবং এলসির মেয়াদের মধ্যে উপস্থাপন করতে হয়।
- অনুচ্ছেদ ১৬: দলিল প্রত্যাখ্যান করলে প্রতিটি অসংগতি উল্লেখ করে একবারই নোটিশ দিতে হয়।
উপরের প্রতিটি নিয়ম ইউসিপি ৬০০-এর মূল পাঠ থেকে নেওয়া।[13] ব্যবহারিক শিক্ষা হলো, রপ্তানিকারক হিসেবে এলসির প্রতিটি শর্ত চালানের আগেই পড়ে নিন; সামান্য বানান বা তারিখের অমিলও প্রত্যাখ্যানের কারণ হতে পারে।

আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯ ও রপ্তানি নীতি
আমদানি নীতি আদেশ ২০২১–২০২৪-এর মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৪-এ শেষ হলেও নতুন আদেশ না আসা পর্যন্ত সেটিই বহাল ছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৪ আগস্ট ২০২৬ আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯-এর গেজেট প্রকাশ করেছে।[8]
নতুন আমদানি নীতির প্রধান পরিবর্তন
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, শিল্প ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরা এখন এলসির পাশাপাশি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে কোনো মূল্যসীমা ছাড়াই আমদানি করতে পারবেন; আগে বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরা এলসি ছাড়া বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ডলারের পণ্য আনতে পারতেন। নতুন আদেশে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউসের বিধান, প্রথমবারের মতো অনিবাসী বাংলাদেশির সংজ্ঞা এবং সিবিইউ মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনসীমা ১৬৫ সিসি থেকে ৩৭৫ সিসিতে উন্নীত করার কথা আছে।[8] এলসি এখন বাধ্যবাধকতা নয়, বেছে নেওয়ার বিষয়; কোন পদ্ধতি কখন উপযুক্ত, তা নিয়ে দেখুন আমাদের এলসি বনাম টিটি বিশ্লেষণ (ইংরেজি)।
রপ্তানি নীতির ভূমিকা
রপ্তানির ক্ষেত্রে রপ্তানি নীতি ঠিক করে কোন পণ্য একেবারে নিষিদ্ধ, কোনগুলো শর্তসাপেক্ষ এবং কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে। ২০২৪–২০২৭ মেয়াদের নীতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে শেষ হবে, তাই পরবর্তী রপ্তানি নীতি প্রণয়নের কাজ সামনেই।[14] এলডিসি উত্তরণের পর নগদ প্রণোদনা সংকুচিত হলে বন্ড সুবিধা, শুল্ক প্রত্যর্পণ ও ভ্যাট ফেরতের মতো অ-নগদ সহায়তার গুরুত্ব বাড়বে; খসড়া পর্যায়ে নিজের খাতের সংগঠনের মাধ্যমে মতামত দিন।
আমদানি রপ্তানি নিবন্ধন ও এলসিতে সাধারণ ভুল
আমাদের অভিজ্ঞতায় নিচের ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি খরচ ডেকে আনে:
- নবায়ন ভুলে যাওয়া: ৬০ দিন আগে আবেদনের নিয়ম না মানায় সনদ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়, ব্যাংক এলসি বা ইএক্সপি আটকে দেয়, আর বিলম্ব ফি জমতে থাকে।
- ভুল ধরনের আইআরসি: শিল্প আইআরসিতে আনা কাঁচামাল বাজারে বিক্রি করা নিবন্ধনের শর্ত ভঙ্গ।
- আমদানিসীমা ছাড়িয়ে যাওয়া: ব্যবসা বাড়লে আগে সীমা বাড়ানোর আবেদন করুন, পরে এলসি খুলুন।
- এইচএস কোডে অমিল: প্রোফর্মা, এলসি ও বিল অব এন্ট্রিতে একই কোড না থাকলে কাস্টমস জরিমানা ও ব্যাংকের আপত্তি দুটোই আসে।
- বিল অব এন্ট্রি জমা না দেওয়া: একটি মাত্র অমিল চালান পুরো প্রতিষ্ঠানের নতুন এলসি বন্ধ করে দিতে পারে।
- ওভার বা আন্ডার ইনভয়েসিং: এটি সনদ বাতিলের পাশাপাশি মানিলন্ডারিং আইনের ঝুঁকি তৈরি করে।
- চার মাসের প্রত্যাবাসন সময় পার করা: রপ্তানিমূল্য দেরিতে এলে নগদ প্রণোদনা হারান এবং ব্যাংকের তদারকির মুখে পড়েন।
- কাগজে নাম ও ঠিকানার অমিল: ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, বিআইএন ও আরজেএসসি রেকর্ডে নাম এক না থাকলে আবেদন ফেরত আসে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনজীবীর ভূমিকা
নিবন্ধন সনদ নেওয়া তুলনামূলক সহজ কাজ; কঠিন অংশ শুরু হয় তার পরে। বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে বিক্রয়চুক্তি, ইনকোটার্মস ও পরিশোধ পদ্ধতি নির্বাচন, এজেন্সি বা ডিস্ট্রিবিউশন চুক্তি, বন্ড লাইসেন্স, কাস্টমসের দাবিনামা, অসংগতির কারণে আটকে যাওয়া এলসি, কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব, প্রতিটি ক্ষেত্রে শুরুতেই সঠিক আইনি কাঠামো পরে মামলা ও লোকসান এড়ায়।
একজন অভিজ্ঞ আমদানি-রপ্তানি আইনজীবী আপনার পণ্য ও এইচএস কোড যাচাই, সঠিক শ্রেণির সনদ বাছাই, ব্যাংকের ঋণসীমা ও মার্জিন নিয়ে দরকষাকষি, চুক্তিতে সালিশি ধারা এবং বিরোধ দেখা দিলে প্রতিকারের পথ ঠিক করে দিতে পারেন। TRW-এর কাস্টমস ও বাণিজ্য কমপ্লায়েন্স এবং রপ্তানি লাইসেন্স ও বাজারে প্রবেশাধিকার দল এই কাজগুলোই করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আমদানি রপ্তানি লাইসেন্স কোথা থেকে নিতে হয়?
আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর (সিসিআইঅ্যান্ডই) থেকে। আমদানির জন্য আইআরসি এবং রপ্তানির জন্য ইআরসি অনলাইনে আবেদন করে নিতে হয়।[2]
আইআরসি করতে কত টাকা লাগে?
বার্ষিক আমদানিসীমা অনুযায়ী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ কোটি টাকার বেশি সীমায় ৮০,০০০ টাকা। নবায়ন ফি ৩,০০০ থেকে ৩২,০০০ টাকা।[2]
ইআরসির ফি ও নবায়ন ফি কত?
সাধারণ ও বহুজাতিক ইআরসিতে নিবন্ধন ১০,০০০ টাকা ও নবায়ন ৭,০০০ টাকা; ইনডেন্টিং সেবার ইআরসিতে নিবন্ধন ৫০,০০০ ও নবায়ন ২৫,০০০ টাকা।[2]
আইআরসি বা ইআরসির মেয়াদ কত দিন?
ইস্যুর তারিখ থেকে এক বছর। মেয়াদ শেষের অন্তত ৬০ দিন আগে নবায়নের আবেদন করতে হয় এবং সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করা যায়।[2]
আইআরসির জন্য কী কী কাগজ লাগে?
হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স বা নিবন্ধন সনদ, ই-টিআইএন ও রিটার্নের প্রমাণ, জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট, ব্যাংক সনদ এবং চেম্বার বা বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ। শিল্প আইআরসিতে অগ্নি লাইসেন্স ও কাঁচামালের তালিকাও লাগে।[2]
বিআইএন ছাড়া কি আমদানি রপ্তানি করা যায়?
না। টার্নওভার যত কমই হোক, আমদানি বা রপ্তানির জন্য বিআইএন লাগবে বলে এনবিআরের নির্দেশিকায় বলা আছে।[4]
এলসি খুলতে কত মার্জিন দিতে হয়?
ইউসিপি ৬০০ কী?
এলসি ছাড়া কি আমদানি করা যায়?
যায়। আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯ শিল্প ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে আমদানির সুযোগ দিয়েছে।[8]
সূত্র তালিকা
প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র
উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।
- The Imports and Exports (Control) Act, 1950 (Act No. XXXIX of 1950) — MCCI Dhaka
- আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও ইনডেন্টর (নিবন্ধন) আদেশ, ২০২৩ (এসআরও নং ৩২৬-আইন/২০২৩) — বাংলাদেশ গেজেট, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
- The Financial Express, 22 July 2026 — Govt to introduce unified IRC to simplify import registration
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড — মূসক কমপ্লায়েন্স নির্দেশিকা: নিবন্ধন ও তালিকাভুক্তি
- বিডিনিউজ২৪, ৩০ জুন ২০২৫ — আমদানি-রপ্তানির সনদ, লাইসেন্স অনলাইনে দাখিল বাধ্যতামূলক
- Bangladesh Bank, FEPD-1 Circular No. 30 (13 August 2026) — Consolidated circular on import transactions
- Bangladesh Bank, FEPD-1 Circular No. 26 (30 July 2026) — Consolidated circular on export transactions
- Dhaka Tribune, 25 August 2026 — Imports allowed outside LCs without value limits (Import Policy Order 2026–2029)
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ১১ নভেম্বর ২০২৫ — রমজানের আগে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে এলসি মার্জিন শিথিল
- Dhaka Tribune, 17 August 2026 — BB eases LC terms to reduce imported fruit prices
- Dhaka Tribune, 6 July 2026 — FY27: BB retains cash incentive for exports of 43 sectors
- The Business Standard, March 2025 — EPB raises fees for exporter services, forms
- ICC Uniform Customs and Practice for Documentary Credits (UCP 600) — text
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ১৫ মে ২০২৪ — ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য (রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭)
TRW-এর সহায়তা
তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে
TRW আইআরসি, ইআরসি ও ইনডেন্টিং নিবন্ধন, নবায়ন ও কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব, রপ্তানি চুক্তি, এলসি ও বন্ড লাইসেন্স এবং কাস্টমস বিরোধে পূর্ণাঙ্গ সহায়তা দেয়। আমাদের কাস্টমস ও বাণিজ্য কমপ্লায়েন্স এবং রপ্তানি লাইসেন্স ও বাজারে প্রবেশাধিকার সেবা দেখুন, অথবা আপনার বিষয়ে আলোচনার জন্য TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।