TRW Insight / বাংলাদেশ
সাজা বা খালাসের রায়ের পর প্রথম কয়েক দিনেই ঠিক হয়ে যায় পরের লড়াইয়ের সুযোগ থাকবে কি না। কোন রায়ে আপিল, কোনটিতে রিভিশন, কোন আদালতে, কত দিনের মধ্যে এবং আপিল চলাকালে জামিন কীভাবে, তা জানলে অধিকার হারানোর ঝুঁকি কমে।
ফৌজদারি আপিল ও রিভিশন ২০২৬: আইন কী বলে
রায়ে সাজা হলে বা আসামি খালাস পেলে পরের প্রশ্ন একটাই: এখন কোথায় যাব, কত দিনের মধ্যে? বাংলাদেশে ফৌজদারি আপিল আইনের সৃষ্টি। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৪০৪ ধারা বলে, এই কার্যবিধি বা অন্য কোনো আইনে বিধান না থাকলে কোনো ফৌজদারি আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে আপিল চলে না।[1] আপিলের পাশে আছে রিভিশন, অর্থাৎ ঊর্ধ্বতন আদালতের তদারকি ক্ষমতা (৪৩৫–৪৪২ক ধারা), আর একেবারে শেষে হাইকোর্ট বিভাগের সহজাত ক্ষমতা (৫৬১এ ধারা)।[1] সময়ের হিসাব দেয় তামাদি আইন ১৯০৮, যেখানে মৃত্যুদণ্ডের রায়ে আপিলের সময় মাত্র সাত দিন।[4]
এই লেখায় একসঙ্গে পাবেন: আপিল ও রিভিশনের পার্থক্য, কে আপিল করতে পারেন (দণ্ডিত ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও বাদী), কোন রায়ের আপিল দায়রা জজ আদালতে আর কোনটি হাইকোর্ট বিভাগে, আপিলের সময়সীমা ও সার্টিফায়েড কপি, আপিলকালীন জামিন, রিভিশনের সীমা, ৫৬১এ ধারা, আপিল বিভাগে লিভ পিটিশন এবং ২০২৬ সালের সংশোধনী কী বদলেছে আর কী বদলায়নি।

সারসংক্ষেপ: ম্যাজিস্ট্রেট বা যুগ্ম দায়রা জজের দণ্ডের আপিল সাধারণত দায়রা জজ আদালতে ৩০ দিনের মধ্যে; দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজের দণ্ডের আপিল হাইকোর্ট বিভাগে ৬০ দিনের মধ্যে, মৃত্যুদণ্ড হলে ৭ দিনের মধ্যে। খালাসের বিরুদ্ধে সরকার ছয় মাসে, নালিশি মামলার বাদী ৬০ দিনে আপিল করতে পারেন। যেখানে আপিল চলে না, সেখানে রিভিশন; দায়রা জজের রিভিশনের পর দ্বিতীয় রিভিশন নেই, থাকে শুধু ৫৬১এ ধারা। হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের পর আপিল বিভাগে সাধারণত লিভ পিটিশন, ৩০ দিনের মধ্যে।
মূল বিষয়: আপিলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আপিল না করলে সেই পক্ষ পরে রিভিশন করতে পারেন না (৪৩৯(৫) ধারা)। আবার দায়রা জজের কাছে রিভিশন হেরে গেলে হাইকোর্ট বিভাগে দ্বিতীয় রিভিশন চলে না (৪৩৯(৪) ও ৪৩৯ক(২) ধারা)। তাই রায়ের দিনই ঠিক করুন কোন প্রতিকার, কোন আদালত, কোন তারিখের মধ্যে।
এক নজরে
আইনে থাকলেই আপিল
৪০৪ ধারা: বিধান না থাকলে আপিল নেই; ৪১৮ ধারায় আপিল তথ্য ও আইন দুই প্রশ্নেই চলে।
আদালত ঠিক করে বিচারিক আদালত
ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ডে দায়রা জজ; দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজের দণ্ডে হাইকোর্ট বিভাগ।
আপিলের সময়সীমা
মৃত্যুদণ্ডে ৭ দিন, নিম্ন আপিল আদালতে ৩০ দিন, হাইকোর্ট বিভাগে ৬০ দিন; খালাসের বিরুদ্ধে সরকারের ছয় মাস।
আপিলকালীন জামিন
৪২৬ ধারায় দণ্ড স্থগিত রেখে জামিন; এক বছর পর্যন্ত সাজায় বিচারিক আদালতই জামিন দিতে পারে।
রিভিশন একবারই
দায়রা জজের রিভিশন আদেশ আবেদনকারীর জন্য চূড়ান্ত; এরপর শুধু ৫৬১এ ধারার সংকীর্ণ পথ।
সূচিপত্র
আপিল ও রিভিশনের পার্থক্য: আগে প্রতিকার বাছাই
আপিল ও রিভিশন শুনতে কাছাকাছি, কিন্তু চরিত্রে আলাদা। ভুল প্রতিকার বেছে নিলে সময়ও যায়, অধিকারও হারাতে পারে। তাই রায়ের কপি হাতে নেওয়ার আগেই জানা দরকার কোন পথটি আপনার জন্য খোলা।
আপিল: মামলার পূর্ণ পুনঃশুনানি
৪১৮ ধারা অনুযায়ী আপিল তথ্যগত প্রশ্নে এবং আইনগত প্রশ্নে দুইভাবেই চলে, আর সাজা অতিরিক্ত কঠোর হয়েছে এমন দাবিকেও আইনগত প্রশ্ন ধরা হয়।[1] অর্থাৎ আপিল আদালত সাক্ষ্য নতুন করে পড়ে দেখেন, সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরার মধ্যে অসংগতি বিচার করেন এবং প্রয়োজনে খালাস, পুনর্বিচার বা সাজা কমানোর আদেশ দেন। দণ্ডিত ব্যক্তির জন্য এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিকার।
রিভিশন: ঊর্ধ্বতন আদালতের তদারকি
৪৩৫ ধারায় হাইকোর্ট বিভাগ বা দায়রা জজ অধস্তন ফৌজদারি আদালতের নথি তলব করে দেখতে পারেন কোনো সিদ্ধান্ত, দণ্ড বা আদেশ সঠিক, বৈধ ও যথাযথ কি না এবং কার্যধারা নিয়মমাফিক চলেছে কি না।[1] হাইকোর্ট বিভাগ বলেছে, রিভিশনের ক্ষমতা মামলাকারীর কোনো অধিকার তৈরি করে না; এটি আদালতের তদারকি ক্ষমতা, যা আইনের ভুল ধারণা, পদ্ধতিগত অনিয়ম বা ন্যায়বিচারের গুরুতর বিচ্যুতি সংশোধনে প্রয়োগ হয়।[7] ফৌজদারি রিভিশন তাই দ্বিতীয় আপিল নয়; আদালত শুধু ভিন্ন মত পোষণের কারণে তথ্যগত সিদ্ধান্ত বদলান না।
আপিল থাকলে রিভিশন নয়
৪৩৯(৫) ধারা স্পষ্ট: যেখানে আপিল চলে অথচ আপিল করা হয়নি, সেখানে যে পক্ষ আপিল করতে পারতেন তার আবেদনে রিভিশন গ্রহণযোগ্য নয়।[1] দণ্ডিত ব্যক্তি আপিলের সময় পার করে দিয়ে পরে রিভিশন চাইলে দরজা বন্ধ পাবেন। অন্যদিকে চার্জ গঠন, অব্যাহতি, নালিশ খারিজ বা জামিন সংক্রান্ত আদেশের মতো যেসব আদেশের বিরুদ্ধে আপিল নেই, সেগুলোর স্বাভাবিক প্রতিকার রিভিশন। পুরো মামলাটাই হয়রানিমূলক হলে প্রশ্ন আসে ৫৬১এ ধারার; মামলার শুরু থেকে রায় পর্যন্ত ধাপগুলো দেখুন আমাদের ফৌজদারি মামলার পর্যায় লেখায়।
কে আপিল করতে পারেন: দণ্ডিত ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও বাদী
দণ্ডিত ব্যক্তি
যে আদালত দণ্ড দিয়েছেন তার স্তর অনুযায়ী দণ্ডিত ব্যক্তি আপিল করেন। যৌথ বিচারে একজনের বিরুদ্ধে আপিলযোগ্য রায় হলে ৪১৫ক ধারায় সব দণ্ডিত আসামিই আপিল করতে পারেন।[1] কারাগারে থাকা আসামি ৪২০ ধারায় জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আপিলের দরখাস্ত দিতে পারেন; ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তা উপযুক্ত আপিল আদালতে পাঠাতে বাধ্য। এটাই জেল আপিল।[1]
খালাসের বিরুদ্ধে সরকার: ৪১৭(১) ধারা
খালাসের রায় হলে আসামির জন্য মামলা শেষ মনে হলেও সরকার আপিল করতে পারে। ৪১৭(১) ধারায় সরকার পাবলিক প্রসিকিউটরকে নির্দেশ দিতে পারে: দায়রা আদালতের খালাসের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে, আর ম্যাজিস্ট্রেটের খালাসের আদেশের বিরুদ্ধে দায়রা আদালতে আপিল করতে।[1] এ ধরনের আপিলে ৪২৭ ধারায় আপিল আদালত খালাসপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেপ্তারের পরোয়ানা দিতে বা জামিনে রাখতে পারেন।[1]
নালিশি মামলার বাদী: ৪১৭(২) ধারা
আদালতে নালিশ (সিআর মামলা) দিয়ে শুরু হওয়া মামলায় বাদী মূল খালাসের আদেশের বিরুদ্ধে নিজেই আপিল করতে পারেন, তবে শর্ত কঠিন: আদেশে এমন আইনগত ভুল থাকতে হবে যার ফলে ন্যায়বিচার ব্যর্থ হয়েছে। খালাসের আদেশের ৬০ দিন পর বাদীর আপিল চলে না।[1] থানার মামলায় (জিআর মামলা) বাদীর এই অধিকার নেই; তাকে সরকারের মাধ্যমে আপিলের ব্যবস্থা করাতে হয়। খালাসের বিরুদ্ধে আপিলে আসামিকে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক (৪২২ ধারা)। মো. নাজমুল ইসলাম মামলায় ঢাকার দায়রা জজ নোটিশ ছাড়াই বাদীর আপিল মঞ্জুর করে ম্যাজিস্ট্রেটের খালাসের রায় উল্টে দিয়েছিলেন; হাইকোর্ট বিভাগ ৫ জানুয়ারি ২০২৩ সেই আদেশ বাতিল করে নোটিশ দিয়ে নতুন করে শুনানির নির্দেশ দেন।[9]
সাজা বাড়ানোর আপিল: ৪১৭ক ধারা
সাজা অপর্যাপ্ত মনে হলে ৪১৭ক ধারায় সরকার হাইকোর্ট বিভাগে, আর বাদী দণ্ডের ৬০ দিনের মধ্যে আপিল আদালতে আপিল করতে পারেন। আসামিকে কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে সাজা বাড়ানো যায় না, এবং তখন তিনি খালাস বা সাজা কমানোর যুক্তিও তুলতে পারেন।[1]
যেখানে আপিল চলে না
দায়রা আদালত, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দোষ স্বীকার করে দণ্ডিত হলে ৪১২ ধারায় আপিল শুধু সাজার পরিমাণ বা বৈধতা নিয়ে চলে।[1] ৪১৩ ও ৪১৪ ধারায় ক্ষুদ্র দণ্ডে আপিল চলে না; ২০২৬ সালের সংশোধনীতে শুধু জরিমানার সেই সীমা বাড়িয়ে ৫,০০০ টাকা করা হয়েছে।[3] তবে ক্ষুদ্র দণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনো সাজা যুক্ত হলে ৪১৫ ধারায় আপিলের অধিকার ফিরে আসে।[1] যেখানে আপিল নেই, সেখানে প্রতিকার রিভিশন।
কোন আদালতে ফৌজদারি আপিল: দায়রা জজ, হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ
আপিলের আদালত ঠিক হয় বিচারিক আদালতের স্তর দেখে, আর একটি ক্ষেত্রে সাজার মেয়াদ দেখে। ভুল আদালতে দাখিল করলে দরখাস্ত ফেরত আসে, কিন্তু সময় থেমে থাকে না।
দায়রা জজ আদালতে আপিল
৪০৮ ধারায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ডের আপিল যায় দায়রা জজের কাছে; দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ডের আপিল ৪০৭ ধারায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে।[1] যুগ্ম দায়রা জজের দণ্ডের আপিলও দায়রা জজের কাছে যায়, তবে যুগ্ম দায়রা জজ পাঁচ বছরের বেশি কারাদণ্ড দিলে আপিল হবে হাইকোর্ট বিভাগে।[1] ৪০৯ ধারায় দায়রা জজ নিজে আপিল শুনতে পারেন অথবা অতিরিক্ত দায়রা জজের কাছে পাঠাতে পারেন।[1] ঢাকা জজ কোর্টে বাস্তবে আপিল দাখিল হয় দায়রা জজ বা মহানগর দায়রা জজ আদালতে, শুনানি প্রায়ই হয় বদলি হওয়া অতিরিক্ত আদালতে।
হাইকোর্ট বিভাগে আপিল
৪১০ ধারায় দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজের বিচারে দণ্ডিত যেকোনো ব্যক্তি হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারেন।[1] হত্যা, ধর্ষণ, মাদক ও বিশেষ আইনের বড় মামলাগুলোর বিচার এই স্তরে হয়, তাই হাইকোর্টের বেশির ভাগ ফৌজদারি আপিল আসে এই ধারায়। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের আপিলের পথ ও সময় সেই বিশেষ আইনেই দেখে নিতে হয়। চেক ডিজঅনার মামলার আপিলে আলাদা শর্ত আছে; দেখুন আমাদের চেক মামলার আপিল বিষয়ক লেখা।
মৃত্যুদণ্ড: ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল
দায়রা আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে ৩৭৪ ধারায় পুরো নথি হাইকোর্ট বিভাগে পাঠাতে হয়, এবং হাইকোর্ট বিভাগ অনুমোদন না করা পর্যন্ত দণ্ড কার্যকর হয় না।[1] এই ডেথ রেফারেন্সের সঙ্গে দণ্ডিতের নিয়মিত আপিল ও জেল আপিল একসঙ্গে শোনা হয়। ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ হাইকোর্ট বিভাগ একটি ডেথ রেফারেন্সের সঙ্গে একটি নিয়মিত আপিল, দুটি জেল আপিল ও বাদীপক্ষের একটি রিভিশন একসঙ্গে নিষ্পত্তি করে: একজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, একজনের দণ্ড যাবজ্জীবনে রূপান্তর এবং দুজন আপিলকারী খালাস পান।[10] নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল অগ্রাধিকার দিয়ে শুনতে প্রধান বিচারপতি ১০ জুন ২০২৬ একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন; ১৪ জুন থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে বেঞ্চটি ১০টি রায় দেয়।[13]
নিচের ছক বিচারিক আদালত অনুযায়ী আপিলের পথ ও সময় একসঙ্গে দেখায়। ফোনে পাশে স্ক্রল করুন।
| বিচারিক আদালত বা রায় | আপিল আদালত | আইনি ভিত্তি | সময়সীমা |
|---|---|---|---|
| দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ড | চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট | ধারা ৪০৭ | ৩০ দিন |
| মেট্রোপলিটন বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ড | দায়রা জজ | ধারা ৪০৮ | ৩০ দিন |
| যুগ্ম দায়রা জজের দণ্ড (৫ বছর পর্যন্ত) | দায়রা জজ | ধারা ৪০৮ | ৩০ দিন |
| যুগ্ম দায়রা জজের ৫ বছরের বেশি কারাদণ্ড | হাইকোর্ট বিভাগ | ধারা ৪০৮-এর শর্ত | ৬০ দিন |
| দায়রা বা অতিরিক্ত দায়রা জজের দণ্ড | হাইকোর্ট বিভাগ | ধারা ৪১০ | ৬০ দিন; মৃত্যুদণ্ডে ৭ দিন |
| খালাস (সরকারের আপিল) | দায়রা আদালত বা হাইকোর্ট বিভাগ | ধারা ৪১৭(১) | ছয় মাস |
| নালিশি মামলায় খালাস (বাদীর আপিল) | দায়রা আদালত বা হাইকোর্ট বিভাগ | ধারা ৪১৭(২), (৩) | ৬০ দিন |
| হাইকোর্ট বিভাগের রায় | আপিল বিভাগ | সংবিধান অনুচ্ছেদ ১০৩ | ৩০ দিন (লিভ বা অধিকারবলে আপিল) |
আপিলের সময়সীমা: ৭, ৩০, ৬০ দিন ও ছয় মাস
কার্যবিধি নিজে অল্প কয়েকটি সময় বেঁধে দিয়েছে; মূল আপিলের সময়সীমা তামাদি আইন ১৯০৮-এর প্রথম তফসিলে। দায়রা আদালতের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল দণ্ডের তারিখ থেকে ৭ দিন (অনুচ্ছেদ ১৫০); হাইকোর্ট বিভাগ ছাড়া অন্য আদালতে আপিল ৩০ দিন (অনুচ্ছেদ ১৫৪); হাইকোর্ট বিভাগে অন্যান্য আপিল ৬০ দিন (অনুচ্ছেদ ১৫৫); আর খালাসের আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল আদেশের তারিখ থেকে ছয় মাস (অনুচ্ছেদ ১৫৭)।[4] বাদীর ৬০ দিনের সীমা আলাদাভাবে ৪১৭(৩) ধারায়।[1] বিশেষ আইনে ভিন্ন সময় থাকলে সেটিই প্রযোজ্য, তাই বিশেষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালের রায়ে আপিলের সময়সীমা সেই আইন খুলে মিলিয়ে নিন।
সার্টিফায়েড কপি ও সময় গণনা
তামাদি আইনের ১২(২) ধারায় আপিলের সময় গণনায় রায় ঘোষণার দিন এবং যে দণ্ড বা আদেশের বিরুদ্ধে আপিল, তার কপি তুলতে প্রয়োজনীয় সময় বাদ যায়।[4] কার্যবিধির ৩৭১ ধারায় আসামি আবেদন করলে দেরি না করে রায়ের কপি পাওয়ার অধিকারী, আর সংক্ষিপ্ত বিচার ছাড়া অন্য মামলায় তা বিনা খরচে।[1] ৪১৯ ধারায় আপিলের দরখাস্তের সঙ্গে রায় বা আদেশের কপি দিতে হয়, যদি না আদালত ভিন্ন নির্দেশ দেন।[1] তাই রায়ের দিনই সার্টিফায়েড কপির আবেদন করুন, আর আবেদন ও সরবরাহের তারিখ সংরক্ষণ করুন; আপিল সময়মতো কি না, তার প্রমাণ এই দুই তারিখ।
দেরি হলে: তামাদি মওকুফের দরখাস্ত
তামাদি আইনের ৫ ধারায় আপিলকারী পর্যাপ্ত কারণ দেখাতে পারলে মেয়াদ পার হওয়ার পরও আপিল গ্রহণ করা যায়।[4] হাইকোর্ট বিভাগ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একটি চেক ডিজঅনার মামলার দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলে ২,৫৯৬ দিনের দেরি মওকুফ করে আপিল নিবন্ধনের নির্দেশ দেন, এই নীতিতে যে আপিল দণ্ডিত ব্যক্তির ন্যায্য অধিকার এবং শুধু তামাদির কারণে তা ব্যর্থ হওয়া উচিত নয়।[11] তবু এটাকে নিয়ম ভাববেন না। প্রতিটি দিনের দেরির ব্যাখ্যা কাগজসহ দিন, আর দেরি মওকুফের দরখাস্ত আপিলের মেমোর সঙ্গেই দাখিল করুন। আপিলের সময়সীমা মেনে চলাই সবচেয়ে সস্তা কৌশল।

আপিলের মেমো, কারণ ও শুনানি
আপিলের কারণ (গ্রাউন্ড) কীভাবে সাজাবেন
৪১৯ ধারায় প্রতিটি আপিল লিখিত দরখাস্তে, আপিলকারী বা তার আইনজীবীর মাধ্যমে দাখিল করতে হয়।[1] মেমোতে থাকে বিচারিক আদালত, মামলা নম্বর, দণ্ড, আপিলের কারণ ও প্রার্থিত প্রতিকার: খালাস, পুনর্বিচার, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা সাজা হ্রাস। শক্তিশালী গ্রাউন্ড সাধারণত এগুলো: এজাহার দায়েরে অব্যাখ্যাত দেরি, এজাহার ও সাক্ষ্যের মধ্যে গুরুতর অসংগতি, জেরায় টেকেনি এমন শনাক্তকরণ, পরিস্থিতিগত সাক্ষ্যের শৃঙ্খলে ফাঁক, অগ্রহণযোগ্য স্বীকারোক্তি, কিংবা আদালতের ক্ষমতার বাইরের সাজা। দশটি দুর্বল গ্রাউন্ডের চেয়ে দুটি স্পষ্ট গ্রাউন্ড বেশি কাজ করে।
শুনানি ও আপিল আদালতের ক্ষমতা
৪২১ ধারায় হস্তক্ষেপের পর্যাপ্ত কারণ না পেলে আপিল আদালত আপিল সংক্ষিপ্তভাবে খারিজ করতে পারেন, তবে আপিলকারীকে শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ না দিয়ে নয়।[1] তাই গ্রহণের শুনানিই প্রথম আসল লড়াই। আপিল গৃহীত হলে ৪২২ ও ৪২৩ ধারায় নোটিশ, নথি তলব ও শুনানি হয়। দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলে আদালত খালাস দিতে, পুনর্বিচারের আদেশ দিতে, সিদ্ধান্ত বদলাতে বা সাজা কমাতে পারেন, কিন্তু আসামির নিজের আপিলে সাজা বাড়াতে পারেন না।[1] ৪৪২ক ধারা প্রতিপক্ষের ওপর নোটিশ জারির পর ৯০ কর্মদিবসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়, কিন্তু বাস্তবে তা প্রায়ই মানা যায় না।[1] ৩১ আগস্ট ২০২৬ হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা ছিল ৬,৪৬,২৭৬টি।[14]
আপিলকালীন জামিন ও দণ্ড স্থগিত
দণ্ডিত ব্যক্তির বড় ভয়, আপিল নিষ্পত্তির আগেই সাজার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এ জন্যই আপিলকালীন জামিন আপিলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। ৪২৬(১) ধারায় আপিল আদালত লিখিত কারণ দেখিয়ে দণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখতে এবং আপিলকারী আটক থাকলে তাকে জামিনে বা নিজস্ব মুচলেকায় মুক্তি দিতে পারেন।[1] অধস্তন আদালতে বিচারাধীন আপিলেও ৪২৬(২) ধারায় হাইকোর্ট বিভাগ একই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।[1]
বিচারিক আদালত থেকেই জামিন: ৪২৬(২ক) ধারা
এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হলে এবং আপিল চলার সুযোগ থাকলে, দণ্ডিত ব্যক্তি আপিল করতে চান বলে সন্তুষ্ট করতে পারলে দণ্ডদানকারী আদালত নিজেই তাকে জামিন দিতে পারেন, যাতে তিনি আপিল দাখিল করে আপিল আদালতের আদেশ নিতে পারেন। জামিনে থাকার সময় দণ্ড স্থগিত বলে গণ্য হয়।[1] এই আবেদন রায়ের দিনই করা উচিত; তাহলে আসামিকে কারাগারে না গিয়েই আপিলকালীন জামিন চাওয়ার সুযোগ মেলে।
আপিল আদালতে জামিন ও লিভ মঞ্জুরের পর জামিন
আপিলের মেমোর সঙ্গেই দণ্ড স্থগিত ও জামিনের দরখাস্ত দিন। যুক্তি হিসেবে কাজে আসে: সাজার মেয়াদের তুলনায় ইতিমধ্যে কাটানো হাজতবাস, বিচারকালে জামিনে থেকে শর্ত মেনে চলার রেকর্ড, স্বাস্থ্য, বয়স, আর আপিলে প্রথম দৃষ্টিতেই জোরালো আইনগত প্রশ্ন। আপিল বিভাগ দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের বিশেষ অনুমতি (লিভ) দিলে ৪২৬(২খ) ধারায় হাইকোর্ট বিভাগ দণ্ড স্থগিত রেখে জামিন দিতে পারেন; আর শেষে কারাদণ্ড বহাল থাকলে জামিনে কাটানো সময় সাজা থেকে বাদ যায় (৪২৬(৩) ধারা)।[1]
জামিনের শর্ত ও অনলাইনে জামিননামা
২০২৬ সালের সংশোধনী ৪৯৮ ধারায় নতুন উপধারা (২) যোগ করেছে: জামিন দেওয়া আদালত পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে বা সদাচরণ নিশ্চিত করতে যুক্তিসংগত ও ন্যায্য শর্ত দিতে পারেন; এটি ১০ আগস্ট ২০২৫ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।[2] ৪৯৯ ধারাও সংশোধিত হয়েছে, যাতে জামিননামা অনলাইনে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।[3] এসব আপিলকালীন জামিনেও প্রযোজ্য। জামিনের সাধারণ নিয়ম, ম্যাজিস্ট্রেট থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত, আমাদের জামিনের নিয়ম লেখায় বিস্তারিত আছে; হাইকোর্টে জামিনের চর্চা ইংরেজিতে দেখুন High Court bail গাইডে।
ফৌজদারি রিভিশন: ধারা ৪৩৫ থেকে ৪৩৯ক
দুই রিভিশন আদালত: হাইকোর্ট বিভাগ ও দায়রা জজ
৪৩৫ ধারায় হাইকোর্ট বিভাগ ও যেকোনো দায়রা জজ নিজ এখতিয়ারের অধস্তন ফৌজদারি আদালতের নথি তলব করতে পারেন, এবং তলবের সময় দণ্ড স্থগিত রেখে আটক আসামিকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন।[1] ৪৩৯(১) ধারায় হাইকোর্ট বিভাগ রিভিশনে আপিল আদালতের ক্ষমতা (৪২৩, ৪২৬, ৪২৭ ও ৪২৮ ধারা) প্রয়োগ করতে পারেন, এমনকি সাজা বাড়াতেও পারেন; তবে আসামির বিরুদ্ধে কোনো আদেশের আগে তাকে শুনানির সুযোগ দিতে হয়।[1] ৪৩৯ক ধারায় দায়রা জজ একই ক্ষমতা পান, আর দায়রা জজের বদলি করা মামলায় অতিরিক্ত দায়রা জজও।[1] ৪৩৬ ধারায় নালিশ খারিজ বা আসামির অব্যাহতির ক্ষেত্রে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া যায়, তবে অব্যাহতিপ্রাপ্তকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে।[1]
কোন আদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি রিভিশন
চার্জ গঠনের আদেশে আপিল নেই, তাই আসামির প্রতিকার রিভিশন। তবে আদালত শুধু দেখেন প্রসিকিউশনের উপকরণে প্রথম দৃষ্টিতে মামলা (প্রাইমা ফেসি) আছে কি না; বিরোধপূর্ণ তথ্য বিচারে নিষ্পত্তি হবে। মির্জা আব্বাস মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ১৩ মে ২০১৯ এই নীতিতে রুল খারিজ করে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষের নির্দেশ দেন।[7] অব্যাহতির আদেশ, নালিশ খারিজ, নারাজি দরখাস্ত নামঞ্জুর, জামিন মঞ্জুর বা বাতিল, সাক্ষী পুনরায় তলব না করা, কিংবা আপিল নেই এমন ক্ষুদ্র দণ্ডও রিভিশনে আনা যায়। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে ক্ষুদ্র দণ্ডের সীমা বাড়ায় আরও বেশি জরিমানার দণ্ড এখন কেবল রিভিশনযোগ্য।[3]
রিভিশনের সীমা: দ্বিতীয় রিভিশন নিষেধ
৪৩৯ক(২) ধারায় কারও পক্ষে দায়রা জজের কাছে রিভিশনের আবেদন হলে, সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে দায়রা জজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। ৪৩৯(৪) ধারা আবার বলে, ৪৩৯ক ধারায় দায়রা জজের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগ রিভিশন গ্রহণ করবেন না, এবং খালাসের সিদ্ধান্তকে দণ্ডে রূপান্তরও করবেন না।[1] ফলে খালাসের বিরুদ্ধে রিভিশনে বাদী বড়জোর খালাস বাতিল করে পুনর্বিচার পেতে পারেন। ৪৪০ ধারায় রিভিশনে কোনো পক্ষের শুনানির অধিকার নেই, আদালত চাইলে শোনেন।[1] এ কারণে জেলা পর্যায়ে ফৌজদারি রিভিশন দ্রুত হলেও ঝুঁকিও আছে: হারলে হাইকোর্টের রিভিশনের দরজা বন্ধ। আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকলে শুরুতেই হাইকোর্ট বিভাগে যাওয়া ভালো কৌশল হতে পারে।
রিভিশনের সময়সীমা: ৬০ দিনের রীতি
কার্যবিধি বা তামাদি আইনে ফৌজদারি রিভিশনের কোনো সময় নির্দিষ্ট নেই। হাইকোর্ট বিভাগ দীর্ঘদিনের রীতি হিসেবে তামাদি আইনের অনুচ্ছেদ ১৫৫-এর ৬০ দিন অনুসরণ করে; তবে এটি চূড়ান্ত বাধা নয়, আদালত দেখেন গুরুতর অবহেলা বা অস্বাভাবিক দেরি হয়েছে কি না।[7] বাস্তবে আদেশের তারিখ থেকে ৬০ দিনকেই শেষ সময় ধরুন, দায়রা জজ আদালতেও। রুল জারির সময় আদালত সাধারণত নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নিম্ন আদালতের কার্যক্রম স্থগিত করেন, যেমন নাজমুল ইসলাম মামলায় ছয় মাস।[9] স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাড়ানোর আবেদন না করলে বিচারিক আদালত মামলা চালিয়ে যেতে পারেন।

৫৬১এ ধারা: রিভিশনের পরের শেষ দরজা
৫৬১এ ধারা হাইকোর্ট বিভাগের সহজাত ক্ষমতা সংরক্ষণ করে: কার্যবিধির কোনো আদেশ কার্যকর করতে, কোনো আদালতের প্রক্রিয়ার অপব্যবহার ঠেকাতে বা অন্যভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা।[1] এটি নতুন আপিল বা ছদ্মবেশী দ্বিতীয় রিভিশন নয়। জাহানারা বেগম মামলায় বাদীর নারাজি দরখাস্ত ও পরে ৪৩৯ক ধারার রিভিশন নামঞ্জুর হওয়ার পর তিনি ৫৬১এ ধারায় হাইকোর্টে আসেন। হাইকোর্ট বিভাগ ১২ নভেম্বর ২০১৯ বলেন, প্রক্রিয়ার অপব্যবহার ঠেকানোর জোরালো কারণ থাকলে ৪৩৯ক ধারার পরেও ৫৬১এ ধারায় আসা যায়, তবে নথিতে উল্লেখযোগ্য উপকরণ লাগে; তা না পেয়ে রুল খারিজ হয়।[8]
পুরো কার্যধারা বাতিল (কোয়াশমেন্ট) চাওয়ার সাধারণ ক্ষেত্র: এজাহার বা নালিশ হুবহু মেনে নিলেও অপরাধ গঠিত হয় না, আইনগত বাধা আছে, আদালতের এখতিয়ার নেই, অথবা মামলা চালানো স্পষ্ট হয়রানি। কারণগুলো, আপিল বিভাগের নজির ও কৌশল ইংরেজিতে বিস্তারিত দেখুন আমাদের section 561A quashment গাইডে, আর মামলা বাতিলে সহায়তার জন্য আমাদের ৫৬১এ ধারায় ফৌজদারি মামলা বাতিল প্র্যাকটিস।
আপিল বিভাগে লিভ পিটিশন ও অধিকারবলে আপিল
সংবিধানের ১০৩(২) অনুচ্ছেদে হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে অধিকারবলে আপিল চলে কয়েকটি ক্ষেত্রে: হাইকোর্ট বিভাগ সংবিধান ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্নের সনদ দিলে, মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন বা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে, অথবা আদালত অবমাননার দণ্ড দিলে। বাকি সব ক্ষেত্রে ১০৩(৩) অনুচ্ছেদে আপিল চলে কেবল আপিল বিভাগ অনুমতি (লিভ) দিলে।[5] ফলে হাইকোর্টে আপিল খারিজ, রিভিশনের রায় বা ৫৬১এ ধারার আদেশের বিরুদ্ধে সাধারণ পথ ক্রিমিনাল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল।
আপিল বিভাগের ১৯৮৮ সালের বিধিমালার আদেশ ২৪-এর বিধি ২ অনুযায়ী ফৌজদারি লিভ পিটিশন রায় বা আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে দাখিল করতে হয়; খালাসের বিরুদ্ধে অ্যাটর্নি জেনারেল বা সরকারি আইন কর্মকর্তা পান ৬০ দিন। বিধি ৮ অনুযায়ী কারাদণ্ডের আদেশে আগে আত্মসমর্পণ না করলে পিটিশন গ্রহণই করা হয় না; আদালত চাইলে নিষ্পত্তি পর্যন্ত দণ্ড স্থগিত রাখতে পারেন।[6] ৩১ আগস্ট ২০২৬ আপিল বিভাগে বিচারাধীন ছিল ৩৯,৫৫৪টি মামলা।[14] এরপর থাকে ১০৫ অনুচ্ছেদে রিভিউ, যা নতুন করে সাক্ষ্য বিচার নয়।[5] লিভ পিটিশনের খুঁটিনাটি ইংরেজিতে দেখুন criminal petition for leave to appeal গাইডে।
২০২৬ সালের সংশোধনী: ফৌজদারি আপিল ও রিভিশনে কী বদলাল
অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫ সালের অধ্যাদেশগুলো স্থায়ী আইনে রূপ দিতে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিল উত্থাপন করেন, এবং সংসদ ৭ এপ্রিল ২০২৬ কণ্ঠভোটে তা পাস করে।[12] এর ফল ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ১১ নং আইন), তারিখ ১০ এপ্রিল ২০২৬।[3]
যা বদলেছে
- ক্ষুদ্র দণ্ডে আপিলের সীমা: ৪১৩ ও ৪১৪ ধারা সংশোধন করে শুধু জরিমানার যে দণ্ডে আপিল চলে না, তার সীমা ৫,০০০ টাকা করা হয়েছে; এর নিচের দণ্ডে প্রতিকার রিভিশন।[3]
- জামিনের শর্ত ও অনলাইন জামিননামা: ৪৯৮(২) ও ৪৯৯ ধারার সংশোধন আপিলকালীন জামিনেও প্রযোজ্য।[2] [3]
- নতুন রিভিশনযোগ্য আদেশ: ১৭৩ক ধারায় অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অব্যাহতি, ১৭৩বি ধারায় তদন্তের সময়সীমা, ৩৪৫ ধারায় আপস সহজ করা, ২৫০ ধারায় মিথ্যা মামলায় ক্ষতিপূরণ। এসব আদেশ নিয়েও ফৌজদারি রিভিশন আসবে।[3]
যা বদলায়নি
আইনটির সংশোধিত ধারার তালিকায় ৪১৩ ও ৪১৪ ছাড়া ৪০৪ থেকে ৪৩৯ক পর্যন্ত কোনো ধারা নেই, ৫৬১এ ধারাও নেই।[3] অর্থাৎ আপিলের আদালত, ৪১৭ ধারার খালাসবিরোধী আপিল, ৪২৬ ধারার আপিলকালীন জামিন, ৩৭৪ ধারার ডেথ রেফারেন্স, দ্বিতীয় রিভিশনের নিষেধ আর ৫৬১এ ধারার সহজাত ক্ষমতা আগের মতোই। সংশোধনীর বড় অংশ গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও তদন্ত নিয়ে; সেগুলো ভঙ্গ হলে তা আপিলে সাক্ষ্যের দুর্বলতা হিসেবে তোলা যায়।

ঢাকা জজ কোর্টে আপিল ও রিভিশন: ধাপে ধাপে
রায়ের দিনটিকে আপিলের প্রথম দিন ধরুন। নিচের ধাপগুলো দণ্ডিত ব্যক্তি, বাদী ও তাদের পরিবারের জন্য।
রায়ের দিনই কপির আবেদন
রায় ও দণ্ডাদেশের সার্টিফায়েড কপির আবেদন করুন; আবেদন ও সরবরাহের তারিখ লিখে রাখুন।
প্রতিকার ও আদালত ঠিক করা
আপিল চলে কি না, না রিভিশন; বিচারিক আদালতের স্তর ও সাজার মেয়াদ দেখে দায়রা জজ না হাইকোর্ট বিভাগ তা নিশ্চিত করুন।
শেষ তারিখ হিসাব করা
আপিলের সময়সীমা হিসাব করুন: তামাদি আইনের ৭, ৩০ বা ৬০ দিন, খালাসের বিরুদ্ধে ছয় মাস বা ৬০ দিন; কপির সময় বাদ দিয়ে শেষ তারিখ ক্যালেন্ডারে তুলুন।
নথি পড়ে গ্রাউন্ড বাছাই
শুধু রায় নয়, এজাহার, জবানবন্দি, জেরা ও প্রদর্শনী পড়ে দুই-তিনটি নির্ধারক আইনগত বা তথ্যগত ত্রুটি চিহ্নিত করুন।
মেমো ও জামিনের দরখাস্ত
আপিলের মেমোর সঙ্গে দণ্ড স্থগিত ও আপিলকালীন জামিনের দরখাস্ত এবং প্রয়োজনে দেরি মওকুফের দরখাস্ত একসঙ্গে দাখিল করুন।
গ্রহণের শুনানি ও স্থগিতাদেশ
সংক্ষিপ্ত খারিজ ঠেকাতে প্রথম শুনানিতেই মূল যুক্তি দিন; রিভিশনে রুল ও স্থগিতাদেশের মেয়াদ নজরে রাখুন।
পেপারবুক ও চূড়ান্ত শুনানি
হাইকোর্টে পেপারবুক প্রস্তুতি তদারকি করুন, মামলা কার্যতালিকায় এলে প্রস্তুত থাকুন।
পরের ধাপ আগেই ভাবা
হাইকোর্টে হারলে ৩০ দিনের লিভ পিটিশন ও আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা আগেই ঠিক রাখুন।
কোন প্রতিষ্ঠান কী করে, এক নজরে:
দায়রা জজ ও মহানগর দায়রা জজ আদালত
ম্যাজিস্ট্রেট ও যুগ্ম দায়রা জজের দণ্ডের আপিল এবং ৪৩৯ক ধারার ফৌজদারি রিভিশন শোনে।
চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট
দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ডের আপিল শোনেন।
হাইকোর্ট বিভাগ
দায়রা স্তরের দণ্ডের আপিল, ডেথ রেফারেন্স, জেল আপিল, রিভিশন ও ৫৬১এ ধারার আবেদন শোনে।
আপিল বিভাগ
অধিকারবলে আপিল, লিভ পিটিশন ও রিভিউ শোনে; এর রায় সব আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।
পাবলিক প্রসিকিউটর ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়
খালাসের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল দাখিল করে এবং আপিল ও রিভিশনে রাষ্ট্রের পক্ষে লড়ে।
জেল কর্তৃপক্ষ
৪২০ ধারায় বন্দির জেল আপিল গ্রহণ করে উপযুক্ত আপিল আদালতে পাঠায়।
যে ভুলগুলো আপিল বা রিভিশন নষ্ট করে
- মৃত্যুদণ্ডে সাত দিন ভুলে যাওয়া: ডেথ রেফারেন্স স্বয়ংক্রিয় বলে অনেক পরিবার আপিল করে না; অথচ দণ্ডিতের নিজের যুক্তি আদালতে পৌঁছানোর পথ এই আপিল।[4]
- ভুল আদালত: যুগ্ম দায়রা জজ পাঁচ বছরের বেশি কারাদণ্ড দিলে আপিল হাইকোর্টে; দাখিলের আগে দণ্ডাদেশ মিলিয়ে নিন।[1]
- আপিলের বদলে রিভিশন: আপিলের সুযোগ থাকলে ৪৩৯(৫) ধারায় রিভিশন চলে না।[1]
- দায়রা জজের কাছে রিভিশন করে পরে হাইকোর্টে দ্বিতীয় রিভিশন চাওয়া: আইন তা নিষেধ করে।[1]
- সার্টিফায়েড কপির তারিখ হারানো: আপিলের সময়সীমা প্রমাণে আবেদন ও সরবরাহের তারিখ লাগে।[4]
- বাদীর আপিলে শুধু তথ্যগত আপত্তি: ৪১৭(২) ধারায় আইনগত ভুল ও ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা দেখাতে হয়, ৬০ দিনের মধ্যে।[1]
- লিভ পিটিশনের আগে আত্মসমর্পণ না করা: কারাদণ্ডে আত্মসমর্পণ ছাড়া পিটিশন গ্রহণযোগ্য নয়।[6]
সফল ফৌজদারি আপিল সাধারণত নতুন তথ্যে নয়, বিচারের নথিতেই জেতা হয়: প্রসিকিউশনের নিজের সাক্ষ্য কোথায় ভেঙে পড়েছে, সেটি খুঁজে বের করা আর সময়ের মধ্যে আদালতের সামনে রাখা। ইংরেজিতে আরও বিস্তারিত পড়ুন আমাদের criminal appeal ও criminal revision গাইডে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ফৌজদারি আপিল কত দিনের মধ্যে করতে হয়?
দায়রা জজসহ হাইকোর্ট বিভাগ ছাড়া অন্য আদালতে ৩০ দিন, হাইকোর্ট বিভাগে ৬০ দিন, আর দায়রা আদালতের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে ৭ দিন। রায়ের দিন ও কপি তোলার প্রয়োজনীয় সময় বাদ যায়।[4]
আপিল ও রিভিশনের মূল পার্থক্য কী?
আপিল তথ্য ও আইন দুই প্রশ্নে পূর্ণ পুনঃশুনানি; রিভিশন ঊর্ধ্বতন আদালতের তদারকি, যেখানে দেখা হয় আদেশটি সঠিক, বৈধ ও যথাযথ কি না। আপিল থাকলে রিভিশন চলে না।[1]
ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের রায়ের আপিল কোথায় হয়?
মেট্রোপলিটন বা প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ডের আপিল দায়রা জজ আদালতে; দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ডের আপিল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে।[1]
খালাসের বিরুদ্ধে বাদী কি আপিল করতে পারেন?
ফৌজদারি আপিল চলাকালে কি জামিন পাওয়া যায়?
হ্যাঁ। ৪২৬ ধারায় আপিল আদালত লিখিত কারণে দণ্ড স্থগিত রেখে জামিন দিতে পারেন; এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে বিচারিক আদালতই আপিল দাখিলের জন্য জামিন দিতে পারেন।[1]
আপিলের জন্য কি সার্টিফায়েড কপি লাগে?
সাধারণত হ্যাঁ। ৪১৯ ধারায় দরখাস্তের সঙ্গে রায়ের কপি দিতে হয়, আর ৩৭১ ধারায় আসামি দেরি ছাড়া ও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিনা খরচে কপি পাওয়ার অধিকারী।[1]
দায়রা জজের কাছে রিভিশন হেরে গেলে হাইকোর্টে আবার রিভিশন করা যায়?
ফৌজদারি রিভিশনের সময়সীমা কত?
আইনে নির্দিষ্ট নেই। হাইকোর্ট বিভাগ রীতি হিসেবে ৬০ দিন অনুসরণ করে, তবে দেরির যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকলে পরেও গ্রহণ করতে পারে।[7]
২০২৬ সালের সংশোধনী কি ফৌজদারি আপিলের নিয়ম বদলেছে?
সামান্যই। ২০২৬ সনের ১১ নং আইন ৪১৩ ও ৪১৪ ধারায় ক্ষুদ্র দণ্ডের সীমা ৫,০০০ টাকা করেছে এবং জামিনের শর্ত ও অনলাইন জামিননামা যোগ করেছে; আপিলের আদালত, সময় ও রিভিশনের কাঠামো অপরিবর্তিত।[3]
সূত্র তালিকা
প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র
উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।
- Code of Criminal Procedure 1898 (ধারা ৩৭১, ৩৭৪, ৪০৪–৪৩১, ৪৩৫–৪৪২ক, ৫৬১এ) — Laws of Bangladesh
- Code of Criminal Procedure 1898, ধারা ৪৯৮ (Act No. XI of 2026 দ্বারা সংশোধিত) — Laws of Bangladesh
- ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ১১ নং আইন) — Laws of Bangladesh
- তামাদি আইন ১৯০৮ (Limitation Act 1908), ধারা ৫, ১২ ও প্রথম তফসিল — Laws of Bangladesh
- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ১০৩ ও ১০৫ — Laws of Bangladesh
- Supreme Court of Bangladesh (Appellate Division) Rules 1988, Order XXIV — Supreme Court of Bangladesh
- হাইকোর্ট বিভাগ, Mirza Abbas v The State, Criminal Revision No. 2792 of 2016 (১৩ মে ২০১৯)
- হাইকোর্ট বিভাগ, Zahanara Begum v The State, Criminal Miscellaneous Case No. 23744 of 2017 (১২ নভেম্বর ২০১৯)
- হাইকোর্ট বিভাগ, Md Nazmul Islam v The State, Criminal Revision No. 347 of 2021 (৫ জানুয়ারি ২০২৩)
- হাইকোর্ট বিভাগ, State v Md Iqbal Hossain, Death Reference No. 82 of 2018 সহ সংশ্লিষ্ট আপিল, জেল আপিল ও রিভিশন (১৫ ডিসেম্বর ২০২৫)
- হাইকোর্ট বিভাগ, Md Ashraful Islam v The State, Criminal Rule No. 48 (Con-A) of 2025 (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
- The Daily Star, ৮ এপ্রিল ২০২৬ — Parliament passes CrPC amendment: families must be told within 12 hours of arrest
- ঢাকা টাইমস, ১৭ জুলাই ২০২৬ — নারী-শিশু নির্যাতন: এক মাসে হাইকোর্টের ১০ রায়
- The Financial Express, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — Supreme Court case disposal and pendency, January to August 2026
TRW-এর সহায়তা
তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে
TRW দায়রা জজ আদালতে ও হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি আপিল ও রিভিশন, আপিলকালীন জামিন, খালাসের বিরুদ্ধে আপিল, আপিল বিভাগে লিভ পিটিশন এবং ৫৬১এ ধারায় মামলা বাতিলে দণ্ডিত ব্যক্তি, বাদী ও তাদের পরিবারকে সহায়তা করে। দেখুন আমাদের ফৌজদারি মামলা বাতিল ও রিভিশন প্র্যাকটিস, অথবা সময়সীমা পার হওয়ার আগেই TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।