TRW Insight / বাংলাদেশ
দলিল রেজিস্ট্রি হলেই কাজ শেষ নয়। নামজারি করার নিয়ম মেনে খতিয়ানে নাম না তুললে এবং নতুন হোল্ডিংয়ে খাজনা না দিলে জমি বিক্রি, দান বা বন্ধক কার্যত আটকে যায়।
নামজারি করার নিয়ম ২০২৬: কেন রেজিস্ট্রির পরই নামজারি জরুরি
নামজারি করার নিয়ম জানা না থাকলে জমি কিনে, দান পেয়ে বা উত্তরাধিকারে পেয়েও মালিক কার্যত আটকে থাকেন। দলিল রেজিস্ট্রি হলে কাগজে স্বত্ব হস্তান্তর হয়, কিন্তু সরকারি রেকর্ডে, অর্থাৎ খতিয়ানে, নতুন মালিকের নাম ওঠে নামজারির (মিউটেশন বা খারিজ) মাধ্যমে। নামজারি না হলে নিজের নামে খাজনা দেওয়া যায় না, পরে জমি বিক্রি বা দান করা যায় না, আর রেকর্ডে থাকা আগের মালিক চাইলে একই জমি আবার অন্য কারও কাছে বিক্রির চেষ্টা করতে পারেন।
এই লেখায় দুটি বিষয় একসঙ্গে আছে: ই-নামজারির ধাপ, কাগজপত্র, হেবা ও ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি, ফি, সময়সীমা, ডিসিআর, শুনানি ও আপিল; এবং নামজারির পর খাজনার দায়িত্ব, অর্থাৎ অনলাইন পরিশোধ, বকেয়ার দণ্ড ও মওকুফ। ইংরেজিতে আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ চাইলে আমাদের land mutation in Bangladesh গাইডটি দেখুন।

সারসংক্ষেপ: নামজারি হলো রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ধারা ১৪৩ অনুযায়ী মালিকানা বদলের পর খতিয়ান হালনাগাদ করা। আবেদন এখন পুরোপুরি অনলাইনে হয়, ইউনিয়ন ভূমি অফিস সরেজমিন প্রতিবেদন দেয়, আপত্তি থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) শুনানি করে কারণসহ আদেশ দেন। সরকারি ফি মোট ১,১৭০ টাকা। নামজারির পর নতুন হোল্ডিংয়ে প্রতি বছর ৩০ জুনের মধ্যে খাজনা দিতে হয়; টানা তিন বছর বকেয়া থাকলে বছরে ৬.২৫ শতাংশ হারে দণ্ড ও সার্টিফিকেট মামলা হতে পারে।
মূল বিষয়: ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর ধারা ৬(৩) অনুযায়ী, হালনাগাদ খতিয়ান নিজের নামে না থাকলে এবং হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের প্রমাণ দেখাতে না পারলে কেউ জমি বিক্রি, দান, হেবা বা অন্যভাবে হস্তান্তর করতে, আমমোক্তারনামা দিতে বা দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারেন না। তাই নামজারি ও খাজনা এখন একই সুতোয় বাঁধা।
এক নজরে
আইনি ভিত্তি
ধারা ১৪৩ অনুযায়ী হস্তান্তর বা উত্তরাধিকারের পর রেকর্ড হালনাগাদ রাখা কালেক্টরের আইনি দায়িত্ব।
শুধু অনলাইনে
আবেদন ও ফি পরিশোধ হয় mutation.land.gov.bd বা ভূমি অ্যাপে; ভূমি অফিসে নগদ লেনদেন নেই।
১,১৭০ টাকা
কোর্ট ফি, নোটিশ ফি, রেকর্ড সংশোধন ফি ও খতিয়ান সরবরাহ ফি মিলিয়ে সরকারি খরচ।
২৮ দিনের লক্ষ্য
ই-নামজারি নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা; অকারণ দেরিতে কর্মকর্তার জবাবদিহি।
৩০ জুন
চলতি বছরের খাজনা দণ্ড ছাড়া দেওয়ার শেষ দিন; সর্বোচ্চ তিন বছরের অগ্রিম দেওয়া যায়।
সূচিপত্র
নামজারি ও খতিয়ান: আইন আসলে কী বলে
খতিয়ান হলো স্বত্বের রেকর্ড (record of rights)। এতে মৌজা, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, প্রত্যেক মালিকের অংশ এবং জমির শ্রেণি লেখা থাকে। এক জরিপ থেকে পরের জরিপ পর্যন্ত মালিকানার প্রতিটি পরিবর্তন রেকর্ডে তোলার প্রক্রিয়াই নামজারি, আর এর ফলে যে খতিয়ান তৈরি হয় তাকে নামজারি খতিয়ান বা মিউটেশন খতিয়ান বলে।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ধারা ১৪৩ কালেক্টরকে দায়িত্ব দিয়েছে হস্তান্তর বা উত্তরাধিকারজনিত নাম পরিবর্তন, হোল্ডিং বিভাজন ও একত্রীকরণসহ সব পরিবর্তন রেকর্ডে তুলে খতিয়ান হালনাগাদ রাখতে।[1] বাস্তবে এই কাজ করেন প্রতিটি উপজেলা বা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি), যিনি নামজারির জন্য রাজস্ব কর্মকর্তা।
ধারা ১৪৩(সি): নোটিশ, আপত্তি ও কারণসহ আদেশ
রেজিস্ট্রি অফিস থেকে হস্তান্তরের নোটিশ পাওয়ার পর রাজস্ব কর্মকর্তা নামজারির নথি খোলেন এবং হোল্ডিংয়ের অন্য শরিকদের নোটিশ দেন। আপত্তি জানানোর জন্য একটি তারিখ ঠিক করা হয়; সেই সময়ে কেউ আপত্তি না করলে রেকর্ড সংশোধন হয়। কোনো শরিক আপত্তি করলে উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে কারণ উল্লেখ করে আদেশ দিতে হয়।[2] এই কাঠামোই প্রতিটি ই-নামজারির পেছনের আইন।
খতিয়ানের ধরন: সিএস, এসএ, আরএস, বিএস ও নামজারি খতিয়ান
একই জমির জন্য বিভিন্ন জরিপে আলাদা খতিয়ান তৈরি হয়েছে: সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে), এসএ (স্টেট অ্যাকুইজিশন), আরএস (রিভিশনাল সার্ভে) এবং বর্তমানে চলমান বিএস (বাংলাদেশ সার্ভে) ও সিটি জরিপ। নামজারির আবেদনে উৎস খতিয়ান হিসেবে সেই খতিয়ানটি দিতে হয় যেখানে বিক্রেতা, দাতা বা মৃত ব্যক্তির নাম আছে। জরিপের ভুল নামজারিতে ঠিক হয় না; তার পথ আমাদের khatian correction in Bangladesh গাইডে আছে।
নামজারি মালিকানা দেয় না, কিন্তু মালিকানা কাজে লাগাতে দেয়
জমির স্বত্ব আসে রেজিস্ট্রি দলিল, উত্তরাধিকার বা আদালতের ডিক্রি থেকে। ভুল নামে নামজারি হলে প্রকৃত মালিকের স্বত্ব নষ্ট হয় না, আবার নামঞ্জুর হলেও দলিলের স্বত্ব চলে যায় না। তবে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর ধারা ৬(৩) এখন হালনাগাদ খতিয়ান ও হালনাগাদ খাজনার প্রমাণ ছাড়া জমি হস্তান্তর ও দলিল রেজিস্ট্রি বন্ধ করে দিয়েছে।[3]
কখন নামজারি করতে হয়: মালিকানা অর্জনের প্রতিটি পথ
রেকর্ডভুক্ত জমির মালিকানা যতবার বদলায়, ততবার নামজারি দরকার। ই-নামজারির আবেদন ফরমে জমি কীভাবে পেয়েছেন তা বেছে নিতে হয়: ক্রয়, ওয়ারিশ, হেবা বা দান, ডিক্রি, নিলাম কিংবা অন্য কোনো উপায়।[4] প্রতিটি পথের প্রমাণ ও ঝুঁকি আলাদা; নিচের সারণিতে সংক্ষেপে দেখানো হলো। মোবাইলে সারণিটি পাশে স্ক্রল করুন।
| অর্জনের ধরন | মূল প্রমাণ | উৎস খতিয়ান | সাধারণ ঝুঁকি |
|---|---|---|---|
| ক্রয় | রেজিস্ট্রি সাফকবলা দলিল ও বায়া দলিল | বিক্রেতা বা পূর্বসূরির নামে | বিক্রেতার অংশের চেয়ে বেশি জমি বিক্রি |
| ওয়ারিশ | ওয়ারিশ সনদ; আলাদা নামজারিতে বণ্টননামা | মৃত ব্যক্তির নামে | ওয়ারিশ বাদ পড়া, ভুল অংশ |
| হেবা বা দান | রেজিস্ট্রি হেবা দলিল বা দানপত্র | দাতার নামে | দখল হস্তান্তর না হওয়া, অন্য ওয়ারিশের আপত্তি |
| আদালতের ডিক্রি | রায় ও ডিক্রির সার্টিফায়েড কপি | যে খতিয়ান সংশোধন হবে | আপিল বা স্থগিতাদেশ চলমান |
| নিলাম | বিক্রয় সনদ ও নিশ্চিতকরণ আদেশ | দেনাদারের নামে | নিলাম বাতিলের আবেদন |
| বণ্টন | রেজিস্ট্রি বণ্টননামা | যৌথ খতিয়ান | সব শরিকের স্বাক্ষর না থাকা |
রেজিস্ট্রি বণ্টননামায় যৌথ জমি ভাগ হলে প্রত্যেক শরিকের আলাদা নামজারি দরকার, আর স্বত্ব মামলার ডিক্রি ভূমি অফিসে রেকর্ড না করালে খতিয়ান আগের নামেই থাকে। কেনার আগে বিক্রেতার নামে নামজারি আছে কি না যাচাই করা জরুরি; আমাদের land ownership verification গাইডে যাচাইয়ের তালিকা আছে।
অনলাইনে নামজারি করার নিয়ম: ধাপে ধাপে ই-নামজারি
নতুন সব আবেদন এখন জাতীয় ই-নামজারি পোর্টাল mutation.land.gov.bd-তে করতে হয়; land.gov.bd থেকেও পোর্টালে যাওয়া যায়। আগস্ট ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৫১৬টি উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস এবং ৩,৪৬৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ই-নামজারি চালু আছে।[4] নভেম্বর ২০২৫-এ চালু হওয়া ‘ভূমি’ অ্যাপ থেকে নামজারির ফি দেওয়া, ডিসিআর ও খতিয়ান ডাউনলোড করা যায়।[5] নিজে আবেদন করতে অসুবিধা হলে ভূমিসেবা সহায়তা নির্দেশিকা ২০২৫-এর আওতায় সারা দেশে প্রায় ৯০০টি বেসরকারি সেবাকেন্দ্র সামান্য ফিতে সাহায্য করে।[6]
কাগজ গুছিয়ে নিন
দলিল, উৎস খতিয়ান, সর্বশেষ দাখিলা, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি ও স্বাক্ষর স্ক্যান করে রাখুন; ওয়ারিশ হলে ওয়ারিশ সনদ।
পোর্টালে আবেদন
mutation.land.gov.bd-তে অর্জনের ধরন, মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর দিয়ে আবেদন করে ট্র্যাকিং নম্বর নিন।
৭০ টাকা পরিশোধ
আবেদনের সময় কোর্ট ফি ও নোটিশ ফি অনলাইনে মোবাইল ওয়ালেট বা কার্ডে দিন।
সরেজমিন তদন্ত
ইউনিয়ন ভূমি অফিস রেকর্ড, খাজনা ও দখল যাচাই করে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে প্রতিবেদন দেয়।
শুনানি প্রয়োজনে
শরিকের আপত্তি থাকলে শুনানি হয়; জটিলতা না থাকলে অনলাইন শুনানির সুযোগ আছে।
অনুমোদন ও ১,১০০ টাকা
মঞ্জুরের পর ডিসিআর ফি দিয়ে নামজারি খতিয়ান ও কিউআর কোডযুক্ত ডিসিআর ডাউনলোড করুন।
খাজনা ও যাচাই
খতিয়ানের প্রতিটি তথ্য মিলিয়ে নিন এবং নতুন হোল্ডিংয়ে প্রথম বছরের খাজনা দিয়ে দাখিলা রাখুন।
আবেদন তৈরি
পোর্টালে ‘অনলাইনে আবেদন করুন’ অপশনে গিয়ে বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজা বেছে নিন, তারপর খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর ও দাবিকৃত জমির পরিমাণ লিখুন। ছবি, স্বাক্ষর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ, সর্বশেষ খাজনার দাখিলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দলিল, ওয়ারিশ সনদ বা আদালতের রায়ের স্ক্যান কপি যুক্ত করুন। জমা দিলে একটি ট্র্যাকিং নম্বর পাবেন।[4] অগ্রগতি এসএমএসে জানানো হয়।[6]
ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সরেজমিন তদন্ত
সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর অফিস আবেদনটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পাঠায়; সেখান থেকে রেকর্ড, খাজনার অবস্থা ও প্রয়োজনে দখল সরেজমিনে যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।[4] সরকারি ফির বাইরে কেউ টাকা চাইলে ভূমিসেবা অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ২০২৬ অনুযায়ী অনলাইনে বা সার্বক্ষণিক হটলাইনে অভিযোগ করা যায়।[6]
অনুমোদন, ফি পরিশোধ ও খতিয়ান সংগ্রহ
মঞ্জুরের পর ডিসিআর ফি পরিশোধ করে পোর্টালে ট্র্যাকিং নম্বর দিয়ে নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর ডাউনলোড ও প্রিন্ট করা যায়।[4] প্রিন্ট নেওয়ার দিনই নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও অংশ মিলিয়ে নিন।

নামজারির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
সব আবেদনে মূল কাগজ একই: আবেদনকারীর ছবি ও স্বাক্ষর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ এবং সর্বশেষ খাজনার দাখিলা।[4] বাকি কাগজ কী লাগবে, নামজারি করার নিয়ম অনুযায়ী তা নির্ভর করে জমি কীভাবে পেয়েছেন তার ওপর।
- ক্রয়: রেজিস্ট্রি সাফকবলা দলিল, বিক্রেতা বা তাঁর পূর্বসূরির নামের খতিয়ান, এবং রেকর্ডীয় মালিক থেকে বিক্রেতা পর্যন্ত আগের দলিল ও নামজারির ধারাবাহিক শৃঙ্খল (বায়া দলিল)।
- ওয়ারিশ: ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের দেওয়া ওয়ারিশ সনদ, মৃত ব্যক্তির নামের খতিয়ান এবং আলাদা নামজারির জন্য বণ্টননামা।[11]
- হেবা বা দান: রেজিস্ট্রি হেবা দলিল বা দানপত্র এবং দাতার নামের খতিয়ান।
- আদালতের ডিক্রি: রায় ও ডিক্রির সার্টিফায়েড কপি, ডিক্রি চূড়ান্ত হওয়া বা স্থগিতাদেশ না থাকার প্রমাণ এবং যে খতিয়ান সংশোধন করতে হবে।
- নিলাম: বিক্রয় সনদ এবং আদালত বা রাজস্ব কর্তৃপক্ষের বিক্রয় নিশ্চিতকরণ আদেশ।
- কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান: দলিল, ক্রয় অনুমোদনের বোর্ড রেজুলেশন এবং আবেদনকারীর কর্তৃত্বপত্র।
বিভিন্ন জরিপে নামের বানান ভিন্ন হলে শুরুতেই ব্যাখ্যা ও সহায়ক কাগজ দিন। দলিলের নাম আর জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম আলাদা হওয়ার কারণে আবেদন নামঞ্জুর করা যায় না, তবে দুজন যে একই ব্যক্তি তা কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে।[8]
হেবা বা দানপত্র দলিলে নামজারি করার নিয়ম
পরিবারের ভেতরে জমি হস্তান্তরের সবচেয়ে প্রচলিত পথ হেবা। হেবা হলো জীবদ্দশায় বিনা মূল্যে সম্পত্তি দেওয়া, যা কার্যকর হতে ঘোষণা, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তর প্রয়োজন। মুসলিম আইনে মৌখিক হেবা বৈধ ছিল, কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২-এর ধারা ১২৩ ও রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ধারা ১৭ সংশোধনের পর স্থাবর সম্পত্তির হেবা রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।[12] তাই রেজিস্ট্রি হেবা দলিল ছাড়া হেবার ভিত্তিতে নামজারি হয় না।
হেবার নামজারিতে কী লাগে
ই-নামজারি ফরমে অর্জনের ধরন হিসেবে ‘হেবা’ বা ‘দান’ বেছে নিতে হয়।[4] সঙ্গে দিন রেজিস্ট্রি হেবা দলিলের কপি, দাতার নামের খতিয়ান বা দাতা যে সূত্রে মালিক হয়েছেন তার কাগজ, দাতার নামে সর্বশেষ দাখিলা এবং গ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্র। দাতা নিজেই যদি ওয়ারিশ সূত্রে মালিক হন এবং তাঁর নামে নামজারি না থাকে, তবে আগে সেই নামজারি বা ওয়ারিশ সনদ ও বণ্টনের কাগজ ঠিক করে নেওয়াই নিরাপদ, নইলে শৃঙ্খল ভেঙে যায়।
হেবার নামজারিতে সাধারণ ভুল
- দখল হস্তান্তর না হওয়া: দলিলে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার কথা না থাকলে বা বাস্তবে দখল না দিলে পরে হেবা চ্যালেঞ্জ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। সম্পূর্ণ দখল হস্তান্তরের পর হেবা সাধারণত প্রত্যাহারযোগ্য নয়।[12]
- সম্পর্ক অস্পষ্ট রাখা: দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক দলিলে স্পষ্ট লিখুন, কারণ নিকটাত্মীয়দের মধ্যে হেবা নিয়েই পরবর্তী বিরোধ বেশি হয়।
- অংশের চেয়ে বেশি দান: দাতার রেকর্ডীয় অংশের চেয়ে বেশি জমি দলিলে লেখা থাকলে নামজারি আটকে যায়।
হেবা দলিলের রেজিস্ট্রি খরচ ও কর আছে আমাদের heba, will and gift registration গাইডে, আর ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত দান আইনের আলোচনা এই বিশ্লেষণে।
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করার নিয়ম
উত্তরাধিকারে পাওয়া জমিই নামজারির সবচেয়ে বড় অংশ, আবার ভুলও এখানে সবচেয়ে বেশি হয়। বণ্টননামা নেই বলে সব ওয়ারিশের যৌথ আবেদন নামঞ্জুর করার প্রবণতা বন্ধ করতে ভূমি মন্ত্রণালয় ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ পরিপত্র জারি করে।[11]
যৌথ না আলাদা নামজারি
পরিপত্র অনুযায়ী সব ওয়ারিশ ওয়ারিশ সনদ দিয়ে যৌথভাবে আবেদন করে এক খতিয়ানে সবার নাম ও মৃত ব্যক্তির মোট জমিতে প্রত্যেকের অংশ লেখাতে পারেন; এ জন্য বণ্টননামা লাগে না। কেউ আলাদা খতিয়ান ও আলাদা খাজনা চাইলে আগে আপসে বণ্টননামা করে কে কোন দাগ বা দাগের অংশ ভোগ করবেন তা ঠিক করতে হয়, এবং ধারা ১৪৩(বি) অনুযায়ী সেই বণ্টননামার ভিত্তিতে আলাদা নামজারি হয়।[11] যৌথ নামজারিতে সবাই প্রতিটি দাগের সহমালিক থাকেন, তাই বিক্রিতে সবার সম্মতি লাগে।
ওয়ারিশ তালিকা ঠিক করুন
ওয়ারিশ সনদের তালিকা যত নির্ভুল, নামজারিও তত টেকসই। কন্যা, বিধবা স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী বা আগে মৃত সন্তানের সন্তানদের বাদ পড়া সবচেয়ে প্রচলিত ত্রুটি, আর এতে পরে আপত্তি, আপিল বা মামলা হয়। অংশ নির্ধারণ হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী; বিস্তারিত পাবেন inheritance law in Bangladesh গাইডে। প্রবাসী ওয়ারিশরা সত্যায়িত আমমোক্তারনামায় অংশ নিতে পারেন।

নামজারির সরকারি ফি ২০২৬: মোট ১,১৭০ টাকা
ই-নামজারির সরকারি খরচ মোট ১,১৭০ টাকা: কোর্ট ফি ২০ টাকা, নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা, রেকর্ড সংশোধন ফি ১,০০০ টাকা এবং খতিয়ান সরবরাহ ফি ১০০ টাকা।[10] আবেদনের সময় ৭০ টাকা (আবেদন ও নোটিশ ফি) দিতে হয়, আর মঞ্জুরের পর খতিয়ানের জন্য ১,১০০ টাকা ডিসিআর ফি।[4] ২০২২ সাল থেকে নামজারির ফি নগদে নেওয়া হয় না; মোবাইল ওয়ালেট, কার্ড বা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে অনলাইনে দিতে হয়।[10] বিকাশ, রকেট, উপায়, ভিসা ও মাস্টারকার্ডে পরিশোধ করা যায়।[4]
পুনরায় আবেদন ও ভুল সংশোধনের খরচ
প্রয়োজনীয় তথ্য বা কাগজ না দেওয়ায় আবেদন নামঞ্জুর হলে সঠিক কাগজসহ আবার জমা দেওয়ার সময় ১,১০০ টাকা আবার দিতে হয়। তবে ডিসিআর বা খতিয়ানের ভুল সংশোধনে কোনো ফি নেই।[10] সেবাকেন্দ্রের সহায়তা ফি এবং আইনজীবী বা সার্ভেয়ারের পেশাগত ফি সরকারি ফির বাইরে আলাদা।[6]
কত দিনে নামজারি হয়: সময়সীমা ও বাস্তবতা
ই-নামজারি নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা ২৮ দিন, এবং যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া সময় পার হলে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।[6] কোনো কোনো নির্দেশনায় মহানগর এলাকায় ৪৫ কর্মদিবস ও অন্যত্র ৩০ কর্মদিবসের বাইরের সীমার কথাও বলা হয়েছে।[4] অগ্রাধিকারপ্রাপ্তদের জন্য ২০২২ সালে কম সময় নির্ধারিত ছিল: প্রবাসীদের ক্ষেত্রে মহানগরে ১২ ও অন্যত্র ৯ কর্মদিবস, গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ১০ কর্মদিবস এবং গুরুত্বপূর্ণ, রপ্তানিমুখী বা বিদেশি বিনিয়োগের শিল্পের ৭ কর্মদিবস।[9]
লক্ষ্য আর বাস্তবতার ফারাক
সেপ্টেম্বর ২০২২-এ মন্ত্রণালয়ের ৯০ দিনের তথ্যে দেখা যায়, ৭ লাখ ৩২ হাজার ২৩১টি আবেদনের ৮৭ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছিল এবং গড়ে ৪৩ দিন লেগেছিল।[9] দেরির প্রধান কারণ কাগজের ঘাটতি, ফি না দেওয়া, রেকর্ডের অমিল ও শরিকের আপত্তি; প্রথম তিনটি আবেদনকারীর নিয়ন্ত্রণে।
ডিসিআর, নামজারি খতিয়ান ও স্বয়ংক্রিয় হোল্ডিং
নামজারি শেষ হলে তিনটি জিনিস পাওয়া যায়। প্রথমত, আবেদনকারীর নামে নতুন নামজারি খতিয়ান। দ্বিতীয়ত, ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ), যা নামজারি ফির সরকারি রসিদ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতে কিউআর কোডযুক্ত অনলাইন ডিসিআর আইনগতভাবে বৈধ এবং হাতে লেখা ডিসিআরের সমতুল্য, তাই এর জন্য অফিসে যেতে হয় না।[4] তৃতীয়ত, খাজনার হোল্ডিং। অটোমেটেড মিউটেশন সিস্টেম ২.১ অনুযায়ী নামজারি অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে জমি বিক্রেতার খতিয়ান থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে ক্রেতার খতিয়ানে যোগ হয় এবং হোল্ডিং তৈরি হয়, যাতে একই জমি প্রতারণা করে একাধিকবার বিক্রি করা না যায়।[5]
জমির শ্রেণি যাচাইয়ের নতুন নির্দেশনা
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর চিঠিতে ভূমি মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে, নামজারি অনুমোদনের সময় জমির প্রকৃত শ্রেণি যাচাই করে নামজারি খতিয়ানে লিখতে হবে। উদ্দেশ্য রেজিস্ট্রি মূল্যায়ন ও খাজনা নির্ধারণ ঠিক রাখা।[7] কৃষিজমিতে ভবন উঠলে বা পুকুর ভরাট হলে শুনানিতে এ নিয়ে প্রশ্ন আসবে, তাই প্রস্তুত থাকুন।
নামজারির শুনানি: আবেদনকারী ও আপত্তিকারীর করণীয়
শরিক কেউ আপত্তি করলেই নামজারি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মামলায় পরিণত হয়, এবং উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে কারণসহ আদেশ দিতে হয়।[2] মন্ত্রণালয়ের জুলাই ২০২২-এর পরিপত্র অনুযায়ী কাগজপত্র যাচাইয়ে সঠিক পাওয়া গেলে উভয় পক্ষের প্রাথমিক শুনানির দরকার নেই, আর জটিলতাহীন ই-নামজারিতে অনলাইন শুনানি উৎসাহিত করা হয়েছে।[8] অনলাইন শুনানির আবেদন করা যায় oh.lams.gov.bd-তে।[4]
আবেদনকারীর প্রস্তুতি
সব দলিলের মূল কপি, জরিপ খতিয়ানের সার্টিফায়েড কপি, ওয়ারিশ সনদ ও দাখিলা সঙ্গে রাখুন, এবং রেকর্ডীয় মালিক থেকে আপনার পর্যন্ত দাগভিত্তিক এক পাতার কালানুক্রম তৈরি করুন। বিরোধ যদি আসলে স্বত্ব নিয়ে হয়, কর্মকর্তাকে সেটি আদেশে লিখতে অনুরোধ করুন, যাতে দেওয়ানি আদালতের প্রশ্ন নামজারির আদেশে মীমাংসিত না হয়ে যায়।
আপত্তিকারীর করণীয়
কোনো শরিক, ওয়ারিশ বা আগের ক্রেতা চলমান নামজারির খবর পেলে নির্ধারিত তারিখের আগে নিজের অধিকারের প্রমাণসহ লিখিত আপত্তি দিন, যেখানে দাগ, অংশ ও নির্ভরযোগ্য দলিল সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। কোনো দলিল জাল বা প্রতারণামূলক বলে যুক্তিসংগত কারণ থাকলে রেকর্ড হালনাগাদকারী কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি বিচারের জন্য উপযুক্ত ফৌজদারি আদালতে পাঠাতে হয়।[3]
নামজারি আবেদন কেন নামঞ্জুর হয়
নামঞ্জুরের কারণ সাধারণত স্বত্বে নয়, কাগজে। জুলাই ২০২২-এর পরিপত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, শুধু কাগজের ঘাটতির কারণে নামজারি আবেদন বাতিল করা যাবে না। প্রথম আদেশেই ঘাটতির কাগজ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে সাধারণত সাত কর্মদিবস বা যুক্তিসংগত সময় দিতে হবে। তারপরও কাগজ না দিলে আদেশে নামঞ্জুর করা যায়; পরে কাগজ দিলে নতুন আবেদন ছাড়াই নামজারি আবার চালু হয় এবং সেবার সময় সেদিন থেকে গোনা হয়।[8]
যে কারণে নামঞ্জুর করা যায় না
একই পরিপত্র অনুযায়ী আবেদনের হার্ড কপি জমা না দেওয়া, দলিলের নামের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের অমিল, ভুল মোবাইল নম্বর কিংবা জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকা—এসব কারণে নামজারি নামঞ্জুর করা যাবে না।[8] এর কোনো কারণে নামঞ্জুর হলে রিভিউ বা আপিলে পরিপত্রটি উল্লেখ করুন।
তবে ভাঙা দলিল-শৃঙ্খল, রেকর্ডীয় অংশের চেয়ে বেশি জমি, খাস বা অধিগ্রহণকৃত জমি, জালিয়াতির সন্দেহ কিংবা শুনানিতে প্রমাণিত আপত্তি থাকলে আবেদন সত্যিই টেকে না।[3]
নামজারির বিরুদ্ধে রিভিউ, আপিল ও রিভিশন
নামজারি মঞ্জুর বা নামঞ্জুরের আদেশ রাজস্ব কর্মকর্তার আদেশ, এবং ১৯৫০ সালের আইনের অষ্টাদশ অধ্যায়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিকারের পূর্ণ সিঁড়ি আছে। প্রতিটি ধাপের সময়সীমা আদেশের তারিখ থেকে গোনা হয়, আদেশ জানার তারিখ থেকে নয়, তাই পোর্টালে আদেশ দেখার দিনই তারিখটি লিখে রাখুন।[1]
সহকারী কমিশনার (ভূমি)
নিজের আদেশ রিভিউ করতে পারেন; আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন (ধারা ১৫০)।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)
কালেক্টরের পক্ষে আপিল শোনেন; সময়সীমা ৩০ দিন (ধারা ১৪৭–১৪৮)।
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব)
কালেক্টরের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল; সময়সীমা ৬০ দিন।
ভূমি আপিল বোর্ড
কমিশনারের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল; সময়সীমা ৯০ দিন।
কালেক্টর, কমিশনার ও বোর্ড
এক, তিন ও ছয় মাসের মধ্যে রিভিশন; আপিল করলে রিভিশন চলে না (ধারা ১৪৯)।
রিভিউ: ধারা ১৫০
রাজস্ব কর্মকর্তা নিজের বা পূর্বসূরির আদেশ রিভিউ করে বদলাতে বা বহাল রাখতে পারেন। আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করতে হয়, যদি না দেরির পর্যাপ্ত কারণ দেখানো যায়। আপিল বা রিভিশন দায়ের হয়ে গেলে রিভিউ চলে না, এবং পক্ষদের নোটিশ না দিয়ে রিভিউতে আদেশ বদলানো যায় না।[1]
আপিল: ধারা ১৪৭ ও ১৪৮
সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর আদেশের বিরুদ্ধে আপিল যায় কালেক্টরের কাছে, কালেক্টরের আদেশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে, আর কমিশনারের আদেশের বিরুদ্ধে বোর্ডে। সময়সীমা যথাক্রমে ৩০, ৬০ ও ৯০ দিন।[1] বাস্তবে কালেক্টরের আপিল ক্ষমতা প্রয়োগ করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), কমিশনারেরটি অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব), আর শীর্ষে ভূমি আপিল বোর্ড।
রিভিশন: ধারা ১৪৯
কালেক্টর অধস্তন কর্মকর্তার আদেশ এক মাসের মধ্যে, কমিশনার কালেক্টরের আদেশ তিন মাসের মধ্যে এবং বোর্ড কমিশনারের আদেশ ছয় মাসের মধ্যে রিভিশন করতে পারেন; আপিল দায়ের হলে রিভিশন চলে না।[1] তাই আপিল না রিভিশন, তা ভেবে বেছে নিন, কারণ একটি করলে অন্যটির দরজা বন্ধ হয়। রাজস্ব কর্তৃপক্ষ দেওয়ানি আদালতের ডিক্রি কার্যকর করতে অস্বীকার করলে হাইকোর্ট বিভাগে রিট বিবেচনা করা যায়; আর প্রশ্নটি যদি আসলে স্বত্বের হয়, তাহলে সমাধান ঘোষণামূলক মামলা, আরেকটি নামজারি আপিল নয়।

ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩: নামজারির পরের দায়িত্ব
নামজারির পর নতুন হোল্ডিংয়ে প্রতি বছর খাজনা, অর্থাৎ ভূমি উন্নয়ন কর, দিতে হয়। ১৯৭৬ সালের অধ্যাদেশের জায়গায় এখন ভূমি উন্নয়ন কর আইন ২০২৩ (২০২৩ সালের ৩১ নং আইন) প্রযোজ্য।[2] আইনে ‘বছর’ মানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন, এবং চলতি বছরের কর দণ্ড ছাড়া ৩০ জুনের মধ্যে দেওয়া যায়। চাইলে বকেয়া ও হাল কর একসঙ্গে, অথবা সর্বোচ্চ তিন বছরের কর অগ্রিম দেওয়া যায়।[2]
কর নির্ধারণ, এসএমএস নোটিশ ও আপত্তি
প্রতি বছর জুলাইয়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জমাবন্দিভিত্তিক কর নির্ধারণ করে তালিকা দেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাত কর্মদিবসের মধ্যে তা অনুমোদন করেন, এবং তালিকা অফিসে ও অনলাইনে প্রকাশ হয়। মালিককে এসএমএসে করের পরিমাণ জানানো হয়, যা আনুষ্ঠানিক নোটিশ হিসেবে গণ্য।[2] আপত্তি থাকলে প্রকাশ বা এসএমএস পাওয়ার ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যায়, যিনি ১৫ কর্মদিবসে সিদ্ধান্ত দেবেন। তাঁর আদেশের বিরুদ্ধে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল চলে, যিনি ৩০ কর্মদিবসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন।[2]
করের হার কীভাবে ঠিক হয়
কৃষি ও অকৃষি জমির করের হার, সীমা ও শর্ত সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনে নির্ধারণ করে। অকৃষি জমি ব্যবহার অনুযায়ী বাণিজ্যিক, শিল্প এবং আবাসিক ও অন্যান্য শ্রেণিতে ভাগ হয়, প্রত্যেকটির হার আলাদা। জমির একাংশ শিল্প বা বাণিজ্যে এবং বাকিটা বসবাসে ব্যবহৃত হলে পুরো জমিই শিল্প বা বাণিজ্যিক হিসেবে গণ্য হয়।[2] সরকারের নির্ধারিত হার নিয়ে দেওয়ানি আদালতে প্রশ্ন তোলা যায় না।[2] আপনার জমির প্রকৃত দাবি হোল্ডিংয়ে অনলাইনেই দেখা যায়।
কৃষিজমিতে ২৫ বিঘার মওকুফ
কৃষিনির্ভর ব্যক্তি বা পরিবারের ৮.২৫ একর (২৫ বিঘা) পর্যন্ত কৃষিজমির কর মওকুফ; আখ ও লবণ চাষের জমি এবং কৃষকের পুকুরও এর আওতায়, তবে বাণিজ্যিক মাছ চাষ নয়। মোট কৃষিজমি এই সীমা ছাড়ালে পুরো জমির ওপরই কর দিতে হয়।[2] মওকুফ পাওয়া জমির মালিককেও হোল্ডিংপ্রতি নির্ধারিত ফি দিয়ে মওকুফ দাখিলা নিতে হয়, যা দখল চলমান থাকার প্রমাণ।[2] পাবলিক কবরস্থান, শ্মশান, উপাসনালয় ও খেলার মাঠ আবেদনক্রমে অব্যাহতি পেতে পারে, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উপাসনালয় নয়।[2]
জমাবন্দি, এনআইডি ও মোবাইল নম্বর
একই মৌজায় একজন মালিকের একাধিক খতিয়ান থাকলে কর নির্ধারণ ও আদায়ের জন্য সেগুলো একটি জমাবন্দিতে একত্র হয়, এবং মালিকের মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর রেকর্ডে যুক্ত করা বাধ্যতামূলক।[2] যৌথ মালিকরা নামজারির মাধ্যমে আলাদা না হলে তাঁদের এক খতিয়ান হিসেবে কর ধরা হয়।[2] তাই দলিল, নামজারি আবেদন ও এনআইডিতে ব্যক্তিগত তথ্য একই রাখুন।
অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের ধাপ
খাজনা আদায় এখন ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে হয়, আর ইলেকট্রনিক দাখিলা অনলাইনে যাচাইযোগ্য এবং প্রিন্ট করে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।[2] প্রথমবার এনআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে land.gov.bd বা ldtax.gov.bd-তে, অথবা ১৬১২২ নম্বরে কল করে নিবন্ধন করুন; খতিয়ান, আগের দাখিলা ও এনআইডি নিয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও নিবন্ধন করা যায়।[13]
- পোর্টালে লগইন করে বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজা বেছে হোল্ডিং খুঁজুন; করের পরিমাণ দেখা যাবে।[13]
- নির্ধারিত কর নিয়ে আপত্তি থাকলে আপত্তির অপশনে ফরম পূরণ করে জমা দিন।[13]
- অনলাইন পেমেন্ট বেছে নিয়ে কার্ড, সোনালী ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পরিশোধ করুন।[13]
- দাখিলা ডাউনলোড করে প্রিন্ট বা সংরক্ষণ করুন, এবং নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআরের সঙ্গে রাখুন।
‘ভূমি’ অ্যাপ থেকেও ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া ও দাখিলা সংগ্রহ করা যায়।[5]
বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর, ৬.২৫ শতাংশ দণ্ড ও সার্টিফিকেট মামলা
কোনো বছরের কর ৩০ জুনের মধ্যে না দিলে তা বকেয়া হয়। টানা তিন বছর বকেয়া থাকলে প্রথম থেকে তৃতীয় বছরের বকেয়ার ওপর বছরে ৬.২৫ শতাংশ হারে দণ্ডসহ আদায়যোগ্য হয়, এবং তৃতীয় বছর শেষে সরকারি পাওনা আদায় আইন ১৯১৩ অনুযায়ী সার্টিফিকেট মামলা করা যায়।[2] মামলা চলাকালে দণ্ডসহ বকেয়া দিলে মামলা প্রত্যাহার করতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক, ভূমি উন্নয়ন কর দাবি কখনো তামাদি হয় না।[2] তাই কেনার আগে বিক্রেতার দাখিলা যাচাই করুন।
২০২৬ সালের নির্দেশনা ও সময় বৃদ্ধি
মে ২০২৬-এ ভূমি মন্ত্রণালয় সারা দেশের জমির মালিকদের বকেয়াসহ চলতি অর্থবছরের খাজনা ৩০ জুনের মধ্যে land.gov.bd পোর্টালে মোবাইল ব্যাংকিং বা কার্ডে পরিশোধের নির্দেশনা দেয়, এবং সময়মতো না দিলে আইন অনুযায়ী বকেয়ার ওপর দণ্ড যোগ হতে পারে বলে জানায়।[14] দুর্যোগ, মহামারি বা অনিবার্য পরিস্থিতিতে সরকার গেজেটে আদায়ের সময় বাড়াতে বা হার কমাতে পারে।[2]
কখন আইনজীবীর সহায়তা নেবেন
পরিষ্কার দলিলে কেনা জমির অবিতর্কিত নামজারি সাধারণত নিজেই করা যায়। নিচের পরিস্থিতিগুলোতে পরামর্শ খরচের চেয়ে বেশি মূল্য দেয়।
- প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ শুনানি: আপত্তির আদেশই পরের মামলার ভিত্তি হবে।
- ভাঙা শৃঙ্খল: পুরোনো দলিল, জরিপভেদে ভিন্ন নাম বা হারানো ধাপ।
- জটিল উত্তরাধিকার: প্রবাসী ওয়ারিশ বা বিতর্কিত ওয়ারিশ তালিকা।
- বিনিয়োগের জমি: ত্রুটিপূর্ণ নামজারি অর্থায়ন ও অনুমোদন আটকে দেয়।
- প্রতারণা: অন্যের নামে নামজারি বা জাল দলিল, যেখানে সঠিক প্রতিকার ও সময় বেছে নিতে হয়।
TRW-এর land records, mutation and khatian correction অনুশীলন আবেদন প্রস্তুত, শুনানিতে প্রতিনিধিত্ব, আপত্তি দাখিল এবং রিভিউ, আপিল ও রিভিশন পরিচালনা করে। জমি নিয়ে বড় বিরোধ হলে আমাদের real estate disputes অনুশীলন এবং how to resolve land disputes গাইড দেখুন।
মূল কথা: নামজারি করার নিয়ম মেনে প্রতিটি রেজিস্ট্রি বা মৃত্যুর পর দ্রুত আবেদন করুন, ডিসিআর ও নামজারি খতিয়ান হাতে পাওয়ার দিনই মিলিয়ে নিন, নতুন হোল্ডিংয়ে প্রথম বছরের খাজনা সঙ্গে সঙ্গে দিন, আর প্রতিকূল আদেশ এলে ৩০ দিনের সময়সীমা সেদিনই ক্যালেন্ডারে লিখুন। পরামর্শের জন্য TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নামজারি কী এবং কেন করতে হয়?
অনলাইনে নামজারি করার নিয়ম কী?
mutation.land.gov.bd-তে অর্জনের ধরন, মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর দিয়ে কাগজ আপলোড করুন এবং ৭০ টাকা দিন। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তদন্ত ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর অনুমোদনের পর ১,১০০ টাকা দিয়ে নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর ডাউনলোড করুন।[4]
নামজারির সরকারি ফি কত?
মোট ১,১৭০ টাকা: কোর্ট ফি ২০, নোটিশ ফি ৫০, রেকর্ড সংশোধন ফি ১,০০০ এবং খতিয়ান সরবরাহ ফি ১০০ টাকা। সব ফি অনলাইনে দিতে হয়, নগদে নয়।[10]
নামজারি হতে কত দিন লাগে?
হেবা দলিলে নামজারি করার নিয়ম কী?
বণ্টননামা ছাড়া ওয়ারিশরা কি নামজারি করতে পারেন?
হ্যাঁ। ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর পরিপত্র অনুযায়ী সব ওয়ারিশ ওয়ারিশ সনদ দিয়ে যৌথ আবেদন করে এক খতিয়ানে নাম তুলতে পারেন। আলাদা খতিয়ান ও আলাদা খাজনা চাইলে বণ্টননামা লাগবে।[11]
ডিসিআর কী, অনলাইন ডিসিআর কি বৈধ?
ডিসিআর হলো নামজারি ফির সরকারি রসিদ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতে কিউআর কোডযুক্ত অনলাইন ডিসিআর আইনগতভাবে বৈধ এবং হাতে লেখা ডিসিআরের সমতুল্য।[4]
নামজারি নামঞ্জুর হলে কী করব?
ভূমি উন্নয়ন কর কবে এবং কীভাবে দিতে হয়?
বকেয়া খাজনার দণ্ড কত, এবং কারা মওকুফ পান?
টানা তিন বছর বকেয়া থাকলে বছরে ৬.২৫ শতাংশ দণ্ড এবং পরে সার্টিফিকেট মামলা হতে পারে; দাবি কখনো তামাদি হয় না। কৃষিনির্ভর ব্যক্তি বা পরিবারের ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমি মওকুফ, তবে সীমা ছাড়ালে পুরো জমিতে কর দিতে হয়।[2]
সূত্র তালিকা
প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র
উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।
- রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (ধারা ১৪৩ এবং ১৪৭–১৫০) — Laws of Bangladesh
- ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ (২০২৩ সালের ৩১ নং আইন) — Laws of Bangladesh
- ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩, ধারা ৬ — Laws of Bangladesh
- যুগান্তর, ১৮ আগস্ট ২০২৬ — ই-নামজারি: অনলাইনে আবেদন ও খরচ
- বাসস, ২৪ নভেম্বর ২০২৫ — ‘ভূমি’ অ্যাপ ও অটোমেটেড মিউটেশন সিস্টেম ২.১ উদ্বোধন
- UNB, 4 April 2026 — Will digitised land services finally ease public suffering?
- যুগান্তর, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — নামজারিতে জমির প্রকৃত শ্রেণি লেখার নির্দেশনা
- প্রথম আলো, ১৮ জুলাই ২০২২ — কাগজের ঘাটতিতে নামজারি আবেদন বাতিল করা যাবে না
- প্রথম আলো, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ — ই-নামজারিতে গড়ে ৪৩ দিন
- The Financial Express, 2 October 2022 — Bangladesh mandates online payment of land mutation fees
- Dhaka Tribune / BSS, 17 February 2025 — Govt clarifies mutation issue for inherited land
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ৩০ জুলাই ২০২৫ — সম্পত্তির উইল ও হেবার মধ্যে পার্থক্য কী
- দেশ রূপান্তর, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ — অনলাইনে জমির খাজনা পরিশোধ করবেন যেভাবে
- বাংলাবার্তা, ১১ মে ২০২৬ — ৩০ জুনের মধ্যে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের নির্দেশ
TRW-এর সহায়তা
তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে
TRW নামজারি আবেদন, শুনানি, আপত্তি, রিভিউ, আপিল ও রিভিশন এবং খতিয়ান সংশোধন ও খাজনা-সংক্রান্ত বিরোধে সহায়তা করে। আমাদের ভূমি রেকর্ড, নামজারি ও খতিয়ান সংশোধন অনুশীলন দেখুন অথবা আপনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।