TRW Insight / বাংলাদেশ
জিডি নাকি এজাহার, থানা নাকি আদালত, ম্যাজিস্ট্রেট নাকি জজ কোর্ট: প্রথম সিদ্ধান্তই ঠিক করে মামলা কোন পথে, কত দ্রুত চলবে। প্রতিটি ধাপের আইন, ২০২৬ সালের নতুন সময়সীমা ও কোন আদালতে কী হয়, এক জায়গায়।
ফৌজদারি মামলার পর্যায় ২০২৬: জিডি থেকে রায় পর্যন্ত পুরো পথ
থানায় একটি জিডি বা এজাহার থেকে শুরু করে আদালতের রায় পর্যন্ত ফৌজদারি মামলার পর্যায় একটির পর একটি নির্দিষ্ট ধারায় বাঁধা: তথ্য দেওয়া, তদন্ত, পুলিশ রিপোর্ট, আমলে গ্রহণ, চার্জ গঠন, সাক্ষ্য, আসামির পরীক্ষা, যুক্তিতর্ক ও রায়। এই কাঠামো এসেছে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (Code of Criminal Procedure) থেকে।[1] ২০২৬ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন (২০২৬ সনের ১১ নং আইন) এর সঙ্গে যোগ করেছে তদন্তের ৬০ কর্মদিবসের সময়সীমা, অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন, অনলাইনে জামিননামা ও মোবাইলে সমনের মতো নতুন বিধান।[4]
এই লেখায় এক জায়গায় পাবেন পুরো পথ: থানায় জিডি করার নিয়ম ও অনলাইন জিডি, জিডি ও এজাহারের পার্থক্য, জিআর মামলা ও সিআর মামলা কীভাবে আলাদা, তদন্ত ও চার্জশিট, নারাজি দরখাস্ত, কগনিজেন্স, চার্জ গঠন, সাক্ষ্য, ৩৪২ ধারার পরীক্ষা, মামলার আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্ক ও রায়। সঙ্গে আছে কোন মামলা কোন কোর্টে হয়: ম্যাজিস্ট্রেট, সিএমএম, দায়রা জজ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, সাইবার ট্রাইব্যুনাল ও স্পেশাল জজ আদালত।

সারসংক্ষেপ: আমলযোগ্য অপরাধে থানায় এজাহার দিলে পুলিশ মামলা বা জিআর মামলা শুরু হয়; যেকোনো অপরাধে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ করলে শুরু হয় সিআর মামলা। পুলিশ এখন সাধারণত ৬০ কর্মদিবসে তদন্ত শেষ করে চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট দেয়; বাদী অসন্তুষ্ট হলে নারাজি দেন। ম্যাজিস্ট্রেট আমলে নিয়ে নিজে বিচার করেন বা দায়রা আদালতে পাঠান। এরপর চার্জ গঠন, সাক্ষ্য, ৩৪২ ধারায় আসামির পরীক্ষা, সাফাই, যুক্তিতর্ক ও রায়।
মূল বিষয়: জিডি কোনো মামলা নয়; এটি থানার খাতায় একটি ঘটনার লিখিত রেকর্ড। চুরি, মারধর, অপহরণ বা ধর্ষণের মতো আমলযোগ্য অপরাধ ঘটলে জিডি নয়, এজাহার করতে হবে, আর অনলাইন জিডি অ্যাপে এজাহার করা যায় না। ভুল দরজা দিয়ে শুরু করলে সময় ও সাক্ষ্য দুটোই হারায়।
এক নজরে
দুই দরজা
থানায় ১৫৪ ধারায় এজাহার (জিআর মামলা), অথবা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ২০০ ধারায় নালিশ (সিআর মামলা)।
৬০ কর্মদিবস
২০২৬ সালের সংশোধনীতে যোগ হওয়া ১৭৩বি ধারায় তদন্ত শেষ করার সময়সীমা; ম্যাজিস্ট্রেট সময় বাড়াতে পারেন।
নারাজি
ফাইনাল রিপোর্ট বা অসম্পূর্ণ চার্জশিটের বিরুদ্ধে বাদীর আপত্তি; অধিকতর তদন্ত বা বিচারিক অনুসন্ধান চাওয়া যায়।
১৮০ ও ৩৬০ দিন
৩৩৯সি ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা আদালতে বিচার শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা।
বিশেষ আদালত
নারী ও শিশু নির্যাতন, সাইবার অপরাধ, দুর্নীতি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা নিজস্ব ট্রাইব্যুনাল বা স্পেশাল জজ আদালতে যায়।
সূচিপত্র
ফৌজদারি মামলার পর্যায় এক নজরে: মামলা শুরুর দুই দরজা
বাংলাদেশে প্রতিটি ফৌজদারি মামলা একই কঙ্কালের ওপর দাঁড়ায়। অপরাধের তথ্য পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যায়; পুলিশ তদন্ত করে বা ম্যাজিস্ট্রেট অনুসন্ধান করান; ম্যাজিস্ট্রেট অপরাধ আমলে নেন; আসামি হাজির হন; আদালত ঠিক করেন বিচার হবে কি না; সাক্ষ্য হয়; তারপর রায়।[1] বিশেষ আইনের মামলায় আদালত ও সময়সীমা আলাদা।
শুরুর দরজা দুটি। প্রথমটি থানা: আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য অফিসার ইনচার্জ লিখে নেন, তথ্যদাতাকে পড়ে শোনান ও স্বাক্ষর নেন। এটিই এজাহার বা এফআইআর (First Information Report)।[2] দ্বিতীয়টি আদালত: ম্যাজিস্ট্রেট নালিশ পেয়ে ১৯০(১)(ক) ধারায় অপরাধ আমলে নিতে পারেন এবং ২০০ ধারায় নালিশকারীকে শপথ নিয়ে তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করেন।[3] দুই পথ আমলে গ্রহণের পর্যায়ে এসে মেলে; চার্জ গঠন থেকে বিচারের পদ্ধতি একই।
ইংরেজিতে পুরো মানচিত্র পাবেন আমাদের ক্রিমিনাল কেস প্রসেস গাইডে। এখানে ফৌজদারি মামলার পর্যায় এমনভাবে সাজানো, যাতে বাদী বা আসামি বোঝেন এখন কোন ধাপে আছেন আর পরের সিদ্ধান্তটি কী।
থানায় জিডি করার নিয়ম: কখন, কীভাবে, কী লিখবেন
জিডি বা সাধারণ ডায়েরি (General Diary) হলো থানার দৈনন্দিন খাতা, যেখানে থানাকে কোনো বিষয় জানিয়ে রাখা হয়। নিজের বা পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা, হুমকি, নিখোঁজ ব্যক্তি, কিংবা পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, চেকবই বা দলিল হারানোর মতো ঘটনায় জিডি করা হয়।[6] পরে অপরাধ ঘটলে আদালত জিডিকে প্রমাণ হিসেবে দেখতে পারেন যে বিষয়টি আগেই জানানো হয়েছিল।[6]
জিডির ফরম্যাট: আবেদনে যা থাকতে হবে
থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর সাদা কাগজে লিখিত আবেদনই যথেষ্ট। তাতে থাকা উচিত:
- আবেদনকারীর নাম, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর;
- ঘটনার তারিখ, সময় ও সঠিক স্থান;
- সংক্ষিপ্ত, তথ্যভিত্তিক বিবরণ: কী হারিয়েছে, কে হুমকি দিয়েছে, কোন শব্দে, কোন মাধ্যমে, কে সাক্ষী;
- হারানো কাগজের নম্বর ও ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ; শেষে স্বাক্ষর ও তারিখ।
থানা ছাড়ার আগে জিডি নম্বর, তারিখ, কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিলসহ কপি হাতে নিন; ব্যাংক, পাসপোর্ট অফিস বা আদালত এই কপিই চাইবে।
অনলাইন জিডি ২০২৬
বাংলাদেশ পুলিশের "Online GD" অ্যাপ গুগল প্লে স্টোরে পাওয়া যায়। পুলিশ সদর দপ্তর ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জানায়, সব ধরনের অনলাইন জিডি দেশের সব থানায় চালু হচ্ছে; নিবন্ধন একবারই করতে হয় এবং সমস্যায় ২৪ ঘণ্টার হটলাইন ০১৩২০০০১৪২৮।[7] নিবন্ধনে লাগে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, সচল মোবাইল নম্বর ও অ্যাপে তোলা লাইভ ছবি। জিডি গৃহীত হলে জিডি নম্বর ও তদন্তকারী কর্মকর্তার তথ্যসহ ডিজিটাল কপি পাওয়া যায়, অ্যাপেই অবস্থা দেখা ও কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।[8]
সীমাটা মনে রাখুন: অনলাইন জিডি এজাহারের বিকল্প নয়। অভিযোগে আমলযোগ্য অপরাধ থাকলে এবং মামলা দরকার হলে অভিযোগের প্রিন্ট কপি বা কোড নম্বর নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় সশরীরে যেতে হয়।[8] প্রতিটি সাবমিশনের স্ক্রিনশট রেখে দিন।
জিডি ও এজাহারের (এফআইআর) পার্থক্য
দুটিই একই ডেস্কে লেখা হয়, কিন্তু আইনের ফল আলাদা। এজাহার অপরাধ ঘটার পর প্রতিকারের জন্য থানায় দেওয়া সংবাদ; এখান থেকেই মামলা শুরু হয়, আর এটিই জিআর মামলার ভিত্তি।[6] ১৫৪ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধের মৌখিক তথ্য লিখে তথ্যদাতাকে পড়ে শোনাতে হয়, তার স্বাক্ষর নিতে হয় এবং সারাংশ নির্ধারিত বইয়ে তুলতে হয়।[2] এরপর অফিসার ইনচার্জ ১৫৭ ধারায় অবিলম্বে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রিপোর্ট পাঠান এবং তদন্ত শুরু হয়।[2]
জিডি কেবল রেকর্ড রাখে। এজাহার নিজে মূল সাক্ষ্য নয়, কিন্তু বিচারে তথ্যদাতার প্রথম বক্তব্য হিসেবে তার প্রতিটি শব্দ মিলিয়ে দেখা হয়।[6] তাই এজাহার হবে নির্ভুল ও সংযত: কে, কী, কখন, কোথায়, কে দেখেছে। বিস্তারিত তুলনা ইংরেজিতে আছে GD vs FIR গাইডে।
আমলযোগ্য ও অআমলযোগ্য অপরাধ
সিদ্ধান্তের মূল চাবি অপরাধের শ্রেণি। যে অপরাধে পুলিশ পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করতে পারে, সেটি আমলযোগ্য (cognizable); যেটিতে পারে না, সেটি অআমলযোগ্য।[1] অআমলযোগ্য অপরাধের তথ্য পেলে ১৫৫ ধারায় অফিসার ইনচার্জ সারাংশ বইয়ে লিখে তথ্যদাতাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠান; প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া পুলিশ তা তদন্ত করতে পারে না।[2] ব্যবহারিকভাবে এই রেকর্ডটিই সাধারণত জিডি হিসেবে থাকে।
থানা মামলা নিতে না চাইলে
আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য নথিভুক্ত করা অফিসার ইনচার্জের ইচ্ছাধীন নয়। নারীপক্ষ বনাম বাংলাদেশ (রিট পিটিশন নং ৫৫৪১/২০১৫, রায় ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬) মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন, আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য নথিভুক্ত করা অফিসার ইনচার্জের অলঙ্ঘনীয় দায়িত্ব, ঘটনাস্থল যে থানার এলাকাতেই হোক।[9] নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় ২০২৬ সালের সংশোধনী এখন ২৫ক ধারায় একই কথা স্পষ্ট লিখেছে: অন্য থানার এলাকা বলে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না, অভিযোগ লিখে কেস ডায়েরিসহ উপযুক্ত থানায় পাঠাতে হবে।[11]
তবু থানা অনড় থাকলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশি মামলা, অর্থাৎ সিআর মামলা।
জিআর মামলা ও সিআর মামলা: পার্থক্য ও প্রক্রিয়া
আদালতপাড়ায় প্রতিটি ফৌজদারি মামলার গায়ে দুটি লেবেলের একটি থাকে। থানায় এজাহারের ভিত্তিতে শুরু হওয়া পুলিশ মামলা আদালতের রেজিস্টারে জিআর মামলা নামে চলে, আর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সরাসরি নালিশ থেকে শুরু হওয়া মামলা সিআর মামলা বা নালিশি মামলা।[6] [3] দুটির নম্বর ও ফাইল আলাদা, তাই নকল তুলতে সঠিক নম্বর জানা জরুরি।
থানায় দায়েরকৃত জিআর মামলা
জিআর মামলায় এজাহার রেকর্ড হওয়ার পর রাষ্ট্র মামলার মালিক। পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়, আলামত জব্দ করে, ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি নেয়, প্রয়োজনে আসামিকে গ্রেপ্তার করে।[2] বাদীর ফি বা তদন্তের খরচ নেই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণও কম: কাকে চার্জশিটে আসামি করা হবে, তা তদন্তকারী কর্মকর্তা ঠিক করেন।
আদালতে নালিশি সিআর মামলা
সিআর মামলায় বাদী আইনজীবীর মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ দাখিল করেন; ঢাকা মহানগরে সিএমএম আদালতে, জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। ম্যাজিস্ট্রেট ২০০ ধারায় নালিশকারীকে শপথ নিয়ে পরীক্ষা করেন।[3] এরপর তাঁর হাতে চারটি পথ: ২০৩ ধারায় যথেষ্ট কারণ না থাকলে নালিশ খারিজ; ২০২ ধারায় সমন স্থগিত রেখে নিজে অনুসন্ধান বা অন্য ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশকে দিয়ে অনুসন্ধান-তদন্ত; ১৫৬(৩) ধারায় পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ; অথবা ২০৪ ধারায় সমন বা পরোয়ানা জারি।[3] [2] সাক্ষীর তালিকা দাখিল না করা পর্যন্ত সমন বা পরোয়ানা জারি হয় না।[3]
প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ বা প্রভাবশালী প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে সিআর মামলা প্রায়ই ভালো পথ, কারণ শুরু থেকেই বিচারিক নিয়ন্ত্রণ থাকে। কিছু অপরাধ, যেমন চেক ডিজঅনার, কেবল লিখিত নালিশেই শুরু হয়। নালিশ দায়েরের খুঁটিনাটি ইংরেজিতে আছে how to file a criminal case গাইডে।
| বিষয় | জিআর মামলা (থানা মামলা) | সিআর মামলা (নালিশি মামলা) |
|---|---|---|
| শুরু | থানায় এজাহার, ধারা ১৫৪ | ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ, ধারা ১৯০(১)(ক) ও ২০০ |
| অপরাধ | আমলযোগ্য অপরাধ | যেকোনো অপরাধ; অআমলযোগ্য ও কিছু বিশেষ আইনে একমাত্র পথ |
| প্রথম ধাপ | পুলিশি তদন্ত, গ্রেপ্তার, জবানবন্দি | নালিশকারীর শপথ পরীক্ষা, তারপর খারিজ, অনুসন্ধান বা সমন |
| নিয়ন্ত্রণ | রাষ্ট্র ও তদন্তকারী কর্মকর্তা | শুরু থেকে আদালত; বাদী সাক্ষী হাজির করেন |
| খরচ | দায়েরে ফি নেই | আইনজীবী ও প্রসেস খরচ বাদীর |
| পুলিশ রিপোর্ট | চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট; আপত্তিতে নারাজি | তদন্ত বা অনুসন্ধানের নির্দেশ হলে প্রতিবেদন |

তদন্ত পর্যায়: গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও ৬০ কর্মদিবস
ফৌজদারি মামলার পর্যায়গুলোর মধ্যে তদন্তই সাধারণত সবচেয়ে দীর্ঘ, আর এখানেই ২০২৬ সালের সংশোধনী সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে। আইনটি ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল তারিখের; এর ১২ ধারা ২০২৫ সালের ১০ জুলাই থেকে এবং বাকি বিধান ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট থেকে কার্যকর বলে গণ্য।[4]
গ্রেপ্তার ও নতুন সুরক্ষা
সংশোধিত ৫৪ ধারায় সাত বছরের কম দণ্ডযোগ্য অপরাধে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করতে হলে কর্মকর্তাকে কারণ ও প্রয়োজনীয়তা লিখে রাখতে হয়।[4] নতুন ৪৬ক থেকে ৪৬ঙ ধারায় গ্রেপ্তারকারীর পরিচয় দেওয়া, গ্রেপ্তারের স্মারক, আত্মীয় বা মনোনীত ব্যক্তিকে জানানো, আহত বা অসুস্থ হলে চিকিৎসা এবং থানার জিডিতে গ্রেপ্তার নথিভুক্ত করা বাধ্যতামূলক।[4] [5] পরিবারের জন্য আটক স্বজনের খোঁজে থানার জিডি এখন গুরুত্বপূর্ণ নথি।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার পর তদন্ত শেষ না হলে ১৬৭ ধারায় আটক রাখার আদেশ হতে পারে, তবে পুরো মামলায় পুলিশ হেফাজত মোট ১৫ দিনের বেশি নয়।[2] রিমান্ড শুনানির কৌশল দেখুন পুলিশ রিমান্ড গাইডে, আর জামিনের পুরো সিঁড়ি আমাদের বাংলা লেখা জামিনের নিয়ম ২০২৬-এ।
তদন্তের সময়সীমা: ১৭৩বি ধারা
নতুন ১৭৩বি ধারায় অপরাধের তথ্য পাওয়ার দিন থেকে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। যুক্তিসংগত কারণে না পারলে তদন্তকারী কর্মকর্তা কারণ লিখে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করবেন; বাড়ানো সময়েও শেষ না হলে ম্যাজিস্ট্রেট অন্য কর্মকর্তাকে তদন্তভার দিতে বা বিলম্বকে অসদাচরণ গণ্য করে ব্যবস্থার নির্দেশ দিতে পারেন।[2] [5] পুরোনো ১৬৭(৫) ধারাও বহাল: ১২০ দিনে তদন্ত শেষ না হলে অপরাধের দণ্ড অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়রা আদালত আসামিকে জামিন দিতে পারেন।[2]
অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ও আগাম অব্যাহতি
১৭৩ক ধারায় তত্ত্বাবধায়ক পুলিশ কর্মকর্তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন চাইতে পারেন। তাতে কোনো আসামির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট তাকে অব্যাহতি দিতে পারেন, বাকিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলে; পরে প্রমাণ মিললে তাকে আবার অভিযুক্ত করা যায়।[2] ঢালাও এজাহারে নাম আসা ব্যক্তির জন্য এটিই সবচেয়ে আগের বেরোনোর পথ। তদন্তকালে কেউ স্বীকারোক্তি দিলে তা ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট রেকর্ড করেন, এবং আগে নিশ্চিত হতে হয় যে স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায়।[2]
পুলিশ রিপোর্ট: চার্জশিট, ফাইনাল রিপোর্ট ও নারাজি
তদন্ত শেষে ১৭৩(১) ধারায় অফিসার ইনচার্জ নির্ধারিত ফরমে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রিপোর্ট পাঠান।[2] প্রমাণ পেলে তা অভিযোগপত্র বা চার্জশিট, যেখানে কাদের বিচার হওয়া উচিত তাদের নাম থাকে; না পেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা ফাইনাল রিপোর্ট। চার্জশিটের সঙ্গে প্রসিকিউশন যেসব কাগজের ওপর নির্ভর করবে এবং সাক্ষীদের ১৬১ ধারার জবানবন্দি পাঠাতে হয়; রিপোর্ট দেওয়ার পরও ১৭৩(৩বি) ধারায় অধিকতর তদন্ত ও সম্পূরক রিপোর্ট সম্ভব।[2]
নারাজি দরখাস্ত
ফাইনাল রিপোর্টে সবাই অব্যাহতি পেলে, বা চার্জশিট থেকে এজাহারভুক্ত আসামি বাদ পড়লে, বাদী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নারাজি দরখাস্ত দেন। শুনানির পর ম্যাজিস্ট্রেট অধিকতর বা নতুন তদন্ত, তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল, নিজে বা অধস্তন বিচারকের মাধ্যমে বিচারিক অনুসন্ধান, কিংবা দরখাস্তকে নালিশ হিসেবে গণ্য করার আদেশ দিতে পারেন।[10] নারাজি নামঞ্জুর হলে দায়রা জজ বা হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশনের পথ খোলা থাকে।[10] চার্জশিটে নাম না থাকা মানেই মুক্তি নয়: নারাজি, অধিকতর তদন্ত বা সম্পূরক চার্জশিটে নাম ফিরে আসতে পারে।
কগনিজেন্স বা আমলে গ্রহণ এবং দায়রা আদালতে বদলি
কগনিজেন্স মানে আদালতের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত যে মামলাটি এগোবে। ১৯০(১) ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট নালিশ, পুলিশ রিপোর্ট বা অন্য সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ আমলে নিতে পারেন।[3] যথেষ্ট কারণ থাকলে ২০৪ ধারায় সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।[3]
অপরাধটি যদি কেবল দায়রা আদালতে বিচার্য হয়, যেমন খুন বা ডাকাতি, তাহলে ২০৫সি ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি দায়রা আদালতে পাঠান, নথি ও আলামত পাঠান এবং পাবলিক প্রসিকিউটরকে জানান।[3] জামিনে থাকা ও আইনজীবী নিযুক্ত আসামি এখন তদন্ত প্রতিবেদনের শুনানি পর্যন্ত আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা দিতে পারেন, আর পলাতক আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারের আগে আদালতের আদেশ বাংলা পত্রিকায় প্রকাশ করতে হয়।[5]
কোন মামলা কোন কোর্টে হয়
ফৌজদারি কার্যবিধির ৬ ধারায় সুপ্রিম কোর্টের নিচে দুই ধরনের ফৌজদারি আদালত: দায়রা আদালত ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। মহানগর এলাকায় শীর্ষ ম্যাজিস্ট্রেট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম), প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটরা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট; জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।[1] কোন অপরাধ কোন আদালতে বিচার্য, তা দণ্ডবিধির অপরাধের ক্ষেত্রে কার্যবিধির দ্বিতীয় তফসিলে লেখা থাকে, আর বিশেষ আইন নিজেই আদালত ঠিক করে দেয়।[1]
ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট বনাম সেশন কোর্ট
পার্থক্যটা মূলত দণ্ড দেওয়ার ক্ষমতায়। সংশোধিত ৩২ ধারায় মেট্রোপলিটন বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, দ্বিতীয় শ্রেণি তিন বছর ও তিন লাখ, তৃতীয় শ্রেণি দুই বছর ও দুই লাখ টাকা দিতে পারেন; ২০২৬ সালের আইনে জরিমানার সীমা বেড়েছে এবং বেত্রাঘাত বাদ গেছে।[1] [4] অন্যদিকে ৩১ ধারায় দায়রা জজ ও অতিরিক্ত দায়রা জজ আইনে অনুমোদিত যেকোনো দণ্ড দিতে পারেন, তবে মৃত্যুদণ্ড হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষ; যুগ্ম দায়রা জজ মৃত্যুদণ্ড বা দশ বছরের বেশি কারাদণ্ড দিতে পারেন না।[1]
তাই সাধারণ আঘাত, চুরি, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ বা হুমকির বেশির ভাগ মামলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেই শেষ হয়; খুন, ধর্ষণ, ডাকাতির মতো গুরুতর অপরাধ যায় দায়রা আদালতে। একই অপরাধের ধারা বদলালে আদালতও বদলাতে পারে, যেমন ২০২৬ সালের সংশোধনীতে দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারা (গুরুতর আঘাত) অজামিনযোগ্য হয়েছে।[5]
সিএমএম কোর্ট বনাম জজ কোর্ট (ঢাকা)
ঢাকায় মানুষ "সিএমএম কোর্ট" আর "জজ কোর্ট" বলতে দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান বোঝান। সিএমএম কোর্ট হলো ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) থানাগুলোর মামলার ম্যাজিস্ট্রেট আদালত: রিমান্ড, প্রথম জামিন শুনানি, পুলিশ রিপোর্ট, আমলে গ্রহণ ও ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতার মধ্যে থাকা মামলার বিচার এখানে হয়। জজ কোর্ট বলতে বোঝায় দায়রা আদালত: মহানগরে মহানগর দায়রা জজ আদালত, আর জেলায় জেলা ও দায়রা জজ আদালত। মহানগর এলাকার দায়রা আদালতকে কার্যবিধিই "মহানগর দায়রা আদালত" বলে, আর ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়রা জজের অধস্তন।[1]
ডিএমপির আওতার বাইরের ঢাকা জেলার থানার মামলা সিএমএম নয়, ঢাকার সিজেএম আদালতে যায়। তাই ঠিকানা নয়, কোন থানায় মামলা রেকর্ড হয়েছে সেটিই এখতিয়ার ঠিক করে। ঢাকার সিএমএম আদালতের কাঠামো ও এখতিয়ার ইংরেজিতে বিস্তারিত আছে CMM court Dhaka jurisdiction গাইডে।
বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনাল
অনেক অপরাধ সাধারণ আদালতে যায়ই না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অপরাধের বিচারে প্রতিটি জেলা সদরে ট্রাইব্যুনাল থাকে, যার বিচারক জেলা ও দায়রা জজদের মধ্য থেকে নিযুক্ত হন; ২০২৬ সালের ৮৫ নং আইনে যোগ হওয়া ২৬ক ধারায় শিশু ধর্ষণের বিচারে আলাদা "শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল" গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে।[11] এই আইনে তদন্তের সময়ও আলাদা: হাতেনাতে ধৃত আসামির ক্ষেত্রে ১৫ কর্মদিবস, অন্যথায় ৩০ কর্মদিবস।[11]
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৮১ নং আইন) অনুযায়ী এর অপরাধ কেবল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৬৮ ধারায় গঠিত সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচার্য, আপিল যায় সাইবার আপিল ট্রাইব্যুনালে।[12] মামলা করতে পারেন কেবল সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, তার লিখিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য; থানা অভিযোগ না নিলে হলফনামাসহ সরাসরি ট্রাইব্যুনালে নালিশ করা যায়।[12] বিস্তারিত দেখুন সাইবার আইন গাইডে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের তফসিলভুক্ত অপরাধের বিচার করেন স্পেশাল জজ, যাদের নিয়োগ ও এখতিয়ার ফৌজদারি আইন সংশোধন আইন, ১৯৫৮ (Criminal Law Amendment Act) থেকে আসে।[13] বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪-এর ২৬ ধারায় ঐ আইনের অপরাধ ও তফসিলভুক্ত কিছু অপরাধের বিচার হয় স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে।[14] মামলা কোন আদালতে যাবে, তা জামিনের নিয়ম ও আপিলের পথও বদলে দেয়।
দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের কাঠামো সংক্ষেপে
জমি, চুক্তি, পাওনা বা বণ্টনের বিরোধ যায় দেওয়ানি আদালতে, যেখানে সহকারী জজ থেকে জেলা জজ পর্যন্ত আদালত মামলার মূল্যমান অনুযায়ী মোকদ্দমা ও আপিল শোনেন; অপরাধের শাস্তি চাইলে পথ ফৌজদারি আদালত। একই ঘটনায় দুটোই চলতে পারে, তবে নিছক দেওয়ানি বিরোধকে ফৌজদারি রূপ দিলে চার্জ গঠনের আগেই অব্যাহতির ঝুঁকি থাকে।

ফৌজদারি মামলার পর্যায়ে চার্জ গঠন বা অব্যাহতি
চার্জশিট আর চার্জ এক জিনিস নয়। চার্জশিট পুলিশের সুপারিশ; চার্জ আদালতের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, যা উভয় পক্ষকে শুনে আদালত নিজে গঠন করেন। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২৪১ক ধারায় নথি ও কাগজপত্র বিবেচনা করে এবং উভয় পক্ষকে শুনে অভিযোগ ভিত্তিহীন মনে হলে আসামিকে কারণ লিখে অব্যাহতি দিতে হয়; অপরাধ করেছেন বলে অনুমান করার ভিত্তি থাকলে ২৪২ ধারায় চার্জ গঠিত হয়।[3]
দায়রা আদালতে ২৬৫খ ধারায় পাবলিক প্রসিকিউটর মামলা উপস্থাপন করেন; ২৬৫গ ধারায় অগ্রসর হওয়ার যথেষ্ট কারণ না থাকলে অব্যাহতি, থাকলে ২৬৫ঘ ধারায় লিখিত চার্জ গঠন করে পড়ে শোনানো হয় এবং আসামি দোষ স্বীকার করেন নাকি বিচার চান তা জানতে চাওয়া হয়।[3] এই শুনানিতে আদালত প্রসিকিউশনের কাগজই দেখেন, সাফাইয়ের কাগজ নয়; তাই অব্যাহতির আবেদন গড়তে হয় এজাহার, জবানবন্দি ও চার্জশিটে কী নেই তার ওপর। চার্জ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল নয়, রিভিশন বা ৫৬১এ ধারার আবেদন চলে। বিস্তারিত ইংরেজিতে framing of charges গাইডে।
সাক্ষ্যগ্রহণ ও ৩৪২ ধারায় আসামির পরীক্ষা
চার্জ গঠনের পর প্রসিকিউশন সাক্ষী হাজির করে। দায়রা আদালতে ২৬৫ছ ধারায় আদালত প্রসিকিউশনের সব সাক্ষ্য নেন, আর জেরা পিছিয়ে দেওয়া বা সাক্ষীকে পুনরায় ডাকা যায়।[3] সাক্ষী না আসা মামলা ঝুলে থাকার বড় কারণ; তাই ২০২৬ সালের সংশোধনীতে ৬৯ ধারায় এসএমএস, ভয়েস কল, ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং বা ইমেইলে সমন জারির বিধান এসেছে, আর আদালত সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষায় যেকোনো প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারেন।[4] [5]
প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য শেষে ৩৪২ ধারায় আদালত আসামিকে প্রশ্ন করেন, যাতে তার বিরুদ্ধে আসা প্রতিটি পরিস্থিতির ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেন। আসামিকে শপথ করানো হয় না; উত্তর না দিলে বা মিথ্যা উত্তর দিলে শাস্তি নেই, তবে আদালত প্রয়োজনমতো অনুমান করতে পারেন।[3] যে অভিযোগমূলক তথ্য আসামির সামনে রাখা হয়নি, তার ওপর দণ্ড টেকানো কঠিন; এটি আপিলের পরিচিত যুক্তি।
এরপর দায়রা আদালতে ২৬৫জ ধারায় আসামির বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য না থাকলে খালাস দিতে হয়; না হলে ২৬৫ঝ ধারায় আসামি সাফাই দেন, লিখিত বক্তব্য দিতে ও সাফাই সাক্ষী আনতে পারেন।[3] দায়রা আদালতে ঐ আদালতের বিচার কীভাবে চলে, তা ইংরেজিতে sessions court trial গাইডে ধাপে ধাপে আছে।
যুক্তিতর্ক: মামলার আর্গুমেন্ট কী ও কখন হয়
মামলার আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্ক হলো সাক্ষ্য শেষ হওয়ার পর রায়ের আগের শুনানি, যেখানে উভয় পক্ষ বলেন সাক্ষ্য আসলে কী প্রমাণ করেছে। দায়রা আদালতে ২৬৫ঞ ধারায় সাফাই সাক্ষ্য শেষে পাবলিক প্রসিকিউটর মামলার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন, এরপর আসামি বা তার আইনজীবীর জবাব দেওয়ার অধিকার আছে; সাফাই পক্ষ কোনো আইনের প্রশ্ন তুললে আদালতের অনুমতিতে প্রসিকিউশন তার জবাব দিতে পারে।[3] যুক্তিতর্ক ও আইনের প্রশ্ন শোনার পর ২৬৫ট ধারায় আদালত রায় দেন।[3]
যুক্তিতর্কে কী বলতে হয়
ভালো যুক্তিতর্ক নতুন তথ্য আনে না; রেকর্ডে যা আছে তা সাজায়। প্রসিকিউশন দেখায় প্রতিটি উপাদান কোন সাক্ষীর কথায় প্রমাণিত; সাফাই পক্ষ দেখায় এজাহার ও সাক্ষ্যের বৈপরীত্য, দেরিতে মামলা, জব্দে ত্রুটি ও ৩৪২ ধারায় না-রাখা পরিস্থিতি। লিখিত যুক্তি ও নজির জমা দেওয়া ভালো চর্চা।
দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় আর্গুমেন্টের পার্থক্য
দেওয়ানি মোকদ্দমায়ও সাক্ষ্য শেষে যুক্তিতর্কের শুনানি হয়, তবে সেখানে প্রশ্ন হলো সম্ভাবনার পাল্লা কোন দিকে ভারী, আর ফল ডিক্রি। ফৌজদারি মামলায় প্রসিকিউশনকে যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রমাণ করতে হয়, আর ফল খালাস বা দণ্ড। ফৌজদারি মামলার পর্যায়ে যুক্তিতর্কের তারিখে বারবার সময় নেওয়া রায় পিছিয়ে দেয়।
রায়, দণ্ড ও পরের ধাপ
রায়ে খালাস হলে আসামি মুক্ত; দণ্ড হলে সাজার ধরন ও মেয়াদ ঠিক হয়। দায়রা আদালতের মৃত্যুদণ্ড হাইকোর্ট বিভাগ অনুমোদন না করা পর্যন্ত কার্যকর হয় না।[1] বিচারের সময়সীমাও আইনে আছে: ৩৩৯সি ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট মামলা পাওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে, আর দায়রা জজ, অতিরিক্ত দায়রা জজ ও সহকারী দায়রা জজ ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করবেন।[3] সংক্ষিপ্ত বিচারে নতুন ২৬৪ক ধারায় সম্ভব হলে চার্জ, সাক্ষ্য, ৩৪২ ধারার পরীক্ষা ও রায় একই বৈঠকে শেষ করা যায়।[3]
রায়ের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ডে সাধারণত দায়রা জজের কাছে, আর দায়রা জজের দণ্ডে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল হয়; অন্তর্বর্তী আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন, আর প্রক্রিয়ার অপব্যবহার ঠেকাতে হাইকোর্ট বিভাগের ৫৬১এ ধারার সহজাত ক্ষমতা।[1] আপিলের সময়সীমা খুব কম, তাই রায়ের দিনই সার্টিফায়েড কপির আবেদন করুন। আপিলের পথ দেখুন criminal appeal গাইডে এবং মামলা বাতিলের জন্য আমাদের ৫৬১এ ধারায় ফৌজদারি মামলা বাতিল প্র্যাকটিস।

২০২৬ সালের সংশোধনী: ফৌজদারি মামলার পর্যায়ে কী বদলাল
২০২৬ সালের ১১ নং আইন অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫ সালের অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপ দিয়েছে।[4] সংক্ষেপে প্রভাব:
- গ্রেপ্তার: ৫৪ ধারায় কারণ লেখার বাধ্যবাধকতা; ৪৬ক–৪৬ঙ ধারায় স্মারক, পরিবারকে জানানো ও জিডিতে নথিভুক্তি।[4]
- তদন্ত: ১৭৩বি ধারায় ৬০ কর্মদিবস; ১৭৩ক ধারায় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ও আগাম অব্যাহতি।[2]
- জামিন: ৪৯৮ ধারায় যেকোনো আদালত যুক্তিসংগত শর্ত দিতে পারেন; ৪৯৯ ধারায় জামিননামা সশরীরে, আইনজীবীর মাধ্যমে বা অনলাইনে দেওয়া যায়, জামিনদারের পরিচয় জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরে যাচাই হয়।[4]
- সমন ও হাজিরা: মোবাইল ও ইমেইলে সমন; জামিনপ্রাপ্ত আসামির আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা।[4] [5]
- মিথ্যা মামলা: ২৫০ ধারায় মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এখন বিচারকের ইচ্ছাধীন নয়, বাধ্যতামূলক।[5]
ঢাকা জজ কোর্টে ফৌজদারি আইনজীবী: কখন ও কেন
ঢাকার একটি মামলায় একই দিনে সিএমএম আদালতে রিমান্ড, মহানগর দায়রা জজ আদালতে জামিনের বিবিধ মামলা আর ট্রাইব্যুনালে চার্জ শুনানি পড়তে পারে। অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীর মূল্য তিন জায়গায়: সঠিক দরজা ও ধারা বাছাই, প্রতিটি সময়সীমা রেকর্ডে তোলা, আর নির্ধারক তারিখে প্রস্তুত থাকা। নিচের ধাপগুলো বাদী ও আসামি দুই পক্ষের জন্যই।
অপরাধের শ্রেণি যাচাই
ঘটনাটি আমলযোগ্য কি না এবং কোনো বিশেষ আইন প্রযোজ্য কি না দেখে ঠিক করুন জিডি, এজাহার, নালিশ নাকি ট্রাইব্যুনালে যাবেন।
সঠিক দরজায় শুরু
আমলযোগ্য অপরাধে ঘটনাস্থলের থানায় স্বাক্ষরিত লিখিত এজাহার দিন; থানা না নিলে দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ করুন।
নম্বর ও কপি সংরক্ষণ
জিডি নম্বর, মামলা নম্বর, জিআর বা সিআর নম্বর ও প্রতিটি আদেশের তারিখ লিখে রাখুন এবং নকল তুলুন।
তদন্তের সময়সীমা তদারকি
৬০ কর্মদিবস ও ১২০ দিনের হিসাব রাখুন; দেরি হলে ১৭৩বি বা ১৬৭(৫) ধারায় আবেদন করুন।
পুলিশ রিপোর্টে প্রতিক্রিয়া
চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট দাখিলের তারিখে হাজির থাকুন; বাদী হলে প্রয়োজনে নারাজি, আসামি হলে জামিন ও অব্যাহতির প্রস্তুতি।
চার্জ শুনানির প্রস্তুতি
এজাহার, জবানবন্দি ও চার্জশিট বিশ্লেষণ করে ২৪১ক বা ২৬৫গ ধারায় অব্যাহতির আবেদন লিখিতভাবে দিন।
সাক্ষ্য ও ৩৪২ ধারা
সাক্ষী হাজির রাখা, জেরার প্রস্তুতি এবং ৩৪২ ধারায় প্রতিটি অভিযোগমূলক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিকল্পনা করুন।
যুক্তিতর্ক ও রায়
রেকর্ডভিত্তিক লিখিত যুক্তি ও নজির জমা দিন; রায়ের দিনই সার্টিফায়েড কপির আবেদন করে আপিলের সময় রক্ষা করুন।
ফৌজদারি মামলার পর্যায়ে যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে
- এজাহারে অতিরঞ্জন: প্রতিটি বাড়তি নাম বা কথা জেরায় বৈপরীত্য হয়ে ফিরে আসে, আর মিথ্যা প্রমাণ হলে ২৫০ ধারার ঝুঁকি।[5]
- নারাজির সুযোগ হারানো: ফাইনাল রিপোর্ট আপত্তি ছাড়া গৃহীত হয়ে গেলে পরে চ্যালেঞ্জ কঠিন।[10]
- চার্জ শুনানিতে অপ্রস্তুত থাকা: অব্যাহতির সুযোগ এই ধাপেই, পরে নয়।[3]
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ফৌজদারি মামলার পর্যায় কয়টি ও কী কী?
মূল ধাপগুলো হলো এজাহার বা নালিশ, তদন্ত, পুলিশ রিপোর্ট (চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট), আমলে গ্রহণ, চার্জ গঠন বা অব্যাহতি, প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য, ৩৪২ ধারায় আসামির পরীক্ষা, সাফাই, যুক্তিতর্ক ও রায়; এরপর আপিল বা রিভিশন।[3]
জিডি ও এজাহারের মধ্যে পার্থক্য কী?
অনলাইনে কি এজাহার বা মামলা করা যায়?
না। "Online GD" অ্যাপে কেবল জিডি হয়। মামলা দরকার হলে অভিযোগের প্রিন্ট কপি বা কোড নম্বর নিয়ে থানায় সশরীরে যেতে হয়।[8]
জিআর মামলা ও সিআর মামলার পার্থক্য কী?
পুলিশ কত দিনে তদন্ত শেষ করবে?
১৭৩বি ধারায় তথ্য পাওয়ার দিন থেকে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে। যুক্তিসংগত কারণে ম্যাজিস্ট্রেট সময় বাড়াতে পারেন, আর তাতেও না হলে তদন্তভার অন্য কর্মকর্তাকে দিতে পারেন।[2]
ফাইনাল রিপোর্টে আপত্তি থাকলে বাদী কী করবেন?
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নারাজি দরখাস্ত দিন। আদালত অধিকতর তদন্ত, বিচারিক অনুসন্ধান বা দরখাস্তকে নালিশ হিসেবে গণ্য করতে পারেন; নামঞ্জুর হলে রিভিশন করা যায়।[10]
কোন মামলা কোন কোর্টে হয়?
সিএমএম কোর্ট আর জজ কোর্টের পার্থক্য কী?
সিএমএম কোর্ট মহানগরের ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, যেখানে রিমান্ড, প্রথম জামিন, আমলে গ্রহণ ও ছোট অপরাধের বিচার হয়। জজ কোর্ট বলতে দায়রা আদালত বোঝায়, যেখানে গুরুতর অপরাধের বিচার ও ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল-রিভিশন হয়।[1]
৩৪২ ধারায় আসামির পরীক্ষা কী?
প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য শেষে আদালত আসামিকে প্রশ্ন করেন, যাতে তিনি বিরুদ্ধ সাক্ষ্যের ব্যাখ্যা দিতে পারেন। শপথ করানো হয় না, উত্তর না দিলে শাস্তি নেই, তবে আদালত অনুমান করতে পারেন।[3]
মামলার আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্ক কখন হয়?
সব সাক্ষ্য ও সাফাই শেষে, রায়ের ঠিক আগে। দায়রা আদালতে ২৬৫ঞ ধারায় প্রথমে পাবলিক প্রসিকিউটর সারসংক্ষেপ দেন, তারপর আসামিপক্ষ জবাব দেয়।[3]
সূত্র তালিকা
প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র
উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।
- ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (Act No. V of 1898), ধারা ৪, ৬, ৯, ১৭, ৩১, ৩২, ৪০৮–৪৩৯ক ও ৫৬১এ সহ সংকলিত পাঠ — Laws of Bangladesh
- ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮, চতুর্দশ অধ্যায় (ধারা ১৫৪–১৭৩বি: এজাহার, তদন্ত, রিমান্ড, পুলিশ রিপোর্ট) — Laws of Bangladesh
- ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮, ষষ্ঠ খণ্ড (ধারা ১৯০–২৬৫ট, ৩৩৯সি ও ৩৪২: আমলে গ্রহণ, নালিশ, চার্জ ও বিচার) — Laws of Bangladesh
- ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ১১ নং আইন, ১০ এপ্রিল ২০২৬) — Laws of Bangladesh
- প্রথম আলো, ১২ আগস্ট ২০২৫ — মিথ্যা মামলায় শাস্তি পেতে হবে, মুঠোফোনে সমন দেওয়া যাবে
- দৈনিক ইত্তেফাক, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ — জিডি ও এফআইআরের পার্থক্য
- Dhaka Tribune, 24 September 2025 — Online GD services to be available in all police stations
- Jagonews24, 30 August 2026 — Lost something? Here's how to file an online GD
- Supreme Court of Bangladesh, High Court Division — Naripokkho v Bangladesh, Writ Petition No. 5541 of 2015 (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬), 10 SCOB
- Dhaka Tribune — Relief against unsatisfactory investigation (নারাজি দরখাস্ত)
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (২০২৬ সনের ৮৫ নং আইন দ্বারা সংশোধিত), ধারা ১৮, ২৫ক, ২৬, ২৬ক ও ২৭ — Laws of Bangladesh
- সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৮১ নং আইন), ধারা ২, ৪০ ও ৪১ — Laws of Bangladesh
- Criminal Law Amendment Act, 1958 (Act No. XL of 1958) — Laws of Bangladesh
- The Special Powers Act, 1974 (Act No. XIV of 1974), section 26 — Laws of Bangladesh
TRW-এর সহায়তা
তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে
TRW এজাহার ও নালিশি দরখাস্ত তৈরি, রিমান্ড ও জামিন শুনানি, নারাজি, অব্যাহতি ও চার্জ শুনানি, দায়রা ও ট্রাইব্যুনালে বিচার, আপিল, রিভিশন এবং ৫৬১এ ধারায় মামলা বাতিলে বাদী, আসামি ও প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করে। দেখুন আমাদের ফৌজদারি মামলা বাতিল (৫৬১এ) প্র্যাকটিস, অথবা আপনার মামলার ধাপ, আদালত ও সময়সীমা যাচাই করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।