বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম ২০২৬: ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী ও মায়ের অংশ, ওয়ারিশ সনদ, সাকসেশন সার্টিফিকেট ও বণ্টননামা

by Barrister Tahmidur Rahman | Oct 21, 2026 | Insights, Private Client & Succession | 0 comments

TRW Insight / বাংলাদেশ

বাবার মৃত্যুর পর জমি, বাড়ি ও ব্যাংকের টাকা কে কত পাবেন, তা ঠিক করে ধর্মভিত্তিক উত্তরাধিকার আইন। অংশের হিসাব সঠিক হলেও ওয়ারিশ সনদ, সাকসেশন সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রি বণ্টননামা ও নামজারি ঠিক ক্রমে না হলে সম্পত্তি বিক্রি বা ব্যবহার আটকে যায়।

হালনাগাদ ২১ অক্টোবর ২০২৬আইনি বিশ্লেষণবাংলাদেশ21 মিনিটে পড়া

বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম ২০২৬: অংশ, কাগজ ও বিক্রি

বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ওঠে জমি, বাড়ি আর ব্যাংকের টাকা নিয়ে: কে কত পাবেন, মেয়েরা কেন ছেলের অর্ধেক, মা কত পাবেন, আর আগে মারা যাওয়া ভাইয়ের সন্তানেরা কিছু পাবে কি না। মুসলিম পরিবারে বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম আসে কোরআনে নির্ধারিত অংশ (ফারায়েজ) থেকে, যা বাংলাদেশে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন হিসেবে আদালতে প্রয়োগ হয়, আর তার ওপর মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারা এতিম নাতি-নাতনিকে অংশ দিয়েছে।[1] [2] [3]

অংশ জানা কাজের অর্ধেক মাত্র। বাকি অর্ধেক কাগজের: ওয়ারিশ সনদ, ব্যাংকের টাকার জন্য সাকসেশন সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রি করা বণ্টননামা, নামজারি এবং বিক্রির আগে সব শরিকের সম্মতি ও অগ্রক্রয়ের ঝুঁকি যাচাই। এই লেখায় হানাফি নিয়মে ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, বাবা-মায়ের অংশ হিসাবের উদাহরণসহ, উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫-এর অধীনে সাকসেশন সার্টিফিকেটের আদালত ও ফি, বণ্টন ও বাঁটোয়ারা মামলা, ওয়ারিশ সম্পত্তি নিরাপদে বিক্রির ধাপ এবং হিন্দু ও খ্রিস্টান পরিবারের মূল নিয়ম সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।

বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম — পরিবারের সদস্যরা উত্তরাধিকারের কাগজপত্র নিয়ে আলোচনা করছেন
অংশের হিসাব শুরু হয় সম্পূর্ণ ওয়ারিশ তালিকা দিয়ে

সারসংক্ষেপ: মৃত বাবার সম্পত্তি থেকে আগে দাফন-কাফনের খরচ, তারপর ঋণ, তারপর এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অসিয়ত মেটানো হয়; বাকিটা ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হয়। সন্তান থাকলে স্ত্রী পান ১/৮, বাবা ও মা প্রত্যেকে ১/৬; ছেলে থাকলে ছেলে-মেয়ে অবশিষ্টাংশ ২:১ অনুপাতে পান। শুধু এক মেয়ে থাকলে ১/২, একাধিক মেয়ে থাকলে মিলে ২/৩। আগে মারা যাওয়া সন্তানের সন্তানেরা তাদের মা বা বাবার অংশ পায়। ব্যাংকের টাকা তুলতে সাধারণত আদালতের উত্তরাধিকার সনদ লাগে, জমি আলাদা নামজারি ও বিক্রির জন্য রেজিস্ট্রি করা বণ্টননামা দরকার।

মূল বিষয়: ওয়ারিশ সনদ একটি প্রশাসনিক কাগজ; এটি উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি করে না এবং ব্যাংক থেকে টাকা তোলার ক্ষমতাও দেয় না। ওয়ারিশ নিয়ে বিরোধ থাকলে প্রশ্নটি দেওয়ানি আদালতে যায়, আর কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে নেওয়া আদালতের উত্তরাধিকার সনদও বাতিল হতে পারে। তাই প্রথম দিন থেকেই সম্পূর্ণ ও সঠিক ওয়ারিশ তালিকা তৈরি করুন।

এক নজরে

01

আগে দায় পরিশোধ

দাফনের খরচ, ঋণ ও এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অসিয়ত মেটানোর পরই ওয়ারিশদের ভাগ।

02

স্ত্রী ও বাবা-মা

সন্তান থাকলে স্ত্রী ১/৮, না থাকলে ১/৪; বাবা ও মা প্রত্যেকে ১/৬।

03

ছেলে-মেয়ে ২:১

ছেলে থাকলে অবশিষ্টাংশে ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ; শুধু মেয়ে হলে ১/২ বা ২/৩।

04

এতিম নাতি-নাতনি

১৯৬১ অধ্যাদেশের ৪ ধারায় আগে মৃত সন্তানের অংশ তার সন্তানেরা পায়।

05

কাগজের ক্রম

ওয়ারিশ সনদ, প্রয়োজনে আদালতের সনদ, রেজিস্ট্রি বণ্টননামা, নামজারি, তারপর বিক্রি।

সূচিপত্র

ভাগের আগে যা মেটাতে হয়: দাফন, ঋণ ও অসিয়ত

মুসলিম আইনে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই সম্পত্তি ওয়ারিশদের হয়ে যায় না। আগে চারটি কাজ ক্রমানুসারে করতে হয়: দাফন-কাফনের খরচ, মৃতের ঋণ পরিশোধ, অসিয়ত থাকলে তা কার্যকর করা (সর্বোচ্চ সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত), এবং তারপর অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন।[4]

বাস্তবে পরিবারগুলো প্রায়ই এই ধাপ বাদ দিয়ে সরাসরি জমি ভাগ করে ফেলে। পরে কোনো পাওনাদার বা ব্যাংক দাবি তুললে সেই ভাগ নিয়ে নতুন বিরোধ শুরু হয়। তাই হিসাব শুরুর আগে বাবার ব্যাংক ঋণ, ব্যক্তিগত ধার, বকেয়া কর ও স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহরের একটি তালিকা করুন, এবং বাবা কোনো লিখিত অসিয়ত বা হেবা (দান) করে গেছেন কি না খুঁজে দেখুন।

কোন আইনে ভাগ হবে: ধর্মভিত্তিক উত্তরাধিকার

বাংলাদেশে সবার জন্য একক উত্তরাধিকার আইন নেই। তাই বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম প্রথমে নির্ভর করে বাবার ধর্মের ওপর: মৃত ব্যক্তির ধর্ম ঠিক করে কোন ব্যক্তিগত আইন প্রযোজ্য হবে। মুসলিম পরিবারে ফারায়েজ, হিন্দু পরিবারে দায়ভাগ মতবাদ, আর খ্রিস্টান পরিবারে উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫ প্রযোজ্য।[14] [15] এই লেখার মুসলিম উত্তরাধিকারের হিসাবগুলো সুন্নি হানাফি নিয়মে করা।

তিনটি ব্যবস্থার ফল একেবারে আলাদা। ভুল আইনে হিসাব করলে তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ওয়ারিশ সনদ, নামজারি ও বিক্রয় দলিল সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ইংরেজিতে তিনটি ব্যবস্থার বিস্তারিত তুলনা পাবেন আমাদের বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইন বিশ্লেষণে।

ইসলামে বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম: কে কত পান

ফারায়েজে ওয়ারিশরা মূলত দুই শ্রেণির। প্রথম শ্রেণি অংশীদার (যাবিল ফুরুজ), যাদের অংশ কোরআনে নির্দিষ্ট, যেমন স্ত্রী, মা, বাবা ও মেয়ে। দ্বিতীয় শ্রেণি অবশিষ্টভোগী (আসাবা), যারা অংশীদারদের দেওয়ার পর যা থাকে তা পান; ছেলে সব সময় অবশিষ্টভোগী।[1] সূরা আন-নিসার ১১, ১২ ও ১৭৬ নম্বর আয়াত এই অংশগুলোর উৎস।[2]

স্ত্রীর অংশ

বাবার কোনো সন্তান না থাকলে স্ত্রী পান ১/৪ অংশ; সন্তান থাকলে, সন্তান যত ছোটই হোক, স্ত্রী পান ১/৮ অংশ।[1] [2] একাধিক স্ত্রী থাকলে এই ১/৮ বা ১/৪ অংশ তারা সমান ভাগে ভাগ করে নেন; প্রত্যেকে আলাদা ১/৮ পান না।[1] উল্টো দিকে, স্ত্রী মারা গেলে স্বামী পান ১/২ (সন্তান না থাকলে) বা ১/৪ (সন্তান থাকলে)।[1]

ছেলে ও মেয়ের অংশ: ২:১ নিয়ম

ছেলের কোনো নির্দিষ্ট অংশ নেই; অংশীদারদের দেওয়ার পর পুরো অবশিষ্টাংশ ছেলেরা পান। ছেলে থাকলে মেয়েরাও অবশিষ্টভোগী হয়ে যান এবং প্রত্যেক ছেলে প্রত্যেক মেয়ের দ্বিগুণ পান।[1] [2] হিসাবের সহজ পদ্ধতি হলো প্রতিটি ছেলেকে দুই ইউনিট আর প্রতিটি মেয়েকে এক ইউনিট ধরা, তারপর অবশিষ্টাংশকে মোট ইউনিট দিয়ে ভাগ করা।

ছেলে না থাকলে মেয়েরা কত পান

ছেলে না থাকলে মেয়েরা নির্দিষ্ট অংশীদার: এক মেয়ে পান ১/২, দুই বা ততোধিক মেয়ে মিলে পান ২/৩, যা তাদের মধ্যে সমান ভাগ হয়।[1] বাকি অংশ যায় অবশিষ্টভোগীর কাছে: মৃতের বাবা জীবিত থাকলে তিনি ১/৬ ছাড়াও অবশিষ্টাংশ পান; বাবা না থাকলে আপন ভাই-বোনেরা, আর মেয়ের উপস্থিতিতে আপন বোনেরাও অবশিষ্টভোগী হতে পারেন।[1] অনেক পরিবার এখানেই অবাক হয়: শুধু মেয়ে থাকলে চাচারাও অংশ পেতে পারেন।

মৃতের বাবা-মায়ের অংশ

বাবার সন্তান থাকলে তাঁর বাবা (সন্তানদের দাদা) ও মা (দাদি) প্রত্যেকে ১/৬ পান। সন্তান না থাকলে মা পান ১/৩, তবে মৃতের দুই বা ততোধিক ভাই-বোন থাকলে মায়ের অংশ ১/৬-এ নেমে আসে। স্বামী বা স্ত্রী এবং বাবা দুজনই জীবিত থাকলে মা পান স্বামী বা স্ত্রীর অংশ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্টের ১/৩।[1] [2] বাবা জীবিত থাকলে দাদা কিছু পান না, আর বাবা-মায়ের কেউ জীবিত থাকলে দাদি বাদ পড়েন।[1]

নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল কখনো পুরো সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়, আবার কখনো অবশিষ্টভোগী না থাকায় কিছু অংশ বেঁচে যায়। প্রথম ক্ষেত্রে আনুপাতিক হ্রাস (আউল) আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অংশীদারদের মধ্যে ফেরত (রদ) প্রয়োগ হয়। এমন জটিল হিসাবে আলেম বা অভিজ্ঞ আইনজীবীর লিখিত হিসাব নিয়ে সব ওয়ারিশের স্বাক্ষর রাখা নিরাপদ।

বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম: চারটি হিসাবের উদাহরণ

নিচের উদাহরণগুলোতে ধরা হয়েছে দাফন, ঋণ ও অসিয়ত মেটানোর পর যে সম্পত্তি থাকে সেটিই ভাগ হচ্ছে, এবং মৃত ব্যক্তি হানাফি মুসলিম। সংখ্যাগুলো উপরের অংশ থেকে সরাসরি হিসাব করা।[1] [2]

উদাহরণ ১: স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে

বাবা ৪০ শতাংশ জমি রেখে মারা গেছেন। সন্তান আছে, তাই স্ত্রী পাবেন ১/৮, অর্থাৎ ৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ ভাগ হবে পাঁচ ইউনিটে (দুই ছেলে × ২ + এক মেয়ে × ১), প্রতি ইউনিট ৭ শতাংশ। ফলে প্রত্যেক ছেলে পাবেন ১৪ শতাংশ, মেয়ে পাবেন ৭ শতাংশ। যোগফল: ৫ + ১৪ + ১৪ + ৭ = ৪০।

উদাহরণ ২: স্ত্রী, বাবা, মা, এক ছেলে ও দুই মেয়ে

মোট সম্পদ ৯৬ লাখ টাকা। স্ত্রী ১/৮ = ১২ লাখ; মৃতের মা ১/৬ = ১৬ লাখ; মৃতের বাবা ১/৬ = ১৬ লাখ। ছেলে থাকায় বাবা কেবল ১/৬ পান। অবশিষ্ট ৫২ লাখ চার ইউনিটে ভাগ (ছেলে ২, দুই মেয়ে ১ করে), প্রতি ইউনিট ১৩ লাখ: ছেলে ২৬ লাখ, প্রত্যেক মেয়ে ১৩ লাখ। যোগফল ৯৬ লাখ।

উদাহরণ ৩: ছেলে নেই; স্ত্রী, এক মেয়ে, বাবা ও মা

সম্পত্তি ২৪ শতাংশ জমি। স্ত্রী ১/৮ = ৩ শতাংশ; একমাত্র মেয়ে ১/২ = ১২ শতাংশ; মা ১/৬ = ৪ শতাংশ; বাবা ১/৬ = ৪ শতাংশ। এতে ২৩ শতাংশ বণ্টন হলো, বাকি ১ শতাংশ বাবা অবশিষ্টভোগী হিসেবে পাবেন। ফলে বাবার মোট অংশ ৫ শতাংশ।[1]

উদাহরণ ৪: ছেলে নেই, বাবা-মা নেই; স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ভাই

সম্পদ ২৪ লাখ টাকা। স্ত্রী ১/৮ = ৩ লাখ; দুই মেয়ে মিলে ২/৩ = ১৬ লাখ, প্রত্যেকে ৮ লাখ। বাকি ৫ লাখ যাবে মৃতের আপন ভাইয়ের কাছে অবশিষ্টভোগী হিসেবে। ভাইয়ের সঙ্গে বোনও থাকলে এই ৫ লাখ তারা ২:১ অনুপাতে ভাগ করবেন।[1] মেয়েদের পুরো সম্পত্তি দিতে চাইলে বাবাকে জীবদ্দশায় রেজিস্ট্রি করা হেবা বা অন্য বৈধ ব্যবস্থা নিতে হয়।

বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম — জমির নকশা ও খতিয়ান দেখে অংশের হিসাব
প্রতিটি দাগ ও খতিয়ান মিলিয়ে অংশ নির্ধারণ

এতিম নাতি-নাতনির অংশ: ১৯৬১ অধ্যাদেশের ৪ ধারা

প্রচলিত হানাফি নিয়মে নিকটতর ওয়ারিশ দূরবর্তীকে বাদ দেন। ফলে দাদার আগে বাবা মারা গেলে এবং দাদার অন্য ছেলে জীবিত থাকলে এতিম নাতি-নাতনি কিছুই পেত না। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারা এই ফল বদলে দিয়েছে: উত্তরাধিকার শুরু হওয়ার আগে কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা গেলে তার সন্তানেরা, সে জীবিত থাকলে যে অংশ পেত, সমপরিমাণ অংশ পায় (per stirpes)।[3]

উদাহরণ: দাদা ৪৮ শতাংশ জমি রেখে মারা গেলেন; রেখে গেলেন স্ত্রী, জীবিত ছেলে করিম, আর আগে মারা যাওয়া ছেলে রহিমের দুই সন্তান। স্ত্রী পাবেন ১/৮ = ৬ শতাংশ। বাকি ৪২ শতাংশ দুই ছেলের মধ্যে সমান, অর্থাৎ ২১ শতাংশ করে, যেন রহিম জীবিত। রহিমের ২১ শতাংশ তার সন্তানদের মধ্যে ভাগ হবে। আগে মারা যাওয়া মেয়ের সন্তানদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।[3]

দুটি সতর্কতা। প্রথমত, অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার আগে, অর্থাৎ ১৯৬১ সালের জুলাইয়ের আগে যাদের উত্তরাধিকার শুরু হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।[1] দ্বিতীয়ত, ওয়ারিশ সনদ বা বণ্টননামায় এতিম নাতি-নাতনিকে বাদ দেওয়া খুব সাধারণ ভুল, এবং এমন বাদ পড়া পরে নামজারি ও বিক্রি দুটোকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। মতবাদগত বিতর্কসহ বিস্তারিত পাবেন আমাদের মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের কাঠামো বিশ্লেষণে (ইংরেজিতে)।

হিন্দু ও খ্রিস্টান পরিবারে সম্পত্তি ভাগ: সংক্ষেপে

হিন্দু পরিবার: দায়ভাগ মতবাদ

হিন্দু পরিবারে বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম আসে দায়ভাগ মতবাদ থেকে, যা বাংলাদেশে চলে আসছে এবং দেশ ভাগের পর থেকে প্রায় অপরিবর্তিত।[14] অকৃষি সম্পত্তিতে স্ত্রী একজন ছেলের সমান অংশ পান। মেয়েরা সাধারণত তখনই উত্তরাধিকারী হন যখন ছেলে, স্ত্রী বা আগে মৃত ছেলের ছেলে কেউ জীবিত নেই। নারীরা উত্তরাধিকারসূত্রে যা পান তা জীবনস্বত্ব; তাঁদের মৃত্যুর পর সম্পত্তি মূল মালিকের নিকটতম পুরুষ ওয়ারিশের কাছে যায়।[14] তাই হিন্দু বিধবা বা মেয়ের কাছ থেকে জমি কেনার আগে বিশেষ যাচাই দরকার।

খ্রিস্টান পরিবার: উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫

খ্রিস্টান কেউ উইল ছাড়া মারা গেলে এবং স্বামী বা স্ত্রী ও বংশধর রেখে গেলে স্বামী বা স্ত্রী পান এক-তৃতীয়াংশ, আর বংশধরেরা দুই-তৃতীয়াংশ। একাধিক সন্তান থাকলে সম্পত্তি সব জীবিত সন্তানের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়।[15] হিন্দু ও খ্রিস্টান উইল, প্রবেট এবং অংশের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন আমাদের উত্তরাধিকার আইন ও প্রবেট বিষয়ক ইংরেজি বিশ্লেষণ।

ওয়ারিশ সনদ: কে দেয়, কী প্রমাণ করে

ওয়ারিশ সনদ (উত্তরাধিকার সনদ) হলো মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের তালিকা, যা স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ দেয়: গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভায় মেয়র, আর সিটি করপোরেশনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর।[6] ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড একই ধরনের সনদ দেয়।[12] নামজারি, পেনশন, ভাতা ও আদালতে পারিবারিক বংশতালিকার প্রমাণ হিসেবে ওয়ারিশ সনদ বহুল ব্যবহৃত; ওয়ারিশের সংখ্যা ও অংশ নির্ধারণেও এটি কাজে লাগে।[4]

তবে ওয়ারিশ সনদ বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়। ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে লায়লা শাহেদ বনাম বাংলাদেশ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন, দুই পক্ষ ওয়ারিশ দাবি করলে সনদ প্রদানকারী কর্মকর্তা প্রশাসনিক ক্ষমতায় সেই বিরোধ মীমাংসা করতে পারেন না; এটি সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নিষ্পত্তিযোগ্য তথ্যগত বিরোধ, যা উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের বিষয়। আদালত আরও বলেছেন, ডিএনএ প্রতিবেদন একটি সাক্ষ্য মাত্র, রায় নয়।[12] অর্থাৎ ওয়ারিশ নিয়ে বিরোধ থাকলে ওয়ারিশ সনদ দিয়ে সমাধান হবে না।

সাকসেশন সার্টিফিকেট: উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫

সাকসেশন সার্টিফিকেট (উত্তরাধিকার প্রমাণপত্র) আদালতের দেওয়া সনদ, যা উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫-এর দশম খণ্ডের অধীনে মৃত ব্যক্তির পাওনা ও সিকিউরিটি আদায়ের ক্ষমতা দেয়।[11] নমিনি না থাকলে ব্যাংকের জমা টাকা তোলা, শেয়ার, বন্ড ও স্টক হস্তান্তর এবং গাড়ির মালিকানা বদলের জন্য সাধারণত এটি লাগে।[4] জমির মালিকানা এটি নির্ধারণ করে না; জমির জন্য পথ হলো ওয়ারিশ সনদ, বণ্টননামা ও নামজারি।

কোন আদালতে আবেদন

আবেদন হয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে।[4] এখতিয়ার ঠিক হয় মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর সময় সাধারণত যেখানে বসবাস করতেন সেই এলাকা দিয়ে, অথবা সেখানে স্থায়ী বসবাস না থাকলে যেখানে তাঁর সম্পদ আছে সেখানে। আবেদন বিবিধ মামলা হিসেবে রেজিস্টার হয় এবং মূলত ৩৭২ ধারায় দাখিল করা হয়।[11] সব ওয়ারিশ একজনকে ক্ষমতা দিলে তিনি হলফনামাসহ দরখাস্ত দাখিল করতে পারেন।[11]

দরখাস্ত, নোটিশ ও আপত্তি

দরখাস্তে মৃত্যুর তারিখ, মৃতের বসবাসের স্থান, সব ওয়ারিশের নাম-ঠিকানা এবং কোন কোন পাওনা বা সিকিউরিটির জন্য সনদ চাওয়া হচ্ছে তা স্পষ্ট লিখতে হয়। সঙ্গে দিতে হয় মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, পরিচয়পত্র এবং ব্যাংক হিসাব বা শেয়ারের প্রমাণ।[11] আপত্তি না থাকলে আদালত নোটিশ জারি করেন; বিরোধ থাকলে প্রতিপক্ষ ওয়ারিশদের ওপর সমন যায় এবং তারা সাধারণত দেড় মাসের মতো সময়ের মধ্যে লিখিত আপত্তি দেন।[11]

কোর্ট ফি ও সময়

সাকসেশন সার্টিফিকেটের কোর্ট ফি কোর্ট-ফিস অ্যাক্ট ১৮৭০-এর প্রথম তফসিলের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মূল্যানুপাতিক: পাওনা ও সিকিউরিটির মোট মূল্য ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ফি নেই, ২০ হাজারের বেশি থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ১ শতাংশ, আর ১ লাখ টাকার বেশি হলে ২ শতাংশ।[11] উদাহরণ: বাবার ৪০ লাখ টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়ী হিসাবের জন্য ফি দাঁড়াবে ৮০ হাজার টাকা। ফি সরকারি ট্রেজারি চালানে জমা হয়।[11]

সময় নির্ভর করে আদালতের কার্যতালিকা, নোটিশ জারি ও আপত্তির ওপর। আপত্তিহীন মামলায় সাধারণত দুই থেকে চার মাস, আর বিরোধপূর্ণ মামলায় ছয় মাস থেকে এক বছর বা তারও বেশি লাগতে পারে।[11] সব ওয়ারিশকে একসঙ্গে আবেদনে যুক্ত করা এবং প্রতিটি হিসাব নম্বর ও ফোলিও নম্বর নির্ভুলভাবে লেখাই সময় বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

কোনো ওয়ারিশ বাদ পড়লে সনদ বাতিল

ওয়ারিশ গোপন করে নেওয়া সাকসেশন সার্টিফিকেট টেকে না। ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একতরফাভাবে নেওয়া একটি সনদ মৃতের দ্বিতীয় স্ত্রীর আবেদনে ১৯২৫ সালের আইনের ৩৮৩ ধারায় বাতিল হয়; নিবন্ধিত কাবিননামা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও সিটি করপোরেশনের ওয়ারিশ সনদ বিবেচনা করে হাইকোর্ট বিভাগ ১০ জুন ২০২৪ তারিখে সেই বাতিল আদেশ বহাল রাখেন।[13] শিক্ষা পরিষ্কার: দ্বিতীয় স্ত্রী, বিদেশে থাকা মেয়ে বা এতিম নাতি-নাতনি, কাউকে তালিকা থেকে বাদ দেবেন না। প্রক্রিয়ার পূর্ণ বিবরণ পাবেন আমাদের ইংরেজি সাকসেশন সার্টিফিকেট গাইডে।

বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম — সাকসেশন সার্টিফিকেটের জন্য আদালতে দরখাস্ত
ব্যাংকের টাকা ও শেয়ারের জন্য আদালতের সনদ লাগে

ওয়ারিশ সনদ, সাকসেশন সার্টিফিকেট ও বণ্টননামার পার্থক্য

তিনটি কাগজ তিনটি ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়: কারা ওয়ারিশ, কে টাকা তুলতে পারবেন, আর কোন জমি কার। ভুল কাগজ নিয়ে ভুল দপ্তরে গেলে মাসের পর মাস নষ্ট হয়। নিচের সারণিতে মূল পার্থক্যগুলো দেওয়া হলো; মোবাইলে পাশে স্ক্রল করুন।

ওয়ারিশ সনদ, সাকসেশন সার্টিফিকেট ও বণ্টননামা: কোনটি কখন
কাগজকে দেয়কী কাজে লাগেসীমাবদ্ধতা
ওয়ারিশ সনদইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, সিটি ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডওয়ারিশ তালিকা, যৌথ নামজারি, পেনশন ও ভাতাপ্রশাসনিক কাগজ; বিরোধ নিষ্পত্তি করে না
সাকসেশন সার্টিফিকেটযুগ্ম জেলা জজ আদালত (উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫)নমিনি ছাড়া ব্যাংকের টাকা, শেয়ার, বন্ড ও পাওনা আদায়জমির মালিকানা ঠিক করে না; ১–২% কোর্ট ফি
বণ্টননামাওয়ারিশরা নিজেরা; সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিকে কোন জমি পাবেন, আলাদা নামজারি ও বিক্রিরেজিস্ট্রি না হলে আলাদা খতিয়ান হয় না
নামজারি খতিয়ানসহকারী কমিশনার (ভূমি)সরকারি রেকর্ডে ওয়ারিশদের নাম, কর পরিশোধ, বিক্রির পূর্বশর্তমালিকানার প্রমাণ, নিজে মালিকানা সৃষ্টি করে না
বাঁটোয়ারা ডিক্রিদেওয়ানি আদালত (নির্ধারিত জেলায় আগে মধ্যস্থতা)আপস না হলে আদালতের মাধ্যমে ভাগসময়সাপেক্ষ; মধ্যস্থতার আপসও আদালতের আদেশের মতো কার্যকর

বণ্টননামা: ওয়ারিশদের মধ্যে আপসে ভাগ

বাবার মৃত্যুর পর বণ্টন না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ওয়ারিশ প্রতিটি দাগের প্রতিটি ইঞ্চিতে অবিভক্ত অংশের মালিক। কোনো ওয়ারিশ নির্দিষ্ট একটি অংশকে "আমার" বলতে পারেন না। এই অবস্থা থেকে বের হওয়ার আপস পথ হলো বণ্টননামা বা বাটোয়ারা দলিল।

রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ১৪৩খ ধারা অনুযায়ী উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া স্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিশরা আপসে ভাগ করলে সংশ্লিষ্ট সবার স্বাক্ষরিত বণ্টননামা রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ অনুযায়ী রেজিস্ট্রি করতে হবে, এবং সেই রেজিস্ট্রি দলিল দাখিল হলে রাজস্ব কর্মকর্তা খতিয়ান সংশোধন করবেন। ধারাটি ২০০৬ সালের সংশোধনীতে যুক্ত হয়েছে।[5] সাদা কাগজে বা স্ট্যাম্পে করা অনিবন্ধিত বণ্টননামা দিয়ে আলাদা নামজারি বা নিরাপদ বিক্রি হয় না।

যৌথ নামজারি না আলাদা নামজারি

ভূমি মন্ত্রণালয় ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ স্পষ্ট করেছে, ওয়ারিশরা চাইলে শুধু ওয়ারিশ সনদ দিয়ে সবাই মিলে যৌথ নামজারি করতে পারেন; এতে বণ্টননামা লাগে না। কিন্তু প্রত্যেকে নিজের অংশ আলাদা খতিয়ানে নিতে চাইলে বণ্টননামার ভিত্তিতে নামজারি করতে হবে, যা ১৪৩খ ধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।[6] যৌথ নামজারি দ্রুত, কিন্তু সবাই সব দাগের সহ-মালিক থেকে যান। বিক্রি বা ডেভেলপারকে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে রেজিস্ট্রি বণ্টননামার পর আলাদা নামজারিই পরিষ্কার পথ। অনলাইন নামজারির ধাপ ও ফি জানতে দেখুন আমাদের নামজারি গাইড।

বণ্টননামায় কী থাকবে

একটি ভালো বণ্টননামায় থাকে মৃতের নাম ও মৃত্যুর তারিখ, সব ওয়ারিশের নাম ও ফারায়েজ অনুযায়ী অংশ, প্রতিটি দাগ ও খতিয়ান নম্বর, কে কোন দাগ বা কোন দিকের অংশ পাচ্ছেন তার চৌহদ্দি, সম্ভব হলে নকশা, এবং কেউ কম-বেশি নিলে তার ক্ষতিপূরণের শর্ত। নাবালক ওয়ারিশ থাকলে তার অংশ নিয়ে কিছু করার আগে আইনগত অভিভাবক ও আদালতের অনুমতির প্রশ্ন যাচাই করুন (দেখুন আমাদের অভিভাবকত্ব বিশ্লেষণ); বিদেশে থাকা ওয়ারিশ সাধারণত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে অংশ নেন।

আপস না হলে: মধ্যস্থতা ও বাঁটোয়ারা মামলা

ওয়ারিশরা একমত না হলে যেকোনো শরিক দেওয়ানি আদালতে বাঁটোয়ারা মামলা করতে পারেন, যেখানে আদালত অংশ ঘোষণা করে সম্পত্তি ভাগ করে দেন। তবে এখন অনেক জেলায় মামলার আগে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক। সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে ১২টি জেলায় সহকারী জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত সম্পত্তি বণ্টন বিরোধ ও অগ্রক্রয় বিরোধ আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতায় পাঠানো শুরু হয়। পক্ষদের স্বাক্ষরিত ও প্রধান লিগ্যাল এইড কর্মকর্তার প্রত্যয়িত আপস চুক্তি চূড়ান্ত, বাধ্যতামূলক এবং আদালতের আদেশের মতো কার্যকর।[9]

এই ব্যবস্থার ভিত্তি এখন আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন ২০২৬ (২০২৬ সনের ৪৫ নং আইন)-এর ২১খ ধারা। ২১ জুলাই ২০২৬ থেকে বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইলে বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা চালু হয়েছে।[10] মামলা করার আগে আপনার জেলা তালিকায় আছে কি না যাচাই করুন। বাঁটোয়ারা মামলার আরজি, কমিশন ও ডিক্রি নিয়ে বিস্তারিত পাবেন আমাদের বাঁটোয়ারা মামলা ও যৌথ সম্পত্তি বণ্টন মামলা বিশ্লেষণে।

ওয়ারিশ সম্পত্তি বিক্রির নিয়ম: সম্মতি, নামজারি ও অগ্রক্রয়

বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম জানার পর পরিবারগুলোর পরের প্রশ্ন হয় বিক্রি নিয়ে। একজন ওয়ারিশ নিজের অবিভক্ত অংশ বিক্রি করতে পারেন, কিন্তু অন্য শরিকদের সম্মতি ও বণ্টন ছাড়া নির্দিষ্ট দাগ বা নির্দিষ্ট দিকের জমি দখলসহ বিক্রি করতে পারেন না। ক্রেতা তখন কেবল সহ-মালিক হন এবং পরে বাঁটোয়ারা ও অগ্রক্রয় মামলার ঝুঁকিতে পড়েন। তাই সচেতন ক্রেতা রেজিস্ট্রি বণ্টননামা ও বিক্রেতার নামে আলাদা খতিয়ান দেখতে চান।

খতিয়ান ও ভূমি উন্নয়ন কর ছাড়া বিক্রি নয়

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ অনুযায়ী হালনাগাদ খতিয়ান এবং ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের প্রমাণ ছাড়া কেউ জমি বিক্রি, দান, হস্তান্তর, আমমোক্তারনামা দেওয়া বা দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারেন না।[7] বাবার নামে থাকা জমি তাই নামজারি না করে বিক্রি করা যায় না। আইনটি তথ্য গোপন করে কারও কাছে জমির পুরো বা আংশিক হস্তান্তরকে অপরাধ ঘোষণা করেছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড।[7] অন্য ওয়ারিশের অংশ নিজের দাবি করে বিক্রি করলে দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি ঝুঁকিও আছে।

সব শরিকের সম্মতি

পুরো সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো সব ওয়ারিশকে বিক্রয় দলিলে দাতা হিসেবে রাখা, অথবা আগে রেজিস্ট্রি বণ্টননামা ও আলাদা নামজারি করে প্রত্যেকে নিজ অংশ বিক্রি করা। বিদেশে থাকা ওয়ারিশ যথাযথভাবে সত্যায়িত আমমোক্তারনামা দিতে পারেন। বিক্রয় দলিলের কাঠামো ও রেজিস্ট্রির খুঁটিনাটি পাবেন আমাদের সাফকবলা দলিল বিশ্লেষণে।

অগ্রক্রয় অধিকার: বাইরের ক্রেতার কাছে বিক্রির ঝুঁকি

কৃষিজমির কোনো শরিক নিজের অংশ বাইরের কারও কাছে বিক্রি করলে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬ ধারায় উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক ওই অংশ নিজে কিনে নেওয়ার আবেদন করতে পারেন। আবেদন করতে হয় ৮৯ ধারার নোটিশ পাওয়ার, অথবা নোটিশ না পেলে বিক্রির কথা জানার দুই মাসের মধ্যে, এবং আবেদনের সঙ্গেই পণমূল্য, ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ ও ৮ শতাংশ বার্ষিক সরল সুদ জমা দিতে হয়।[8]

পূর্ণ টাকা জমা দেওয়া পূর্বশর্ত। ১৬ জুলাই ২০২৫ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ এমন একটি অগ্রক্রয় আদেশ বাতিল করেন, যেখানে আবেদনকারী শরিকেরা দাখিলের সময় আংশিক টাকা দিয়ে প্রায় দশ মাস পরে বাকিটা জমা দিয়েছিলেন।[8] ক্রেতার জন্য শিক্ষা হলো, শরিকদের আগে বিক্রির প্রস্তাব দিন বা তাঁদের লিখিত অনাপত্তি নিন। বিস্তারিত পাবেন আমাদের অগ্রক্রয় বিশ্লেষণে।

বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম — রেজিস্ট্রি বণ্টননামা ও বিক্রয় দলিলে স্বাক্ষর
রেজিস্ট্রি বণ্টননামার পরেই নিরাপদ বিক্রি

বাবার জীবদ্দশায় পরিকল্পনা: অসিয়ত ও হেবা

উপরের অংশগুলো ডিফল্ট নিয়ম। মুসলিম বাবা এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অসিয়ত করতে পারেন এবং জীবদ্দশায় রেজিস্ট্রি করা হেবা দলিলে সন্তানদের সম্পত্তি দিতে পারেন।[4] শুধু মেয়ে আছে এমন পরিবারে এটিই মেয়েদের পূর্ণ নিরাপত্তার প্রধান উপায়। সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর বাবা-মায়ের ভোগদখলের অধিকার রাখার জন্য ২০২৬ সালে সরকার যে আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছে, তা নিয়ে পড়ুন আমাদের প্রস্তাবিত জীবনস্বত্ব-হেবা আইন বিশ্লেষণ। পরিকল্পনায় সহায়তার জন্য দেখুন আমাদের উত্তরাধিকার ও উত্তরসূরি পরিকল্পনা প্র্যাকটিস।

ধাপে ধাপে বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম: মৃত্যু থেকে বিক্রয়যোগ্য মালিকানা

যেকোনো ধর্মের পরিবারেই কাগজের ক্রম প্রায় একই। ক্রম ভাঙলেই পরে মামলা হয়।

ধাপ 01

মৃত্যু নিবন্ধন ও দায়ের তালিকা

মৃত্যু সনদ নিন; ঋণ, বকেয়া কর, দেনমোহর ও অসিয়তের তালিকা করুন।

ধাপ 02

সম্পূর্ণ ওয়ারিশ তালিকা

স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, বাবা-মা ও এতিম নাতি-নাতনিসহ সবাইকে তালিকায় রাখুন।

ধাপ 03

ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ

ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে সনদ নিন; বিরোধ থাকলে আদালতে যান।

ধাপ 04

অংশের লিখিত হিসাব

ফারায়েজ বা প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইনে অংশ হিসাব করে সব ওয়ারিশের স্বাক্ষর রাখুন।

ধাপ 05

সাকসেশন সার্টিফিকেট

নমিনি ছাড়া ব্যাংকের টাকা, শেয়ার বা সঞ্চয়পত্রের জন্য যুগ্ম জেলা জজ আদালতে আবেদন করুন।

ধাপ 06

বণ্টননামা রেজিস্ট্রি

কে কোন দাগ পাবেন তা চৌহদ্দিসহ লিখে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করুন।

ধাপ 07

নামজারি ও কর

যৌথ বা আলাদা নামজারি করে ভূমি উন্নয়ন কর হালনাগাদ করুন।

ধাপ 08

বিক্রির আগে যাচাই

শরিকদের সম্মতি বা অনাপত্তি নিন, অগ্রক্রয়ের ঝুঁকি দেখুন, তারপর দলিল রেজিস্ট্রি করুন।

যে ভুলগুলো বাবার সম্পত্তি ভাগে বিরোধ বাড়ায়

  • ওয়ারিশ বাদ দেওয়া: মেয়ে, দ্বিতীয় স্ত্রী বা এতিম নাতি-নাতনি বাদ পড়লে ওয়ারিশ সনদ, আদালতের সনদ ও নামজারি সবই চ্যালেঞ্জযোগ্য।[3] [13]
  • অনিবন্ধিত বণ্টননামা: রেজিস্ট্রি ছাড়া বণ্টননামা দিয়ে আলাদা খতিয়ান হয় না।[5]
  • ব্যাংকে ওয়ারিশ সনদ নিয়ে যাওয়া: নমিনি না থাকলে ব্যাংক সাধারণত আদালতের উত্তরাধিকার সনদ চায়।[4]
  • নামজারির আগে বিক্রি: হালনাগাদ খতিয়ান ছাড়া দলিল রেজিস্ট্রি হয় না।[7]
  • শরিকদের না জানিয়ে বাইরের ক্রেতার কাছে বিক্রি: অগ্রক্রয় মামলায় ক্রেতা জমি হারাতে পারেন।[8]
  • ঋণ উপেক্ষা: মৃতের ঋণ ওয়ারিশদের ভাগের আগে পরিশোধ করতে হয়।[4]
  • মধ্যস্থতা এড়িয়ে সরাসরি মামলা: নির্ধারিত জেলায় আগে লিগ্যাল এইড অফিসে যেতে হয়।[9] [10]

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম অনুযায়ী মেয়ে কত পাবে?

ছেলে থাকলে প্রত্যেক মেয়ে প্রত্যেক ছেলের অর্ধেক পান। ছেলে না থাকলে এক মেয়ে পান ১/২, আর দুই বা ততোধিক মেয়ে মিলে ২/৩।[1] [2]

স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রী কত অংশ পান?

সন্তান থাকলে ১/৮, না থাকলে ১/৪। একাধিক স্ত্রী থাকলে এই অংশ তারা সমানভাবে ভাগ করেন।[1]

ছেলের মৃত্যুর পর তার বাবা-মা কত পান?

মৃতের সন্তান থাকলে বাবা ও মা প্রত্যেকে ১/৬। সন্তান না থাকলে মা ১/৩ পান, তবে মৃতের দুই বা ততোধিক ভাই-বোন থাকলে ১/৬।[1]

দাদার আগে বাবা মারা গেলে নাতি-নাতনি কি সম্পত্তি পায়?

হ্যাঁ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারায় তারা তাদের বাবা বা মা জীবিত থাকলে যে অংশ পেতেন, সেটিই পায়।[3]

শুধু মেয়ে থাকলে কি চাচারা সম্পত্তি পান?

মৃতের বাবা জীবিত না থাকলে মেয়েদের ও স্ত্রীর অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্টাংশ অবশিষ্টভোগী হিসেবে মৃতের ভাই-বোনেরা পেতে পারেন। বাবা জীবিত থাকলে অবশিষ্টাংশ তিনিই পান।[1]

ওয়ারিশ সনদ ও সাকসেশন সার্টিফিকেটের পার্থক্য কী?

ওয়ারিশ সনদ স্থানীয় সরকারের দেওয়া ওয়ারিশ তালিকা, মূলত নামজারির জন্য। সাকসেশন সার্টিফিকেট যুগ্ম জেলা জজ আদালতের সনদ, যা ব্যাংকের টাকা, শেয়ার ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের ক্ষমতা দেয়।[4] [6]

সাকসেশন সার্টিফিকেটের কোর্ট ফি কত?

মোট পাওনা ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ফি নেই; ২০ হাজারের বেশি থেকে ১ লাখ পর্যন্ত ১ শতাংশ; ১ লাখের বেশি হলে ২ শতাংশ।[11]

বণ্টননামা কি রেজিস্ট্রি করতেই হবে?

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি আপসে ভাগ করলে ১৪৩খ ধারায় বণ্টননামা রেজিস্ট্রি করতে হয়; আলাদা নামজারির জন্যও এটি লাগে। শুধু যৌথ নামজারির জন্য ওয়ারিশ সনদই যথেষ্ট।[5] [6]

একজন ওয়ারিশ কি অন্যদের সম্মতি ছাড়া জমি বিক্রি করতে পারেন?

নিজের অবিভক্ত অংশ বিক্রি করতে পারেন, তবে বণ্টন ছাড়া নির্দিষ্ট জমি নয়। বাইরের ক্রেতার কাছে কৃষিজমির অংশ বিক্রি হলে উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক দুই মাসের মধ্যে অগ্রক্রয়ের আবেদন করতে পারেন।[8]

বাঁটোয়ারা মামলার আগে কি মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক?

নির্ধারিত জেলাগুলোতে হ্যাঁ। সম্পত্তি বণ্টন ও অগ্রক্রয় বিরোধ আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতায় যায়; সফল আপস আদালতের আদেশের মতো কার্যকর।[9] [10]

সূত্র তালিকা

প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র

উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।

  1. প্রথম আলো, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ — মুসলিম উত্তরাধিকারেরা কে কতটুকু সম্পত্তি পান? (তানজিম আল ইসলাম, আইনজীবী)
  2. প্রথম আলো, জুলাই ২০২৬ — উত্তরাধিকার সম্পদ: ইসলাম যেভাবে নারীর ন্যায্যতা নিশ্চিত করে (সূরা নিসা ১১, ১২, ১৭৬)
  3. The Daily Star, Law Desk queries, November 2003 — text of section 4, Muslim Family Laws Ordinance 1961
  4. The Daily Star, 28 July 2020 — The legal rights of Muslim heirs
  5. The Daily Star, 3 September 2009 — Partition among heirs under section 143B, State Acquisition and Tenancy Act 1950
  6. Dhaka Tribune / BSS, 17 February 2025 — Govt clarifies mutation issue for inherited land
  7. UNB, 12 September 2023 — Land Crime Prevention and Remedy Bill 2023 passed in JS
  8. হাইকোর্ট বিভাগ — Mohammad Nurul Alam Chowdhury v Sree Shibu Prashad Dutta, Civil Revision No 4517 of 2023 (১৬ জুলাই ২০২৫), অগ্রক্রয় ও ৯৬ ধারা
  9. Dhaka Tribune, 17 September 2025 — Pre-litigation mediation to begin in 12 districts
  10. টিবিএস বাংলা, ২১ জুলাই ২০২৬ — আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন ২০২৬-এর ২১খ ধারায় আরও ১০ জেলায় বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা
  11. Law Help BD, 25 July 2026 — How to obtain a Succession Certificate (court fee under Court-fees Act 1870, Schedule I, Article 11)
  12. হাইকোর্ট বিভাগ — Laila Shahed v Bangladesh, Writ Petition No 13635 of 2024 (৩ আগস্ট ২০২৬), ওয়ারিশ সনদ
  13. হাইকোর্ট বিভাগ — Md Munir Hossain v Hamida Begum, First Miscellaneous Appeal No 279 of 2012 (১০ জুন ২০২৪), সাকসেশন সার্টিফিকেট বাতিল (৩৮৩ ধারা)
  14. Banglapedia — Hindu Law (Dayabhaga succession in Bangladesh)
  15. Banglapedia — Christian Law (intestate succession under the Succession Act 1925)

TRW-এর সহায়তা

তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে

TRW ফারায়েজ অনুযায়ী অংশের হিসাব, ওয়ারিশ সনদ ও সাকসেশন সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রি বণ্টননামা, নামজারি, বাঁটোয়ারা ও অগ্রক্রয় মামলা এবং ওয়ারিশ সম্পত্তি বিক্রিতে পরিবার ও ক্রেতাদের সহায়তা করে। দেখুন আমাদের উত্তরাধিকার ও উত্তরসূরি পরিকল্পনা প্র্যাকটিস ও ইসলামি পারিবারিক আইন প্র্যাকটিস, অথবা আপনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

Message TRW on WhatsApp