জমি রেজিস্ট্রেশন ২০২৬: খরচ, কাগজপত্র, ধাপ ও জমি-ফ্ল্যাটের মালিকানা যাচাই

by Barrister Tahmidur Rahman | Oct 21, 2026 | Insights, Property & Real Estate | 0 comments

TRW Insight / বাংলাদেশ

জমি বা ফ্ল্যাটের মালিকানা আসে কেবল রেজিস্ট্রি করা দলিলে, কিন্তু রেজিস্ট্রি অফিস স্বত্ব যাচাই করে না। কেনার আগে খতিয়ান, দলিল, নামজারি ও ডেভেলপারের কাগজ মেলানো এবং খরচের সঠিক হিসাবই ক্রেতার আসল সুরক্ষা।

হালনাগাদ ২১ অক্টোবর ২০২৬আইনি বিশ্লেষণবাংলাদেশ21 মিনিটে পড়া

জমি রেজিস্ট্রেশন: ২০২৬ সালে দলিল, খরচ ও মালিকানা যাচাইয়ের পূর্ণ চিত্র

বাংলাদেশে জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার আইনি মুহূর্ত একটিই: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের জমি রেজিস্ট্রেশন। টাকা দেওয়া, দখল নেওয়া বা স্ট্যাম্পে চুক্তি সই করা মালিকানা দেয় না; রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ অনুযায়ী যে দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক, রেজিস্ট্রি না হলে তা স্থাবর সম্পত্তিতে কোনো স্বত্ব সৃষ্টি বা হস্তান্তর করে না।[1] আবার রেজিস্ট্রি হলেই নিরাপদ, তা-ও নয়। বিক্রেতার নাম হালনাগাদ খতিয়ানে না থাকলে সেই বিক্রি আইনত বাতিল, আর জাল বা প্রতারণামূলক দলিল এখন সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ।[3] [4]

এই লেখায় একসঙ্গে পাবেন: কেনার আগে জমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা কীভাবে যাচাই করবেন (খতিয়ান, পর্চা, দলিলের ধারাবাহিকতা, নামজারি ও ডিসিআর, দায়মুক্ততা, রাজউক ও ডেভেলপারের কাগজ), রেজিস্ট্রির জন্য কী কী কাগজপত্র লাগে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ধাপে ধাপে কী হয়, ২০২৬ সালে রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক, স্থানীয় সরকার কর ও উৎসে কর কত, রেজিস্ট্রির পরে নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর, এবং ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর আলোকে বাজারে প্রচলিত প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায়।

জমি রেজিস্ট্রেশন — সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল ও কাগজপত্র পর্যালোচনা
জমি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া মালিকানার কোনো আইনি পথ নেই

সারসংক্ষেপ: বিক্রয় দলিল লেখার পর তিন মাসের মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে উপস্থাপন করতে হয়, আর বায়না দলিল ৬০ দিনের মধ্যে। দলিলের সঙ্গে বিক্রেতার নামে হালনাগাদ খতিয়ান, সম্পত্তির প্রকৃতি ও মূল্য, নকশা, ২৫ বছরের মালিকানার বিবরণ এবং হলফনামা থাকা বাধ্যতামূলক। খরচের মধ্যে আছে ১% রেজিস্ট্রেশন ফি, ১.৫% স্ট্যাম্প শুল্ক, ২–৩% স্থানীয় সরকার কর এবং এলাকাভেদে উৎসে কর; নতুন ফ্ল্যাটে ভ্যাটও। রেজিস্ট্রির পরে আলাদাভাবে ই-নামজারি করতে হয়, সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা।

মূল বিষয়: রেজিস্ট্রি অফিস মালিকানা যাচাই করে দেয় না। সাব-রেজিস্ট্রার দেখেন কাগজ ঠিক আছে কি না এবং পক্ষরা নিজেরা এসে সম্পাদন স্বীকার করছেন কি না। বিক্রেতার স্বত্ব আছে কি না, জমি বন্ধক বা মামলায় জড়ানো কি না, ফ্ল্যাটটি আদৌ ডেভেলপারের ভাগে পড়েছে কি না, এসব যাচাইয়ের দায় ক্রেতার নিজের।

এক নজরে

০১

রেজিস্ট্রি ছাড়া মালিকানা নেই

বাধ্যতামূলক নিবন্ধনযোগ্য দলিল রেজিস্ট্রি না হলে স্থাবর সম্পত্তিতে কোনো স্বত্ব হস্তান্তর করে না।

০২

খতিয়ানে নাম আগে

বিক্রেতা বা ওয়ারিশের পূর্বসূরির নাম সর্বশেষ খতিয়ানে না থাকলে বিক্রি বাতিল।

০৩

তিন মাস ও ৬০ দিন

বিক্রয় দলিল সম্পাদনের তিন মাসের মধ্যে, বায়না দলিল ৬০ দিনের মধ্যে উপস্থাপন।

০৪

খরচের চার স্তর

রেজিস্ট্রেশন ফি ১%, স্ট্যাম্প ১.৫%, স্থানীয় সরকার কর ২–৩%, আর মৌজাভেদে উৎসে কর।

০৫

জাল দলিলে সাত বছর

ভূমি প্রতারণা ও জালিয়াতি জামিন-অযোগ্য অপরাধ; সাজা সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।

সূচিপত্র

জমি রেজিস্ট্রেশনের আইনি ভিত্তি: কোন আইন কী বলে

জমি কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করে মূলত তিনটি আইন। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ ঠিক করে কে, কীভাবে সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন। রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ ঠিক করে দলিল কোথায়, কত দিনের মধ্যে, কী কাগজসহ রেজিস্ট্রি হবে। আর ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ প্রতারণা, জালিয়াতি ও অবৈধ দখলকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ করেছে।[1] [4] ফ্ল্যাট কেনায় এর সঙ্গে যোগ হয় রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০।[12]

রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ ও ২০২৬ সালের সংশোধনী

রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১৭ স্থাবর সম্পত্তিতে স্বত্ব সৃষ্টি বা হস্তান্তরকারী দলিলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে, আর ধারা ৪৯ বলছে এমন দলিল রেজিস্ট্রি না হলে সম্পত্তিতে কোনো অধিকার তৈরি করে না।[1] ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জারি করা নিবন্ধন (সংশোধন) অধ্যাদেশ বেশ কিছু বদল এনেছে: বায়না দলিল উপস্থাপনের সময় ৩০ দিন থেকে বেড়ে ৬০ দিন, বিদেশে সম্পাদিত দলিল দেশে আসার পর উপস্থাপনের সময় চার মাস থেকে ছয় মাস, এবং হেবা ও বিভিন্ন ধর্মের ব্যক্তিগত আইনের দানপত্রেও ধারা ৫২ক-এর শর্ত প্রযোজ্য।[2]

একই সংশোধনীতে কর্মকর্তার জবাবদিহিও কড়া হয়েছে। প্রাপ্য ফি, কর বা শুল্ক আদায় না করে দলিল রেজিস্ট্রি করলে তা কর্মকর্তার অসদাচরণ, আর ঘাটতি তাঁর কাছ থেকেই আদায় হবে; সরল বিশ্বাসে ভুল হলে আদায় হবে পক্ষদের কাছ থেকে। নতুন ধারা ৮০ অনুযায়ী সব ফি, কর ও শুল্ক দলিল উপস্থাপনের সময়ই পরিশোধ করতে হয়।[1] [2] তাই জমি রেজিস্ট্রেশনের দিনে "পরে দিয়ে দেব" বলার সুযোগ আর নেই।

খতিয়ানে নাম না থাকলে বিক্রি বাতিল

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ধারা ৫৩গ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন না, যদি না রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর অধীনে প্রস্তুত সর্বশেষ খতিয়ানে তাঁর নাম থাকে; উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হলে তাঁর বা তাঁর পূর্বসূরির নাম থাকলেই চলবে। এর বাইরে করা বিক্রি বাতিল।[3] ভূমি অপরাধ আইনের ধারা ৬-ও হালনাগাদ খতিয়ান ছাড়া জমি বিক্রি, দান বা রেজিস্ট্রি নিষেধ করেছে।[4] সহজ কথায়, যিনি কয়েক বছর আগে জমি কিনে নামজারি করেননি, তিনি আগে নিজের নামে নামজারি না করে আপনার কাছে বৈধভাবে বিক্রি করতে পারবেন না।

জমি রেজিস্ট্রেশনের আগে মালিকানা যাচাই

যাচাইয়ের মূল প্রশ্ন একটাই: এই বিক্রেতা কি ঠিক এই জমিটির পুরো স্বত্ব আপনাকে দিতে পারেন? উত্তর পেতে চারটি স্তরে কাগজ মেলাতে হয়: রেকর্ড, দলিল, নামজারি ও কর, এবং দায়মুক্ততা। প্রতিটি স্তরে মূল কাগজের পাশাপাশি সরকারি অফিস থেকে নেওয়া সার্টিফায়েড কপি মিলিয়ে দেখুন; বিক্রেতার দেওয়া ফটোকপির ওপর ভরসা করবেন না।

খতিয়ান ও পর্চা: সিএস থেকে বিএস ও সিটি জরিপ

খতিয়ান হলো স্বত্বের রেকর্ড, আর পর্চা তার অনুলিপি। এলাকাভেদে সিএস, এসএ, আরএস এবং বিএস বা ঢাকা সিটি জরিপের খতিয়ান থাকতে পারে। প্রতিটি জরিপে দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও মালিকের নাম মিলিয়ে দেখুন। আগের জরিপে যাঁর নাম, তাঁর কাছ থেকে বর্তমান বিক্রেতা পর্যন্ত স্বত্ব কীভাবে এল, সেই সূত্র না মিললে সেখানেই থামুন। খতিয়ানে ভুল থাকলে তা সংশোধনের আলাদা আইনি পথ আছে, যা আমাদের খতিয়ান সংশোধন বিষয়ক বিশ্লেষণে বিস্তারিত আছে।

দলিলের ধারাবাহিকতা ও ২৫ বছরের মালিকানার বিবরণ

রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৫২ক অনুযায়ী বিক্রয় দলিলের সঙ্গে সম্পত্তির গত ২৫ বছরের মালিকানার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে হয়।[1] এটিকে আনুষ্ঠানিকতা ভাববেন না; এটিই আপনার যাচাইয়ের নকশা। প্রতিটি আগের দলিলের নম্বর ও সাল ধরে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সার্টিফায়েড কপি তুলে মিলিয়ে দেখুন। উত্তরাধিকারের জমিতে সব ওয়ারিশ ও তাঁদের অংশ নিশ্চিত করুন; কয়েকজন ওয়ারিশ সই করলে কেবল তাঁদের অংশই হস্তান্তর হয়।

নামজারি, ডিসিআর ও ভূমি উন্নয়ন কর

বিক্রেতার নামে নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ) চেয়ে নিন। এখন ই-নামজারির পর কিউআর কোডযুক্ত অনলাইন ডিসিআর ইস্যু হয়, যা ভূমি মন্ত্রণালয় হাতে লেখা ডিসিআরের সমান বৈধ বলে গণ্য করে।[10] সঙ্গে সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা দেখুন। কর প্রতি বছর ৩০ জুনের মধ্যে জরিমানা ছাড়া দেওয়া যায়; তিন বছর টানা বকেয়া থাকলে বছরে ৬.২৫ শতাংশ হারে সারচার্জ যুক্ত হয় এবং সার্টিফিকেট মামলায় আদায়যোগ্য হয়।[11] বকেয়া কর কে দেবেন, তা দলিলে লিখে নিন।

দায়মুক্ততা: বন্ধক, মামলা, বায়না ও সরকারি জমি

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশি দিয়ে দেখুন জমিটি আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি, বন্ধক বা বায়না করা হয়েছে কি না। আগের কোনো নিবন্ধিত বায়না বহাল থাকলে সেই জমি কেনা মানে নিশ্চিত বিরোধ কেনা, আর ব্যাংকে বন্ধক থাকা জমি বন্ধকগ্রহীতার লিখিত সম্মতি ও দায়মুক্তি ছাড়া কিনবেন না। দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব বা বণ্টনের মামলা চলছে কি না, জমিটি খাস, অর্পিত বা অধিগ্রহণের তালিকায় আছে কি না, তা-ও যাচাই করুন। সরেজমিনে গিয়ে প্রকৃত দখল, সীমানা ও প্রতিবেশীদের বক্তব্য দেখুন; কাগজ আর মাঠের অবস্থা না মিললে সেটিই সবচেয়ে বড় সতর্কসংকেত। বিস্তারিত চেকলিস্ট আছে আমাদের ভূমি মালিকানা যাচাই বিষয়ক ইংরেজি বিশ্লেষণে।

জমি রেজিস্ট্রেশন — খতিয়ান, নকশা ও মাঠে জমির সীমানা যাচাই
কাগজ আর মাঠের দখল না মিললে সেখানেই থামুন

ফ্ল্যাট মালিকানা যাচাই: ডেভেলপার, রাজউক ও চুক্তি

ডেভেলপারের ফ্ল্যাটে ঝুঁকি দুই স্তরের: নিচের জমির স্বত্ব এবং ওপরের ফ্ল্যাটটি বিক্রির অধিকার। জমির যাচাই আগের অংশের মতোই; বাড়তি কাজ হলো ডেভেলপার, অনুমোদন ও জমির মালিক-ডেভেলপার চুক্তি পরীক্ষা করা।

ডেভেলপারের নিবন্ধন ও প্রকল্প অনুমোদন

রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০-এর ধারা ৫ অনুযায়ী নিবন্ধন ছাড়া কেউ রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করতে পারেন না; নিবন্ধন পাঁচ বছরের জন্য বৈধ ও নবায়নযোগ্য। ধারা ৬ বলছে, প্রকল্প অনুমোদনের আগে ডেভেলপার কোনো ফ্ল্যাট বিজ্ঞাপন, বিক্রি বা বিক্রয় চুক্তি করতে পারবেন না, এবং ক্রেতাকে অনুমোদনপত্র ও জমির মালিকানার কাগজ দেখাতে বাধ্য।[12] নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা বা অননুমোদিত প্রকল্প বিক্রির শাস্তি দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয়।[12] রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রকল্পের অনুমোদন মিলিয়ে নিন এবং ভবনটি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী উঠছে কি না দেখুন।

জমির মালিক-ডেভেলপার চুক্তি ও আমমোক্তারনামা

ধারা ১০ অনুযায়ী জমির মালিক ও ডেভেলপারের মধ্যে লিখিত যৌথ উদ্যোগ চুক্তি থাকতে হবে, যাতে ডেভেলপারের অংশ, আমমোক্তারনামার শর্ত এবং কাজ শুরু ও শেষের সময় লেখা থাকে।[12] চুক্তির বণ্টন তালিকা দেখে নিশ্চিত হোন যে আপনার ফ্ল্যাটটি ডেভেলপারের ভাগে পড়েছে; জমির মালিকের ভাগের ফ্ল্যাট ডেভেলপার বিক্রি করতে পারেন না। আমমোক্তারনামা নিবন্ধিত কি না, সব সহ-মালিক ও ওয়ারিশ তাতে সই করেছেন কি না এবং তা প্রত্যাহার হয়েছে কি না, যাচাই করুন। আমমোক্তারনামা না থাকলে ডেভেলপারের লিখিত অনুরোধের ১৫ দিনের মধ্যে জমির মালিককে ক্রেতার দলিল সম্পাদন করতে হয়।[12] এ বিষয়ে বিরোধ হলে আমাদের ডেভেলপার-জমির মালিক বিরোধ বিষয়ক বিশ্লেষণ দেখুন।

বন্ধক, নকশা ও হস্তান্তরের সময়সীমা

ধারা ১৬ অনুযায়ী ডেভেলপার বন্ধকি ফ্ল্যাট ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে পারেন না এবং হস্তান্তর দলিল সম্পাদনের আগেই বন্ধক মুক্ত করতে হয়। ধারা ১৮ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া অনুমোদিত নকশা বদলানো যায় না, আর ক্রেতা স্থাপত্য, কাঠামোগত ও সার্ভিস নকশার কপি পাওয়ার অধিকারী।[12] পুরো দাম পরিশোধের তিন মাসের মধ্যে দখল হস্তান্তর এবং দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি শেষ করতে হয়; নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট না দিলে চুক্তির ক্ষতিপূরণসহ, আর চুক্তিতে হার না থাকলে পরিশোধিত অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণসহ ছয় মাসের মধ্যে সব টাকা ফেরত দিতে হয়।[12] বিস্তারিত আছে আমাদের ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনা বিষয়ক ইংরেজি বিশ্লেষণে।

পুরোনো ফ্ল্যাট ও সরকারি লিজের প্লট

পুনর্বিক্রির ফ্ল্যাটে বিক্রেতার মূল বিক্রয় দলিল, তাঁর নামে জমির আনুপাতিক অংশের নামজারি, ফ্ল্যাট মালিক সমিতির বকেয়া এবং ইউটিলিটি বিল দেখুন। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থার বরাদ্দ করা তালিকাভুক্ত আবাসিক প্লট ও ফ্ল্যাট ১০ নভেম্বর ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এখন আগাম অনুমতি ছাড়াই হস্তান্তর করা যায়; ফ্ল্যাট বা ভবনসহ জমিতে দলিলমূল্যের ২ শতাংশ ফি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুকূলে জমা দিতে হয়। তবে বরাদ্দের শর্ত বা ব্যবহারের শ্রেণি বদলাতে আগাম অনুমতি এখনো লাগে।[13]

জমি রেজিস্ট্রি করতে কী কী কাগজপত্র লাগে

রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৫২ক অনুযায়ী বিক্রয় দলিলে নিচের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ও সংযুক্ত না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল রেজিস্ট্রি করবেন না:[1]

  • বিক্রেতার নামে সর্বশেষ খতিয়ান; উত্তরাধিকারের জমিতে বিক্রেতা বা তাঁর পূর্বসূরির নামে খতিয়ান;
  • সম্পত্তির প্রকৃতি ও মূল্য;
  • চৌহদ্দিসহ সম্পত্তির নকশা;
  • গত ২৫ বছরের মালিকানার সংক্ষিপ্ত বিবরণ;
  • দলিলদাতার হলফনামা যে সম্পত্তি আগে হস্তান্তর হয়নি এবং তাঁর বৈধ স্বত্ব আছে।

এর বাইরে বাস্তবে লাগে উভয় পক্ষের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি, ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে হলফনামা, হস্তান্তর নোটিশের আবেদনে ১০ টাকার কোর্ট ফি, এবং ফি ও করের পে-অর্ডার ও চালানের কপি। সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণও দিতে হয়।[6] দলিলটি সরকার নির্ধারিত ফরম্যাটে লিখতে হয় এবং ক্রেতা-বিক্রেতা দুজনের ছবি সেঁটে তার ওপর সই ও বাঁ হাতের টিপসই দিতে হয়।[1]

ধাপে ধাপে জমি রেজিস্ট্রেশন: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কী হয়

যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এলাকায় জমি অবস্থিত, সেখানেই দলিল রেজিস্ট্রি হয়। নিচের ধাপগুলো একটি সুশৃঙ্খল ক্রয়ের স্বাভাবিক ক্রম; আমাদের সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বিষয়ক ইংরেজি বিশ্লেষণেও একই ক্রম বিস্তারিত আছে।

ধাপ 01

মালিকানা যাচাই

খতিয়ানের সূত্র, আগের দলিলের সার্টিফায়েড কপি, নামজারি, ডিসিআর, কর ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশি।

ধাপ 02

বায়না দলিল

সঙ্গে সঙ্গে সাফ কবলা না হলে লিখিত বায়না, সম্পাদনের ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি।

ধাপ 03

খরচের হিসাব

মৌজামূল্য, উৎসে কর, ভ্যাট ও স্থানীয় কর নির্ধারণ; কে কোনটি দেবেন তা লিখিত করা।

ধাপ 04

পে-অর্ডার ও চালান

ফি ও শুল্কের পে-অর্ডার, উৎসে কর ও ভ্যাটের এ-চালান; শহর এলাকায় রিটার্নের প্রমাণ।

ধাপ 05

দলিল প্রস্তুত

সরকারি ফরম্যাটে দলিল, ধারা ৫২ক-এর সংযুক্তি, দুই পক্ষের ছবি ও হলফনামা।

ধাপ 06

সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে

পক্ষদের হাজিরা, পরিচয় যাচাই, সম্পাদন স্বীকার, সই ও টিপসই।

ধাপ 07

মূল দলিল সংগ্রহ

রসিদ সংরক্ষণ; পরে মূল রেজিস্ট্রি দলিল ও সার্টিফায়েড কপি তুলুন।

ধাপ 08

ই-নামজারি

অনলাইনে আবেদন, মোট ১,১৭০ টাকা সরকারি ফি; নতুন খতিয়ান ও ডিসিআর মিলিয়ে দেখুন।

বায়না দলিল: ৬০ দিনের সময়সীমা

সঙ্গে সঙ্গে সাফ কবলা সম্ভব না হলে প্রথমে বায়না দলিল হয়। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন অনুযায়ী বিক্রয় চুক্তি লিখিত ও নিবন্ধিত হতে হয়, আর রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১৭ক(২) অনুযায়ী সম্পাদনের ৬০ দিনের মধ্যে তা রেজিস্ট্রির জন্য উপস্থাপন করতে হয়।[1] বায়নার রেজিস্ট্রেশন ফি সম্পত্তির মূল্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট: পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫০০ টাকা, ৫০ লাখ পর্যন্ত ১,০০০ টাকা, তার বেশি হলে ২,০০০ টাকা।[1] অগ্রিম, সাফ কবলার তারিখ ও খেলাপের পরিণতি নিয়ে আমাদের বায়না দলিল বিশ্লেষণ দেখুন।

উপস্থিতি, শনাক্তকরণ ও সম্পাদন স্বীকার

ধারা ৩৪ অনুযায়ী দলিলদাতা বা তাঁর বৈধ প্রতিনিধিকে সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে হাজির হতে হয়; কর্মকর্তা জিজ্ঞাসা করেন দলিলটি তিনি সম্পাদন করেছেন কি না এবং তাঁর পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হন।[1] বিক্রেতা নিজে দাম পাওয়ার কথা স্বীকার করলে তা দলিলে পৃষ্ঠাঙ্কিত হয়। তাই দাম ব্যাংকের মাধ্যমে দিন এবং দলিলে পে-অর্ডার বা চেকের নম্বর লিখিয়ে নিন।

দেরিতে উপস্থাপন ও রেজিস্ট্রি প্রত্যাখ্যান

উইল ছাড়া যেকোনো দলিল সম্পাদনের তিন মাসের মধ্যে উপস্থাপন করতে হয়। জরুরি প্রয়োজন বা অনিবার্য দুর্ঘটনায় দেরি হলে আরও চার মাস পর্যন্ত রেজিস্ট্রার যথাযথ ফির সর্বোচ্চ দশ গুণ জরিমানা নিয়ে গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারেন।[1] সাব-রেজিস্ট্রার রেজিস্ট্রি প্রত্যাখ্যান করলে ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রারের কাছে আপিল করা যায়, যা ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে; সম্পাদন অস্বীকারের কারণে প্রত্যাখ্যান হলে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন, নিষ্পত্তিও ৩০ দিনে।[1]

প্রবাসী বিক্রেতা ও আমমোক্তারনামা

বিদেশে থাকা মালিক নিবন্ধিত আমমোক্তারনামার মাধ্যমে প্রতিনিধি দিয়ে দলিল সম্পাদন করাতে পারেন, অথবা বিদেশে দলিল সই করে পাঠাতে পারেন, যা ২০২৬ সালের সংশোধনীর পর দেশে আসার ছয় মাসের মধ্যে উপস্থাপন করা যায়।[2] প্রতিনিধির কাছ থেকে কিনলে আমমোক্তারনামায় বিক্রি ও দাম গ্রহণের ক্ষমতা স্পষ্ট আছে কি না এবং তা বাতিল হয়নি কি না দেখুন; বিস্তারিত আছে আমাদের আমমোক্তারনামা বিশ্লেষণে।

জমি রেজিস্ট্রেশন — ঢাকায় নির্মাণাধীন আবাসিক ভবন ও ফ্ল্যাট
ফ্ল্যাটে জমির স্বত্ব ও ডেভেলপারের বিক্রির অধিকার দুটোই যাচাই করতে হয়

জমি রেজিস্ট্রেশন খরচ ২০২৬: ফি, স্ট্যাম্প ও কর

খরচ একটি নয়, কয়েকটি আলাদা চার্জের যোগফল, যার প্রতিটি আলাদা আইনে নির্ধারিত এবং আলাদা পথে পরিশোধযোগ্য। সাধারণ বিক্রয় দলিলে চারটি প্রধান চার্জ নিচের সারণিতে দেওয়া হলো; সংখ্যাগুলো দলিলে লেখা মূল্যের ওপর হিসাব হয়।[6]

সাধারণ বিক্রয় দলিলের প্রধান খরচ, ২০২৬
চার্জআইনি ভিত্তিহারপরিশোধের পথ
রেজিস্ট্রেশন ফিরেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮দলিলমূল্যের ১%২৪,০০০ টাকার বেশি হলে পে-অর্ডার
স্ট্যাম্প শুল্কস্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯, তফসিল ১১.৫%১,২০০ টাকা পর্যন্ত স্ট্যাম্প, বাকি পে-অর্ডার
স্থানীয় সরকার করস্থানীয় কর্তৃপক্ষের হস্তান্তর করসিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্টে ২%, অন্যত্র ৩%আলাদা পে-অর্ডার
উৎসে করআয়কর আইন ২০২৩, ধারা ১২৫মৌজা ও জমির শ্রেণিভেদে; ন্যূনতম অঙ্কসহএ-চালান
ভ্যাট (ডেভেলপারের ফ্ল্যাট ও প্লট)মূসক উৎসে কর্তন বিধিফ্ল্যাটে ২% বা ৪.৫%, প্লটে ২%এ-চালান

রেজিস্ট্রেশন ফি ২৪ হাজার টাকার বেশি হলে সোনালী ব্যাংকের পে-অর্ডারে দিতে হয়। স্ট্যাম্প শুল্কের সর্বোচ্চ ১,২০০ টাকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে দেওয়া যায়, বাকিটা পে-অর্ডারে। স্থানীয় সরকার কর আলাদা পে-অর্ডারে দেওয়া হয়।[6] পৌরসভার জমিতে হারটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আগে নিশ্চিত করে নিন।

উৎসে কর বা "গেইন ট্যাক্স"

আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১২৫ অনুযায়ী বিক্রেতা নির্ধারিত হারে কর না দিলে রেজিস্ট্রিকারী কর্মকর্তা দলিল রেজিস্ট্রি করবেন না। আইন সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিয়েছে: জমিতে কাঠাপ্রতি ২০ লাখ টাকা, ভবন বা ফ্ল্যাটে বর্গফুটপ্রতি এক হাজার টাকা, অথবা দলিলমূল্যের ১০ শতাংশ, যেটি বেশি।[5] প্রকৃত হার এর অনেক নিচে এবং মৌজা ও জমির শ্রেণিভেদে ভিন্ন। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে হার কমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৮ থেকে ৫ শতাংশ, অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনে ৬ থেকে ৩ শতাংশ এবং পৌরসভায় ৪ থেকে ২ শতাংশ হয়।[7] বর্তমানে হার নির্ধারিত হয় উৎসে কর বিধিমালা ২০২৬ অনুযায়ী, যার সর্বশেষ গেজেট ৫ জুলাই ২০২৬; কর এ-চালানে জমা দিতে হয়।[6]

দুটি বিষয় মনে রাখুন। প্রথমত, শতাংশ হারের পাশাপাশি অনেক এলাকায় শতক বা কাঠাপ্রতি ন্যূনতম অঙ্ক আছে, যেটি বেশি সেটিই দিতে হয়; তাই কম দলিলমূল্য দেখালেও প্রাইম এলাকায় কর তেমন কমে না। দ্বিতীয়ত, জমির ওপর ভবন বা ফ্ল্যাট থাকলে কাঠামোর জন্য আলাদা কর ধরা হয়। আইনে কর বিক্রেতার, কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই ক্রেতা বহন করেন; কে কোনটি দেবেন, বায়নায় লিখে নিন।

নতুন ফ্ল্যাটে ভ্যাট ও ডেভেলপারের কর

ডেভেলপার বা সহ-ডেভেলপার বিক্রেতা হলে ধারা ১২৫-এর পাশাপাশি ধারা ১২৬-এর কর এবং ভ্যাট দিতে হয়। প্রথম রেজিস্ট্রিতে ১,৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটে ভ্যাট দলিলমূল্যের ২ শতাংশ, তার বেশি হলে ৪.৫ শতাংশ; প্লট বা জমিতে ২ শতাংশ; আর যেকোনো আকারের ফ্ল্যাট পুনঃরেজিস্ট্রিতে ২ শতাংশ।[6] প্রথম আলোর হিসাবে ২০২৫ সালের বাজেটের পর ঢাকা মহানগরে জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির মোট খরচ মূল্যের প্রায় ১২.৫ শতাংশ।[7]

ছোট ফি ও পরিশোধের পদ্ধতি

প্রতিটি দলিলে ১০০ টাকা ই-ফি, প্রতি ৩০০ শব্দের পৃষ্ঠায় ২৪ টাকা এন-ফি এবং ৩৬ টাকা এনএন-ফি (নকলনবিশের পারিশ্রমিক) লাগে। রেজিস্ট্রেশন ফি, ই-ফি ও এন-ফি একটি পে-অর্ডারে, এনএন-ফি নগদে, আর উৎসে কর ও ভ্যাট এ-চালানে দিতে হয়।[6] দলিল লেখক ও আইনজীবীর ফি এর বাইরে। পুরো হিসাব ও উদাহরণ পাবেন আমাদের রেজিস্ট্রেশন ফি বিষয়ক ইংরেজি বিশ্লেষণে।

কম দলিলমূল্য দেখানোর ঝুঁকি

দলিলে মূল্য সরকার নির্ধারিত বাজারমূল্যের কম দেখালে ধারা ৬৩ক অনুযায়ী রেজিস্ট্রিকারী কর্মকর্তা সঠিক মূল্যের ভিত্তিতে ফি ও শুল্ক আদায় করেই রেজিস্ট্রি করবেন।[1] কম মূল্য দেখানো দলিল ক্রেতার নিজের বিনিয়োগের প্রমাণও দুর্বল করে, যা পরে কর রিটার্ন, পুনর্বিক্রি বা দলিল বাতিলের মামলায় ক্ষতির কারণ হয়।

অর্থ আইন ২০২৬: কী বদলাল, কী বদলায়নি

অর্থ আইন ২০২৬-এ সম্পত্তি হস্তান্তরের মূলধনী মুনাফা আর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হবে না; ফলে রেজিস্ট্রির সময় দেওয়া কর বিক্রেতার রিটার্নে প্রকৃত দায়ের বিপরীতে সমন্বয় হবে।[9] অন্যদিকে বণ্টননামা ও নামজারিতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এবং মৌজামূল্যে রেজিস্ট্রি হওয়া লেনদেনে অপ্রদর্শিত বিনিয়োগ ঘোষণার প্রস্তাব সংসদে পাসের আগে বাদ দেওয়া হয়েছে।[8]

রেজিস্ট্রির পরে: নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর

দলিল রেজিস্ট্রি হয় আইন মন্ত্রণালয়ের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে, আর নামজারি হয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে। তাই রেজিস্ট্রির পর আলাদা করে mutation.land.gov.bd-তে ই-নামজারির আবেদন করতে হয়। আবেদনে লাগে ছবি ও সই, জাতীয় পরিচয়পত্র, সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং দলিলের স্ক্যান কপি।[10]

সরকারি ফি মোট ১,১৭০ টাকা: আবেদনের সময় ৭০ টাকা এবং অনুমোদনের পর খতিয়ান প্রস্তুতের জন্য ১,১০০ টাকা। আইনগত সময়সীমা মহানগরে ৪৫ কর্মদিবস, অন্যত্র ৩০ কর্মদিবস।[10] নামজারি হয়ে গেলে নতুন খতিয়ান ও ডিসিআর মিলিয়ে দেখুন, তারপর প্রথম বছর থেকেই নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন কর দিন। কৃষিনির্ভর ব্যক্তি বা পরিবারের মোট কৃষিজমি ৮.২৫ একর বা ২৫ বিঘা পর্যন্ত হলে কর মওকুফ।[11] প্রক্রিয়া ও আপিলের পথ বিস্তারিত আছে আমাদের নামজারি বিষয়ক বিশ্লেষণে।

জমি রেজিস্ট্রেশন — দলিলে স্বাক্ষর ও আইনি পরামর্শ
রেজিস্ট্রির পরে নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর বাকি থাকে

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ এবং সাধারণ প্রতারণা

২০২৩ সালের ৩৬ নং আইনটি জমি সংক্রান্ত প্রতারণাকে দেওয়ানি বিরোধের গণ্ডি থেকে বের করে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ বানিয়েছে। আইনের সব অপরাধ আমলযোগ্য; বিচার করেন প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, এবং মামলা পাওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা।[4]

আইনে কোন কাজ অপরাধ

  • ভূমি প্রতারণা (ধারা ৪): অন্যের জমি নিজের বলে চালানো, তথ্য গোপন করে হস্তান্তর, ছদ্মবেশে হস্তান্তর, মিথ্যা বিবরণসহ দলিল সম্পাদন; সাজা সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।
  • ভূমি জালিয়াতি (ধারা ৫): প্রতারণার উদ্দেশ্যে জাল দলিল তৈরি বা সম্পাদিত দলিল কর্তৃত্ব ছাড়া পরিবর্তন; সাজা সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। ধারা ৪ ও ৫ জামিন-অযোগ্য।
  • অবৈধ দখল (ধারা ৭): হালনাগাদ খতিয়ান, বৈধ দলিল বা আদালতের আদেশ ছাড়া জমি দখলে রাখা; সাজা দুই বছর পর্যন্ত।
  • বিক্রীত জমি বুঝিয়ে না দেওয়া (ধারা ৯): পুরো দাম পাওয়ার পরও যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া ক্রেতাকে দখল না দেওয়া; সাজা দুই বছর পর্যন্ত।

দখলচ্যুত ব্যক্তি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদনও করতে পারেন, যেখানে তিন মাসের মধ্যে আদেশ দেওয়ার বিধান আছে।[4] জবরদখলের প্রতিকার নিয়ে আমাদের জমি দখল মামলা বিশ্লেষণ দেখুন।

বাজারে প্রচলিত প্রতারণার ধরন

  • একই জমি একাধিক ক্রেতার কাছে বিক্রি বা বায়না করা;
  • সব ওয়ারিশের সম্মতি ছাড়া উত্তরাধিকারের জমি বিক্রি, অথবা ভুয়া ওয়ারিশ সনদ দেখানো;
  • অন্য কাউকে মালিক সাজিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে হাজির করা;
  • বাতিল বা প্রত্যাহার করা আমমোক্তারনামা দিয়ে বিক্রি;
  • ব্যাংকে বন্ধক থাকা জমি বা ফ্ল্যাট গোপন করে বিক্রি;
  • জমির মালিকের ভাগের ফ্ল্যাট ডেভেলপারের নামে বুকিং নেওয়া, বা অনুমোদনহীন অতিরিক্ত তলার ফ্ল্যাট বিক্রি;
  • খাস, অর্পিত বা অধিগ্রহণের আওতাধীন জমি ব্যক্তিগত বলে বিক্রি।

এর প্রায় প্রতিটি ধরা পড়ে যদি খতিয়ানের সূত্র, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তল্লাশি, সরেজমিন পরিদর্শন এবং ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ চুক্তি ও অনুমোদিত নকশা রেজিস্ট্রির আগে যাচাই করা হয়।

প্রতারিত হলে করণীয়

রেজিস্ট্রি প্রতারণা বা জালিয়াতি ঢেকে দেয় না। জাল বা প্রতারণামূলক দলিল বাতিলের জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করা যায়, আর একই সঙ্গে ভূমি অপরাধ আইনে ফৌজদারি মামলা চলতে পারে; আদালত জাল দলিলের তথ্য ভূমি রেকর্ডে লিপিবদ্ধ করার আদেশও দিতে পারেন।[4] ডেভেলপারের সঙ্গে বিরোধে রিয়েল এস্টেট আইনের ধারা ৩৬ অনুযায়ী আগে আপস আলোচনা, তারপর সালিসি; ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হলে আদালত।[12] দলিল বাতিলের মামলার সময়সীমা ও প্রমাণ নিয়ে আমাদের দলিল বাতিল মামলা বিশ্লেষণ দেখুন।

রিয়েল এস্টেট ক্রয়-বিক্রয়ে আইনজীবীর ভূমিকা

অধিকাংশ দলিল লেখেন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখকেরা। দলিল লেখক দলিল প্রস্তুত করেন; তিনি স্বত্ব তদন্ত করেন না, কোনো পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করেন না। আইনজীবীর কাজ শুরু হয় তার আগে: খতিয়ান ও দলিলের সূত্র যাচাই, তল্লাশি, ওয়ারিশ ও আমমোক্তারনামা পরীক্ষা, ফ্ল্যাটে যৌথ উদ্যোগ চুক্তি ও অনুমোদন পর্যালোচনা, বায়না ও সাফ কবলার খসড়া, খরচের সঠিক হিসাব, জমি রেজিস্ট্রেশনের দিনে তদারকি এবং পরে নামজারি।

উত্তরাধিকারের জমি, প্রবাসী পক্ষ, ডেভেলপারের ফ্ল্যাট, ব্যাংক ঋণ শোধ করে কেনা জমি বা কোটি টাকার বেশি লেনদেনে এই খরচ বিমার মতো কাজ করে। সাফ কবলার খসড়া ও ধারা ৫২ক-এর সংযুক্তি নিয়ে আমাদের বিক্রয় দলিল বিষয়ক বিশ্লেষণ দেখুন। TRW-এর ভূমি রেকর্ড, নামজারি ও খতিয়ান সংশোধন প্র্যাকটিস এবং রিয়েল এস্টেট বিরোধ প্র্যাকটিস ক্রেতা, বিক্রেতা, ওয়ারিশ ও প্রবাসী মালিকদের পক্ষে কাজ করে।

সামনে কী আসছে: অনলাইন দলিল রেজিস্ট্রি

২০২৬ সালের সংশোধনীতে নতুন ধারা ৭৭ক সরকার অনুমোদিত সফটওয়্যারে ডিজিটালি দলিল উপস্থাপন, গ্রহণ ও রেজিস্ট্রির আইনি ভিত্তি দিয়েছে, তবে বিধিমালা ও সফটওয়্যার এখনো চালু হয়নি।[1] আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ৩০ এপ্রিল ২০২৬ সংসদে জানান, ৬৩২.৬৯ কোটি টাকার "ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থা অটোমেশন" প্রকল্পের আওতায় সমন্বিত রেজিস্ট্রেশন রিসোর্স প্ল্যানার তৈরি হচ্ছে, এবং অনলাইনে দলিল রেজিস্ট্রি ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ বা ২০২৮ সালের প্রথমার্ধে চালু হতে পারে।[14] ততদিন প্রতিটি জমি রেজিস্ট্রেশন হবে কাগজের দলিলে, আর পক্ষদের সশরীরে হাজির হতে হবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

রেজিস্ট্রি না করা দলিলে কি জমির মালিক হওয়া যায়?

না। রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৪৯ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নিবন্ধনযোগ্য দলিল রেজিস্ট্রি না হলে স্থাবর সম্পত্তিতে কোনো স্বত্ব সৃষ্টি বা হস্তান্তর করে না। দখল বা টাকার রসিদ মালিকানার বিকল্প নয়।[1]

দলিল সম্পাদনের কত দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করতে হয়?

বিক্রয় দলিল তিন মাসের মধ্যে উপস্থাপন করতে হয়; যুক্তিসংগত কারণে আরও চার মাস পর্যন্ত জরিমানা দিয়ে গ্রহণযোগ্য। বায়না দলিল সম্পাদনের ৬০ দিনের মধ্যে।[1]

বিক্রেতার নামে নামজারি না থাকলে কি জমি কেনা যাবে?

বিক্রেতার নাম, অথবা উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে তাঁর পূর্বসূরির নাম, সর্বশেষ খতিয়ানে না থাকলে বিক্রি বাতিল। ক্রয়সূত্রে মালিক বিক্রেতাকে আগে নিজের নামে নামজারি করাতে বলুন।[3]

২০২৬ সালে জমি রেজিস্ট্রেশন খরচ কত?

রেজিস্ট্রেশন ফি ১%, স্ট্যাম্প শুল্ক ১.৫%, স্থানীয় সরকার কর সিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্টে ২% ও অন্যত্র ৩%, এবং মৌজাভেদে উৎসে কর। নতুন ফ্ল্যাটে ভ্যাট ২% বা ৪.৫%। ছোট ফি আলাদা।[6]

গেইন ট্যাক্স কে দেয়, ক্রেতা না বিক্রেতা?

আয়কর আইনের ধারা ১২৫ অনুযায়ী কর বিক্রেতার; তা না দিলে দলিল রেজিস্ট্রি হয় না। বাস্তবে পক্ষরা চুক্তিতে ভিন্ন বণ্টন ঠিক করতে পারেন, তাই বায়নায় লিখে নিন।[5]

জমি রেজিস্ট্রেশনে আয়কর রিটার্নের প্রমাণ লাগে কি?

সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় লাগে। নামজারি ও বণ্টননামায় টিআইএন বাধ্যতামূলক করার ২০২৬ সালের প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়েছে।[6] [8]

ফ্ল্যাট কেনার আগে কোন কাগজগুলো দেখব?

ডেভেলপারের নিবন্ধন, প্রকল্পের অনুমোদন ও নকশা, জমির মালিকানার কাগজ, যৌথ উদ্যোগ চুক্তি ও বণ্টন তালিকা, নিবন্ধিত আমমোক্তারনামা এবং বন্ধক না থাকার প্রমাণ। আইন অনুযায়ী ডেভেলপার অনুমোদন ও মালিকানার কাগজ দেখাতে বাধ্য।[12]

রেজিস্ট্রির পর নামজারি করতে কত খরচ ও সময় লাগে?

সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা, অনলাইনে পরিশোধযোগ্য। সময়সীমা মহানগরে ৪৫ কর্মদিবস, অন্যত্র ৩০ কর্মদিবস।[10]

জাল দলিলের শাস্তি কী?

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর ধারা ৫ অনুযায়ী সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড; অপরাধটি আমলযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য।[4]

অনলাইনে কি দলিল রেজিস্ট্রি করা যায়?

এখনো না। আইনে ডিজিটাল রেজিস্ট্রির বিধান যুক্ত হয়েছে, তবে আইনমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী ২০২৭ সালের শেষার্ধ বা ২০২৮ সালের প্রথমার্ধে তা চালু হতে পারে।[1] [14]

সূত্র তালিকা

প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র

উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।

  1. Registration Act 1908, sections 17, 17A, 22A, 23, 25, 26, 34, 49, 52A, 63A, 68, 72, 73, 77A, 78A, 80 (as amended to 2026) — Laws of Bangladesh
  2. প্রথম আলো, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ — দলিল নিবন্ধনব্যবস্থা ডিজিটাল করতে নিবন্ধন আইন সংশোধন, চালু হচ্ছে ই-রেজিস্ট্রেশন
  3. Transfer of Property Act 1882, section 53C (immoveable property without khatian not to be sold) — Laws of Bangladesh
  4. ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ৩৬ নং আইন) — বাংলাদেশ আইন (bdlaws)
  5. Income Tax Act 2023, section 125 (collection of tax on transfer of property) — National Board of Revenue
  6. Land Registration BD (হালনাগাদ ৩১ আগস্ট ২০২৬) — সাফ কবলা দলিল রেজিস্ট্রির খরচ ও পরিশোধ পদ্ধতি
  7. প্রথম আলো, ২৬ জুন ২০২৫ — জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের খরচ আরও কমল
  8. The Daily Star, 29 June 2026 — Finance Bill passed, tax-free threshold set at Tk 4 lakh for FY2026-27
  9. PwC Bangladesh, June 2026 — Finance Act 2026: Key Amendments
  10. যুগান্তর, ১৮ আগস্ট ২০২৬ — ই-নামজারি: অনলাইনে আবেদন, ফি ও সময়
  11. ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ৩১ নং আইন), ধারা ৩, ৭–৯ — বাংলাদেশ আইন (bdlaws)
  12. রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ৪৮ নং আইন), ধারা ৫, ৬, ৯, ১০, ১৫, ১৬, ১৮, ১৯–২০, ৩৬ — বাংলাদেশ আইন (bdlaws)
  13. bdnews24.com, November 2025 — Residential plots and flats can be transferred without prior approval (housing ministry notification of 10 November 2025)
  14. BSS, 30 April 2026 — Law Minister on the Land Registration System Automation project

TRW-এর সহায়তা

তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে

TRW জমি ও ফ্ল্যাট কেনার আগে মালিকানা যাচাই, বায়না ও সাফ কবলার খসড়া, রেজিস্ট্রির তদারকি, নামজারি এবং জাল দলিল ও ডেভেলপার বিরোধে ক্রেতা, বিক্রেতা ও প্রবাসী মালিকদের পরামর্শ দেয়। দেখুন আমাদের ভূমি রেকর্ড, নামজারি ও খতিয়ান সংশোধন প্র্যাকটিস, অথবা আপনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

Message TRW on WhatsApp