জমি সংক্রান্ত মামলা ২০২৬: ঘোষণামূলক মামলা, দখল পুনরুদ্ধার, নিষেধাজ্ঞা, বণ্টন, অগ্রক্রয়, তামাদি ও কোর্ট ফি

by Barrister Tahmidur Rahman | Oct 21, 2026 | Insights, Property & Real Estate | 0 comments

TRW Insight / বাংলাদেশ

জমি সংক্রান্ত মামলা জেতা-হারা প্রায়ই ঠিক হয় মামলা দায়েরের আগেই: কোন প্রতিকার চাইবেন, কোন ক্রমে চাইবেন এবং সময়ের মধ্যে চাইছেন কি না। ভুল পথে গেলে শক্ত কাগজও কাজে আসে না।

হালনাগাদ ২১ অক্টোবর ২০২৬আইনি বিশ্লেষণবাংলাদেশ21 মিনিটে পড়া

জমি সংক্রান্ত মামলা ২০২৬: কোন বিরোধে কোন প্রতিকার

জমি সংক্রান্ত মামলা বাংলাদেশের আদালতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, আর সবচেয়ে বেশি ভুলও হয় এখানেই। কেউ জাল দলিল দেখিয়ে মালিকানা দাবি করছেন, কেউ রাতারাতি বেড়া দিয়ে জমি দখল করে নিয়েছেন, শরিকরা ভাগ নিয়ে একমত হচ্ছেন না, অথবা বাইরের কেউ শরিকের অংশ কিনে নিয়েছেন। প্রতিটি পরিস্থিতির আইন আলাদা, প্রতিকার আলাদা, মামলা করার সময়সীমাও আলাদা। ভুল প্রতিকার চাইলে বা সময় পেরিয়ে গেলে শক্ত দাবিও আদালতে হেরে যায়।

এই লেখায় আমরা একসঙ্গে তুলে ধরেছি: জমির বিরোধের ধরন; সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারায় ঘোষণামূলক মামলা, ৮ ও ৯ ধারায় দখল পুনরুদ্ধার, নিষেধাজ্ঞা, দলিল বাতিল, বণ্টন ও অগ্রক্রয়; ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারা ও ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩; তামাদি, কোর্ট ফি, কোন আদালতে যাবেন, কী কাগজ লাগবে, কত সময় লাগে এবং মধ্যস্থতা। ইংরেজিতে আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ চাইলে আমাদের land dispute litigation guide দেখুন।

জমি সংক্রান্ত মামলা — গ্রামের ধানক্ষেতের সীমানা নিয়ে বিরোধ
বিরোধের ধরন চিনলেই সঠিক প্রতিকার বেছে নেওয়া যায়

সারসংক্ষেপ: মালিকানা নিয়ে বিরোধে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৪২ ধারায় ঘোষণামূলক মামলা হয়, তবে দখল হারালে সঙ্গে দখল পুনরুদ্ধারও চাইতে হয়। জোর করে উচ্ছেদ হলে ছয় মাসের মধ্যে ৯ ধারায় স্বত্ব প্রমাণ ছাড়াই দখল ফেরত চাওয়া যায়; পরে স্বত্বের ভিত্তিতে ৮ ধারায় ১২ বছরের মধ্যে। দলিল বাতিলে সাধারণত তিন বছর, ঘোষণায় ছয় বছর। ভূমি অপরাধ আইন ২০২৩ অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তিন মাসের মধ্যে দখল ফিরিয়ে দিতে পারেন। ৩০টি জেলায় বণ্টন ও অগ্রক্রয়ের বিরোধ আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতায় যায়।

মূল বিষয়: তামাদি আইন ১৯০৮-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী দখলের মামলা করার মেয়াদ পেরিয়ে গেলে শুধু মামলার অধিকার নয়, জমির ওপর মালিকের অধিকারই বিলুপ্ত হয়ে যায়।[4] তাই যেদিন দখল হারাবেন, সেদিনের তারিখ লিখে রাখুন, থানায় জিডি করুন এবং দেরি না করে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

এক নজরে

01

ধারা ৪২

মালিকানা অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে ঘোষণামূলক মামলা; দখল চাওয়া সম্ভব হলে শুধু ঘোষণা চলে না।

02

ছয় মাস

৯ ধারার সংক্ষিপ্ত দখল মামলার সময়সীমা; স্বত্ব প্রমাণ লাগে না, আপিলও চলে না।

03

১২ বছর

স্বত্বের ভিত্তিতে দখল পুনরুদ্ধারের সময়সীমা; এরপর মালিকের অধিকার বিলুপ্ত হয়।

04

তিন মাস

ভূমি অপরাধ আইনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দখল পুনরুদ্ধার আবেদন নিষ্পত্তির সময়।

05

৩৫,০০০ টাকা

আরজিতে সর্বোচ্চ অ্যাড ভ্যালোরেম কোর্ট ফি; শুধু ঘোষণার মামলায় নির্ধারিত ৩০০ টাকা।

সূচিপত্র

জমির বিরোধ কত ধরনের হয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের মে মাসে ভূমি সেবা মেলার উদ্বোধনে বলেছেন, দেশের আদালতে ৪৭ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন এবং খুব সম্ভবত এর বেশির ভাগই ভূমি সংক্রান্ত; তিনি গ্রাম আদালত ও মধ্যস্থতার মতো বিকল্প পথে বিরোধ মেটানোর ওপর জোর দিয়েছেন।[14] বাস্তবে জমির বিরোধ মোটামুটি সাতটি ধরনে পড়ে, আর ধরন চিনতে পারাই সঠিক মামলার প্রথম শর্ত।

  • মালিকানা বা স্বত্বের বিরোধ: একই জমি দুজন দাবি করছেন, কারও দলিল বা খতিয়ান অন্যের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
  • দখলের বিরোধ: মালিককে জোর করে উচ্ছেদ করা হয়েছে, অথবা ভাড়াটে, কেয়ারটেকার বা আত্মীয় জমি ছাড়ছেন না।
  • জাল বা প্রতারণামূলক দলিল: ভুয়া মালিক সেজে বিক্রি, জাল আমমোক্তারনামা, স্বাক্ষর জাল করা হেবা।
  • শরিকানা ও বণ্টন: ওয়ারিশ বা যৌথ ক্রেতারা অংশ ভাগ করতে পারছেন না।
  • অগ্রক্রয়: শরিকের অংশ বাইরের কেউ কিনে নিয়েছেন।
  • সীমানা ও রাস্তা: প্রতিবেশী সীমানা পেরিয়ে স্থাপনা করছেন বা চলাচলের পথ বন্ধ করছেন।
  • রেকর্ড ও নামজারির ভুল: খতিয়ানে ভুল নাম, ভুল অংশ বা ভুল দাগ।

রেকর্ডের ভুল সাধারণত ভূমি অফিস বা ট্রাইব্যুনালে সংশোধন হয়; এ বিষয়ে আমাদের khatian correction গাইড দেখুন। বাকি ছয় ধরনের বিরোধের সমাধান মূলত দেওয়ানি আদালতে, কিছু ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট ও ফৌজদারি আদালতেও।

দেওয়ানি না ফৌজদারি: আগে পথ বেছে নিন

দেওয়ানি আদালত ঠিক করে জমির মালিক কে, দখলের অধিকার কার, কোন দলিল বাতিল হবে এবং জমি কীভাবে ভাগ হবে। ফৌজদারি পথে অপরাধীর শাস্তি হয়, আর ম্যাজিস্ট্রেট দ্রুত দখল বা শান্তি রক্ষার আদেশ দিতে পারেন, কিন্তু মালিকানার চূড়ান্ত মীমাংসা করেন না। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুই পথ পাশাপাশি চলে, তবে ক্রম ঠিক রাখা জরুরি। যেমন, একই জমির দখল পুনরুদ্ধারের দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকলে ভূমি অপরাধ আইনের ৮ ধারায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন চলে না।[8]

নিজে লোক জড়ো করে জমি দখল করা এখন বড় ঝুঁকি। আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া বৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করা ভূমি অপরাধ আইনের ৭ ধারায় অপরাধ, শাস্তি অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।[8] তা ছাড়া জোর করে দখল নিলে প্রতিপক্ষ ৯ ধারায় আপনার বিরুদ্ধেই দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করতে পারেন।

ঘোষণামূলক মামলা: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ধারা ৪২

জমির মালিকানা মামলা বলতে মানুষ সাধারণত যা বোঝেন, আইনের ভাষায় সেটি ঘোষণামূলক মামলা বা স্বত্ব ঘোষণার মামলা (declaratory suit বা title suit)। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৪২ ধারা অনুযায়ী, কোনো সম্পত্তিতে যাঁর আইনগত অধিকার আছে, তিনি সেই অধিকার অস্বীকারকারী বা অস্বীকারে আগ্রহী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে আদালতের কাছে ঘোষণা চাইতে পারেন যে তিনিই ওই অধিকারের মালিক।[1] আদালত ঘোষণা দেবেন কি না, তা আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা।

কে, কার বিরুদ্ধে ঘোষণামূলক মামলা করবেন

বাদীর বর্তমান অধিকার থাকতে হবে: ক্রয়সূত্রে মালিকানা, ওয়ারিশ হিসেবে অংশ, হেবা বা বণ্টনসূত্রে প্রাপ্ত জমি। বিবাদী হবেন তিনি, যিনি সেই অধিকার অস্বীকার করছেন, যেমন বিরোধী দলিলের দাতা ও গ্রহীতা, বিরোধী খতিয়ানে নাম থাকা ব্যক্তি বা তাঁদের কাছ থেকে কেনা ক্রেতা। ঘোষণা কেবল মামলার পক্ষদের এবং তাঁদের মাধ্যমে দাবিদারদের ওপর বাধ্যতামূলক, তাই প্রতিকূল দাবিদার সবাইকে পক্ষ করতে হবে।[1]

শর্তাংশ: শুধু ঘোষণা চাইলে মামলা খারিজের ঝুঁকি

৪২ ধারার শর্তাংশই ঘোষণামূলক মামলার সবচেয়ে বড় ফাঁদ। বাদী যদি শুধু ঘোষণার চেয়ে বেশি প্রতিকার চাইতে পারতেন কিন্তু চাননি, তাহলে আদালত ঘোষণা দেবেন না।[1] যেমন, আপনি দখলে না থাকলে স্বত্ব ঘোষণার সঙ্গে খাস দখল পুনরুদ্ধারও চাইতে হবে; দখলে থাকলেও হুমকি থাকলে সঙ্গে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা; পথে কোনো দলিল বাধা হলে সেটি বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণা।

তবে শর্তাংশ যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ হয় না। ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ আরজু মিয়া বনাম রহিমা বেগম মামলায় বলেছে, দখল পুনরুদ্ধার চাওয়া জরুরি ছিল কি না তা নির্ভর করে দখল সম্পর্কে সাক্ষ্যভিত্তিক তথ্যের ওপর; শর্তাংশ দিয়ে অন্যথায় প্রমাণিত দাবি যান্ত্রিকভাবে নাকচ করা যায় না। একই মামলায় ভুল আরএস দাগ লেখা দলিল সংশোধনের (rectification) ডিক্রিও বহাল রাখা হয়।[12] তবু নিরাপদ পথ হলো, তথ্য যত প্রতিকার সমর্থন করে, আরজিতে সবগুলো একসঙ্গে চাওয়া।

জমির মালিকানা মামলায় কী প্রমাণ লাগে

আদালত তিনটি জিনিস একসঙ্গে মিলিয়ে দেখেন: স্বত্বের উৎস, রেকর্ডভুক্ত মালিক থেকে বাদী পর্যন্ত ছেদহীন হস্তান্তর বা উত্তরাধিকারের শৃঙ্খল, এবং সেই শৃঙ্খলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ দখল। সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান, রেজিস্ট্রি দলিল ও বায়া দলিল, নামজারি খতিয়ান, খাজনার দাখিলা এবং স্থানীয় সাক্ষী এই প্রমাণের মেরুদণ্ড। খতিয়ান মালিকানার দলিল নয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। নামজারি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের ইংরেজি গাইড land mutation in Bangladesh দেখুন। মামলার কাঠামো, ভ্যালুয়েশন ও স্বত্বের প্রমাণ নিয়ে ইংরেজিতে বিস্তারিত আছে আমাদের title suit গাইডে।

দখল পুনরুদ্ধার: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ধারা ৮ ও ৯

দখল পুনরুদ্ধারের দেওয়ানি পথ দুটি, আর দুটির প্রশ্ন সম্পূর্ণ আলাদা। ৯ ধারা জানতে চায় আপনি সম্প্রতি দখলে ছিলেন কি না এবং বেআইনিভাবে উচ্ছেদ হয়েছেন কি না। ৮ ধারা জানতে চায় জমির মালিক কে এবং দখলের অধিকার কার।

ধারা ৯: ছয় মাসের মধ্যে সংক্ষিপ্ত দখল মামলা

কাউকে তাঁর সম্মতি ছাড়া এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া স্থাবর সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করা হলে তিনি বা তাঁর মাধ্যমে দাবিদার মামলা করে দখল পুনরুদ্ধার করতে পারেন, বিবাদী যে স্বত্বই দাবি করুন না কেন।[2] অর্থাৎ এখানে মালিকানা প্রমাণ করতে হয় না; প্রমাণ করতে হয় পূর্ববর্তী দখল, সম্মতিহীন উচ্ছেদ এবং আইনি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি। মামলা করতে হবে উচ্ছেদের তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে।[3]

এই ধারার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য মনে রাখুন। সরকারের বিরুদ্ধে ৯ ধারার মামলা চলে না; এই মামলার আদেশ বা ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিউ চলে না; আর এতে স্বত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক মামলা করার অধিকার ক্ষুণ্ন হয় না।[2] তাই ৯ ধারার ডিক্রি কেবল আগের অবস্থা ফিরিয়ে দেয়, মালিকানার মীমাংসা করে না। আপিল না থাকায় সংক্ষুব্ধ পক্ষ হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশনের পথ খোঁজেন, তাই বিচারিক আদালতেই নথি নিখুঁত রাখতে হয়।

ধারা ৮: স্বত্বের ভিত্তিতে দখল পুনরুদ্ধার

৮ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থাবর সম্পত্তির দখল পাওয়ার অধিকারী ব্যক্তি দেওয়ানি কার্যবিধিতে নির্ধারিত পদ্ধতিতে তা পুনরুদ্ধার করতে পারেন।[1] এটিই সাধারণ "স্বত্ব সাব্যস্তে খাস দখল পুনরুদ্ধার" মামলা। দখলে থাকার পর উচ্ছেদ হলে তামাদি উচ্ছেদের তারিখ থেকে ১২ বছর (অনুচ্ছেদ ১৪২); অন্য ক্ষেত্রে বিবাদীর দখল যেদিন থেকে বাদীর প্রতিকূল হয়েছে, সেদিন থেকে ১২ বছর (অনুচ্ছেদ ১৪৪)।[3] বিবাদী আপনার মালিকানা অস্বীকার করলে দখলের সঙ্গে স্বত্ব ঘোষণাও চাইতে হবে।

বিরুদ্ধ দখল: ১২ বছর চুপ থাকলে কী হয়

দখলের মামলার মেয়াদ শেষ হলে মালিকের অধিকার বিলুপ্ত হয়।[4] এর ফলেই বিরুদ্ধ দখল (adverse possession) তত্ত্ব কাজ করে: কেউ প্রকাশ্যে, ধারাবাহিকভাবে ও মালিকের প্রতিকূলে ১২ বছর দখলে থাকলে মালিক জমি ফেরত চাওয়ার অধিকার হারাতে পারেন। তবে ভাড়াটে, কেয়ারটেকার বা অনুমতিপ্রাপ্ত আত্মীয়ের দখল সাধারণত প্রতিকূল নয়, যতক্ষণ না তিনি স্পষ্টভাবে মালিকের স্বত্ব অস্বীকার করেন। প্রবাসী মালিকদের জন্য পরামর্শ: নিজের নামে খাজনা দিন, অনুমতির বিষয়টি লিখিত রাখুন এবং নিয়মিত জমি দেখাশোনা করান। দখল পুনরুদ্ধার নিয়ে ইংরেজিতে বিস্তারিত পাবেন আমাদের recovery of possession গাইডে।

জমি সংক্রান্ত মামলা — দখল পুনরুদ্ধারের জন্য দলিল ও খতিয়ান যাচাই
ছয় মাস আর বারো বছর: দখল পুনরুদ্ধারের দুই সময়সীমা

নিষেধাজ্ঞা: অস্থায়ী ও চিরস্থায়ী

মামলা চলতে কয়েক বছর লাগতে পারে। এর মধ্যে প্রতিপক্ষ জমি বিক্রি করে দিতে পারেন, দালান তুলতে পারেন বা জমির চরিত্র বদলে দিতে পারেন। এই ঝুঁকি ঠেকাতে মামলার সঙ্গে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৯ অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত দেওয়া হয়। আদালত সাধারণত তিনটি বিষয় দেখেন: প্রাথমিক মামলা (prima facie case), সুবিধা-অসুবিধার ভারসাম্য এবং অপূরণীয় ক্ষতির সম্ভাবনা। ২৯ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ মো. ফজলে মোরহাল বনাম নওশের আলী মামলায় এই তিন বিবেচনার কথা উল্লেখ করে নালিশি সম্পত্তির দখল ও অবস্থানের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেয় এবং বিচারিক আদালতকে ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে বলে।[10]

চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আসে চূড়ান্ত ডিক্রিতে। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৫৪ ধারা অনুযায়ী বাদীর পক্ষে বিদ্যমান কোনো দায় লঙ্ঘন ঠেকাতে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায়।[1] দখলে থাকা মালিক, যাঁর স্বত্ব নিয়ে গুরুতর বিরোধ নেই কিন্তু দখলে হুমকি আছে, প্রায়ই কেবল নিষেধাজ্ঞার মামলা করেন। স্বত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলে ঘোষণার সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা চাওয়াই নিরাপদ। শর্ত, শুনানি ও আপিলের খুঁটিনাটি পাবেন আমাদের temporary injunction গাইডে।

দলিল বাতিল, বণ্টন ও অগ্রক্রয় মামলা

দলিল বাতিলের মামলা (ধারা ৩৯)

যাঁর বিরুদ্ধে কোনো লিখিত দলিল বাতিল বা বাতিলযোগ্য, এবং দলিলটি টিকে থাকলে গুরুতর ক্ষতির যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা আছে, তিনি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় দলিলটি বাতিল ঘোষণার মামলা করতে পারেন। দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে থাকলে আদালত ডিক্রির কপি রেজিস্ট্রি অফিসে পাঠান, যেখানে বাতিলের বিষয়টি নথিভুক্ত হয়।[1] তামাদি সাধারণত তিন বছর, তবে দলিলের তারিখ থেকে নয়, বরং যেদিন বাদী বাতিলের অধিকার দেয় এমন তথ্য জেনেছেন সেদিন থেকে।[3] জাল দলিল ও সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি প্রতিকার নিয়ে আমাদের deed cancellation suit গাইড দেখুন।

বণ্টন বা বাটোয়ারা মামলা

ওয়ারিশ বা যৌথ মালিকরা আপসে বণ্টননামা রেজিস্ট্রি করতে না পারলে যেকোনো শরিক বণ্টনের মামলা করতে পারেন। আদালত প্রথমে প্রাথমিক ডিক্রিতে প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ করেন, পরে প্রয়োজনে অ্যাডভোকেট কমিশনার দিয়ে জমি মেপে চূড়ান্ত ডিক্রিতে নির্দিষ্ট ছাহাম বুঝিয়ে দেন। শরিকের বিরুদ্ধে সাধারণত দখলের মামলা নয়, বণ্টনের মামলাই সঠিক পথ, কারণ ভাগ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক শরিক পুরো জমিতে অংশীদার। উল্লেখ্য, ৩০টি জেলায় সহকারী জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টন মামলা এখন আগে লিগ্যাল এইড অফিসে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতায় যায় (নিচে দেখুন)।[11] বিস্তারিত পড়ুন আমাদের partition suit গাইডে।

অগ্রক্রয় বা প্রিয়েমশন মামলা

কৃষিজমির কোনো শরিক তাঁর অংশ বাইরের কারও কাছে বিক্রি করলে উত্তরাধিকারসূত্রে শরিক রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৯৬ ধারায় অগ্রক্রয়ের আবেদন করতে পারেন। সময়সীমা ৮৯ ধারার নোটিশ পাওয়ার দুই মাস, তবে দলিল রেজিস্ট্রির তিন বছর পর আর আবেদন চলে না। আবেদনের সঙ্গেই জমা দিতে হয় পণমূল্য, তার ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ এবং বার্ষিক ৮ শতাংশ সরল সুদ।[13] হাইকোর্ট বিভাগ ১৬ জুলাই ২০২৫ তারিখের রায়ে আবারও বলেছে, এই জমা পূর্বশর্ত; মেয়াদের পর বাকি টাকা জমার অনুমতি দেওয়া এখতিয়ারবহির্ভূত।[13] মুসলিম আইনভিত্তিক অগ্রক্রয়ের মামলার তামাদি এক বছর।[3] অকৃষি জমির জন্য আলাদা আইন আছে; বিস্তারিত পাবেন আমাদের pre-emption গাইডে।

জমি সংক্রান্ত মামলায় ফৌজদারি প্রতিকার

দেওয়ানি মামলা মালিকানার মীমাংসা করে, কিন্তু দখলবাজ বা প্রতারকের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থার জন্য দুটি ফৌজদারি পথ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সংঘবদ্ধ দখলের ঘটনায় প্রথম কয়েক দিনের পদক্ষেপই প্রায়ই ফল ঠিক করে দেয়, তাই কোন আবেদন আগে আর কোনটি পরে, তা শুরুতেই ঠিক করুন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারা

জমি বা জলাশয় নিয়ে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট ১৪৫ ধারায় পক্ষদের ডেকে লিখিত বক্তব্য নেন। তিনি কার দখলের অধিকার আছে তা বিচার না করে শুধু দেখেন আদেশের তারিখে প্রকৃত দখলে কে ছিলেন। আদেশের আগের দুই মাসের মধ্যে কেউ জোরপূর্বক ও অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ হলে তাঁকে দখলে ছিলেন বলে গণ্য করা যায়, আর জরুরি অবস্থায় বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি ক্রোক করা যায়।[7] ১৪৫ ধারার চূড়ান্ত আদেশে হেরে গেলে আদেশের তারিখ থেকে তিন বছরের মধ্যে দেওয়ানি মামলা করতে হয়।[3] ওয়ারিশদের পারিবারিক বিরোধে এই পথ প্রায়ই অকার্যকর।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩

এই আইনে ভূমি প্রতারণা (ধারা ৪) ও ভূমি জালিয়াতি (ধারা ৫) অনধিক সাত বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় এবং অজামিনযোগ্য। বৈধ খতিয়ান বা স্বত্ব ছাড়া জমি দখলে রাখা বা আদেশ ছাড়া বৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করা (ধারা ৭), এবং পূর্ণ মূল্য পেয়েও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া ক্রেতাকে দখল না দেওয়া (ধারা ৯) অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয়। সব অপরাধ আমলযোগ্য; ধারা ৪ ও ৫ ছাড়া বাকিগুলো জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য; বিচার মামলা প্রাপ্তির ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান আছে।[8]

৮ ধারার প্রতিকার সবচেয়ে কার্যকর: আদেশ ছাড়া উচ্ছেদ হলে ভুক্তভোগী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন করতে পারেন, যা তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।[8] তবে উত্তরাধিকার বা হস্তান্তরসূত্রে মালিক রেকর্ড সংশোধন বা স্বত্ব ঘোষণার মামলা করলে তা ৭ ধারার অপরাধ নয়।[8] জমি দখলের ফৌজদারি দিক নিয়ে বিস্তারিত পাবেন আমাদের land grabbing case গাইডে।

জমি সংক্রান্ত মামলা — বেড়া দিয়ে অবৈধ দখল ও ফৌজদারি প্রতিকার
ভূমি অপরাধ আইন ২০২৩ দখলবাজির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিকার দিয়েছে

তামাদি: কত দিনের মধ্যে মামলা করতে হবে

তামাদি আইন ১৯০৮-এর প্রথম তফসিলে প্রতিটি ধরনের মামলার মেয়াদ বেঁধে দেওয়া আছে, আর মেয়াদ পেরোনো মামলা আদালতে টেকে না। জমি সংক্রান্ত মামলায় সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য মেয়াদগুলো নিচে দেওয়া হলো।[3]

  • ৯ ধারার দখল মামলা: উচ্ছেদের তারিখ থেকে ছয় মাস (অনুচ্ছেদ ৩)।
  • মুসলিম আইনে অগ্রক্রয়: ক্রেতা পুরো জমির প্রকৃত দখল নেওয়া থেকে, অথবা দখলযোগ্য না হলে রেজিস্ট্রি থেকে এক বছর (অনুচ্ছেদ ১০)।
  • ১৪৫ ধারার আদেশের পর মামলা: চূড়ান্ত আদেশের তারিখ থেকে তিন বছর (অনুচ্ছেদ ৪৭)।
  • দলিল বাতিল: বাতিলের অধিকার দেয় এমন তথ্য জানার দিন থেকে তিন বছর (অনুচ্ছেদ ৯১)।
  • ঘোষণামূলক মামলা: অন্য কোথাও মেয়াদ নির্ধারিত না থাকলে মামলার কারণ উদ্ভবের দিন থেকে ছয় বছর (অনুচ্ছেদ ১২০)।
  • স্বত্বের ভিত্তিতে দখল: উচ্ছেদ বা প্রতিকূল দখল শুরুর দিন থেকে ১২ বছর (অনুচ্ছেদ ১৪২ ও ১৪৪)।

একাধিক প্রতিকার একসঙ্গে চাইলে প্রতিটির মেয়াদ আলাদাভাবে মেলাতে হয়। ধরুন আপনি ১০ বছর আগে দখল হারিয়েছেন, তাই দখলের দাবি এখনো সময়ের মধ্যে আছে; কিন্তু যে দলিলের জোরে প্রতিপক্ষ দখলে আছেন, সেটির কথা আপনি পাঁচ বছর আগে জেনে থাকলে দলিল বাতিলের দাবি তামাদিতে আটকে যেতে পারে। এই কারণেই মামলার আগে তারিখগুলো কাগজে সাজিয়ে নেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান কাজ।

কোর্ট ফি ও কোন আদালতে মামলা করবেন

আরজিতে চাওয়া প্রতিকারের মূল্যমান অনুযায়ী অ্যাড ভ্যালোরেম কোর্ট ফি দিতে হয়, তবে একটি আরজি বা আপিল মেমোতে সর্বোচ্চ ফি ৩৫,০০০ টাকা। পরিণামগত প্রতিকার ছাড়া কেবল ঘোষণামূলক ডিক্রি চাইলে নির্ধারিত ফি ৩০০ টাকা।[5] কম ফির লোভে শুধু ঘোষণা চাওয়া বিপজ্জনক, কারণ ৪২ ধারার শর্তাংশে সেই মামলাই খারিজ হতে পারে। মূল্যমান কম দেখালে আদালত তা সংশোধন করে বাড়তি ফি দাবি করতে পারেন, না দিলে আরজি নাকচের ঝুঁকি থাকে। কোর্ট ফির বিস্তারিত হিসাব পাবেন আমাদের court fee গাইডে।

মামলা করতে হয় জমি যে এলাকায় অবস্থিত, সেই এলাকার এখতিয়ারসম্পন্ন সর্বনিম্ন আদালতে। ২০২১ সালের সংশোধনের পর সহকারী জজ আদালতের আর্থিক এখতিয়ার ১৫ লাখ টাকা এবং সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের ২৫ লাখ টাকা; এর বেশি মূল্যের মামলা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে যায়। একই সংশোধনে জেলা জজের আপিল শুনানির সীমা ৫ কোটি টাকা করা হয়।[9] নিচের তালিকায় প্রধান জমি সংক্রান্ত মামলা পাশাপাশি তুলনা করা হলো; মোবাইলে পাশে স্ক্রল করুন।

জমি সংক্রান্ত প্রধান মামলা: আইন, সময়সীমা ও মূল শর্ত
মামলাআইনি ভিত্তিতামাদিমূল শর্ত
স্বত্ব ঘোষণাসুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ধারা ৪২সাধারণত ৬ বছরদখল বা অন্য প্রতিকার সম্ভব হলে সেটিও চাইতে হবে
সংক্ষিপ্ত দখল মামলাধারা ৯উচ্ছেদ থেকে ৬ মাসস্বত্ব প্রমাণ লাগে না; আপিল নেই; সরকারের বিরুদ্ধে নয়
স্বত্বের ভিত্তিতে দখলধারা ৮১২ বছরমেয়াদ শেষে মালিকের অধিকার বিলুপ্ত
দলিল বাতিলধারা ৩৯জানার দিন থেকে ৩ বছরদলিল বাতিল বা বাতিলযোগ্য এবং গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা
অগ্রক্রয় (কৃষিজমি)প্রজাস্বত্ব আইন, ধারা ৯৬নোটিশ থেকে ২ মাস, রেজিস্ট্রির ৩ বছরের মধ্যেমূল্য, ২৫% ক্ষতিপূরণ ও ৮% সুদ আগাম জমা
দখল পুনরুদ্ধার আবেদনভূমি অপরাধ আইন ২০২৩, ধারা ৮৩ মাসে নিষ্পত্তিএকই জমির দেওয়ানি দখল মামলা বিচারাধীন থাকলে চলে না
শান্তিভঙ্গের আশঙ্কাফৌজদারি কার্যবিধি, ধারা ১৪৫আদেশের পর মামলা ৩ বছরেশুধু প্রকৃত দখল নির্ধারণ, মালিকানা নয়

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

জমি সংক্রান্ত মামলা আসলে কাগজের লড়াই। আইনজীবীর কাছে যাওয়ার আগে নিচের কাগজগুলোর মূল বা সার্টিফায়েড কপি জোগাড় করুন:

  • নিজের রেজিস্ট্রি দলিল ও পেছনের সব বায়া দলিল, হেবা বা বণ্টননামা;
  • সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস (বা সিটি জরিপ) খতিয়ানের সার্টিফায়েড কপি এবং মৌজা ম্যাপ;
  • নামজারি খতিয়ান, ডিসিআর ও হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা;
  • উত্তরাধিকারসূত্রে হলে ওয়ারিশ সনদ ও বংশতালিকা;
  • দখলের প্রমাণ: বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিল, চাষাবাদ বা ভাড়ার রসিদ, তারিখসহ ছবি;
  • উচ্ছেদ বা হুমকির প্রমাণ: থানার জিডি বা অভিযোগের কপি, ঘটনার ছবি ও ভিডিও, নিরপেক্ষ সাক্ষীর নাম;
  • প্রতিপক্ষের দলিল বা খতিয়ানের কপি, আগের কোনো মামলা বা আদেশের নথি।

আরজিতে জমি অবশ্যই মৌজা, জেএল নম্বর, খতিয়ান, দাগ, পরিমাণ ও চৌহদ্দি দিয়ে নির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করতে হয়। অনেক মামলা হারে শুধু এই কারণে যে বাদী প্রমাণ করতে পারেন না, মাঠের জমি আর দলিলের জমি একই।

মধ্যস্থতা ও সালিশ: মামলার আগে ও মামলা চলাকালে

লিগ্যাল এইড আইনের সংশোধনের পর মামলা-পূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা ধাপে ধাপে চালু হচ্ছে। ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের উপস্থিতিতে আরও ১০টি জেলায় (বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল) এটি চালু হয়, ফলে মোট জেলা ৩০টি। এর আওতায় সহকারী জজ আদালতের বণ্টন মামলা এবং প্রজাস্বত্ব আইনের অগ্রক্রয় মামলাও আছে। আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে, ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসে পাইলট জেলাগুলোতে বণ্টন মামলা দায়ের ২০২৫ সালের ২,০০১টি থেকে ২০২৬ সালে ৬৬১টিতে নেমেছে।[11] এসব জেলায় বণ্টন বা অগ্রক্রয়ের বিরোধ থাকলে আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করুন।

মামলা দায়েরের পরও মধ্যস্থতার সুযোগ থাকে। দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯ক ধারায় প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষরা হাজির হলে আদালত শুনানি মুলতবি রেখে নিজে মধ্যস্থতা করতে পারেন বা লিগ্যাল এইড অফিসার, আইনজীবী বা প্যানেল মধ্যস্থতাকারীর কাছে পাঠাতে পারেন। মধ্যস্থতা ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হয়, প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন বাড়ানো যায়; আপসে নিষ্পত্তি হলে আদালত কোর্ট ফি ফেরতের সনদ দেন।[6] গ্রামের সালিশে সমঝোতা হলে তা লিখিত ও সাক্ষীসহ রাখুন, এবং প্রয়োজনে রেজিস্ট্রি বণ্টননামা বা আপস ডিক্রিতে রূপ দিন; মৌখিক সালিশ পরে টেকে না। মধ্যস্থতা নিয়ে আরও জানতে আমাদের court-annexed mediation গাইড দেখুন।

জমি সংক্রান্ত মামলা কত দিন চলে এবং ধাপগুলো কী

প্রতিটি মামলার সময় নির্ভর করে আদালতের মামলার চাপ, পক্ষের সংখ্যা, সমন জারি, কমিশন ও সাক্ষীর ওপর। একটি পূর্ণাঙ্গ স্বত্ব ও দখলের মামলা বিচারিক আদালতে কয়েক বছর চলা অস্বাভাবিক নয়, আপিল ও রিভিশন মিলিয়ে আরও বেশি। আইনে বেঁধে দেওয়া সময়ও আছে: ভূমি অপরাধ আইনে ম্যাজিস্ট্রেটের দখল পুনরুদ্ধার আবেদন তিন মাসে এবং ফৌজদারি বিচার ১৮০ দিনে শেষ করার বিধান,[8] আর আদালত-সংযুক্ত মধ্যস্থতা ৬০ দিনে।[6] সাধারণ ক্রম নিচে দেওয়া হলো।

ধাপ 01

তারিখ ও তথ্য লিখুন

কবে দখল হারালেন, কবে প্রতিপক্ষের দলিলের কথা জানলেন, কে কে দাবিদার, সব তারিখসহ লিখে রাখুন এবং থানায় জিডি করুন।

ধাপ 02

কাগজ সংগ্রহ

দলিল, বায়া দলিল, সব জরিপের খতিয়ান, নামজারি, খাজনার দাখিলা ও দখলের প্রমাণের সার্টিফায়েড কপি তুলুন।

ধাপ 03

পথ নির্ধারণ

তামাদি হিসাব করে ঠিক করুন: ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দখল পুনরুদ্ধার, ৯ ধারার মামলা, নাকি স্বত্বের মামলা।

ধাপ 04

মধ্যস্থতা যাচাই

বণ্টন বা অগ্রক্রয়ের বিরোধ ৩০টি নির্ধারিত জেলার কোনোটিতে হলে আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করুন।

ধাপ 05

আরজি ও নিষেধাজ্ঞা

সব প্রতিকার একসঙ্গে চেয়ে সঠিক মূল্যমান ও কোর্ট ফি দিয়ে আরজি দাখিল করুন, প্রয়োজনে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্তসহ।

ধাপ 06

জবাব ও মধ্যস্থতা

সমন জারির পর বিবাদীর লিখিত জবাব; আদালত ৮৯ক ধারায় মধ্যস্থতায় পাঠাতে পারেন।

ধাপ 07

বিচার ও রায়

বিচার্য বিষয় গঠন, দলিল প্রমাণ, প্রয়োজনে সরেজমিন কমিশন, সাক্ষ্য, জেরা ও যুক্তিতর্কের পর রায় ও ডিক্রি।

ধাপ 08

জারি ও নামজারি

ডিক্রি জারি করে দখল বুঝে নিন, ডিক্রির ভিত্তিতে নামজারি করুন এবং নিজের নামে খাজনা দিন।

সময় বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শুরুতেই সব পক্ষ যুক্ত করা, জমির নির্ভুল তফসিল দেওয়া, সব প্রতিকার একসঙ্গে চাওয়া এবং দলিলগুলো যথাযথভাবে প্রমাণ ও প্রদর্শনী (exhibit) হিসেবে চিহ্নিত করানো।

জমি সংক্রান্ত মামলা — আদালতে শুনানির জন্য আইনজীবীর প্রস্তুতি
সঠিক পক্ষ, নির্ভুল তফসিল ও সময়মতো দায়েরই মামলার ভিত্তি

আইনজীবীর ভূমিকা ও যে ভুলগুলো এড়াবেন

জমি সংক্রান্ত মামলায় আইনজীবী কী করেন

একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী প্রথমে কাগজ মিলিয়ে স্বত্বের শৃঙ্খলে ফাঁক খোঁজেন, তারিখ ধরে তামাদি হিসাব করেন, তারপর ঠিক করেন কোন প্রতিকার কোন ক্রমে চাওয়া হবে: ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন আগে, নাকি সরাসরি দেওয়ানি মামলা; মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা প্রযোজ্য কি না; কোর্ট ফি ও আদালতের এখতিয়ার কী হবে। এরপর আরজি, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত, সাক্ষ্য, জেরা এবং ডিক্রির পর নামজারি ও দখল বুঝে নেওয়া পর্যন্ত পুরো পথ তিনি পরিচালনা করেন। ঘোষণামূলক মামলা হোক বা দখল পুনরুদ্ধার, ভুল কৌশল পরে আপিলে শোধরানো কঠিন।

সাধারণ ভুল

  • শুধু ঘোষণা চাওয়া: দখল, নিষেধাজ্ঞা বা দলিল বাতিল চাওয়া সম্ভব হলেও না চাইলে ৪২ ধারার শর্তাংশে মামলা খারিজের ঝুঁকি।[1]
  • ছয় মাস পার করে ফেলা: সালিশ বা দরকষাকষির অপেক্ষায় ৯ ধারার সুযোগ হারানো।[3]
  • ভুল ক্রমে মামলা: আগে দেওয়ানি দখল মামলা করে ফেলায় ম্যাজিস্ট্রেটের দ্রুত প্রতিকার বন্ধ হয়ে যাওয়া।[8]
  • পক্ষ বাদ দেওয়া: প্রতিপক্ষের ক্রেতা বা কোনো শরিককে পক্ষ না করা।
  • অগ্রক্রয়ে কম জমা: পণমূল্য, ক্ষতিপূরণ ও সুদ একসঙ্গে জমা না দেওয়া।[13]
  • নিজে দখল নেওয়া: জোর করে জমিতে ঢুকে উল্টো ফৌজদারি মামলার আসামি হওয়া।[8]

সাধারণ জিজ্ঞাসা

জমি সংক্রান্ত মামলা কোন আদালতে করতে হয়?

জমি যে এলাকায়, সেই এলাকার এখতিয়ারসম্পন্ন সর্বনিম্ন দেওয়ানি আদালতে। মূল্যমান ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে সহকারী জজ, ২৫ লাখ পর্যন্ত সিনিয়র সহকারী জজ, এর বেশি হলে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে।[9]

ঘোষণামূলক মামলা কী এবং কখন করতে হয়?

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারায় সম্পত্তিতে নিজের অধিকারের ঘোষণা চাওয়ার মামলা। সাধারণত মামলার কারণ উদ্ভবের ছয় বছরের মধ্যে করতে হয়, আর দখলে না থাকলে সঙ্গে দখল পুনরুদ্ধারও চাইতে হয়।[1] [3]

কেউ জোর করে জমি দখল করলে প্রথমে কী করব?

থানায় জিডি বা মামলা করুন, প্রমাণ সংরক্ষণ করুন এবং দেওয়ানি মামলা করার আগে ভূমি অপরাধ আইনের ৮ ধারায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন বিবেচনা করুন, যা তিন মাসে নিষ্পত্তির কথা।[8] পাশাপাশি ৯ ধারার ছয় মাসের সময়সীমা মাথায় রাখুন।[3]

৯ ধারার মামলায় কি মালিকানা প্রমাণ করতে হয়?

না। প্রমাণ করতে হয় আপনি দখলে ছিলেন এবং সম্মতি ও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া উচ্ছেদ হয়েছেন। এই মামলায় আপিল বা রিভিউ চলে না এবং সরকারের বিরুদ্ধে এটি করা যায় না।[2]

১২ বছর পর কি জমি ফেরত পাওয়া যায়?

সাধারণত না। দখলের মামলার ১২ বছরের মেয়াদ পেরোলে মালিকের অধিকার বিলুপ্ত হয়, যদি প্রতিপক্ষের দখল প্রতিকূল হয়ে থাকে।[3] [4] অনুমতিসূত্রে দখল, যেমন ভাড়াটে বা কেয়ারটেকারের দখল, সাধারণত প্রতিকূল নয়।

জাল দলিল বাতিলের মামলা কত দিনের মধ্যে করতে হয়?

সাধারণত তিন বছর, যেদিন আপনি বাতিলের অধিকার দেয় এমন তথ্য জেনেছেন সেদিন থেকে।[3] জালিয়াতির জন্য ভূমি অপরাধ আইনের ৫ ধারায় আলাদা ফৌজদারি মামলাও করা যায়, শাস্তি অনধিক সাত বছর।[8]

জমি সংক্রান্ত মামলায় কোর্ট ফি কত লাগে?

পরিণামগত প্রতিকারসহ মামলায় মূল্যমান অনুযায়ী অ্যাড ভ্যালোরেম ফি, আরজিতে সর্বোচ্চ ৩৫,০০০ টাকা। শুধু ঘোষণামূলক ডিক্রি চাইলে ৩০০ টাকা।[5]

১৪৫ ধারার মামলা কি মালিকানা ঠিক করে?

না। ম্যাজিস্ট্রেট শুধু দেখেন আদেশের তারিখে প্রকৃত দখলে কে ছিলেন।[7] হেরে গেলে চূড়ান্ত আদেশের তিন বছরের মধ্যে দেওয়ানি মামলা করে স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হয়।[3]

বণ্টন মামলার আগে কি মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক?

বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালু থাকা ৩০টি জেলায় সহকারী জজ আদালতের বণ্টন মামলা ও প্রজাস্বত্ব আইনের অগ্রক্রয় মামলা আগে লিগ্যাল এইড অফিসে যায়।[11] অন্য জেলায় মামলা চলাকালে আদালত ৮৯ক ধারায় মধ্যস্থতায় পাঠাতে পারেন।[6]

বিক্রেতা টাকা নিয়ে দখল না দিলে কী করব?

পূর্ণ মূল্য পরিশোধের পরও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া দখল না দেওয়া ভূমি অপরাধ আইনের ৯ ধারায় অপরাধ, শাস্তি অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।[8] পাশাপাশি স্বত্বের ভিত্তিতে ৮ ধারায় দখল পুনরুদ্ধারের দেওয়ানি মামলা করা যায়।[1]

সূত্র তালিকা

প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র

উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।

  1. Specific Relief Act 1877 (sections 8, 39, 42 and 54) — Laws of Bangladesh
  2. Specific Relief Act 1877, section 9 (suit by person dispossessed) — Laws of Bangladesh
  3. Limitation Act 1908, First Schedule (articles 3, 10, 47, 91, 120, 142 and 144) — Laws of Bangladesh
  4. Limitation Act 1908, section 28 (extinguishment of right to property) — Laws of Bangladesh
  5. Court-fees Act 1870, Schedules I and II (as substituted in 2010) — Laws of Bangladesh
  6. Code of Civil Procedure 1908, section 89A (mediation) — Laws of Bangladesh
  7. Code of Criminal Procedure 1898, section 145(4) (inquiry as to possession) — Laws of Bangladesh
  8. ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ (ধারা ৪, ৫, ৭, ৮, ৯ ও ১৯) — Laws of Bangladesh
  9. বাংলা ট্রিবিউন, ২৭ জানুয়ারি ২০২১ — দেওয়ানি আদালতের আর্থিক বিচারিক এখতিয়ার বাড়লো
  10. High Court Division, Md Fazle Morhal v Nawsher Ali, Civil Revision No 212 of 2021 (29 October 2025)
  11. Dhaka Tribune, 21 July 2026 — Law minister: mediation yielding encouraging results in reducing case backlog
  12. High Court Division, Arju Miah v Rahima Begum, Civil Revision No 5422 of 2023 (22 July 2026)
  13. High Court Division, Mohammad Nurul Alam Chowdhury v Sree Shibu Prashad Dutta, Civil Revision No 4517 of 2023 (16 July 2025)
  14. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ১৯ মে ২০২৬ — ভূমি সেবা নিতে মানুষকে আর অযথা অফিসে ঘুরতে হবে না: প্রধানমন্ত্রী

TRW-এর সহায়তা

তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে

TRW ঘোষণামূলক ও দখল পুনরুদ্ধারের মামলা, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, দলিল বাতিল, বণ্টন ও অগ্রক্রয়, ভূমি অপরাধ আইনে দখল পুনরুদ্ধার এবং আপিল ও রিভিশনে উভয় পক্ষের হয়ে কাজ করে। আমাদের রিয়েল এস্টেট ও ভূমি বিরোধ অনুশীলন দেখুন অথবা আপনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

Message TRW on WhatsApp