তালাকের নিয়ম ২০২৬: নোটিশ, ৯০ দিন, খোলা, কাজি নিবন্ধন, দেনমোহর ও ভরণপোষণ

by Barrister Tahmidur Rahman | Oct 21, 2026 | Family & Private Client, Insights | 0 comments

TRW Insight / বাংলাদেশ

তালাকের নিয়ম না মেনে দেওয়া তালাক বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা তৈরি করে: বিয়ে আদৌ শেষ হলো কি না, দেনমোহর কবে পাওনা, নতুন বিয়ে বৈধ কি না। চেয়ারম্যানকে নোটিশ, ৯০ দিনের হিসাব, খোলা ও তাফউইজ, কাজি নিবন্ধন এবং দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবি, এক জায়গায় ধাপে ধাপে।

হালনাগাদ ২১ অক্টোবর ২০২৬আইনি বিশ্লেষণবাংলাদেশ22 মিনিটে পড়া

তালাকের নিয়ম ২০২৬: আইন কী বলে, কে কীভাবে তালাক দিতে পারেন

বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ শেষ করার তালাকের নিয়ম মুখে তিনবার "তালাক" বলা বা একটি স্ট্যাম্প কাগজে সই করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারা অনুযায়ী যিনি তালাক দেন তাকে লিখিতভাবে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার চেয়ারম্যান অথবা সিটি করপোরেশনের মেয়রকে নোটিশ দিতে হয় এবং তার কপি স্ত্রীকে দিতে হয়। চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে ৯০ দিন না পেরোলে তালাক কার্যকর হয় না।[1] [4] নোটিশ ছাড়া দেওয়া তালাক, এমনকি পারস্পরিক সম্মতির খোলা তালাকও, হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৫ সালে অকার্যকর ধরেছে।[6]

এই লেখায় একসঙ্গে পাবেন পুরো চিত্র: স্বামীর তালাক, কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরের ক্ষমতায় স্ত্রীর তালাক-ই-তাফউইজ, খোলা ও পারস্পরিক সম্মতির তালাক, ৩০ দিনের মধ্যে সালিশি পরিষদ, কাজি অফিসে নিবন্ধন ও ফি, ১৯৩৯ সালের আইনে আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদের কারণ, দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ, সন্তানের ভরণপোষণ এবং পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর অধীনে মামলা। শেষে আছে সেই ভুলগুলোর তালিকা, যেগুলোর কারণে বছর পেরিয়েও অনেকে জানেন না তারা আইনের চোখে এখনো বিবাহিত কি না।

তালাকের নিয়ম — চেয়ারম্যানকে দেওয়ার জন্য লিখিত তালাকের নোটিশ প্রস্তুত
লিখিত নোটিশ ছাড়া তালাকের প্রক্রিয়া শুরুই হয় না

সারসংক্ষেপ: মুসলিম স্বামী তালাক দিলে যত দ্রুত সম্ভব চেয়ারম্যান বা মেয়রকে লিখিত নোটিশ দিতে হয় এবং স্ত্রীকে কপি দিতে হয়; নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন পর, আর স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসবের পর, যেটি পরে হয়, তালাক কার্যকর হয়। কাবিননামায় ক্ষমতা দেওয়া থাকলে স্ত্রীও একই পদ্ধতিতে তালাক দিতে পারেন, না থাকলে খোলা অথবা পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হয়। তালাকের পর দেনমোহরের বাকি টাকা, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ ও সন্তানের ভরণপোষণ পাওনা থাকে; নিবন্ধন হয় নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজি) কাছে ১,০০০ টাকা ফিতে।

মূল বিষয়: চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ না দিলে তালাক কবে কার্যকর হলো, এমনকি আদৌ হলো কি না, সেটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ২০২৫ সালের পারভেজ হোসেন বনাম শোহানা শোহগী মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ বলেছে, পারস্পরিক সম্মতির খোলাতেও ৭(১) ধারার নোটিশ বাধ্যতামূলক; নোটিশ ছাড়া খোলা আইনগতভাবে অকার্যকর।[6]

এক নজরে

01

লিখিত নোটিশ

তালাক দেওয়ার পর চেয়ারম্যান বা মেয়রকে লিখিত নোটিশ, স্ত্রীকে কপি; না দিলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা।

02

৩০ দিন

নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান সমঝোতার জন্য সালিশি পরিষদ গঠন করবেন।

03

৯০ দিন

নোটিশ পৌঁছানোর ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর; স্ত্রী গর্ভবতী হলে প্রসব পর্যন্ত, যেটি পরে।

04

১,০০০ টাকা

কাজি অফিসে তালাক নিবন্ধনের সরকারি ফি; নিবন্ধনের সত্যায়িত কপি বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা।

05

২০০ টাকা

দেনমোহর, ভরণপোষণ বা বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় পারিবারিক আদালতে আরজির কোর্ট ফি।

সূচিপত্র

বাংলাদেশে তালাকের আইনি কাঠামো

বাংলাদেশে বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ প্রত্যেক ধর্মের ব্যক্তিগত আইনে চলে। মুসলমানদের ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি মুসলিম শরিয়া আইন, তবে তার ওপর চারটি বিধিবদ্ধ আইন পদ্ধতি ঠিক করে দিয়েছে: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (নোটিশ, সালিশি পরিষদ, ৯০ দিন, দেনমোহর ও ভরণপোষণ), মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ (স্ত্রীর আদালতে যাওয়ার কারণ), মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ (কাজির কাছে নিবন্ধন) এবং পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ (মামলার আদালত ও পদ্ধতি)।[1] [2] [3] [4]

পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ২৬ নং আইন) ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে কার্যকর হয়ে ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ রহিত করেছে।[2] তাই এখন কেউ "পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ" অনুযায়ী মামলার কথা বললে বুঝতে হবে, প্রযোজ্য আইন হলো ২০২৩ সালের আইন। এই আইন পার্বত্য জেলাগুলো ছাড়া সারা দেশে প্রযোজ্য।[2]

অন্য ধর্মের দম্পতিদের ক্ষেত্রে

এই লেখার তালাকের নিয়ম শুধু মুসলিম দম্পতির জন্য। হিন্দু শাস্ত্রীয় আইনে বিবাহবিচ্ছেদের বিধান নেই; একজন হিন্দু স্ত্রী ১৯৪৬ সালের আইনে নির্দিষ্ট কারণে পৃথক বাসস্থান ও ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন। খ্রিস্টানদের বিবাহবিচ্ছেদ হয় ১৮৬৯ সালের বিবাহবিচ্ছেদ আইনে, আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে; আর বিশেষ বিবাহ আইনে বিয়ে হলে বিচ্ছেদও আদালত ছাড়া হয় না।[4] [5]

স্বামীর তালাক: ধাপে ধাপে তালাকের নিয়ম

মুসলিম আইনে স্বামী তালাক দিতে পারেন, কিন্তু ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ সেই ক্ষমতার ওপর একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া চাপিয়েছে। ৭(১) ধারা বলছে, যে ব্যক্তি স্ত্রীকে তালাক দিতে চান, তিনি "যেকোনো পদ্ধতিতে" তালাক উচ্চারণের পর যত শীঘ্র সম্ভব চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দেবেন এবং তার একটি কপি স্ত্রীকে সরবরাহ করবেন।[1] মৌখিক তালাক, একসঙ্গে তিন তালাক বা লিখিত তালাকনামা, যে রূপেই হোক, এই নোটিশ ছাড়া প্রক্রিয়া শুরুই হয় না।

নোটিশ কার কাছে যাবে

অধ্যাদেশের ২(খ) ধারায় "চেয়ারম্যান" মানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যান (মেয়র), সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সরকার নিযুক্ত ব্যক্তি, অথবা স্থানীয় সংস্থা বাতিল থাকলে সেই দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি।[1] চেয়ারম্যান অমুসলিম হলে, নিজেই আবেদনকারী হলে বা অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে পরিষদ তার একজন মুসলিম সদস্য বা কাউন্সিলরকে এই কাজের জন্য নির্বাচন করবে।[1]

বাস্তবে নোটিশ সাধারণত স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন সেই ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তালাকের নোটিশ রেজিস্ট্রি ডাকে প্রাপ্তিস্বীকারসহ পাঠান অথবা হাতে জমা দিয়ে তারিখসহ গ্রহণের সিল নিন, কারণ ৯০ দিনের হিসাব শুরু হয় চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে।[1]

তালাকের নোটিশে কী লিখবেন

তালাকের নোটিশে স্বামী ও স্ত্রীর নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা, বিয়ের তারিখ ও কাবিননামার নিবন্ধন নম্বর, কোন তারিখে তালাক দেওয়া হয়েছে এবং সন্তানদের নাম ও বয়স উল্লেখ করুন। সঙ্গে কাবিননামার কপি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি রাখুন। স্ত্রীকে পাঠানো কপির ডাক রসিদ আলাদা করে সংরক্ষণ করুন; পরে দেনমোহর বা ভরণপোষণের মামলায় এগুলোই প্রমাণ।

নোটিশ না দিলে শাস্তি

৭(১) ধারা লঙ্ঘন করলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।[1] শাস্তির চেয়েও বড় ক্ষতি হলো দেওয়ানি ফল: নোটিশ ছাড়া তালাক কার্যকর হওয়ার তারিখ প্রমাণ করা যায় না, ফলে পরবর্তী বিয়ে, দেনমোহরের তামাদি ও উত্তরাধিকার, সবকিছু নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।[6]

ধাপ 01

কাবিননামা যাচাই

নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে কাবিননামার সত্যায়িত কপি তুলে দেনমোহর ও ১৮ নম্বর ঘর দেখুন।

ধাপ 02

তালাকের সিদ্ধান্ত ও লিখিত রূপ

তালাক, তাফউইজ না খোলা, তা ঠিক করে লিখিত তালাকনামা বা চুক্তি প্রস্তুত করুন।

ধাপ 03

চেয়ারম্যানকে নোটিশ

সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে লিখিত নোটিশ দিন এবং অপর পক্ষকে কপি পাঠান।

ধাপ 04

প্রাপ্তির প্রমাণ সংরক্ষণ

রেজিস্ট্রি ডাকের রসিদ, প্রাপ্তিস্বীকার বা গ্রহণের সিল যত্ন করে রাখুন; ৯০ দিন এখান থেকেই গোনা হয়।

ধাপ 05

সালিশি পরিষদে উপস্থিতি

৩০ দিনের মধ্যে গঠিত সালিশি পরিষদের বৈঠকে প্রতিনিধিসহ হাজির হন ও কার্যবিবরণী সংগ্রহ করুন।

ধাপ 06

৯০ দিন পার

গর্ভাবস্থা থাকলে প্রসব পর্যন্ত অপেক্ষা করুন; এ সময় ভরণপোষণ চালু রাখুন।

ধাপ 07

কাজি অফিসে নিবন্ধন

১,০০০ টাকা ফি দিয়ে তালাক নিবন্ধন করুন, রসিদ ও বিনা মূল্যের সত্যায়িত কপি নিন।

ধাপ 08

আর্থিক দাবি নিষ্পত্তি

দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ও সন্তানের ভরণপোষণ পরিশোধ বা দাবির জন্য মধ্যস্থতা বা পারিবারিক আদালতে যান।

তালাক কখন কার্যকর হয়: সালিশি পরিষদ ও ৯০ দিন

চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার জন্য সালিশি পরিষদ গঠন করবেন, এবং পরিষদ সমঝোতার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।[1] পরিষদ গঠিত হয় চেয়ারম্যান এবং দুই পক্ষের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে; কোনো পক্ষ নির্ধারিত সময়ে প্রতিনিধি মনোনয়ন না দিলে প্রতিনিধি ছাড়াই পরিষদ বৈধভাবে গঠিত হয়।[1] সালিশি বৈঠকে উপস্থিত থাকুন এবং কার্যবিবরণীর কপি চেয়ে নিন। তালাকের নিয়মে সবচেয়ে বেশি ভুল হয় পরের ধাপ, অর্থাৎ সময়ের হিসাবে।

৯০ দিনের হিসাব

৭(৩) ধারা অনুযায়ী, আগে প্রকাশ্যে বা অন্যভাবে প্রত্যাহার না করা হলে, চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর দিন থেকে ৯০ দিন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয় না।[1] এই ৯০ দিন দুজন আইনের চোখে স্বামী-স্ত্রী; স্বামীকে স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে হয় এবং চাইলে তারা তালাক প্রত্যাহার করে সংসার চালিয়ে যেতে পারেন।[5] তালাক কার্যকর হওয়ার তারিখ মানে তালাক উচ্চারণের তারিখ নয়, বরং নোটিশ পৌঁছানোর ৯০ দিন পরের তারিখ।

স্ত্রী গর্ভবতী হলে

তালাকের সময় স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে ৯০ দিন অথবা গর্ভাবস্থা, যেটি পরে শেষ হয়, তার আগে তালাক কার্যকর হয় না।[1] অর্থাৎ ৯০ দিনের মধ্যে সন্তান জন্ম নিলে সাধারণ ৯০ দিনের নিয়মই চলবে, আর ৯০ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রসব না হলে তালাক কার্যকর হবে প্রসবের পর।[5] এই পুরো সময় স্ত্রীর ভরণপোষণ ও চিকিৎসার দায় স্বামীর।[4]

একই স্বামীকে আবার বিয়ে

৭(৬) ধারা অনুযায়ী কার্যকর তালাকের পর স্ত্রী একই স্বামীকে আবার বিয়ে করতে পারেন, মাঝখানে তৃতীয় কারও সঙ্গে বিয়ের প্রয়োজন নেই, যদি না এটি তৃতীয়বার এভাবে কার্যকর হওয়া তালাক হয়।[1] তাই তথাকথিত "হিল্লা বিয়ে" প্রথম বা দ্বিতীয় কার্যকর তালাকের পর আইনের দাবি নয়।

তালাকের নিয়ম — ৯০ দিনের হিসাব রাখতে ক্যালেন্ডারে তারিখ চিহ্নিত
৯০ দিনের গণনা শুরু চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে

স্ত্রীর তালাক: তালাক-ই-তাফউইজ ও কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘর

স্ত্রীও তালাক দিতে পারেন, যদি স্বামী তাকে সেই ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন। একে বলে তালাক-ই-তাফউইজ বা অর্পিত তালাক। মানক কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে লেখা থাকে স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দিয়েছেন কি না, এবং দিলে শর্তসাপেক্ষে নাকি শর্তহীনভাবে।[7] এই ঘর পূরণ করা থাকলে স্ত্রী আদালতে না গিয়েই বিবাহ শেষ করতে পারেন, আর খোলার মতো দেনমোহর বা ভরণপোষণ ছেড়ে দিতে হয় না।[7]

অধ্যাদেশের ৮ ধারা বলছে, তালাকের ক্ষমতা যথাযথভাবে স্ত্রীকে অর্পিত হলে এবং তিনি তা প্রয়োগ করতে চাইলে, অথবা কোনো পক্ষ তালাক ছাড়া অন্যভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চাইলে, ৭ ধারার বিধান প্রয়োজনীয় পরিবর্তনসহ প্রযোজ্য হবে।[1] তাই স্ত্রীকেও চেয়ারম্যানকে লিখিত তালাকের নোটিশ দিতে হবে, স্বামীকে কপি দিতে হবে, এবং ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে। ১৮ নম্বর ঘরে "না" লেখা থাকলে বা ঘর ফাঁকা থাকলে স্ত্রীর পথ হলো খোলা অথবা পারিবারিক আদালতে মামলা।[5]

কাবিননামার কোন ঘর আগে দেখবেন

শুধু বাড়িতে রাখা কপির ওপর ভরসা না করে নিকাহ রেজিস্ট্রারের বালাম বই থেকে কাবিননামার সত্যায়িত কপি তুলুন। ১৩ থেকে ১৬ নম্বর ঘরে দেনমোহরের মোট পরিমাণ, মুয়াজ্জল ও মুয়াজ্জাল অংশ, বিয়ের সময় পরিশোধিত অংশ এবং দেনমোহরের বদলে দেওয়া সম্পত্তির হিসাব থাকে; ১৯ নম্বর ঘরে স্বামীর তালাকের অধিকারে কোনো শর্ত আছে কি না তা লেখা থাকে।[7] তালাকের আগে এই ঘরগুলো পড়ে নিলে পরবর্তী সব দাবির হিসাব পরিষ্কার হয়।

খোলা তালাক ও পারস্পরিক সম্মতিতে তালাক

খোলা তালাক হলো স্ত্রীর উদ্যোগে, স্বামীর সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ, যেখানে সাধারণত স্ত্রী দেনমোহরের পুরো বা কিছু অংশ ছেড়ে দেন বা অন্য কোনো বিনিময় দেন।[4] দুজনেই বিচ্ছেদ চাইলে তাকে মুবারাত বলা হয়। আইনে "খোলা" শব্দটি সরাসরি নেই, কিন্তু ৭ ধারা "যেকোনো পদ্ধতির" তালাকে এবং ৮ ধারা তালাক ছাড়া অন্যভাবে বিচ্ছেদে প্রযোজ্য, তাই খোলা তালাক ও মুবারাত দুটিই এই পদ্ধতির মধ্যে পড়ে।[1]

খোলাতেও নোটিশ বাধ্যতামূলক

অনেকে মনে করেন খোলা তালাক কাজি অফিসে এক বৈঠকেই শেষ হয়ে যায়। হাইকোর্ট বিভাগ ১৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মো. পারভেজ হোসেন বনাম মোসা. শোহানা শোহগী (দেওয়ানি রিভিশন নং ৯৭৩/২০২১) মামলায় বলেছে, খোলা স্বামীর সম্মতিতেই কার্যকর হয়, তাই এটি ৭(১) ধারার আওতায় পড়ে এবং চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক। নোটিশ না দেওয়ায় ওই খোলা অকার্যকর ধরা হয় এবং স্ত্রীর পক্ষের দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি বহাল থাকে।[6]

খোলার চুক্তিতে যা লিখবেন

খোলা তালাক বা মুবারাতের চুক্তিতে বিচ্ছেদের ধরন, কাবিননামার নিবন্ধন নম্বর, দেনমোহরের মোট পরিমাণ, কত পরিশোধ হয়েছে, স্ত্রী ঠিক কত টাকা ছাড়ছেন বা পাচ্ছেন, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ, সন্তানদের ভরণপোষণের অঙ্ক ও তারিখ, স্বর্ণালংকার ও ব্যক্তিগত জিনিস ফেরত এবং চলমান মামলা প্রত্যাহারের কথা স্পষ্ট লিখুন। স্বাধীন সাক্ষীর সামনে প্রতিটি পাতায় সই করুন। টাকা লেনদেন ৯০ দিন শেষে তালাক কার্যকর হওয়ার তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে করুন, কারণ এর আগে তালাক প্রত্যাহারযোগ্য।[1] বিস্তারিত চুক্তি কাঠামো আমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ বিষয়ক ইংরেজি বিশ্লেষণে আছে।

তালাকের ধরন: কে শুরু করেন, কী লাগে, দেনমোহরের কী হয়
তালাকের ধরনকে শুরু করেনমূল শর্তকখন কার্যকরদেনমোহর
স্বামীর তালাকস্বামীচেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ, স্ত্রীকে কপিনোটিশ পৌঁছানোর ৯০ দিন পর বা প্রসবের পরঅপরিশোধিত পুরোটা পাওনা
তালাক-ই-তাফউইজস্ত্রীকাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে ক্ষমতা অর্পণ; নোটিশএকইভাবে ৯০ দিন পরছাড়তে হয় না
খোলা তালাকস্ত্রী, স্বামীর সম্মতিতেলিখিত চুক্তি ও নোটিশ৯০ দিন পরচুক্তিতে যতটুকু ছাড়েন ততটুকু বাদ
মুবারাতউভয়েপারস্পরিক চুক্তি ও নোটিশ৯০ দিন পরচুক্তি অনুযায়ী
আদালতের ডিক্রিস্ত্রী (১৯৩৯ আইন)২ ধারার কারণ প্রমাণচেয়ারম্যান কপি পাওয়ার ৯০ দিন পর৫ ধারায় রক্ষিত

আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ: ১৯৩৯ সালের আইনের কারণ

তাফউইজের ক্ষমতা না থাকলে এবং স্বামী খোলায় রাজি না হলে স্ত্রী মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯-এর ২ ধারার এক বা একাধিক কারণে পারিবারিক আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি চাইতে পারেন।[3] প্রধান কারণগুলো হলো:

  • চার বছর ধরে স্বামীর কোনো খোঁজ না থাকা;
  • দুই বছর ধরে স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে অবহেলা বা ব্যর্থতা;
  • ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে স্বামীর আরেকটি বিয়ে;
  • স্বামীর সাত বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড (দণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার পর);
  • যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তিন বছর দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা;
  • বিয়ের সময় থেকে স্বামীর পুরুষত্বহীনতা, যা এখনো চলছে;
  • দুই বছর ধরে স্বামীর মানসিক ভারসাম্যহীনতা, কুষ্ঠ বা মারাত্মক যৌনরোগ;
  • ১৮ বছর বয়সের আগে অভিভাবকের দেওয়া বিয়ে ১৯ বছর হওয়ার আগে অস্বীকার, যদি দাম্পত্য মিলন না হয়ে থাকে;
  • নিষ্ঠুর আচরণ: অভ্যাসগত মারধর বা জীবন দুর্বিষহ করা, খারাপ চরিত্রের নারীর সঙ্গে মেলামেশা, অনৈতিক জীবনে বাধ্য করার চেষ্টা, স্ত্রীর সম্পত্তি হস্তান্তর বা তার অধিকারে বাধা, ধর্ম পালনে বাধা, অথবা একাধিক স্ত্রীর সঙ্গে সমান আচরণ না করা;
  • মুসলিম আইনে স্বীকৃত অন্য যেকোনো বৈধ কারণ।[3]

নিখোঁজ থাকার কারণে দেওয়া ডিক্রি ছয় মাস কার্যকর হয় না; এর মধ্যে স্বামী ফিরে এসে দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত বলে আদালতকে সন্তুষ্ট করলে ডিক্রি বাতিল হতে পারে।[3] ১৯৩৯ সালের আইনের ৫ ধারা বলছে, এই আইনের কোনো কিছুই বিচ্ছেদের পর স্ত্রীর দেনমোহরের অধিকার ক্ষুণ্ন করবে না।[3]

আদালতের ডিক্রিও চেয়ারম্যানের কাছে যায়

পারিবারিক আদালত মুসলিম আইনে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি দিলে ৭ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি ডাকে তার প্রত্যয়িত কপি সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের কাছে পাঠায়। চেয়ারম্যান এটিকে তালাকের নোটিশ হিসেবে গণ্য করে ব্যবস্থা নেন, এবং কপি পাওয়ার ৯০ দিন পর ডিক্রি কার্যকর হয়; এর মধ্যে দুজন আপস করলে ডিক্রির আর কার্যকারিতা থাকে না।[2] ২(viii)(ঘ) ধারার কারণ, অর্থাৎ স্ত্রীর সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ, ছাড়া অন্য কারণে দেওয়া বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল চলে না।[2]

তালাকের নিয়ম — পারিবারিক আদালতে বিবাহবিচ্ছেদ ও দেনমোহরের মামলার নথি
আদালতের ডিক্রিও চেয়ারম্যানের কাছে যায়, ৯০ দিন পর কার্যকর

কাজি অফিসে নিবন্ধন: তালাকের নিয়মের শেষ ধাপ

তালাক কার্যকর হওয়ার পর মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর ৬ ধারা অনুযায়ী যিনি তালাক দিয়েছেন তিনি এলাকার নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজি) কাছে তালাক নিবন্ধনের আবেদন করেন। নিবন্ধনের পর তার সত্যায়িত কপি বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা।[5] তালাক নিবন্ধন ছাড়া পরবর্তী বিয়ে, পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রে বৈবাহিক অবস্থা বদল, কিংবা বিদেশে ভিসার আবেদনে তালাক প্রমাণ করার মতো সরকারি নথি থাকে না।

তালাক নিবন্ধন ফি

আইন ও বিচার বিভাগের ২১ ডিসেম্বরের প্রজ্ঞাপনে তালাক নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করা হয়েছে, যা ৩ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে প্রকাশিত হয়।[8] কাজি এর বেশি দাবি করলে লিখিত রসিদ চান; রসিদই প্রমাণ করে নিবন্ধন যথাযথভাবে হয়েছে। চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ দেওয়ার জন্য অধ্যাদেশের ৭ ধারায় আলাদা কোনো ফি নির্ধারিত নেই।[1]

২০২৫ সালের বিধিমালা সংশোধন ও তালাক সনদ

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯-এর সংশোধনী (ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত) অনুযায়ী ম্যানুয়াল পদ্ধতির পাশাপাশি অনলাইনেও বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন করা যাবে, ফি ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া যাবে, এবং নিকাহ রেজিস্ট্রার পক্ষদের চাহিদা অনুযায়ী ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য ও নিবন্ধনের বিবরণসহ "ছ১" ফরমে তালাক সনদ দিতে পারবেন।[9] ৩ অক্টোবর ২০২৬ আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন অনলাইনে হবে এবং তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে যুক্ত হবে; তবে চালুর তারিখ জানানো হয়নি।[10]

তালাক নিবন্ধনের জন্য যা নিয়ে যাবেন

  • কাবিননামা বা বিয়ের নিবন্ধনের সত্যায়িত কপি;
  • চেয়ারম্যানকে দেওয়া তালাকের নোটিশের কপি ও প্রাপ্তিস্বীকার;
  • ৯০ দিন শেষে সমঝোতা হয়নি মর্মে চেয়ারম্যান কার্যালয়ের প্রত্যয়ন (যেখানে দেওয়া হয়);
  • তাফউইজের ক্ষেত্রে ১৮ নম্বর ঘরে ক্ষমতা অর্পণের প্রমাণ, খোলার ক্ষেত্রে সই করা চুক্তি;
  • দুই পক্ষ ও সাক্ষীর জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ছবি।

দেনমোহর: তালাকের পর কখন, কত টাকা পাওনা

দেনমোহর স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি, স্বামীর দয়া নয়। কাবিননামায় দেনমোহর সাধারণত দুই ভাগে লেখা থাকে: মুয়াজ্জল (তাৎক্ষণিক), যা স্ত্রী চাইলেই দিতে হয়, এবং মুয়াজ্জাল (বিলম্বিত), যা বিবাহ মৃত্যু বা তালাকে শেষ হলে পাওনা হয়।[7] ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ১০ ধারা অনুযায়ী কাবিননামায় পরিশোধের পদ্ধতি উল্লেখ না থাকলে পুরো দেনমোহর চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য।[1]

তালাক কার্যকর হলে দেনমোহরের অপরিশোধিত পুরো অংশ পাওনা হয়ে যায়, আর তালাক যে-ই দিন, স্ত্রীর এই অধিকার থাকে; খোলায় স্ত্রী যতটুকু ছেড়ে দিতে লিখিতভাবে রাজি হন, শুধু ততটুকুই বাদ যায়।[4] [5] আদালতের ডিক্রিতে বিচ্ছেদ হলেও ১৯৩৯ সালের আইনের ৫ ধারা দেনমোহর রক্ষা করে।[3] আর স্বামী সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করলে বর্তমান স্ত্রীর মুয়াজ্জল ও মুয়াজ্জাল সব দেনমোহর তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হয়; না দিলে তা বকেয়া ভূমি রাজস্বের মতো আদায়যোগ্য।[1]

দেনমোহর আদায়ের মামলা

দেনমোহরের মামলা পারিবারিক আদালতে, ২০০ টাকা কোর্ট ফিতে করা যায়, এবং স্ত্রী যে এলাকায় সাধারণত বসবাস করেন সেখানকার আদালতেও মামলা চলে।[2] ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেনমোহরের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল চলে না, তাই প্রথম আদালতেই সব প্রমাণ দিতে হয়।[2] তামাদির সময়, প্রমাণ ও স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তি থেকে আদায়ের বিস্তারিত পাবেন আমাদের দেনমোহর আদায় বিষয়ক ইংরেজি বিশ্লেষণে।

মুদ্রাস্ফীতি ও ২০২৬ সালের হাইকোর্টের রুল

২০ বছর আগে লেখা এক লাখ টাকার দেনমোহর আজ অনেক কম মূল্যের। ১৩ জুলাই ২০২৬ বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার মূল্য হ্রাস বিবেচনায় দীর্ঘদিন পর পাওনা হওয়া দেনমোহর নির্ধারণ ও আদায়ে ১০ ধারার আওতায় নির্দেশিকা তৈরির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না।[14] রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দেনমোহর কাবিননামায় লেখা টাকার অঙ্কেই আদায় হয়।

ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ ও তালাকের পর স্ত্রীর অধিকার

তালাকের পর স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হয়, এবং ইদ্দতকালে স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার তার আছে; স্ত্রী গর্ভবতী হলে ইদ্দত চলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত।[4] বাস্তবে ৯০ দিনের নোটিশ-কাল আর ইদ্দতের সময় অনেকটা মিলে যায়, কারণ তালাক কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বহাল থাকে এবং স্বামীকে স্বাভাবিক ভরণপোষণ দিতে হয়।[1] [5]

ইদ্দতের পর কি ভরণপোষণ চলে?

না। মো. হেফজুর রহমান বনাম শামসুন নাহার বেগম মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ সুরা বাকারার ২৪১ আয়াতের ভিত্তিতে ইদ্দতের পরও যুক্তিসংগত ভরণপোষণের কথা বলেছিলেন, কিন্তু ১৯৯৮ সালে আপিল বিভাগ সেই রায় বাতিল করেন।[11] তাই তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম স্ত্রী অনির্দিষ্টকালের ভরণপোষণ পান না; তিনি পান অপরিশোধিত দেনমোহর, তালাক কার্যকর হওয়া পর্যন্ত বকেয়া ভরণপোষণ, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং সন্তানদের ভরণপোষণ।

বিয়ের মধ্যে ভরণপোষণ না দিলে

বিয়ে চলাকালে স্বামী পর্যাপ্ত ভরণপোষণ না দিলে, বা একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমানভাবে না দিলে, স্ত্রী অন্য আইনি প্রতিকারের পাশাপাশি ৯ ধারায় চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে পারেন। সালিশি পরিষদ ভরণপোষণের অঙ্ক নির্ধারণ করে সার্টিফিকেট দিতে পারে, যার বিরুদ্ধে সহকারী জজের কাছে রিভিশন চলে, এবং সময়মতো না দিলে টাকা বকেয়া ভূমি রাজস্বের মতো আদায় হয়।[1] তালাকের পর স্ত্রীর সব অধিকারের তালিকা আছে আমাদের ইংরেজি বিশ্লেষণে।

সন্তানের ভরণপোষণ ও পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩

সন্তানের ভরণপোষণের দায় বাবার, এবং তালাক এই দায় শেষ করে না। পারিবারিক আদালত আইনের ৫ ধারায় বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধানের মামলার এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের।[2] মা নিজের দাবির সঙ্গে একই মামলায় সন্তানদের ভরণপোষণ চাইতে পারেন।

ভরণপোষণ কত দিন, কত টাকা

আইনে ভরণপোষণের কোনো নির্দিষ্ট সূত্র নেই; আদালত বাবার আয় ও জীবনমান এবং সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও থাকার খরচ মিলিয়ে অঙ্ক ঠিক করেন। বাগেরহাটের একটি মামলায় পারিবারিক আদালত প্রতিটি সন্তানের জন্য মাসিক ভরণপোষণ দিয়েছিলেন মেয়ের বিয়ে ও ছেলের সাবালকত্ব পর্যন্ত, সঙ্গে স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহর ১৫,০০১ টাকা ও ইদ্দতকালীন ৩,০০০ টাকা। ১৩ জুলাই ২০২৫ হাইকোর্ট বিভাগ বলেছে, বাবা পরে সন্তানদের নিজের হেফাজতে নিতে চাইলেও চূড়ান্ত ডিক্রি এড়ানো যায় না।[12]

মামলা কোথায়, কীভাবে

মামলা করা যায় যেখানে মামলার কারণ ঘটেছে বা পক্ষরা একসঙ্গে বসবাস করতেন সেখানে, আর বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলায় স্ত্রী যেখানে সাধারণত বসবাস করেন সেখানেও।[2] আরজির কোর্ট ফি ২০০ টাকা। বাদীর খরচে বিবাদীর ইমেইলেও সমন পাঠানো যায়, যা প্রবাসী স্বামীর ক্ষেত্রে কাজে আসে। লিখিত জবাবের পর ৩০ দিনের মধ্যে বিচার-পূর্ব শুনানিতে আদালত আপসের চেষ্টা করেন, আর আপস হলে সেই চুক্তির ভিত্তিতে ডিক্রি হয়।[2] জরুরি প্রয়োজনে আদালত অন্তর্বর্তী আদেশও দিতে পারেন।[2]

ডিক্রি জারি ও আপিল

অর্থের ডিক্রি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না হলে সেই সময় পেরোনোর এক বছরের মধ্যে জারির আবেদন করতে হয়। আদালত দেওয়ানি ডিক্রির মতো সম্পত্তি ক্রোক করতে পারেন, অথবা জরিমানার মতো আদায়ে পরোয়ানা দিয়ে অনধিক তিন মাস বা পরিশোধ পর্যন্ত, যেটি আগে হয়, কারাদণ্ড দিতে পারেন; প্রয়োজনে কিস্তিতে পরিশোধের আদেশও দেওয়া যায়।[2] রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ৩০ দিনের মধ্যে পারিবারিক আপিল আদালতে।[2] পুরো পদ্ধতি দেখুন আমাদের ভরণপোষণ মামলা বিষয়ক ইংরেজি বিশ্লেষণে।

২০২৬ সাল থেকে আগে মধ্যস্থতা

আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৪৫ নং আইন) মূল আইনে ২১খ ধারা যোগ করেছে। তফসিলভুক্ত বিরোধে মামলার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার আবেদন করতে হয়; মধ্যস্থতা ব্যর্থ হলে প্রতিবেদনসহ মামলা করা যায়, আর মধ্যস্থতায় ব্যয়িত সময় তামাদি থেকে বাদ যায়। এসআরও নং ২৮৮ অনুযায়ী ৩১ জুলাই ২০২৬ থেকে ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, সিলেট, কুমিল্লা, বগুড়া, যশোর, কক্সবাজার ও টাঙ্গাইলসহ ৩০টি জেলায় এটি চালু।[13] ঢাকা ও চট্টগ্রাম এই তালিকায় নেই; মামলার আগে সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন দেখে নিন।

সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব আলাদা বিষয়; বিস্তারিত দেখুন সন্তানের হেফাজত বিষয়ক ইংরেজি বিশ্লেষণে।

তালাকের নিয়ম — তালাকের পর মা ও সন্তান, সন্তানের ভরণপোষণ বাবার দায়
তালাক বাবার ভরণপোষণের দায় শেষ করে না

তালাকের নিয়ম মানতে যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

আমাদের অভিজ্ঞতায় তালাকের নিয়ম ভাঙে কয়েকটি পরিচিত জায়গায়, আর প্রতিটির ফল বছরের পর বছর টানতে হয়।

  • চেয়ারম্যানকে নোটিশ না দেওয়া: শুধু তালাকনামা বা হলফনামায় তালাক দিলে তা দণ্ডনীয় এবং কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ; খোলার ক্ষেত্রেও একই কথা।[1] [6]
  • ৯০ দিনের আগে নতুন বিয়ে: তালাক কার্যকর হওয়ার আগে বিবাহ বহাল থাকে, তাই এর মধ্যে স্বামীর আরেক বিয়ে অনুমতিহীন বহুবিবাহ হয়ে যেতে পারে।[1]
  • গর্ভাবস্থা গোপন রাখা বা উপেক্ষা করা: প্রসবের আগে তালাক কার্যকর হয় না, এবং এ সময় ভরণপোষণ চালু থাকে।[1]
  • দেনমোহর নিয়ে অস্পষ্ট মুক্তিপত্র: "সব পাওনা বুঝে পেয়েছি" ধরনের এক লাইনের ঘোষণা পরে বিরোধ বাড়ায়; মোট, পরিশোধিত ও ছেড়ে দেওয়া অঙ্ক আলাদা লিখুন।
  • নিবন্ধন না করা বা ভুল সময়ে করা: ৯০ দিন শেষ হওয়ার আগের তারিখে নিবন্ধিত তালাক সনদ বিদেশে বা আদালতে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
  • সন্তানের ভরণপোষণ "মাফ" করানো: মা চুক্তিতে ছেড়ে দিলেও সন্তানের স্বার্থ আদালত আলাদা করে দেখেন।[12]
  • মধ্যস্থতা এড়িয়ে সরাসরি মামলা: বিজ্ঞাপিত জেলায় লিগ্যাল এইড অফিসের প্রতিবেদন ছাড়া আরজি দাখিল সমস্যায় পড়ে।[13]
  • ডিক্রি পেয়ে বসে থাকা: পরিশোধের সময় পেরোনোর এক বছরের মধ্যে জারির আবেদন না করলে ডিক্রির জোর হারায়।[2]

২০২৬ সালে যেসব পরিবর্তনে নজর রাখবেন

তিনটি বিষয় আগামী এক বছরে তালাক ও তার আর্থিক দাবির চর্চা বদলে দিতে পারে। প্রথমত, অনলাইন নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে বৈবাহিক তথ্য যুক্ত হলে নিবন্ধনহীন বা ভুয়া তালাকের সুযোগ কমবে।[10] দ্বিতীয়ত, দেনমোহরে মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনার রুলের নিষ্পত্তি দেনমোহরের হিসাব বদলে দিতে পারে।[14] তৃতীয়ত, বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা আরও জেলায় ছড়ালে দেনমোহর ও ভরণপোষণের বেশির ভাগ বিরোধ লিগ্যাল এইড অফিসেই শুরু হবে।[13]

তালাক দেওয়ার নিয়ম ঠিকভাবে মানা হলে পরবর্তী সব দাবি সহজ হয়: সঠিক নোটিশ, প্রাপ্তির প্রমাণ, ৯০ দিনের সঠিক হিসাব, পরিষ্কার চুক্তি ও নিবন্ধন। TRW-এর ইসলামি পারিবারিক আইন প্র্যাকটিস তালাকের নোটিশ, খোলার চুক্তি, দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলা পরিচালনা করে, আর পারিবারিক মধ্যস্থতা ও নিষ্পত্তি দল আদালতের বাইরে সমাধানে সহায়তা করে। ইংরেজিতে পুরো প্রক্রিয়া পড়তে দেখুন Muslim divorce procedure in Bangladesh।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাংলাদেশে তালাকের নিয়ম অনুযায়ী তালাক কখন কার্যকর হয়?

চেয়ারম্যান বা মেয়রের কাছে লিখিত নোটিশ পৌঁছানোর দিন থেকে ৯০ দিন পর, যদি এর মধ্যে তালাক প্রত্যাহার না হয়। স্ত্রী গর্ভবতী হলে ৯০ দিন বা প্রসব, যেটি পরে হয়।[1]

মুখে তিন তালাক বললেই কি তালাক হয়ে যায়?

না। যেকোনো পদ্ধতিতে তালাক দিলেও ৭ ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দিতে হয় এবং ৯০ দিন পেরোতে হয়; নোটিশ না দেওয়া দণ্ডনীয়।[1]

তালাকের নোটিশ কোথায় পাঠাতে হয়?

সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার চেয়ারম্যান অথবা সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসকের কাছে, আর একটি কপি অপর পক্ষকে।[1] [5]

স্ত্রী কি নিজে তালাক দিতে পারেন?

পারেন, যদি কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে স্বামী তাকে তালাকের ক্ষমতা দিয়ে থাকেন। না থাকলে খোলা অথবা ১৯৩৯ সালের আইনের কারণ দেখিয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হয়।[5] [7]

খোলা তালাকে কি চেয়ারম্যানকে নোটিশ দিতে হয়?

হ্যাঁ। ১৬ নভেম্বর ২০২৫ হাইকোর্ট বিভাগ বলেছে, পারস্পরিক খোলাতেও ৭(১) ধারার নোটিশ বাধ্যতামূলক, নোটিশ ছাড়া খোলা অকার্যকর।[6]

কাজি অফিসে তালাক নিবন্ধনের ফি কত?

সরকারি ফি ১,০০০ টাকা, যা ৫০০ টাকা থেকে বাড়ানো হয়েছে; নিবন্ধনের সত্যায়িত কপি বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা।[5] [8]

তালাক দিলে কি স্ত্রী দেনমোহর পান?

হ্যাঁ। তালাক কার্যকর হলে অপরিশোধিত পুরো দেনমোহর পাওনা হয়; খোলায় স্ত্রী যতটুকু ছেড়ে দিতে রাজি হন শুধু ততটুকু বাদ যায়। আদালতের ডিক্রিতে বিচ্ছেদেও দেনমোহর রক্ষিত।[3] [4]

ইদ্দতের পরও কি স্ত্রী ভরণপোষণ পাবেন?

না। আপিল বিভাগ ১৯৯৮ সালে হেফজুর রহমান মামলায় ইদ্দতের পর ভরণপোষণের রায় বাতিল করেছেন। তবে বকেয়া ও ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং সন্তানের ভরণপোষণ পাওনা থাকে।[11]

সন্তানের ভরণপোষণ কত দিন দিতে হয়?

আইনে নির্দিষ্ট সূত্র নেই, তবে পারিবারিক আদালতের ডিক্রিতে সাধারণত ছেলের সাবালকত্ব ও মেয়ের বিয়ে পর্যন্ত ভরণপোষণ দেওয়া হয়, যা হাইকোর্ট বিভাগ বহাল রেখেছে।[12]

দেনমোহর বা ভরণপোষণের মামলার আগে কি মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক?

৩১ জুলাই ২০২৬ থেকে বিজ্ঞাপিত ৩০টি জেলায় তফসিলভুক্ত বিরোধে আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার আবেদন করতে হয়; ব্যর্থ হলে প্রতিবেদনসহ পারিবারিক আদালতে মামলা।[13]

সূত্র তালিকা

প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র

উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।

  1. Muslim Family Laws Ordinance, 1961 (Ordinance No. VIII of 1961), ধারা ২, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ — Laws of Bangladesh
  2. পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ২৬ নং আইন) — বাংলাদেশ আইন
  3. মুসলমান বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ (১৯৩৯ সালের ৮ নং আইন), ধারা ২ ও ৫ — বাংলা পাঠ, BD Service Rules
  4. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২৯ নভেম্বর ২০২৫ — বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে আইনে যা আছে
  5. প্রথম আলো, ২৭ মে ২০২৩ — ডিভোর্সের যে আইনগুলো জানা প্রয়োজন
  6. হাইকোর্ট বিভাগ, ১৬ নভেম্বর ২০২৫ — Md. Parvej Hossain v Mst. Shohana Shohgi, Civil Revision No. 973 of 2021
  7. The Daily Star, Law and Our Rights, 2 March 2023 — The intricacies of kabinnama
  8. দৈনিক ইত্তেফাক, ৩ জানুয়ারি ২০২৩ — বিয়ে করবেন? বাড়লো খরচ! তালাকেও
  9. BD Service Rules, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ — মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯-এর সংশোধন
  10. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ৩ অক্টোবর ২০২৬ — বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন হবে অনলাইনে, তথ্য যুক্ত হবে এনআইডি-পাসপোর্টে: আইনমন্ত্রী
  11. The Daily Star — Redress for women divorced unjustly (Hefzur Rahman v Shamsun Nahar Begum)
  12. হাইকোর্ট বিভাগ, ১৩ জুলাই ২০২৫ — Kazi Abdul Mannan v Chyna Begum, Civil Revision No. 1672 of 2021 (সন্তানের ভরণপোষণের ডিক্রি জারি)
  13. আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০, ধারা ২১খ (২০২৬ সনের ৪৫ নং আইন দ্বারা সন্নিবেশিত) ও এসআরও নং ২৮৮-আইন/২০২৬ — বাংলাদেশ আইন
  14. The Financial Express, 13 July 2026 — High Court issues rule seeking guidelines on deferred dower payments

TRW-এর সহায়তা

তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে

TRW তালাকের নোটিশ ও সালিশি পরিষদ, তাফউইজ ও খোলার চুক্তি, কাজি অফিসে নিবন্ধন, এবং পারিবারিক আদালতে দেনমোহর, ভরণপোষণ ও সন্তানের হেফাজতের মামলায় স্বামী, স্ত্রী ও পরিবারকে সহায়তা করে। দেখুন আমাদের ইসলামি পারিবারিক আইন প্র্যাকটিস, অথবা আপনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

Message TRW on WhatsApp