বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া: এজাহার থেকে রায়, আপিল ও আপিল বিভাগ পর্যন্ত
থানায় দায়ের হওয়া মামলার (জিআর মামলা) ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া শুরু হয় ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ধারা ১৫৪ অনুযায়ী থানায় এজাহার (FIR) দায়েরের মাধ্যমে, আর শেষ হয় বিচারিক আদালতের রায়ে; এরপর আপিল আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়াতে পারে। মাঝখানে থাকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ড, তদন্ত, অভিযোগপত্র (চার্জশিট) বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন, ম্যাজিস্ট্রেটের আমলে গ্রহণ (cognizance), দায়রা আদালতে প্রেরণ, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও রায়।
এই গাইডে ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সালের ১১ নং আইন, ১০ আগস্ট ২০২৫ থেকে কার্যকর) প্রতিফলিত হয়েছে, যার মধ্যে ধারা ১৭৩খ-এর নতুন ৬০ কার্যদিবসের তদন্তসীমাও রয়েছে।
- কোথা থেকে শুরু
- সংশ্লিষ্ট এলাকার এখতিয়ারসম্পন্ন থানা (এজাহার); এরপর মুখ্য মহানগর হাকিম (CMM, ঢাকা মহানগর) বা চিফ জুডিশিয়াল…
- মূল আইন
- ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৬ক, ৫৪, ৬১, ১৫৪-১৭৩খ, ১৯০, ২০৫গ, ২৬৫ক-২৬৫ঠ, ৩৩৯গ, ৩৪২, ৩৭৪-৩৭৬, ৪১০, ৪১৭, ৪২০-৪২৩, ৪৩৫-৪৩৯ক…
- সাধারণ সময়কাল
- নির্দেশক হিসেবে তদন্তে ৩-১২ মাস, এরপর ঢাকায় দায়রা বিচারে ২-৬ বছর; হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে আপিলে আরও ৩-১০ বছর…
- কে মামলা করতে পারেন
- ভুক্তভোগী, আত্মীয়, সাক্ষী বা পুলিশ কর্মকর্তা, যে কেউ আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য দিতে পারেন; রাষ্ট্র পাবলিক প্রসিকিউটরের…
বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া: প্রতিটি পর্যায় ধাপে ধাপে
“পরের” চাপুন, কিবোর্ডের তীর-চিহ্ন ব্যবহার করুন অথবা ম্যাপে কোনো আদালতে ট্যাপ করুন। সোনালি চিহ্ন দেখায় আপনার মামলা এখন কোথায়, আর সবুজ রেখা দেখায় মামলাটি কোন পথে এসেছে। পূর্ণ অভিজ্ঞতার জন্য পূর্ণ স্ক্রিনে চালান।
প্রতিটি ধাপ লেখা আকারে পড়ুন
ধাপ ১ · এজাহার, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডথানায় এজাহার দায়ের
থানার মামলায় বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া শুরু হয় যখন সংবাদদাতা ঘটনাস্থল যে থানার আওতায়, সেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) কোনো আমলযোগ্য অপরাধের (cognizable offence) তথ্য দেন। কর্মকর্তাকে তা লিখে নিতে হবে, পড়ে শোনাতে হবে, সংবাদদাতার স্বাক্ষর নিতে হবে এবং রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করতে হবে। এটিই ধারা ১৫৪-এর অধীন প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা এজাহার, এবং সংবাদদাতা বিনামূল্যে এর অনুলিপি পান। আমলঅযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ কেবল সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে এবং সংবাদদাতাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যেতে বলে (ধারা ১৫৫)। এজাহারে সময়, স্থান, আসামিদের নাম, প্রত্যেকের ভূমিকা ও সাক্ষীদের নাম থাকা উচিত।
পরে ঘটনার বিবরণ বদলালে বিচারে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
কোথায়: থানা (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তদন্তকারী কর্মকর্তা) · সময়: একই দিন · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৫৪; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৫৫; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪(১)(চ) (আমলযোগ্য অপরাধ) · কাগজপত্র: সংবাদদাতার স্বাক্ষরিত লিখিত এজাহার (FIR), সংবাদদাতার জাতীয় পরিচয়পত্র, মেডিকেল সনদ বা ছবি (যদি থাকে)
পরামর্শ: দেরি না করে এজাহার দায়ের করুন; ব্যাখ্যাহীন বিলম্ব হলো সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি, যার ভিত্তিতে আসামিপক্ষ মামলাকে চ্যালেঞ্জ করে।
ধাপ ২ · এজাহার, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডগ্রেপ্তার ও ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা
প্রতিস্থাপিত ধারা ৫৪-তে বর্ণিত পরিস্থিতিতে পুলিশ পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে। আগস্ট ২০২৫ থেকে ধারা ৪৬ক অনুযায়ী গ্রেপ্তারকারী কর্মকর্তাকে স্পষ্ট পরিচয়চিহ্ন পরতে হবে এবং চাইলে পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। কর্মকর্তাকে পরিবারের কোনো সদস্য বা স্থানীয় সাক্ষীর সত্যায়নসহ গ্রেপ্তারি স্মারক (arrest memorandum) তৈরি করতে হবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একজন আত্মীয়কে জানাতে হবে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে। ধারা ৬১ ও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩ অনুযায়ী গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হবে এবং যাতায়াতের সময় বাদে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে।
কোথায়: থানা (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তদন্তকারী কর্মকর্তা) · সময়: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৬ক-৪৬ঙ (২০২৬ সালের ১১ নং আইন দ্বারা সন্নিবেশিত); ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৫৪ (২০২৬ সালের ১১ নং আইন দ্বারা প্রতিস্থাপিত); ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৬১; সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩ · কাগজপত্র: গ্রেপ্তারি স্মারক, প্রেরণ প্রতিবেদন (ফরওয়ার্ডিং), আঘাত বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত নোট (যদি থাকে)
পরামর্শ: পরিবারের সদস্যদের উচিত গ্রেপ্তারি স্মারকের একটি অনুলিপি চাওয়া; এটি এখন আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং এতে গ্রেপ্তারের সময় নির্ধারিত হয়ে যায়।
ধাপ ৩ · এজাহার, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডরিমান্ড শুনানি: পুলিশ হেফাজত নাকি বিচারিক হেফাজত
২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা কেস ডায়েরির সংশ্লিষ্ট অংশসহ আসামিকে আদালতে পাঠান এবং ধারা ১৬৭ অনুযায়ী পুলিশ রিমান্ড চাইতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ দিন পর্যন্ত আটক রাখার অনুমতি দিতে পারেন, তবে কোনো অবস্থাতেই মোট পুলিশ হেফাজত ১৫ দিনের বেশি হতে পারবে না। এর পরের যেকোনো আটক কারাগারে বিচারিক হেফাজত হিসেবে হতে হবে। কারণ লিপিবদ্ধ করতে হবে। হস্তান্তরের আগে ম্যাজিস্ট্রেট মেডিকেল পরীক্ষার আদেশ দিতে পারেন, আর ফেরত আসার পর আসামি নির্যাতনের অভিযোগ করলে তা অবশ্যই দিতে হবে। আসামিপক্ষের আইনজীবী একই শুনানিতে রিমান্ডের বিরোধিতা করেন এবং জামিনের আবেদন করেন।
কোথায়: চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা · সময়: একই দিন; সাধারণত ১-৭ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয় · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৬৭(১)-(৩); ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৬৭(২) (প্রতিস্থাপিত) ও ধারা ১৬৭(২ক) (সন্নিবেশিত), ২০২৬ সালের ১১ নং আইন; ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ, ৫৫ ডিএলআর ৩৬৩ এবং ৬৯ ডিএলআর (এডি) ৬৩ (রিমান্ড নির্দেশিকা) · কাগজপত্র: প্রেরণ প্রতিবেদন ও রিমান্ডের আবেদন, কেস ডায়েরির উদ্ধৃতি, জামিনের আবেদন, মেডিকেল প্রতিবেদন
পরামর্শ: প্রথমবার হাজির করার সময়ই কোনো আঘাত থাকলে তা লিপিবদ্ধ করতে ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধ করুন; রিমান্ডকালে নির্যাতনের বিরুদ্ধে এটিই সবচেয়ে শক্ত সুরক্ষা।
ধাপ ৪ · এজাহার, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জামিন
জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন পাওয়া অধিকার। জামিন-অযোগ্য অপরাধে, আসামি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে ধারা ৪৯৭ জামিনে বাধা দেয়। তবুও আদালত ষোলো বছরের কম বয়সী কাউকে, কোনো নারীকে, কিংবা অসুস্থ বা অক্ষম কাউকে মুক্তি দিতে পারেন। জামিন নামঞ্জুর হলে আসামি ধারা ৪৯৮ অনুযায়ী দায়রা জজের কাছে এবং পরে হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করতে পারেন।
আলাদাভাবে, দীর্ঘদিনের পুরোনো ধারা ১৬৭(৫) (১৯৯২ সাল থেকে চালু, ২০২৬ সালের সংশোধনী নয়) অনুযায়ী ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে ম্যাজিস্ট্রেট, অথবা মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন বা দশ বছরের বেশি দণ্ডযোগ্য অপরাধে দায়রা আদালত, আসামিকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন। এটি আদালতের বিবেচনাধীন, স্বয়ংক্রিয় নয়।
কোথায়: চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা · সময়: কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৬-৪৯৮; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৬৭(৫) (১৯৯২ সালের ৪২ নং আইন দ্বারা প্রতিস্থাপিত); ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৮(২) ও ধারা ৪৯৯(৩) (জামিনের শর্ত ও অনলাইন বন্ড, ২০২৬ সালের ১১ নং আইন) · কাগজপত্র: জামিনের আবেদন, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ জামিনদারের বন্ড, অসুস্থতার ভিত্তিতে আবেদন করলে চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজ
পরামর্শ: জাতীয় পরিচয়পত্রসহ জামিনদার আগেই প্রস্তুত রাখুন; জামিনদার যাচাইয়ে বিলম্বের কারণে প্রায়ই জামিন মঞ্জুরের পরও মানুষকে কারাগারে থাকতে হয়।
ধাপ ৫ · তদন্ত ও পুলিশ প্রতিবেদনপুলিশের তদন্ত
তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, খসড়া মানচিত্র ও জব্দতালিকা তৈরি করেন এবং আলামত ফরেনসিক ল্যাবে পাঠান। তিনি ধারা ১৬১ অনুযায়ী সাক্ষীদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন এবং চিকিৎসা, ময়নাতদন্ত ও ডিজিটাল সাক্ষ্য সংগ্রহ করেন। কঠোর সুরক্ষাব্যবস্থা মেনে একজন ম্যাজিস্ট্রেট ধারা ১৬৪ অনুযায়ী স্বীকারোক্তি বা সাক্ষীর জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করতে পারেন। ২০২৫ সাল থেকে ধারা ১৭৩খ অনুযায়ী প্রতিটি তদন্ত তথ্য পাওয়ার ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করতে হবে। লিপিবদ্ধ কারণে কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে সময় বাড়িয়ে নিতে পারেন, আর অযৌক্তিক বিলম্বকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
কোথায়: থানা (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তদন্তকারী কর্মকর্তা) · সময়: ৬০ কার্যদিবস, প্রায়ই ৬-১২ মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয় · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৫৬-১৬১; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৬৪; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৭৩খ (২০২৬ সালের ১১ নং আইন দ্বারা সন্নিবেশিত) · কাগজপত্র: জব্দতালিকা, ধারা ১৬১-এর জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত বা মেডিকেল প্রতিবেদন, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ধারা ১৬৪-এর জবানবন্দি
পরামর্শ: ধারা ১৬৪-এর স্বীকারোক্তি অবশ্যই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হতে হবে এবং সতর্ক করার পর লিপিবদ্ধ করতে হবে; স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করতে চাইলে কারণসহ দ্রুত আবেদন করতে হবে।
ধাপ ৬ · তদন্ত ও পুলিশ প্রতিবেদনঅন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ও আসামির আগাম অব্যাহতি
নতুন ধারা ১৭৩ক অনুযায়ী তত্ত্বাবধানকারী পুলিশ কমিশনার বা পুলিশ সুপার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন চাইতে পারেন। এতে কোনো নির্দিষ্ট আসামির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য না পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো যায়, এবং বাকিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তিনি ওই ব্যক্তিকে অব্যাহতি দিতে পারেন। এই অব্যাহতি চূড়ান্ত নয়। পরে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য পাওয়া গেলে চূড়ান্ত পুলিশ প্রতিবেদনে ওই ব্যক্তির নাম আবারও আসতে পারে। ফলে ভুলভাবে আসামি করা ব্যক্তিরা অভিযোগপত্রের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা না করেই মামলা থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ পান।
কোথায়: চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা · সময়: ১-৩ মাস · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৭৩ক (২০২৬ সালের ১১ নং আইন দ্বারা সন্নিবেশিত, ১০ জুলাই ২০২৫ থেকে কার্যকর) · কাগজপত্র: অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন, অব্যাহতির আবেদন
পরামর্শ: দীর্ঘ এজাহারে নাম থাকা কোনো আসামি নিজের ভূমিকা বিষয়ে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন চেয়ে তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করতে পারেন।
ধাপ ৭ · তদন্ত ও পুলিশ প্রতিবেদনপুলিশ প্রতিবেদন: অভিযোগপত্র নাকি চূড়ান্ত প্রতিবেদন
তদন্ত শেষ হলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ধারা ১৭৩ অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) বিচারের জন্য আসামিদের নাম, সাক্ষীদের তালিকা এবং নির্ভরযোগ্য দলিলাদি সংযুক্ত থাকে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে (ফাইনাল রিপোর্ট) বলা হয় যে অভিযোগ সত্য কিন্তু অপরাধী শনাক্ত হয়নি, অথবা তথ্যগত ভুল, অথবা মিথ্যা। গৃহীত ব্যবস্থার কথা সংবাদদাতাকে জানাতে হবে। প্রতিবেদন দাখিলের পরও পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যেতে পারে এবং সম্পূরক প্রতিবেদন দিতে পারে (ধারা ১৭৩(৩খ))। গুরুতর মামলায় তদন্তভার পিবিআই বা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।
কোথায়: চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা · সময়: এজাহারের ৩-১২ মাস পর · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৭৩(১), (৩খ) · কাগজপত্র: অভিযোগপত্র বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীর তালিকা, দলিলাদি ও আলামত, সম্পূরক প্রতিবেদন (যদি থাকে)
পরামর্শ: অভিযোগপত্র বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল হওয়ামাত্র এর সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করুন; বাস্তবে আপত্তি জানানোর সময় ওই তারিখ থেকেই গণনা শুরু হয়।
ধাপ ৮ · তদন্ত ও পুলিশ প্রতিবেদনচূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন
পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলে, কিংবা অভিযোগপত্র থেকে কয়েকজন আসামিকে বাদ দিলে, সংবাদদাতা নারাজি (আপত্তি) আবেদন করতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট কেস ডায়েরিসহ তা শুনানি করেন। তিনি চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে ধারা ২০২(২খ) অনুযায়ী আসামিদের অব্যাহতি দিতে পারেন। তিনি একই বা অন্য সংস্থাকে অধিকতর তদন্তের আদেশ দিতে পারেন, অথবা বিচারিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দিতে পারেন। কিংবা নারাজিকে নালিশ হিসেবে গণ্য করে নিজেই মামলা আমলে নিতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের মতামত মানতে বাধ্য নন; উপকরণে যৌক্তিকতা থাকলে পুলিশ যাদের অব্যাহতি দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও তিনি আমলে নিতে পারেন।
কোথায়: চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা · সময়: ১-৪ মাস · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৭৩(৩খ); ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৯০(১)(ক)-(খ); ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ২০২(২খ) · কাগজপত্র: নারাজি আবেদন, সাক্ষীদের হলফনামা, চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সার্টিফায়েড কপি
পরামর্শ: পুলিশ যেসব সাক্ষীকে উপেক্ষা করেছে তাদের হলফকৃত বিবৃতি দিয়ে নারাজিকে জোরালো করুন; পক্ষপাতের সাধারণ অভিযোগ খুব কমই সফল হয়।
ধাপ ৯ · আমলে গ্রহণ ও প্রেরণম্যাজিস্ট্রেটের আমলে গ্রহণ
আমলে গ্রহণ (cognizance) হলো সেই পর্যায়, যেখানে বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া পুলিশের হাত থেকে আদালতে যায়। অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ধারা ১৯০(১)(খ) অনুযায়ী প্রকাশিত অপরাধগুলো আমলে নেন। যেসব আসামি এখনো আদালতে হাজির হননি তাদের বিরুদ্ধে তিনি পরোয়ানা বা প্রসেস জারি করেন, সাধারণত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এবং কোনো আসামি পলাতক থাকলে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিতে পারেন। জামিনে থাকা আসামিদের হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। অপরাধটি ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারযোগ্য হলে মামলাটি বিচারের জন্য মেট্রোপলিটন বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়। কেবল দায়রা আদালতে বিচারযোগ্য হলে পরবর্তী ধাপ হলো দায়রা আদালতে প্রেরণ।
কোথায়: চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা · সময়: প্রতিবেদনের ১-৬ মাস পর · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৯০(১)(খ); ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৮৭-৮৮ (হুলিয়া ও ক্রোক) · কাগজপত্র: আমলে গ্রহণের আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা হুলিয়া (ঘোষণা), আসামিদের জন্য পুলিশ প্রতিবেদনের অনুলিপি
পরামর্শ: নতুন অভিযোগপত্রে নাম আসা আসামির উচিত দ্রুত জামিনের আবেদন করা বা আত্মসমর্পণ করা; আমলে গ্রহণের পর সাধারণত পরোয়ানা জারি হয়।
ধাপ ১০ · আমলে গ্রহণ ও প্রেরণমামলা দায়রা আদালতে পাঠানো
অপরাধটি কেবল দায়রা আদালতে বিচারযোগ্য হলে (যেমন খুন, অপরাধজনক নরহত্যা, গুরুতর আঘাতসহ দস্যুতা বা ডাকাতি) ম্যাজিস্ট্রেট ধারা ২০৫গ অনুযায়ী মামলাটি পাঠান। তিনি নথি, দলিলাদি ও আলামত পাঠান এবং আসামিকে হেফাজতে বা জামিনে রাখেন। মহানগর দায়রা জজ এটিকে দায়রা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেন এবং নিজের কাছে রাখতে পারেন বা অতিরিক্ত কিংবা যুগ্ম মহানগর দায়রা জজের কাছে বদলি করতে পারেন। ধারা ৩৩৯গ অনুযায়ী ৩৬০ দিনের বিচারসীমা গণনা শুরু হয় বিচারের জন্য মামলা গ্রহণের তারিখ থেকে।
কোথায়: মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা · সময়: ১-৩ মাস · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ২০৫গ; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৯৩; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৩৯গ(২) · কাগজপত্র: ধারা ২০৫গ অনুযায়ী প্রেরিত নথি, দায়রা মামলা নম্বর, বদলির আদেশ
পরামর্শ: জব্দকৃত সব আলামত আসলেই দায়রা আদালতে পৌঁছেছে কি না যাচাই করুন; আলামত হারিয়ে গেলে দীর্ঘ মুলতবি হয়।
ধাপ ১১ · দায়রা বিচারঅব্যাহতির শুনানি ও অভিযোগ গঠন
পাবলিক প্রসিকিউটর মামলার সূচনা বক্তব্য দেন এবং সাক্ষ্যের বিবরণ তুলে ধরেন। আদালত নথি বিবেচনা করে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন। পর্যাপ্ত কারণ না থাকলে আদালত ধারা ২৬৫গ অনুযায়ী কারণ লিপিবদ্ধ করে আসামিকে অব্যাহতি দেন। অন্যথায় ধারা ২৬৫ঘ অনুযায়ী লিখিত অভিযোগ গঠন (charge framing) করেন, তা পড়ে শোনান এবং প্রত্যেক আসামিকে জিজ্ঞাসা করেন তিনি দোষ স্বীকার করেন কি না। দোষ স্বীকার করলে আদালত দণ্ড দিতে পারেন। অভিযোগ পরে পরিবর্তন করা যায়, তবে তখন নতুন অভিযোগের জবাব দেওয়ার ন্যায্য সুযোগ আসামিকে দিতে হবে।
কোথায়: মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা · সময়: ২-৬ মাস · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ২৬৫ক-২৬৫ঙ; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ২২১-২৩১ (অভিযোগের ধরন ও পরিবর্তন) · কাগজপত্র: অব্যাহতির আবেদন, গঠিত অভিযোগ, আসামির জবাবের রেকর্ড
পরামর্শ: অনেক আসামি অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে রিভিশন (revision) করেন; কেবল স্পষ্ট আইনগত ভিত্তি থাকলেই তা করুন, কারণ এ পর্যায়ে হাইকোর্ট বিভাগ কদাচিৎ হস্তক্ষেপ করেন।
ধাপ ১২ · দায়রা বিচাররাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ও জেরা
পাবলিক প্রসিকিউটর সংবাদদাতা, প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসক, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, জব্দতালিকার সাক্ষী এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সাক্ষ্য দিতে ডাকেন। ভুক্তভোগীর নিযুক্ত আইনজীবী সহায়তা করতে পারেন। প্রত্যেক সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়, প্রত্যেক আসামি তাকে জেরা করেন, এরপর পুনঃজবানবন্দি নেওয়া হয়। বিলম্বের প্রধান কারণ সাক্ষীর অনুপস্থিতি। আদালত প্রথমে সমন, তারপর পরোয়ানা জারি করেন, এবং সাক্ষীরা বারবার হাজির না হলে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য সমাপ্ত ঘোষণা করতে পারেন। ২০২৫ সাল থেকে আদালত বাদী, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা এবং তাদের খরচ পরিশোধের আদেশ দিতে পারেন।
কোথায়: মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা · সময়: ১-৪ বছর · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ২৬৫চ; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৫৪৪ (খরচ ও সুরক্ষা, ২০২৬ সালের ১১ নং আইন দ্বারা সংশোধিত); সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ধারা ১৩৭-১৩৮; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৩ (পাবলিক প্রসিকিউটরের অধীনে বেসরকারি আইনজীবী) · কাগজপত্র: সাক্ষীর সমন ও পরোয়ানা, আলামত ও জব্দতালিকা, জবানবন্দির শিট
পরামর্শ: আসামিপক্ষের উচিত ধারা ১৬১-এর প্রতিটি জবানবন্দির সার্টিফায়েড কপি আগেভাগেই সংগ্রহ করা; আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যের সঙ্গে অসংগতি তদন্তকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়।
ধাপ ১৩ · দায়রা বিচারধারা ৩৪২-এর অধীন আসামি পরীক্ষা ও আসামিপক্ষের সাক্ষ্য
রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য শেষ হলে বিচারক ধারা ৩৪২ অনুযায়ী প্রত্যেক আসামিকে পরীক্ষা করেন। আসামির বিরুদ্ধে আসা প্রতিটি সাক্ষ্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে আসামির সামনে তুলে ধরেন, যাতে আসামি তার ব্যাখ্যা দিতে পারেন। আসামি শপথের অধীন থাকেন না এবং লিখিত বক্তব্য দাখিল করতে পারেন। আসামি অপরাধ করেছেন এমন কোনো সাক্ষ্য না থাকলে আদালত ধারা ২৬৫জ অনুযায়ী খালাস দেন। অন্যথায় আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনে সাক্ষ্য দেন, সাক্ষী ডাকতে ও দলিল উপস্থাপন করতে পারেন (ধারা ২৬৫ঝ), এরপর যুক্তিতর্ক হয় (ধারা ২৬৫ঞ)।
কোথায়: মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা · সময়: ২-৬ মাস · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৪২; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ২৬৫ছ-২৬৫ঞ · কাগজপত্র: ধারা ৩৪২-এর পরীক্ষার রেকর্ড, আসামির লিখিত বক্তব্য, আসামিপক্ষের প্রদর্শনী
পরামর্শ: ধারা ৩৪২-এর পরীক্ষায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ পারিপার্শ্বিক বিষয় আসামির সামনে তুলে না ধরা হলে হাইকোর্ট বিভাগ প্রায়ই সেই কারণে দণ্ড বাতিল করেন।
ধাপ ১৪ · রায় ও দণ্ডরায়: দণ্ড নাকি খালাস
বিচারক ধারা ২৬৫ট অনুযায়ী লিখিত রায় দেন, যাতে বিচার্য বিষয়, সিদ্ধান্ত ও কারণ এবং দণ্ডের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধারা ও সাজা উল্লেখ থাকে। খালাস হলে হেফাজতে থাকা আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয়। দণ্ড হলে সাজা স্বল্প হয়ে জামিন মঞ্জুর না হলে সাজা পরোয়ানাসহ আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়। বিচার ৩৬০ দিনের সীমা পেরিয়ে গেলে, জামিন-অযোগ্য অভিযোগের আসামি বিচার চলাকালেই ধারা ৩৩৯গ(৪) অনুযায়ী জামিনের আবেদন করতে পারতেন। এখানেই বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়ার প্রথম স্তর শেষ হয়।
কোথায়: মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা · সময়: যুক্তিতর্কের ১-৩ মাস পর · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ২৬৫ট; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৬৬-৩৬৭; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৩৯গ(৪) · কাগজপত্র: রায় ও দণ্ডাদেশ, সাজা পরোয়ানা, সার্টিফায়েড কপির আবেদন
পরামর্শ: সঙ্গে সঙ্গে সার্টিফায়েড কপির আবেদন করুন; আপিলের মেয়াদ গণনা হয় দণ্ডাদেশের তারিখ থেকে।
ধাপ ১৫ · রায় ও দণ্ডমৃত্যুদণ্ড হলে ডেথ রেফারেন্স
দায়রা আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে হাইকোর্ট বিভাগ অনুমোদন (কনফার্ম) না করা পর্যন্ত তা কার্যকর করা যায় না। আদালতকে দণ্ডিত ব্যক্তিকে জানাতে হবে যে তিনি সাত দিনের মধ্যে আপিল করতে পারেন, এবং পুরো নথি ডেথ রেফারেন্স (death reference) হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগে পাঠাতে হবে। রেফারেন্স নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দণ্ডিতকে কনডেম সেলে রাখা হয়। অন্য সব দণ্ডের ক্ষেত্রে দণ্ডিত ব্যক্তির নিজের আপিলই পরবর্তী ধাপ।
কোথায়: মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা · সময়: দণ্ডাদেশের পরপরই · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৭৪; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৭১(৩); তামাদি আইন, ১৯০৮-এর অনুচ্ছেদ ১৫০ · কাগজপত্র: পূর্ণ নথিসহ ডেথ রেফারেন্স, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হিসেবে কারাগারে সোপর্দের পরোয়ানা
পরামর্শ: ডেথ রেফারেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেলেও আইনজীবীর মাধ্যমে বা কারাগার থেকে নিয়মিত আপিলও দায়ের করুন, যাতে প্রতিটি যুক্তি উপস্থাপিত হয়।
ধাপ ১৬ · রায় ও দণ্ডসাজা ভোগ ও কারাগার থেকে আপিল দায়ের
হেফাজতে থাকা দণ্ডিত ব্যক্তি কারাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে আপিলের আবেদন দাখিল করতে পারেন, যিনি তা আপিল আদালতে পাঠিয়ে দেন। এটিই ধারা ৪২০-এর অধীন জেল আপিল। অর্থদণ্ড ধারা ৩৮৬-৩৮৯ অনুযায়ী আদায় করা হয়, এবং অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে অনাদায়ে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। দণ্ডের আগে হেফাজতে কাটানো সময় ধারা ৩৫ক অনুযায়ী সাজা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আপিল আদালত ধারা ৪২৬ অনুযায়ী দণ্ড স্থগিত করে আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত জামিন দিতে পারেন।
কোথায়: ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (হেফাজত) · সময়: চলমান · আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪২০; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪২৬; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৫ক; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৮৬-৩৮৯ · কাগজপত্র: জেল আপিলের আবেদন, রায়ের অনুলিপি, হেফাজতকালের সনদ
পরামর্শ: জেল আপিল আসলেই পাঠানো হয়েছে কি না পরিবারের উচিত কারা দপ্তরে নিশ্চিত হওয়া এবং এর নম্বর সংগ্রহ করা।
যদি এমন হয়…? বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া যেভাবে গতিপথ বদলাতে পারে
একটি পরিস্থিতি বেছে নিন। ম্যাপটি দেখাবে মামলা কীভাবে উচ্চ আদালতে ওঠে, আর ফেরত পাঠানো হলে কীভাবে নিম্ন আদালতে নেমে আবার ওপরে যায়।
দণ্ডিত আসামি বা রাষ্ট্র আপিল করলে কী হয়?
- 1হাইকোর্ট বিভাগ
হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি আপিল
দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজের দেওয়া দণ্ডের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ব্যক্তি দণ্ডাদেশের ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করেন। যুগ্ম দায়রা জজের দেওয়া পাঁচ বছরের বেশি সাজার আপিলও সেখানে যায়। ছোট মামলার আপিল ৩০ দিনের মধ্যে দায়রা জজের কাছে যায়। খালাসের বিরুদ্ধে সরকার ছয় মাসের মধ্যে আপিল করতে পারে। কেবল নালিশি মামলায় বাদী খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন, ৬০ দিনের মধ্যে এবং কেবল এমন আইনগত ভুলের ভিত্তিতে যার ফলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়েছে। আপিলে নথির ভিত্তিতে তথ্য ও আইন উভয়ই নতুন করে শোনা হয়, এবং আদালত ধারা ৪২৮ অনুযায়ী অতিরিক্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারেন।
ঢাকায় ৩-৮ বছরফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪০৮, ৪১০ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪১৭, ৪১৭কফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪২৩, ৪২৮তামাদি আইন, ১৯০৮-এর অনুচ্ছেদ ১৫৪, ১৫৫, ১৫৭
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: হাইকোর্ট বিভাগ দণ্ড বহাল রাখেন, পরিবর্তন করেন বা বাতিল করেন, অথবা পুনর্বিচারের আদেশ দেন।
অভিযোগ গঠন বা নারাজি নামঞ্জুরের মতো অন্তর্বর্তী আদেশ কোনো পক্ষ চ্যালেঞ্জ করলে কী হয়?
- 1হাইকোর্ট বিভাগ
ফৌজদারি রিভিশন বা ধারা ৫৬১ক
অভিযোগ গঠন, অব্যাহতি নামঞ্জুর, নারাজি নামঞ্জুর বা রিমান্ডের আদেশের মতো অন্তর্বর্তী আদেশ ফৌজদারি রিভিশনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যায়। ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের বিরুদ্ধে দায়রা জজ বা হাইকোর্ট বিভাগে, আর দায়রা আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে যেতে হয়। রিভিশনে বৈধতা ও যথার্থতা পরীক্ষা করা হয়, সাক্ষ্যের নতুন শুনানি নয়। অন্য কোনো প্রতিকার উপযুক্ত না হলে আদালতের প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধে হাইকোর্ট বিভাগ ধারা ৫৬১ক অনুযায়ী কার্যধারা বাতিল (quash) করতে পারেন।
৬-২৪ মাসফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৩৫, ৪৩৯, ৪৩৯কফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৫৬১ক
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: আদেশটি বহাল থাকে, অথবা বাতিল হয় এবং সংশোধিত পথে বিচার আবার শুরু হয়।
আদালত কি নিজের ফৌজদারি রায় রিভিউ করতে পারেন?
- 1মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা
বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের রায় রিভিউ করা যায় না
ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৬৯ অনুযায়ী কোনো ফৌজদারি আদালত রায়ে স্বাক্ষর করার পর তা পরিবর্তন বা রিভিউ করতে পারেন না, কেবল করণিক ভুল সংশোধন ছাড়া। এটি দায়রা আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। রায় ভুল মনে করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উচ্চতর আদালতে আপিল বা রিভিশন করতে হবে।
প্রযোজ্য নয়ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৬৯ - 2সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ
আপিল বিভাগে রিভিউ
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৫ অনুযায়ী কেবল আপিল বিভাগই নথিতে সুস্পষ্ট ভুলের ভিত্তিতে নিজের ফৌজদারি রায় রিভিউ (review) করতে পারেন। আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে দাখিল করতে হবে। মৃত্যুদণ্ডের মামলায় প্রাণভিক্ষার আবেদনের আগে এটিই প্রায়ই সর্বশেষ আইনি প্রতিকার।
৩-১২ মাসসংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৫সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ) রুলস, ১৯৮৮-এর আদেশ ২৬
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: আপিল বিভাগের রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত; এরপর আর রিভিউ চলে না।
ডেথ রেফারেন্স কীভাবে কাজ করে?
- 1হাইকোর্ট বিভাগ
আপিলের সঙ্গে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি
হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ধারা ৩৭৪-এর অধীন ডেথ রেফারেন্স এবং সংশ্লিষ্ট যেকোনো ফৌজদারি আপিল বা জেল আপিল একসঙ্গে শুনানি করেন। দণ্ডিত ব্যক্তির আইনজীবী থাকুক বা না থাকুক, আদালতকে স্বাধীনভাবে সম্পূর্ণ সাক্ষ্য পরীক্ষা করতে হবে। আদালত মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করতে পারেন, অন্য যেকোনো দণ্ড দিতে পারেন, খালাস দিতে পারেন, অথবা অধিকতর অনুসন্ধান, অতিরিক্ত সাক্ষ্য বা নতুন বিচারের আদেশ দিতে পারেন। অনুমোদনের জন্য অন্তত দুজন বিচারপতির স্বাক্ষর প্রয়োজন।
ঢাকায় ৪-৮ বছরফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৭৪-৩৭৭ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪২০ - 2ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (হেফাজত)
সিদ্ধান্ত কারাগারে পাঠানো
হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ দায়রা আদালতে পাঠানো হয়, যা ধারা ৩৮১ অনুযায়ী কারা কর্তৃপক্ষের কাছে উপযুক্ত পরোয়ানা জারি করে। দণ্ড যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে হ্রাস পেলে দণ্ডিত ব্যক্তিকে কনডেম সেল থেকে সরানো হয়। দণ্ড অনুমোদিত হলে দণ্ডিত ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে অধিকারবলে আপিল বিভাগে আপিল করতে পারেন।
১-২ মাসফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৮১সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৩(২)(খ)
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: মৃত্যুদণ্ড অনুমোদিত বা হ্রাস হয়, অথবা নতুন বিচারের আদেশ হয়।
হাইকোর্ট বিভাগ পুনর্বিচারের আদেশ দিলে কী হয়?
- 1হাইকোর্ট বিভাগ
দণ্ড বাতিল ও মামলা পুনর্বিচারের জন্য নিম্ন আদালতে ফেরত
বিচারে ত্রুটি থাকলে হাইকোর্ট বিভাগ দণ্ড বাতিল করে নতুন বিচারের জন্য বা নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের জন্য মামলাটি দায়রা আদালতে ফেরত পাঠাতে পারেন। সাধারণ ত্রুটিগুলো হলো: অপরাধের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ অভিযোগ, ধারা ৩৪২-এ আসামির সামনে অভিযোগমূলক সাক্ষ্য তুলে না ধরা, কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অন্যায়ভাবে সাক্ষ্য দিতে না দেওয়া। নথি দায়রা আদালতে ফেরত যায়।
আপিলের আদেশেফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪২৩(১)(খ)ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৭৬(খ) - 2মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা
দায়রা আদালতে পুনর্বিচার
দায়রা আদালত পুনর্বিচারের নির্দেশনা অনুসরণ করেন। আদেশ অনুযায়ী আদালত নতুন বা সংশোধিত অভিযোগ গঠন করতে পারেন, নির্দিষ্ট সাক্ষীদের আবার জেরার জন্য তলব করতে পারেন, অথবা ধারা ৩৪২ অনুযায়ী আসামিকে পুনরায় পরীক্ষা করতে পারেন। এরপর আবার যুক্তিতর্ক শুনে নতুন রায় দেন। ফেরত পাঠানোর আদেশে অনুমতি থাকলে আগে লিপিবদ্ধ সাক্ষ্য বহাল থাকতে পারে, ফলে পুনর্বিচার মূল বিচারের চেয়ে সংক্ষিপ্ত হয়।
১-৩ বছরফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ২৬৫ঘ-২৬৫ট - 3হাইকোর্ট বিভাগ
আবার নতুন আপিল
নতুন রায়ের বিরুদ্ধে নতুন দণ্ডাদেশের ৬০ দিনের মধ্যে নতুন সার্টিফায়েড কপিসহ আবার হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করা যায়। আবারও মৃত্যুদণ্ড হলে ধারা ৩৭৪ অনুযায়ী নতুন ডেথ রেফারেন্স পাঠাতে হবে। ফলে মামলাটি দ্বিতীয়বার আদালতের স্তর বেয়ে ওপরে ওঠে, এবং হাইকোর্ট বিভাগ যাচাই করেন তাঁদের আগের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালিত হয়েছে কি না।
২-৬ বছরফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪১০ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৭৪তামাদি আইন, ১৯০৮-এর অনুচ্ছেদ ১৫৫
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য দায়রা আদালতে ফেরত যায় এবং পরে নতুন আপিলে আবার হাইকোর্ট বিভাগে আসে।
মামলা কীভাবে আপিল বিভাগে পৌঁছায়?
- 1সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ
অধিকারবলে আপিল বা লিভ নিয়ে আপিল
হাইকোর্ট বিভাগ মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করলে, অথবা (যেমন খালাস বাতিল করে) কাউকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে অধিকারবলে আপিল বিভাগে আপিল করা যায়। তা ৩০ দিনের মধ্যে দায়ের করতে হবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের অনুমতি চেয়ে ফৌজদারি পিটিশন (লিভ টু আপিল) দাখিল করেন; খালাসের বিরুদ্ধে সরকারের ক্ষেত্রে এ সময় ৬০ দিন। কারাগারে থাকা দণ্ডিত ব্যক্তি জেল পিটিশন দাখিল করতে পারেন।
২-৫ বছরসংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৩(২)(খ), (৩)সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ) রুলস, ১৯৮৮-এর আদেশ ২৩ বিধি ১ এবং আদেশ ২৪ বিধি ২-৩
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: আপিল বিভাগের রায়ে মামলার নিষ্পত্তি হয়, কেবল রিভিউয়ের সুযোগ থাকে।
মৃত্যুদণ্ডের মামলায় আপিল বিভাগের পরও কি কিছু করার থাকে?
- 1ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (হেফাজত)
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন
আপিল বিভাগ আপিল ও রিভিউ খারিজ করার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৯ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি ক্ষমা, দণ্ড স্থগিত বা বিলম্বিত করতে পারেন, কিংবা দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করতে পারেন। এটি নির্বাহী ক্ষমতা, আদালতের কার্যধারা নয়, এবং কারা কর্তৃপক্ষ আবেদনটি পাঠিয়ে দেয়।
কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসসংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৯জেল কোড (প্রাণভিক্ষার আবেদনের পদ্ধতি)
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: দণ্ড কার্যকর হয়, অথবা রাষ্ট্রপতি তা হ্রাস বা মওকুফ করেন।
বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া যেভাবে আদালতের স্তর বেয়ে ওপরে ওঠে
বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট স্তরক্রম মেনে ওপরে ওঠে। থানার মামলা শুরু হয় থানায়, আর প্রথম বিচারিক ফোরাম হলো ঢাকা মহানগরে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। রিমান্ড, জামিন, পুলিশ প্রতিবেদন ও আমলে গ্রহণ ম্যাজিস্ট্রেটই দেখেন। কোন অপরাধের বিচার কোন আদালতে হবে, তা ফৌজদারি কার্যবিধির দ্বিতীয় তফসিলে নির্ধারিত। লঘু অপরাধ মেট্রোপলিটন বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেই থাকে। খুন, ডাকাতি ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধ যায় দায়রা আদালতে, যেখানে মহানগর দায়রা জজ অথবা অতিরিক্ত বা যুগ্ম দায়রা জজ বিচার করেন। আপিলের পথ বিচারিক আদালত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
ম্যাজিস্ট্রেটের দেওয়া দণ্ডের আপিল ৩০ দিনের মধ্যে দায়রা জজের কাছে যায়। দায়রা জজের দণ্ড, কিংবা যুগ্ম দায়রা জজের পাঁচ বছরের বেশি সাজার আপিল ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে যায়। প্রতিটি মৃত্যুদণ্ড রেফারেন্স হিসেবেও ওপরে যায়। হাইকোর্ট বিভাগ তথ্য ও আইন নতুন করে শোনেন, এবং ডেথ রেফারেন্সে সাক্ষ্য নতুনভাবে মূল্যায়ন করেন। মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের মামলায় আপিল বিভাগ অধিকারবলে আপিল শোনেন, অন্য ক্ষেত্রে অনুমতি (লিভ) সাপেক্ষে, মূলত আইনগত প্রশ্নে।
- আপিল বিভাগসুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ
- হাইকোর্ট বিভাগহাইকোর্ট বিভাগ
- আপিল পর্যায়মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা
- প্রথম দফার আদালতচিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা
- শুরু · আদালতের বাইরেথানা (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তদন্তকারী কর্মকর্তা) · ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (হেফাজত)
আপনার মামলা কোথায় শুনানি হয়
ঠিকানাগুলো ঢাকার। প্রতিটি জেলার নিজস্ব জজশিপে সমমানের আদালত আছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ)
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, শাহবাগ, রমনা, ঢাকা-১০০০হাইকোর্ট বিভাগ (High Court Division) আপিল, রিভিশন (revision), রেফারেন্স, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২-এর অধীন রিট পিটিশন (writ petition), কোম্পানি বিষয় ও ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানি করে; আপিল বিভাগ (Appellate Division) হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতিসাপেক্ষে আপিল শুনানি করে।
দুই বিভাগই সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে বসে; হাইকোর্ট বিভাগের অনেক বেঞ্চ বসে অ্যানেক্স ভবনে। কোন বেঞ্চ ও কোন কোর্ট রুম, তা জানতে দৈনিক কার্যতালিকা (cause list) দেখুন। ডাক যোগাযোগের ঠিকানা: রেজিস্ট্রার জেনারেল, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, রমনা, ঢাকা-১০০০।
মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা
৪০-৪৫ জনসন রোড, ঢাকা-১১০০ঢাকা মহানগরের থানাগুলো থেকে আসা দায়রা আদালতে বিচার্য অপরাধের বিচার করে এবং মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের আদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আপিল ও রিভিশন শুনানি করে; অতিরিক্ত ও যুগ্ম মহানগর দায়রা জজরা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল হিসেবেও বসেন।
মহানগর দায়রা জজ বসেন মূল ভবনের ২য় তলায়; অতিরিক্ত ও যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতগুলো মূল ভবনে এবং একই চত্বরের টিনশেড ভবনে। মহানগর দায়রা জজ, ঢাকা একই সঙ্গে সিনিয়র স্পেশাল জজ, ঢাকা পদেও দায়িত্ব পালন করেন। আদালতের প্রকাশিত হেল্পলাইন: ০১৩৩৫-১৪৫০০২।
চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা
১৯ জনসন রোড, ঢাকা-১১০০ঢাকা মহানগর পুলিশের এলাকায় উদ্ভূত ফৌজদারি মামলা আমলে নেয় ও বিচার করে (মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহ), জামিন (bail), রিমান্ড এবং এজাহার (FIR)/নালিশি মামলার শুনানি করে, এবং দায়রা আদালতে বিচার্য মামলা মহানগর দায়রা জজের কাছে পাঠায়।
মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলো সিএমএম (CMM) আদালতের মূল ভবন (২য় থেকে ৯ম তলা) এবং সিজেএম আদালত ভবনে (৮ম ও ৯ম তলায় ২৯-৩৭ নং আদালত) ছড়িয়ে আছে। কার্যতালিকায় আদালতের নম্বর দেখে নিন। প্রতিটি মহানগরে (চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, গাজীপুর) নিজস্ব সিএমএম আদালত আছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর
৩৬ মিন্টো রোড, ঢাকাঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তর; এজাহার এখানে নয়, সংশ্লিষ্ট থানায় দায়ের করতে হয়।
জরুরি সেবা: ৯৯৯। মামলা করতে ঘটনাস্থল যে থানার এখতিয়ারে, সেই থানায় যান।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (হেফাজত)
এটি কোথায় হবে তা আপনার জেলা বা সংশ্লিষ্ট অফিসের ওপর নির্ভর করে। সঠিক এজলাস ও ঠিকানার জন্য আমাদের জিজ্ঞেস করুন।
প্রতিটি পর্যায়ে কত সময় লাগে
এগুলো ঢাকার সাধারণ চর্চার ভিত্তিতে নির্দেশক সময়সীমা। মুলতবি, মামলাজট ও আপিলের কারণে সময় বাড়তে পারে।
কাগজপত্রের চেকলিস্ট ও মূল পরিভাষা
আপনার কাছে যা আছে টিক দিন। টিকগুলো এই ব্রাউজারে সংরক্ষিত থাকবে। আইনজীবীর সঙ্গে প্রথম বৈঠকে তালিকাটি নিয়ে যান।
- জিআর মামলা (GR case)
- এজাহারের ভিত্তিতে শুরু হওয়া ও পুলিশ তদন্ত করা সাধারণ রেজিস্টারভুক্ত মামলা; নালিশি (সিআর) মামলা থেকে এটি ভিন্ন।
- এজাহার (FIR)
- ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৫৪ অনুযায়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক লিপিবদ্ধ আমলযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক তথ্য।
- পুলিশ রিমান্ড (Police remand)
- জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে আটক, যা ধারা ১৬৭ অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট অনুমোদন করেন এবং মোট ১৫ দিনে সীমিত।
- অভিযোগপত্র (Charge sheet)
- ধারা ১৭৩-এর অধীন পুলিশ প্রতিবেদন, যাতে নির্দিষ্ট আসামিদের বিচারের সুপারিশ করা হয়।
- চূড়ান্ত প্রতিবেদন (Final report)
- যে পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয় মামলাটি মিথ্যা, তথ্যগত ভুল, অথবা সত্য কিন্তু অপরাধী শনাক্ত হয়নি, এবং অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
- নারাজি আবেদন (Naraji petition)
- চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্র থেকে আসামি বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে সংবাদদাতার আপত্তি।
- ধারা ৩৪২-এর পরীক্ষা (Section 342 examination)
- রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যের পর প্রতিটি অভিযোগমূলক পারিপার্শ্বিক বিষয়ে আদালত কর্তৃক আসামিকে প্রশ্ন করা।
- ডেথ রেফারেন্স (Death reference)
- ধারা ৩৭৪ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে বাধ্যতামূলকভাবে পাঠানো।
- জেল আপিল (Jail appeal)
- ধারা ৪২০ অনুযায়ী হেফাজতে থাকা দণ্ডিত ব্যক্তি কর্তৃক কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দাখিল করা আপিল।
বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া: সাধারণ প্রশ্ন
পুলিশ এজাহার নিতে না চাইলে কী করব?
পুলিশ কাউকে কত দিন রিমান্ডে রাখতে পারে?
বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়ায় কত সময় লাগে?
অভিযোগপত্র আর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মধ্যে পার্থক্য কী?
ভুক্তভোগী কি নিজের আইনজীবী রাখতে পারেন?
ডেথ রেফারেন্স কী?
ফৌজদারি মামলা কি প্রত্যাহার বা আপসে মীমাংসা করা যায়?
বাংলাদেশে ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়ায় প্রথমে কার সঙ্গে যোগাযোগ করব?
আইন ও উৎস
- The Code of Criminal Procedure, 1898 (as amended by Act XI of 2026)
- The Penal Code, 1860
- The Limitation Act, 1908
- The Constitution of the People's Republic of Bangladesh
- Code of Criminal Procedure (Amendment) Act, 2026 (Act No. XI of 2026)
- The Daily Star: BLAST welcomes safeguards on arrest introduced in the Code of Criminal Procedure
এই কেস জার্নি অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের কার্যপ্রণালীর একটি সাধারণ গাইড। এটি আইনি পরামর্শ নয়। কার্যপ্রণালী, ফি ও সময়সীমা বদলায়, আর প্রতিটি মামলা তার নিজস্ব তথ্যের ওপর নির্ভর করে। সময়রেখাগুলো নির্দেশক। নিজের বিষয়ে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।
বাংলাদেশের বাইরে থেকে এই মামলা চালান
সাধারণত দেশে না এসেও এই মামলা শুরু ও পরিচালনা করা যায়। আপনি বিদেশে একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (মোক্তারনামা) সই করবেন, বাংলাদেশ হাইকমিশন বা দূতাবাস তা সত্যায়ন করবে, আর ঢাকায় আপনার প্রতিনিধি ও আইনজীবী আপনার হয়ে কাজ করবেন। সশরীরে সাক্ষ্য দেওয়ার মতো কিছু ধাপে তবু আপনাকে বা একটি কমিশনকে প্রয়োজন হতে পারে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে মামলা কীভাবে চলে দেখুন →
আপনার মামলা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে, জানতে চান?
একটি পরামর্শ বুক করুন। একজন TRW আইনজীবী আপনার বিষয়টি এই ম্যাপে বসিয়ে দেবেন, পরবর্তী ধাপ ও বাস্তবসম্মত সময়রেখা ব্যাখ্যা করবেন এবং কী প্রস্তুত করতে হবে তা জানাবেন।