TRW Insight / বাংলাদেশ
গ্রেপ্তার বা মামলার পর প্রথম কয়েক দিনের সিদ্ধান্তই ঠিক করে আসামি বাড়ি ফিরবেন নাকি কারাগারে যাবেন। কোন অপরাধে জামিন অধিকার, কোন পর্যায়ে কোন আদালতে যেতে হয় এবং ২০২৬ সালের সংশোধনী কী বদলেছে, তা জানলে ভুল ধাপে সময় নষ্ট হয় না।
জামিনের নিয়ম ২০২৬: আইন কী বলে, কোন আদালতে যাবেন
কেউ গ্রেপ্তার হলে বা মামলায় নাম এলে পরিবারের প্রথম প্রশ্ন থাকে একটাই: জামিন কবে, কোন আদালতে, কীভাবে? বাংলাদেশে জামিনের নিয়ম মূলত ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৪৯৬, ৪৯৭ ও ৪৯৮ ধারায় বাঁধা। ৪৯৬ ধারায় জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন অধিকার, ৪৯৭ ধারায় অজামিনযোগ্য অপরাধে আদালতের বিবেচনা, আর ৪৯৮ ধারায় দায়রা আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগের বিস্তৃত ক্ষমতা।[1] [2] [6] ২০২৬ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন (Act No. XI of 2026) এই কাঠামোয় জামিনের শর্ত, অনলাইনে জামিননামা ও তদন্তের সময়সীমা যোগ করেছে।[5]
এই লেখায় একসঙ্গে পাবেন পুরো পথ: চার্জশিটের আগে ও পরে জামিন কীভাবে আলাদা, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিন নামঞ্জুর হলে সেশন কোর্টে জামিন চাওয়ার নিয়ম, ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের চর্চা, হাইকোর্ট বিভাগে রুল ও অন্তর্বর্তী জামিন, আগাম জামিনের শর্ত ও মেয়াদ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিশেষ বিধান, এবং জামিনের দরখাস্তের একটি নমুনা কাঠামো ও প্রয়োজনীয় কাগজের তালিকা।

সারসংক্ষেপ: জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন আসামির অধিকার; অজামিনযোগ্য অপরাধে জামিন আদালতের বিবেচনা, তবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধে দোষী মনে করার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে সাধারণত জামিন হয় না। ম্যাজিস্ট্রেট নামঞ্জুর করলে ৪৯৮ ধারায় দায়রা জজ আদালতে, সেখানেও না হলে হাইকোর্ট বিভাগে যেতে হয়। গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থাকলে হাইকোর্টে আগাম জামিন চাওয়া যায়, তবে তা স্বল্পমেয়াদি এবং শেষে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হয়।
মূল বিষয়: চার্জশিটের পর মামলা দায়রা আদালতে বদলি হলে আগের জামিন থাকলেও নতুন আদালতে আত্মসমর্পণ করে আবার জামিন চাইতে হতে পারে, আর আগাম জামিন চার্জশিট দাখিলের পর টিকে থাকে না। তাই মামলার প্রতিটি ধাপ বদলের সঙ্গে জামিনের অবস্থাও নতুন করে যাচাই করতে হয়।
এক নজরে
ধারা ৪৯৬
জামিনযোগ্য অপরাধে আসামি জামিন দিতে প্রস্তুত থাকলে তাকে জামিনে মুক্তি দিতেই হবে।
ধারা ৪৯৭
অজামিনযোগ্য অপরাধে জামিন বিবেচনাধীন; নারী, ১৬ বছরের কম বয়সী ও অসুস্থদের জন্য বিশেষ সুযোগ।
ধারা ৪৯৮
দায়রা আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগ যেকোনো মামলায় যেকোনো ব্যক্তিকে জামিনের নির্দেশ দিতে পারে।
আগাম জামিন
সাধারণত আট সপ্তাহের বেশি নয়, চার্জশিটের পর চলে না; শেষে নিম্ন আদালতে হাজির হতে হয়।
২০২৬ সংশোধনী
জামিনে যুক্তিসংগত শর্ত, অনলাইনে জামিননামা, ১৫ দিনের পুলিশ হেফাজত সীমা ও ৬০ কর্মদিবসে তদন্ত।
সূচিপত্র
জামিনযোগ্য ও অজামিনযোগ্য অপরাধে জামিনের নিয়ম
যেকোনো জামিনের প্রশ্নে প্রথম কাজ অপরাধটি জামিনযোগ্য কি না তা ঠিক করা। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪ ধারা অনুযায়ী জামিনযোগ্য অপরাধ হলো দ্বিতীয় তফসিলে জামিনযোগ্য হিসেবে দেখানো অপরাধ, অথবা অন্য কোনো আইনে জামিনযোগ্য করা অপরাধ; বাকি সব অপরাধ অজামিনযোগ্য।[4] তফসিল বদলায়, তাই পুরোনো ছাপা বই দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক। যেমন ২০২৫ সালের সংশোধনীতে দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারার অপরাধকে (ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর আঘাত) অজামিনযোগ্য করা হয়েছে।[7]
ধারা ৪৯৬: জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন অধিকার
অজামিনযোগ্য অপরাধের আসামি ছাড়া অন্য কেউ থানায় পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার বা আটক হলে, অথবা আদালতে হাজির হলে বা হাজির করা হলে, তিনি জামিন দিতে প্রস্তুত থাকলে তাকে জামিনে মুক্তি দিতে হবে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা আদালত চাইলে জামিনদার ছাড়াই শুধু মুচলেকায় ছেড়ে দিতে পারেন।[1] অর্থাৎ এখানে আদালতের "না" বলার সুযোগ নেই; বিতর্ক হতে পারে কেবল জামিনের অঙ্ক ও জামিনদারের যোগ্যতা নিয়ে। জামিনযোগ্য অভিযোগে কেউ কারাগারে থাকলে সেটি অবিলম্বে আদালতের নজরে আনা উচিত।
ধারা ৪৯৭: অজামিনযোগ্য অপরাধে আদালতের বিবেচনা
অজামিনযোগ্য অপরাধে জামিন দেওয়া আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা। তবে আসামি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধে দোষী বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে আদালত সাধারণত জামিন দেন না। ব্যতিক্রম হলো ১৬ বছরের কম বয়সী, নারী এবং অসুস্থ বা অক্ষম ব্যক্তি; তাদের ক্ষেত্রে আদালত বিবেচনা করে জামিন দিতে পারেন।[6] বাস্তবে আদালত দেখেন অভিযোগের গুরুত্ব, এজাহারে আসামির নির্দিষ্ট ভূমিকা, আগের অপরাধের রেকর্ড, পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এবং মামলাটি হয়রানির উদ্দেশ্যে করা কি না।[6]
ধারা ৪৯৮: দায়রা আদালত ও হাইকোর্টের বিস্তৃত ক্ষমতা
৪৯৮(১) ধারা বলে, প্রতিটি জামিননামার অঙ্ক মামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় ঠিক করতে হবে এবং তা অতিরিক্ত হবে না। হাইকোর্ট বিভাগ বা দায়রা আদালত যেকোনো মামলায়, দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল থাকুক বা না থাকুক, যেকোনো ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তির নির্দেশ দিতে পারে, কিংবা পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্ধারিত জামিনের অঙ্ক কমাতে পারে।[2] "যেকোনো মামলায় যেকোনো ব্যক্তি" কথাটিই সেশন কোর্টে জামিন, হাইকোর্টে জামিন এবং আগাম জামিন, তিনটিরই আইনি ভিত্তি।[6]
২০২৬ সালের সংশোধনী: জামিনে কী বদলেছে
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালে অধ্যাদেশের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধিতে বড় পরিবর্তন আসে। পরে সংসদ ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন ২০২৬ পাস করে, যা ২০২৬ সালের ১১ নম্বর আইন এবং তারিখ ১০ এপ্রিল ২০২৬।[5] জামিনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো হলো:
- জামিনের শর্ত: ৪৯৮ ধারায় নতুন উপধারা (২) যুক্ত হয়েছে; জামিনে মুক্তি দেওয়ার সময় যেকোনো আদালত আসামির পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে বা সদাচরণ নিশ্চিত করতে যুক্তিসংগত ও ন্যায্য শর্ত দিতে পারেন। এটি ১০ আগস্ট ২০২৫ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।[2]
- অনলাইনে জামিননামা: সংশোধনীতে অনলাইনে বেইল বন্ড দাখিল ও ডিজিটাল সমনের বিধান রাখা হয়েছে; ৪৯৯ ধারাও সংশোধিত হয়েছে।[8] [5]
- পুলিশ হেফাজতের সীমা: একটি মামলায় মোট ১৫ দিনের বেশি পুলিশ হেফাজত (রিমান্ড) দেওয়া যাবে না; এর বেশি আটক রাখতে হলে বিচারিক হেফাজত, যা সশরীরে বা ভিডিও সংযোগে হাজির করে দেওয়া যায়।[3]
- তদন্তের সময়সীমা: অপরাধের তথ্য পাওয়ার দিন থেকে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে; সময় বাড়াতে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি লাগে।[7]
- অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ও অব্যাহতি: অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো আসামির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া গেলে আদালত তাকে অব্যাহতি দিতে পারেন, অন্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলবে।[7]
- শ্যোন অ্যারেস্ট ও হাজিরা: অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে আসামিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করে কেস ডায়েরি দেখাতে ও তার বক্তব্য শুনতে হবে; আর জামিনে থাকা আসামিকে তদন্ত প্রতিবেদন শুনানি পর্যন্ত ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরার সুযোগ দেওয়া যায়।[7]
গ্রেপ্তারের পর ১২ ঘণ্টার মধ্যে পরিবার, বন্ধু বা আইনজীবীকে জানানো এবং গ্রেপ্তারকারী পুলিশের পরিচয়পত্র দেখানোর বাধ্যবাধকতাও এই সংস্কারের অংশ।[8] জামিনের শুনানিতে এসব সুরক্ষা লঙ্ঘনের তথ্য দেখানো গেলে আসামির পক্ষে যুক্তি শক্ত হয়।
চার্জশিটের আগে জামিন: তদন্ত পর্যায়ে জামিনের নিয়ম
এজাহার দায়েরের পর থেকে পুলিশ প্রতিবেদন (চার্জশিট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন) জমা পড়া পর্যন্ত সময়টিই তদন্ত পর্যায়। এই সময়ে জামিনের আবেদন হয় সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে: ঢাকা মহানগরে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে, জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। আপিল বিভাগ বলেছে, আমলে নেওয়ার আগে ম্যাজিস্ট্রেট ৪৯৭ ধারায় জামিনের আবেদন নিষ্পত্তি করবেন।[9] বিশদ প্রক্রিয়ার জন্য দেখুন আমাদের সিএমএম আদালতে জামিনের প্রক্রিয়া বিষয়ক বিশ্লেষণ।
গ্রেপ্তারের পর প্রথম হাজিরা ও রিমান্ড
পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ করতে না পারলে আসামিকে কেস ডায়েরিসহ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাতে হয়। একই শুনানিতে পুলিশ রিমান্ড চায়, আসামিপক্ষ জামিন চায়। এখন পুলিশ হেফাজত মোট ১৫ দিনের বেশি হতে পারে না, এবং তৃতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড দিতে পারেন না।[3] প্রথম হাজিরাতেই এজাহারের কপি, আসামির পরিচয়পত্র ও জামিনদার প্রস্তুত রাখা জরুরি। রিমান্ড ঠেকানোর কৌশল আমাদের পুলিশ রিমান্ড বিষয়ক লেখায় আছে।
১২০ দিনে তদন্ত শেষ না হলে জামিন
তথ্য পাওয়ার তারিখ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে ১৬৭(৫) ধারায় জামিনের পথ খোলে। মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন বা দশ বছরের বেশি কারাদণ্ডযোগ্য নয় এমন অপরাধে ম্যাজিস্ট্রেট জামিন দিতে পারেন; ওই গুরুতর অপরাধে দায়রা আদালত দিতে পারেন। জামিন না দিলে কারণ লিখতে হয়।[3] নতুন ৬০ কর্মদিবসের সময়সীমার সঙ্গে মিলিয়ে, তদন্তে অযৌক্তিক দেরি এখন জামিনের শুনানিতে একটি শক্তিশালী যুক্তি।[7]
আত্মসমর্পণ করে জামিন
এজাহারে নাম থাকলে বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে সাধারণ পথ হলো আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আত্মসমর্পণ করে একই দিনে জামিন চাওয়া। ম্যাজিস্ট্রেট আগাম জামিন দিতে পারেন না; আসামি আদালতে হাজির হলে বা তাকে হাজির করা হলেই কেবল জামিনের প্রশ্ন ওঠে।[1] [6] ঝুঁকিটা স্পষ্ট: জামিন নামঞ্জুর হলে আসামি সরাসরি কারাগারে যান। তাই অভিযোগ গুরুতর হলে আগে হাইকোর্টে আগাম জামিনের সম্ভাবনা যাচাই করা বুদ্ধিমানের কাজ।

চার্জশিটের পর জামিন: বিচার পর্যায়ের নিয়ম
পুলিশ চার্জশিট দিলে মামলা নতুন পর্যায়ে ঢোকে। ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগপত্র আমলে নেন, আর অপরাধটি দায়রা আদালতে বিচার্য হলে মামলা দায়রা জজ আদালতে বদলি হয়। চার্জশিটের পর জামিন নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, আগের জামিন আপনাআপনি চলতে থাকবে। আদালত বদলালে নতুন আদালতে হাজির হয়ে জামিন নবায়ন বা নতুন করে চাইতে হতে পারে।
মামলা দায়রা আদালতে বদলি হলে নতুন করে জামিন
একটি পরিচিত উদাহরণ: বনানী থানার মাদক মামলায় সিআইডি ৪ অক্টোবর ২০২১ চার্জশিট দেয়, ১০ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তা গ্রহণ করে মামলা বিচারের জন্য দায়রা আদালতে পাঠান। আদালত বদলানোয় আসামিদের আগে থেকে জামিন থাকলেও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে নতুন করে জামিন চাইতে হয়, এবং আদালত "পূর্বশর্ত অনুযায়ী" জামিন দেন।[10] এই ধরনের শুনানিতে আগের জামিনের আদেশ, নিয়মিত হাজিরার রেকর্ড এবং শর্ত পালনের প্রমাণ নিয়ে যাওয়াই চার্জশিটের পর জামিন টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
চার্জশিটের পর জামিন: যখন চার্জশিট আসামির পক্ষে যুক্তি দেয়
চার্জশিট সবসময় আসামির বিপক্ষে যায় না। চার্জশিটে নাম বাদ পড়লে, কম গুরুতর ধারায় অভিযোগ দেওয়া হলে, বা সহ-আসামিরা জামিন পেলে সেগুলো নতুন পরিস্থিতি, যার ভিত্তিতে নতুন জামিনের দরখাস্ত করা যায়। আবার চার্জশিটের পর জামিন চাওয়ার সময় দীর্ঘ কারাবাস, অভিযোগ গঠনে দেরি বা সাক্ষী হাজির না হওয়াও জোরালো যুক্তি। অভিযোগ গঠন ও বিচারের ধাপ জানতে পড়ুন দায়রা আদালতে ফৌজদারি বিচার বিষয়ক লেখাটি।
বিশেষ আইনের মামলায় আমলে নেওয়ার পর
দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা বা মানিলন্ডারিং মামলার মতো বিশেষ আদালতে বিচার্য মামলায় আমলে নেওয়ার পর জামিনের এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট স্পেশাল জজের; দুদকের মামলায় ম্যাজিস্ট্রেটের কোনো এখতিয়ারই নেই বলে আপিল বিভাগ জানিয়েছে।[9] ভুল আদালতে দরখাস্ত করা মানে সময় নষ্ট, তাই চার্জশিটের পর জামিন চাওয়ার আগে নিশ্চিত হোন মামলাটি এখন কোন আদালতে আছে।
ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে জামিন না হলে: সেশন কোর্টে জামিন
ম্যাজিস্ট্রেটের জামিন নামঞ্জুরের আদেশের বিরুদ্ধে প্রচলিত অর্থে আপিল হয় না। প্রতিকার হলো ৪৯৮ ধারায় দায়রা আদালতে নতুন দরখাস্ত, যা ফৌজদারি বিবিধ মামলা (Criminal Miscellaneous Case) হিসেবে দাখিল হয়। আপিল বিভাগ এই ক্রম স্পষ্ট করেছে: ম্যাজিস্ট্রেট নামঞ্জুর করলে আসামি ৪৯৮ ধারায় বিবিধ মামলা করে দায়রা আদালতে যাবেন, সেখানেও ব্যর্থ হলে হাইকোর্ট বিভাগে।[9] তাই সেশন কোর্টে জামিন হলো সিঁড়ির দ্বিতীয় ধাপ, যা বাদ দিয়ে সরাসরি হাইকোর্টে গেলে বেঞ্চ সাধারণত কারণ জানতে চান।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে জামিন
আইনে "দায়রা আদালত" বলতে মহানগর দায়রা আদালতও বোঝায়।[4] ফলে ঢাকা মহানগরের সিএমএম আদালতে জামিন নামঞ্জুর হলে পরের ধাপ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত; মহানগর এলাকার বাইরের মামলায় জেলা দায়রা জজ আদালত। অনেক দরখাস্ত শুনানির জন্য অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। মহানগর দায়রা জজ আদালতে জামিনের দরখাস্তের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটের নামঞ্জুর আদেশের সার্টিফায়েড কপি থাকা বাধ্যতামূলক বলেই ধরে নিন।
সেশন কোর্টে জামিনের শুনানিতে কী দেখা হয়
সেশন কোর্টে জামিন শুনানিতে বিচারক দেখেন নিম্ন আদালতের আদেশে কী কারণ লেখা হয়েছিল, তারপর কী বদলেছে (রিমান্ড শেষ, চিকিৎসা প্রতিবেদন, সহ-আসামির জামিন), এজাহারে আসামির ব্যক্তিগত ভূমিকা কতটা নির্দিষ্ট, এবং প্রস্তাবিত শর্ত ঝুঁকি কমাবে কি না। ৪৯৮(২) ধারার পর আসামিপক্ষ নিজেই শর্ত প্রস্তাব করতে পারে, যেমন বিদেশ না যাওয়া বা তদন্তে সহযোগিতা।[2] রাষ্ট্রপক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর বা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটরের দপ্তর বিরোধিতা করে।
রিভিশন না নতুন দরখাস্ত
নিম্ন আদালতের কোনো আদেশ আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ হলে, জামিন প্রত্যাখ্যানের বদলে আদেশটির বৈধতাই প্রশ্ন হলে, দায়রা আদালতে রিভিশনের পথও আছে। আপিল বিভাগ বলেছে, ম্যাজিস্ট্রেটের জামিন আদেশে সংক্ষুব্ধ পক্ষের দায়রা আদালতে রিভিশন করা উচিত ছিল, এবং "প্রচলিত চর্চা" দিয়ে সুনির্দিষ্ট আইনি বিধান এড়ানো যায় না।[9] কোন প্রতিকার ঠিক, তা আইনজীবীর সঙ্গে আগে স্থির করুন।
হাইকোর্ট বিভাগে জামিন: রুল ও অন্তর্বর্তী জামিন
সেশন কোর্টে জামিন নামঞ্জুর হলে ৪৯৮ ধারায় হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি বিবিধ মামলা দায়ের করা যায়। ডিভিশন বেঞ্চ সাধারণত রুল জারি করেন, অর্থাৎ রাষ্ট্রকে কারণ দর্শাতে বলেন কেন আসামিকে জামিন দেওয়া হবে না, এবং অনেক ক্ষেত্রে রুল নিষ্পত্তি পর্যন্ত নির্দিষ্ট মেয়াদের অন্তর্বর্তী জামিন দেন। কুমিল্লার একটি মামলায় ২৬ মে ২০২৪ হাইকোর্ট বিভাগ চার সপ্তাহের মধ্যে ফেরতযোগ্য রুল জারি করে এক বছরের অন্তর্বর্তী জামিন দেন; সাত দিনের মধ্যে রিকুইজিট জমা দিতে বলা হয়, জামিনের মেয়াদ বাড়াতে হলে হালনাগাদ তথ্যসহ হলফনামা দিতে বলা হয়, এবং অপব্যবহার হলে নিম্ন আদালতকে জামিন বাতিলের স্বাধীনতা দেওয়া হয়।[11]
হাইকোর্টের আদেশ পাওয়ার পর রাষ্ট্র আপিল বিভাগে স্থগিতাদেশ চাইতে পারে, তাই আদেশ জেলখানায় পৌঁছে মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কাজ শেষ হয় না। আসামি অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো থাকলে সেখানেও জামিন লাগবে। বিস্তারিত ইংরেজিতে পড়ুন হাইকোর্ট বিভাগে জামিন বিষয়ক বিশ্লেষণ।

আগাম জামিনের নিয়ম: হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ, শর্ত ও মেয়াদ
বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তারের আগেই শর্তসাপেক্ষে আদালত যে জামিন দেন, তাকেই আগাম জামিন বলে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে "আগাম জামিন" শব্দটি নেই; আদালত ৪৯৮ ধারার "যেকোনো মামলায় যেকোনো ব্যক্তি" কথা থেকে এই ক্ষমতা নেন।[6] আইনে দায়রা আদালতের নামও আছে, তবে বাস্তবে প্রায় সব আগাম জামিনের আবেদন হয় হাইকোর্ট বিভাগে। আসামি একবার গ্রেপ্তার হলে আর আগাম জামিন চাওয়া যায় না, তখন নিয়মিত জামিন চাইতে হয়।[6]
কারা আগাম জামিন পান
আবেদনকারীকে দেখাতে হয় যে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা বাস্তব, মামলাটি হয়রানি বা অসৎ উদ্দেশ্যে, এবং গ্রেপ্তার হলে তার সুনাম ও স্বাধীনতার অপূরণীয় ক্ষতি হবে। আদালত দেখেন অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব, আগের দণ্ডের রেকর্ড এবং পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। শুনানির সময় আবেদনকারীকে ব্যক্তিগতভাবে হাইকোর্টে হাজির থাকতে হয়; এই আত্মসমর্পণ ছাড়া আবেদন শোনা হয় না।[6] বিদেশে থাকা বা আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তি এই প্রতিকার পান না।
আপিল বিভাগের নির্দেশনা: আট সপ্তাহ ও চার্জশিট
২০১৯ সালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের বেঞ্চ আগাম জামিন নিয়ে নির্দেশনা দেন। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগাম জামিন কেবল ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে দেওয়া হবে; সাধারণত আট সপ্তাহের বেশি হবে না এবং চার্জশিট দাখিলের পর চলবে না; হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে আগাম জামিন দেওয়া হবে না; আবেদনকারীকে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে এবং সাক্ষীকে প্রলোভন বা ভয় দেখানো যাবে না; রাষ্ট্র বা বাদী যথাযথ কারণ দেখালে জামিন বাতিল হতে পারে।[12]
৬ মার্চ ২০২৪ প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ এক মামলায় "পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত" দেওয়া আগাম জামিন কমিয়ে আট সপ্তাহ করেন এবং এরপর ঢাকার সিএমএম আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। আদালত বলেন, আসামিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আগাম জামিনে থাকতে দেওয়া যায় না।[13] বিস্তারিত ইংরেজিতে দেখুন বাংলাদেশে আগাম জামিন বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।
শর্ত ও মেয়াদ শেষে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ
আগাম জামিনের আদেশে সাধারণত মেয়াদ, কোন আদালতের সন্তুষ্টিতে জামিননামা দিতে হবে, শর্ত এবং মেয়াদ শেষে কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে তা লেখা থাকে। ২০২৬ সালের সংশোধনীর পর ৪৯৮(২) ধারায় আদালত এখন আইনগতভাবেই যুক্তিসংগত শর্ত দিতে পারেন।[2] মেয়াদ শেষে আসামিকে নির্ধারিত নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে নিয়মিত জামিন চাইতে হয়, এবং সেই আদালত দেখবেন আগাম জামিনের সুবিধার অপব্যবহার হয়েছে কি না।[13] আদেশের দিনই আত্মসমর্পণের তারিখ ক্যালেন্ডারে লিখে নিয়মিত জামিনের দরখাস্ত তৈরি শুরু করুন।
বিশেষ আইনে জামিন: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন
বিশেষ আইনে আলাদা জামিনের বিধান থাকলে সেটিই প্রাধান্য পায়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ১৯ ধারায় সব অপরাধ আমলযোগ্য। সরাসরি ও প্রধানভাবে অভিযুক্ত আসামির জামিনের জন্য দুটি শর্ত: বাদীকে শুনানির সুযোগ দিতে হবে, এবং ট্রাইব্যুনাল বা ক্ষেত্রমতে এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতকে সন্তুষ্ট হতে হবে যে আসামিকে দোষী বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ নেই। নারী, শিশু ও শারীরিকভাবে অসুস্থ বা অক্ষম আসামি ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত না হলে জামিন পেতে পারেন; অন্যদের ক্ষেত্রে কারণ লিখে জামিন দেওয়া যায়।[14]
"এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত" শব্দগুলো যুক্ত হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন ২০২৬ (২০২৬ সালের ৮৫ নম্বর আইন) দিয়ে, কার্যকর ২৫ মার্চ ২০২৫ থেকে।[14] তাই এ আইনের মামলায় জামিনের দরখাস্ত বাদীকে নোটিশ দিয়ে এবং অভিযোগের বিরুদ্ধে সরাসরি যুক্তি দিয়ে করতে হয়। মাদক বা হত্যা মামলার জামিনের আলাদা বিশ্লেষণ পাবেন আমাদের মাদক মামলায় জামিন ও হত্যা মামলায় জামিন লেখায়।
সেশন কোর্টে জামিনের দরখাস্তের নমুনা কাঠামো
নিচে একটি নমুনা খসড়ার কাঠামো দেওয়া হলো, পূরণ করা ফরম নয়। প্রতিটি দরখাস্ত মামলার তথ্য অনুযায়ী আইনজীবী তৈরি করবেন; বন্ধনীর অংশগুলো আপনার মামলার তথ্যে বদলাবে। সেশন কোর্টে জামিনের দরখাস্ত যত সংক্ষিপ্ত, নির্দিষ্ট ও কাগজে সমর্থিত হয়, শুনানি তত কার্যকর হয়।
দরখাস্তের অংশগুলো
- আদালতের নাম: "বিজ্ঞ [মহানগর দায়রা জজ / জেলা ও দায়রা জজ] আদালত, [শহর/জেলা]"।
- মামলার শিরোনাম: ফৌজদারি বিবিধ মামলা নং [ ] / [সাল]; [থানার নাম] থানার মামলা নং [ ], তারিখ [ ]; জি.আর. নং [ ]; ধারা [দণ্ডবিধি বা বিশেষ আইনের ধারা]।
- পক্ষগণ: [আসামির নাম, পিতার নাম, ঠিকানা] — দরখাস্তকারী; বনাম রাষ্ট্র — প্রতিপক্ষ।
- বিষয়: "ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারার অধীনে জামিনের প্রার্থনা"।
- মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ: এজাহারের অভিযোগ, এজাহারে দরখাস্তকারীর নির্দিষ্ট ভূমিকা (বা তার অনুপস্থিতি), গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের তারিখ, হাজতবাসের মেয়াদ।
- নিম্ন আদালতের আদেশ: কোন ম্যাজিস্ট্রেট কোন তারিখে জামিন নামঞ্জুর করেছেন এবং আদেশে কী কারণ লেখা হয়েছে।
- জামিনের কারণসমূহ: ক্রমিক নম্বরে আলাদা আলাদা যুক্তি: নির্দিষ্ট ভূমিকা নেই, হয়রানির উদ্দেশ্য, দীর্ঘ হাজতবাস, তদন্তে দেরি, সহ-আসামির জামিন, স্বাস্থ্য বা বয়স, স্থায়ী ঠিকানা ও পালানোর আশঙ্কা নেই।
- শর্ত পালনের অঙ্গীকার: আদালত যে শর্ত দেবেন তা মানা, নিয়মিত হাজিরা, সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগ না করা।
- প্রার্থনা: উপযুক্ত জামিননামা ও শর্তে দরখাস্তকারীকে জামিনে মুক্তির আদেশ।
- হলফনামা ও স্বাক্ষর: তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে হলফনামা এবং আইনজীবীর স্বাক্ষর।
প্রয়োজনীয় সংযুক্তি
- আসামির স্বাক্ষরিত ওকালতনামা (কারাগারে থাকলে জেলের মাধ্যমে)।
- এজাহার বা নালিশি দরখাস্তের কপি; দাখিল হয়ে থাকলে চার্জশিটের কপি।
- ম্যাজিস্ট্রেটের জামিন নামঞ্জুর আদেশের সার্টিফায়েড কপি এবং আদেশনামা (অর্ডার শিট)।
- আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ।
- চিকিৎসা, বয়স বা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থার প্রমাণ, যদি সেই যুক্তি দেওয়া হয়।
- সহ-আসামির জামিনের আদেশ, যদি সমতার যুক্তি দেওয়া হয়।
- প্রস্তাবিত জামিনদারদের নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
হাইকোর্ট বিভাগের জন্য একই কাঠামো লাগে, তবে সেখানে দায়রা জজের নামঞ্জুর আদেশসহ পুরো নথি সংযুক্ত করতে হয় এবং সাধারণত পরিবারের একজন অনুমোদিত সদস্য হলফনামা দেন।

জামিনের আদালত এক নজরে
কোন পর্যায়ে কোন আদালতে যাবেন তা নিচের সারণিতে সংক্ষেপে দেওয়া হলো। মোবাইলে সারণিটি পাশে স্ক্রল করুন।
| পর্যায় | আদালত | আইনি ভিত্তি | মূল বিষয় |
|---|---|---|---|
| গ্রেপ্তারের পর বা তদন্ত পর্যায় | ম্যাজিস্ট্রেট (ঢাকায় সিএমএম, জেলায় সিজেএম) | ধারা ৪৯৬, ৪৯৭, ১৬৭ | জামিনযোগ্য অপরাধে অধিকার; ১৫ দিনের রিমান্ড সীমা |
| ম্যাজিস্ট্রেট নামঞ্জুর করলে | দায়রা জজ / মহানগর দায়রা জজ আদালত | ধারা ৪৯৮ | ফৌজদারি বিবিধ মামলা; নামঞ্জুর আদেশের কপি লাগবে |
| দায়রা জজ নামঞ্জুর করলে | হাইকোর্ট বিভাগ | ধারা ৪৯৮ | রুল ও নির্দিষ্ট মেয়াদের অন্তর্বর্তী জামিন |
| গ্রেপ্তারের আগে | হাইকোর্ট বিভাগ (আগাম জামিন) | ধারা ৪৯৮ ও আপিল বিভাগের নির্দেশনা | সাধারণত আট সপ্তাহ; পরে আত্মসমর্পণ |
| চার্জশিটের পর জামিন | বিচারিক আদালত (দায়রা বা বিশেষ আদালত) | ধারা ৪৯৭, ৪৯৮ বা বিশেষ আইন | আদালত বদলালে নতুন করে জামিন |
| নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা | ট্রাইব্যুনাল বা এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত | নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ধারা ১৯ | বাদীর শুনানি বাধ্যতামূলক |
ধাপে ধাপে জামিনের নিয়ম মেনে প্রস্তুতি
গ্রেপ্তার, পরোয়ানা বা মামলার খবর পাওয়ার পর থেকে নিচের ক্রমে এগোলে সময় ও ঝুঁকি দুটোই কমে।
অপরাধের শ্রেণি যাচাই
এজাহারের ধারাগুলো সংশোধিত দ্বিতীয় তফসিল ও বিশেষ আইনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন অপরাধটি জামিনযোগ্য কি না।
মামলার পর্যায় ও আদালত চিহ্নিত
তদন্ত চলছে নাকি চার্জশিট হয়েছে, আর মামলা এখন ম্যাজিস্ট্রেট, দায়রা জজ নাকি বিশেষ আদালতে আছে তা নিশ্চিত করুন।
কাগজপত্র সংগ্রহ
এজাহার, আগের আদেশ, আদেশনামা, পরিচয়পত্র, চিকিৎসা কাগজ ও জামিনদারের তথ্য এক ফাইলে রাখুন।
আগাম জামিন না আত্মসমর্পণ
গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থাকলে হাইকোর্টে আগাম জামিনের যোগ্যতা যাচাই করুন; না হলে প্রস্তুত হয়ে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করুন।
নির্দিষ্ট যুক্তিতে জামিনের দরখাস্ত
আসামির ব্যক্তিগত ভূমিকা, হাজতবাস, তদন্তে দেরি ও সহ-আসামির জামিনের মতো যুক্তি ক্রমিক নম্বরে সাজান এবং শর্ত প্রস্তাব করুন।
নামঞ্জুর হলে পরের ধাপ
সার্টিফায়েড কপি নিয়ে দায়রা জজ আদালতে, তারপর হাইকোর্ট বিভাগে ৪৯৮ ধারায় দরখাস্ত করুন।
জামিননামা ও মুক্তি
জামিননামা দাখিল, জামিনদার স্বাক্ষর ও মুক্তির আদেশ কারাগারে পৌঁছানো পর্যন্ত তদারকি করুন; অন্য মামলা আছে কি না দেখুন।
শর্ত ও তারিখ মেনে চলা
প্রতিটি হাজিরা, আত্মসমর্পণের তারিখ ও জামিনের মেয়াদ ক্যালেন্ডারে রাখুন, যাতে জামিন বাতিল না হয়।
জামিননামা, জামিনদার ও জামিন বাতিলের ঝুঁকি
জামিনের নিয়ম অনুযায়ী জামিন মঞ্জুর হলেই মুক্তি হয় না। আদালতের নির্ধারিত অঙ্কের জামিননামা দিতে হয়, জামিনদার স্বাক্ষর করেন, তারপর মুক্তির আদেশ কারাগারে পৌঁছায়। জামিনের অঙ্ক অতিরিক্ত হতে পারবে না; বেশি হলে দায়রা আদালত বা হাইকোর্ট তা কমাতে পারেন।[2] জামিনদার এমন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া উচিত যার স্থায়ী ঠিকানা আছে এবং যিনি বোঝেন যে আসামি পালালে তার দায় তৈরি হয়। অনলাইনে জামিননামা দাখিলের বিধান চালু হলেও সংশ্লিষ্ট আদালত তা গ্রহণ করছে কি না আগে জেনে নিন।[8]
জামিন পাওয়া মানে জামিন নিশ্চিত হওয়া নয়। হাইকোর্টের আদেশেও নিম্ন আদালতকে অপব্যবহারের ক্ষেত্রে জামিন বাতিলের স্বাধীনতা দেওয়া থাকে।[11] তারিখে হাজির না হওয়া, সাক্ষীকে ভয় দেখানো বা অনুমতি ছাড়া বিদেশযাত্রা জামিন বাতিলের সাধারণ কারণ। বাতিলের প্রক্রিয়া জানতে দেখুন জামিন বাতিল বিষয়ক লেখা।
যে ভুলগুলো জামিন আটকে দেয়
- অপরাধের শ্রেণি না দেখা: সংশোধিত দ্বিতীয় তফসিল না মিলিয়ে ধরে নেওয়া যে অপরাধটি জামিনযোগ্য।[7]
- খালি হাতে আদালতে যাওয়া: এজাহারের কপি, আগের আদেশ ও জামিনদার ছাড়া দরখাস্ত করা।
- ধাপ এড়ানো: কারণ ছাড়া সেশন কোর্টে জামিন না চেয়ে সরাসরি হাইকোর্টে যাওয়া।[9]
- আগের দরখাস্ত গোপন করা: আগের নামঞ্জুর আদেশ উল্লেখ না করলে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।
- আগাম জামিনকে স্থায়ী ভাবা: মেয়াদ শেষে আত্মসমর্পণ না করলে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি ফেরে।[13]
- আদালত বদল খেয়াল না করা: চার্জশিটের পর জামিন নতুন আদালতে নবায়ন না করা।[10]
- অন্য মামলা ভুলে যাওয়া: এক মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো থাকলে মুক্তি আটকে যায়।
ঢাকা জজ কোর্টে জামিন: আইনজীবীর ভূমিকা
ঢাকা জজ কোর্টে জামিনের কাজ মানে শুধু শুনানিতে যুক্তি দেওয়া নয়। ভালো আইনজীবী ঠিক করেন কখন দরখাস্ত করবেন, কারণ তাড়াহুড়োর একটি নামঞ্জুর আদেশ পরের সব আদালতে প্রথমে পড়া হয়। তিনি নিম্ন আদালতের আদেশনামা থেকে হাজতবাস ও তারিখের হিসাব বের করেন, সেশন কোর্টে জামিনের দরখাস্তে বাস্তবসম্মত শর্ত প্রস্তাব করেন, জামিননামা ও মুক্তির আদেশ কারাগারে পৌঁছানো পর্যন্ত লেগে থাকেন, এবং আসামির বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা আছে কি না খুঁজে দেখেন।
যেখানে মামলাটি নিজেই আইনের অপব্যবহার, সেখানে জামিনের পাশাপাশি ৫৬১এ ধারায় কার্যধারা বাতিলের প্রতিকার বিবেচনা করা যায়; দেখুন আমাদের ৫৬১এ ধারায় ফৌজদারি মামলা বাতিল প্র্যাকটিস। আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য না থাকলে সরকারি আইনগত সহায়তা নিয়ে আমাদের আইনগত সহায়তা বিষয়ক লেখাটি পড়ুন।
বাংলাদেশে জামিনের নিয়ম জটিল নয়, কিন্তু সময়ের প্রতি নির্মম। প্রথম হাজিরা, প্রথম দরখাস্ত আর প্রথম আদেশই পরের সব ধাপের ভিত্তি তৈরি করে। কাছের কেউ গ্রেপ্তার হলে বা মামলায় নাম এলে প্রথম দিনেই এজাহার নিয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে বসুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জামিনযোগ্য অপরাধে কি জামিন পাওয়া অধিকার?
হ্যাঁ। ৪৯৬ ধারা অনুযায়ী জামিনযোগ্য অপরাধের আসামি জামিন দিতে প্রস্তুত থাকলে তাকে মুক্তি দিতে হবে; আদালত চাইলে জামিনদার ছাড়াই মুচলেকায় ছাড়তে পারেন।[1]
অজামিনযোগ্য অপরাধে কি জামিন হয়?
হয়, তবে তা আদালতের বিবেচনা। মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধে দোষী মনে করার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে সাধারণত জামিন হয় না; নারী, ১৬ বছরের কম বয়সী ও অসুস্থদের ক্ষেত্রে আদালত ব্যতিক্রম করতে পারেন।[6]
ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে জামিন না হলে কী করণীয়?
নামঞ্জুর আদেশের সার্টিফায়েড কপি নিয়ে ৪৯৮ ধারায় দায়রা জজ আদালতে (ঢাকায় মহানগর দায়রা জজ আদালতে) ফৌজদারি বিবিধ মামলা করুন; সেখানেও নামঞ্জুর হলে হাইকোর্ট বিভাগে যান।[9]
চার্জশিটের আগে জামিন কোথায় চাইতে হয়?
চার্জশিটের পর জামিন কি নতুন করে নিতে হয়?
মামলা দায়রা আদালতে বদলি হলে প্রায়ই নতুন আদালতে হাজির হয়ে আবার জামিন চাইতে হয়; আগের শর্তে জামিন বহাল রাখার আবেদন করা যায়।[10]
আগাম জামিন কত দিনের জন্য দেওয়া হয়?
আগাম জামিনের জন্য কি হাইকোর্টে সশরীরে হাজির হতে হয়?
হ্যাঁ। শুনানির সময় আবেদনকারীকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে উপস্থিত থাকতে হয়। গ্রেপ্তার হয়ে গেলে আর আগাম জামিন চাওয়া যায় না।[6]
হত্যা বা ধর্ষণ মামলায় কি আগাম জামিন হয়?
সাধারণত না। আপিল বিভাগের ২০১৯ সালের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের আসামিদের আগাম জামিন দেওয়া হবে না।[12]
আদালত জামিনে কী ধরনের শর্ত দিতে পারেন?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় জামিনের নিয়ম কী?
১৯ ধারা অনুযায়ী প্রধান অভিযুক্তের জামিনে বাদীকে শুনানির সুযোগ দিতে হয় এবং ট্রাইব্যুনাল বা এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতকে সন্তুষ্ট হতে হয় যে দোষী বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ নেই।[14]
সূত্র তালিকা
প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র
উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।
- ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮, ধারা ৪৯৬ (জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন) — Laws of Bangladesh
- ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮, ধারা ৪৯৮ (Act No. XI of 2026 দ্বারা সংশোধিত) — Laws of Bangladesh
- ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮, ধারা ১৬৭ (Act No. XI of 2026 দ্বারা সংশোধিত) — Laws of Bangladesh
- ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮, ধারা ৪ (জামিনযোগ্য অপরাধ ও দায়রা আদালতের সংজ্ঞা) — Laws of Bangladesh
- ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ১১ নং আইন) — Laws of Bangladesh
- প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০২৩ — 'আগাম জামিন' কাকে বলে
- দেশ রূপান্তর, ১২ আগস্ট ২০২৫ — ফৌজদারি আইনে পরিবর্তন, পুলিশের গ্রেপ্তারের ক্ষমতায় লাগাম
- প্রথম আলো, ২৪ জুলাই ২০২৫ — কাউকে গ্রেপ্তার করলে ১২ ঘণ্টার মধ্যে পরিবারকে জানাতে হবে
- Supreme Court of Bangladesh, Appellate Division — Minaz Ahmed v Arif Motahar, 16 SCOB [2022] AD 89
- বাংলা ট্রিবিউন, ২৬ অক্টোবর ২০২১ — আগের শর্তেই পরীমণিসহ তিন জনের জামিন
- Supreme Court of Bangladesh, High Court Division — ধারা ৪৯৮-এর অধীনে রুল ও অন্তর্বর্তী জামিনের আদেশ, Shah Alam v State (২৬ মে ২০২৪)
- The Daily Star, 9 August 2019 — SC directives over anticipatory bail
- Supreme Court of Bangladesh, Appellate Division — State v Zainul Abedin, Criminal Petition No. 2835 of 2023 (৬ মার্চ ২০২৪)
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, ধারা ১৯ (জামিন সংক্রান্ত বিধান) — বাংলাদেশ আইন
TRW-এর সহায়তা
তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে
TRW আগাম জামিন, ম্যাজিস্ট্রেট ও সেশন কোর্টে জামিন, হাইকোর্ট বিভাগে জামিন ও আপিল বিভাগে স্থগিতাদেশের শুনানি এবং ৫৬১এ ধারায় মামলা বাতিলে আসামি ও তাদের পরিবারকে সহায়তা করে। দেখুন আমাদের ফৌজদারি মামলা বাতিল (৫৬১এ) প্র্যাকটিস, অথবা আপনার মামলা নিয়ে আলোচনা করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।