TRW Insight / বাংলাদেশ
ধর্ষণ, যৌন পীড়ন, যৌতুক বা এসিড সহিংসতার পর প্রথম কয়েক দিনের সিদ্ধান্তই ঠিক করে মামলা কতটা শক্ত হবে। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে থানার দায়িত্ব, তদন্ত ও বিচারের সময়সীমা, ডিএনএ পরীক্ষা ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা বদলেছে; কোন অপরাধে কোন আইনে, কোন আদালতে যাবেন তা জানা থাকলে ভুল পথে সময় নষ্ট হয় না।
নারী নির্যাতন মামলা ২০২৬: আইন, আদালত ও ভুক্তভোগীর অধিকার
ধর্ষণ, যৌন পীড়ন, যৌতুকের জন্য মারধর বা এসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনার পর ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সামনে প্রথম প্রশ্ন থাকে: নারী নির্যাতন মামলা কোথায়, কীভাবে করবেন, আর মামলা করলে কত দিনে বিচার পাবেন? বাংলাদেশে এর প্রধান আইন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০। ২০২৫ সালের মার্চে অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটিতে বড় পরিবর্তন আসে, আর ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদ সেই পরিবর্তনগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৮৫ নং আইন) হিসেবে পাস করে; সংশোধনীগুলো ২৫ মার্চ ২০২৫ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।[1] [2]
এই লেখায় পাবেন অপরাধ ও শাস্তি, থানা ও ট্রাইব্যুনালে মামলার নিয়ম, সহায়তা সেবা, মেডিক্যাল ও ডিএনএ পরীক্ষা, নতুন সময়সীমা, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, জামিন, মিথ্যা মামলার শাস্তি, পারিবারিক সহিংসতা আইন ২০১০ ও যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮। প্রতিটি ধাপে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও সম্মতিকে আগে রাখা হয়েছে।

সারসংক্ষেপ: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অপরাধে মামলা করা যায় দুইভাবে: থানায় এজাহার দিয়ে, অথবা থানা মামলা না নিলে হলফনামাসহ সরাসরি ট্রাইব্যুনালে নালিশ করে। ২০২৬ সালের সংশোধনীর পর থানা অন্য এলাকার ঘটনা বলে ফিরিয়ে দিতে পারে না, তদন্ত শেষ করতে হয় ১৫ বা ৩০ কার্যদিবসে, ধর্ষণ মামলার বিচার অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসে, আর যৌতুকের জন্য সাধারণ জখমের মামলা এখন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যায়। মূল আসামির জামিনে বাদীর শুনানি বাধ্যতামূলক, আর জেনেশুনে মিথ্যা মামলা করলে সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।
মূল বিষয়: ঘটনার পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা ও মেডিক্যাল পরীক্ষা করান এবং আলামত নষ্ট হতে দেবেন না। সরকারি হাসপাতালে ভুক্তভোগীর মেডিক্যাল পরীক্ষা বিনা ফিতে হয় এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিনামূল্যে সার্টিফিকেট দিতে হয়; এই সার্টিফিকেট ও সময়মতো এজাহারই পরে মামলার মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
এক নজরে
মূল আইন
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, যা ২০২৬ সনের ৮৫ নং আইনে সংশোধিত এবং ২৫ মার্চ ২০২৫ থেকে কার্যকর।
মামলার দুই পথ
থানায় এজাহার, অথবা থানা ব্যর্থ হলে হলফনামাসহ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি নালিশ।
সময়সীমা
তদন্ত ১৫ বা ৩০ কার্যদিবস; বিচার ১৮০ কার্যদিবস, ধর্ষণ মামলা অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসে।
জামিন
মূল ও প্রত্যক্ষ আসামির জামিনে বাদীর শুনানি বাধ্যতামূলক; দোষী হওয়ার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে জামিন হয় না।
সহায়তা
১০৯ ও ৯৯৯ হেল্পলাইন, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার এবং প্রতিটি জেলার লিগ্যাল এইড অফিস।
সূচিপত্র
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০: ২০২৬ সালের পর কাঠামো
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন একটি বিশেষ আইন। এর ৩ ধারা বলে, অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক, এই আইনের বিধান কার্যকর থাকবে। অপরাধগুলোর বিচার হয় প্রতিটি জেলা সদরে গঠিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে, যার বিচারক জেলা ও দায়রা জজ বা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজদের মধ্য থেকে নিযুক্ত হন। ট্রাইব্যুনাল দায়রা আদালত হিসেবে গণ্য হয়, আর আইনে ভিন্ন কিছু না থাকলে মামলা দায়ের, তদন্ত ও বিচারে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য।[1]
অধ্যাদেশ থেকে ২০২৬ সনের ৮৫ নং আইন
২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার সংশোধনী অধ্যাদেশ চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে। এতে ধর্ষণের সংজ্ঞা বদলানো, বিয়ের প্রলোভনে যৌনকর্মকে আলাদা অপরাধ করা এবং শিশু ধর্ষণের বিচারে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত ছিল।[3] [4] নির্বাচিত সংসদ ২০২৬ সালের এপ্রিলে কণ্ঠভোটে সংশোধনী বিল পাস করে।[2] সরকারি সংকলিত পাঠে প্রতিটি সংশোধনীর পাশে লেখা আছে, সেগুলো ২৫ মার্চ ২০২৫ থেকে কার্যকর।[1] তাই ২০২৫ সালের মার্চের পর হওয়া ঘটনায় পুরোনো বই দেখে ধারা বা শাস্তি ঠিক করা বিপজ্জনক।
কাকে সুরক্ষা দেয়: নারী, শিশু ও মূল সংজ্ঞা
এই আইনে "নারী" অর্থ যেকোনো বয়সের নারী, আর "শিশু" অর্থ অনধিক ষোল বছর বয়সী যেকোনো ব্যক্তি। ২০২৬ সালের সংশোধনী "যৌনকর্ম" শব্দের একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা দিয়েছে এবং ছেলে শিশুর ওপর যৌন নিপীড়নকে "বলাৎকার" নামে সংজ্ঞায়িত করে ধর্ষণের অন্তর্ভুক্ত করেছে। "যৌতুক" অর্থ বিয়ের পণ হিসেবে দাবি করা বা দেওয়া অর্থ, সামগ্রী বা সম্পদ।[1]
যেসব অপরাধে মামলা হয়: ধারা ও শাস্তি
আইনের ৪ থেকে ১৪ ধারায় অপরাধ ও শাস্তি সাজানো; প্রধানগুলো নিচে দেওয়া হলো।[1]
ধর্ষণ, বলাৎকার ও ধর্ষণের চেষ্টা: ধারা ৯
সংশোধিত ৯(১) ধারায় নারী বা শিশুকে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিবাহ বন্ধন ছাড়া ষোল বছরের বেশি বয়সী নারীর সঙ্গে তার সম্মতি ছাড়া, ভয় দেখিয়ে বা প্রতারণা করে সম্মতি আদায় করে যৌনকর্ম, অথবা ষোল বছরের কম বয়সী শিশুর সঙ্গে সম্মতি থাকুক বা না থাকুক যৌনকর্ম ধর্ষণ বলে গণ্য। ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হলে বা দলবদ্ধ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণে মৃত্যু বা জখম হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অন্যূন দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড।[1]
ধর্ষণের চেষ্টার শাস্তি পাঁচ থেকে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড। ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টায় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। ২০২৬ সালে যোগ হওয়া ৯(৪)(গ) দফায় ধর্ষণের উদ্দেশ্যে কোনো অঙ্গ, অস্ত্র বা রাসায়নিক ব্যবহার করে মারাত্মক জখম করলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন এবং অন্যূন তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড। পুলিশ বা অন্য শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ধর্ষণ হলে হেফাজতের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও দণ্ডনীয়।[1]
বিয়ের প্রলোভনে যৌনকর্ম ও আত্মহত্যায় প্ররোচনা
নতুন ৯খ ধারায় দৈহিক বলপ্রয়োগ ছাড়া বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ষোল বছরের বেশি বয়সী কোনো নারীর সঙ্গে যৌনকর্ম, যখন দুজনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক ছিল, সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডযোগ্য আলাদা অপরাধ।[1] ৯ক ধারায় কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত কাজে সম্ভ্রমহানির প্রত্যক্ষ কারণে তিনি আত্মহত্যা করলে দায়ী ব্যক্তি পাঁচ থেকে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয়।[1]
যৌন পীড়ন: ধারা ১০
যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে শরীরের কোনো অঙ্গ বা বস্তু দিয়ে নারী বা শিশুর যৌনাঙ্গ বা অন্য কোনো অঙ্গ স্পর্শ করা, অথবা কোনো নারীর শ্লীলতাহানি করা ১০ ধারায় "যৌন পীড়ন"। শাস্তি তিন থেকে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।[1] কর্মস্থলের অভিযোগ কমিটি ও প্রতিষ্ঠানের দায় নিয়ে আমাদের কর্মস্থলে হয়রানি বিষয়ক লেখাটি দেখুন।
যৌতুকের জন্য নির্যাতন: ধারা ১১ ও নতুন ধারা ৩৫
স্বামী, স্বামীর বাবা-মা, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষে অন্য কেউ যৌতুকের জন্য কোনো নারীকে হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। ২০২৬ সালে যোগ হওয়া (কক) দফায় হত্যার চেষ্টায় যাবজ্জীবন বা বারো বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড। মারাত্মক জখমে যাবজ্জীবন বা পাঁচ থেকে বারো বছর, আর সাধারণ জখমে (দফা গ) শাস্তি বাড়িয়ে এখন দুই থেকে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড, সঙ্গে অর্থদণ্ড।[1]
সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন নতুন ৩৫ ধারা। সংশোধনী বলবৎ হওয়ার পর থেকে ১১(গ) দফার অপরাধ, অর্থাৎ যৌতুকের জন্য সাধারণ জখম, প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আমলে নেবেন ও বিচার করবেন। অপরাধটি আমলযোগ্য, আপসযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য, এবং এর দায়ের থেকে আপিল পর্যন্ত সব ধাপে এই আইনের বিশেষ বিধানের বদলে ফৌজদারি কার্যবিধি ও সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ প্রযোজ্য। ট্রাইব্যুনালে আগে থেকে চলমান ১১(গ) মামলা বদলি হবে না।[1]
দহনকারী পদার্থ বা এসিড নিক্ষেপ: ধারা ৪
দহনকারী, ক্ষয়কারী বা বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটালে বা চেষ্টা করলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। দৃষ্টি বা শ্রবণশক্তি নষ্ট হলে বা মুখমণ্ডল বিকৃত হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন ও দশ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড; অন্য অঙ্গের ক্ষতিতে সাত থেকে চৌদ্দ বছর। কোনো ক্ষতি না হলেও শুধু নিক্ষেপ বা চেষ্টায় তিন থেকে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড। ২০২৬ সালে অর্থদণ্ডের সীমা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে, আর আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীকে দিতে হয়।[1]
অপহরণ, মুক্তিপণ ও মানব পাচার
পাচার ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে নারী বা শিশুকে অপহরণ করলে ৭ ধারায় যাবজ্জীবন বা অন্যূন চৌদ্দ বছর সশ্রম কারাদণ্ড; মুক্তিপণের জন্য আটক করলে ৮ ধারায় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। নারী ও শিশু পাচারের পুরোনো ৫ ও ৬ ধারা মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ৪৭(১) ধারায় রহিত হয়েছে; তাই পাচারের উদ্দেশ্যে অপহরণ বা পাচারের মামলা এখন ২০১২ সালের আইনেই করতে হয়।[1]

থানায় নারী নির্যাতন মামলা করার নিয়ম
সাধারণ পথ হলো ঘটনাস্থলের থানায় গিয়ে এজাহার বা এফআইআর দেওয়া। এই আইনের সব অপরাধ আমলযোগ্য।[1] জিডি থেকে চার্জশিট পর্যন্ত সাধারণ ফৌজদারি মামলার ধাপগুলো আমাদের ফৌজদারি মামলার পর্যায় বিষয়ক লেখায় বিস্তারিত আছে; এখানে শুধু এই আইনের বিশেষ নিয়মগুলো বলা হলো।
ধারা ২৫ক: ওসি ফিরিয়ে দিতে পারবেন না
২০২৬ সালে যোগ হওয়া ২৫ক ধারা বলে, প্রাথমিক সাক্ষ্যপ্রমাণসহ কোনো অভিযোগকারী থানায় হাজির হলে অফিসার ইনচার্জ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগটি এজাহারভুক্ত করবেন এবং ভুক্তভোগীর মেডিক্যাল পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নেবেন। ঘটনা অন্য থানার এলাকায় ঘটেছে, শুধু এই যুক্তিতে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না; যে থানাতেই যান, ওসি বক্তব্য লিপিবদ্ধ করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন এবং কেস ডায়েরিসহ অভিযোগ উপযুক্ত থানায় পাঠাবেন।[1]
নারীপক্ষ মামলার নির্দেশনা
এই বিধানের আগেই হাইকোর্ট বিভাগ নারীপক্ষ বনাম বাংলাদেশ (রিট পিটিশন নং ৫৫৪১/২০১৫, রায় ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬) মামলায় বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেন: ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের তথ্য ঘটনাস্থল যেখানেই হোক দেরি না করে লিখে নিতে হবে; প্রতিটি থানায় সার্বক্ষণিক অন্তত কনস্টেবল পদমর্যাদার একজন নারী পুলিশ সদস্য থাকবেন; সব পর্যায়ে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখতে হবে; আর জবানবন্দি তার মনোনীত আইনজীবী, বন্ধু বা সমাজকর্মীর উপস্থিতিতে নিতে হবে।[7]
এজাহারে যা লিখবেন
এজাহারে তারিখ, সময়, স্থান, প্রত্যেক আসামির নির্দিষ্ট ভূমিকা, সাক্ষী, চিকিৎসার তথ্য এবং দেরি হলে তার কারণ সত্যভাবে লিখুন। এজাহারের কপি ও মামলা নম্বর অবশ্যই নিয়ে নিন। পুরো নারী নির্যাতন মামলা এই প্রথম কাগজটির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।
ট্রাইব্যুনালে সরাসরি নালিশি মামলা
থানা মামলা না নিলে ভুক্তভোগীর পথ বন্ধ হয় না। ২৭ ধারা অনুযায়ী সাধারণভাবে সাব-ইন্সপেক্টরের নিচে নন এমন পুলিশ কর্মকর্তার লিখিত রিপোর্ট ছাড়া ট্রাইব্যুনাল অপরাধ আমলে নেয় না। কিন্তু অভিযোগকারী যদি হলফনামাসহ জানান যে তিনি পুলিশকে অভিযোগ নিতে অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়েছেন, তাহলে ট্রাইব্যুনালে সরাসরি নালিশ করা যায়।[1]
হলফনামা, পরীক্ষা ও সাত কার্যদিবসের অনুসন্ধান
ট্রাইব্যুনাল অভিযোগকারীকে পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট হলে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্য কাউকে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়, যিনি সাত কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দেবেন; সন্তুষ্ট না হলে অভিযোগ সরাসরি নাকচ হয়। রিপোর্টে পুলিশের কাছে ব্যর্থ হওয়ার প্রমাণ ও প্রাথমিক সাক্ষ্য পাওয়া গেলে ট্রাইব্যুনাল অপরাধ আমলে নেয়।[1] তাই নালিশি দরখাস্তের সঙ্গে থানায় যাওয়ার তারিখ, কার সঙ্গে কথা হয়েছে এবং কী বলা হয়েছে, তা হলফনামায় নির্দিষ্টভাবে লিখুন।
অভিযোগকে এজাহার হিসেবে গণ্য করার আদেশ
২০২৬ সালে যোগ হওয়া ২৭(১ঘ) উপধারায় উপযুক্ত ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল নালিশটিকে এজাহার হিসেবে গণ্য করতে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে আদেশ দিতে পারে।[1] এতে সরাসরি পুলিশি তদন্ত শুরু হয়। ঘটনা বা অপরাধীকে যে ট্রাইব্যুনালের এলাকায় পাওয়া গেছে, সেখানে নালিশ করা যায়।[1]
ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ১০৯ হেল্পলাইন ও আইনগত সহায়তা
নারী নির্যাতন মামলায় চিকিৎসা, আশ্রয়, মানসিক সহায়তা ও নিরাপত্তাও লাগে; নিচের সেবাগুলো বিনা খরচে পাওয়া যায়।[9]
১০৯ জাতীয় হেল্পলাইন
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২৪ ঘণ্টার টোল-ফ্রি নম্বর; উদ্ধার, আইনি ও মনোসামাজিক সহায়তা।
৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবা
নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা, হয়রানি বা পিছু নেওয়াকে জরুরি অবস্থা হিসেবে গণ্য করে।
ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং, আশ্রয় ও ডিএনএ পরীক্ষা এক জায়গায়।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিস
৬৪ জেলায় অসচ্ছল নারী ও শিশুর জন্য বিনা খরচে আইনজীবী; জাতীয় হেল্পলাইন ১৬৬৯৯।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল
প্রতিটি জেলা সদরে; শিশু ধর্ষণের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুযোগ।
২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাত্র ১২ শতাংশ নারী ১০৯ সম্পর্কে এবং মাত্র ২ শতাংশ ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার সম্পর্কে জানেন।[9] ২০২৬ সালের অক্টোবরের সরকারি তথ্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা হেল্পলাইনের টোল-ফ্রি নম্বর ১৬৬৯৯।[10] কারা যোগ্য ও কীভাবে আবেদন করবেন, তা আমাদের আইনগত সহায়তা বিষয়ক লেখায় আছে।
মেডিক্যাল পরীক্ষা ও ডিএনএ পরীক্ষা
৩২ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী দুজনেরই মেডিক্যাল পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে বা সরকার-স্বীকৃত বেসরকারি হাসপাতালে করা যায়। ভুক্তভোগী নিজে সরকারি হাসপাতালে গেলে বা পুলিশ হাজির করলে কোনো ফি লাগে না। কর্তব্যরত চিকিৎসক অতিদ্রুত পরীক্ষা শেষ করবেন, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিনামূল্যে সার্টিফিকেট ভুক্তভোগী বা তার পরিবার এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেবেন এবং স্থানীয় থানাকে জানাবেন।[1]
৩২ক ধারায় তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীর সম্মতি থাকুক বা না থাকুক ডিএনএ আইন, ২০১৪ অনুযায়ী ডিএনএ পরীক্ষা করাতে পারেন, তবে করা বা না করা দুই ক্ষেত্রেই ট্রাইব্যুনাল বা এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন লাগে; পরীক্ষা না করলে কারণ তদন্ত প্রতিবেদনে লিখতে হয়।[1] নারীপক্ষ মামলায় হাইকোর্ট সব ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন মামলায় রাসায়নিক বা ডিএনএ পরীক্ষা এবং ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নমুনা ল্যাবে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।[7]
তবে ডিএনএ রিপোর্ট না থাকলেই মামলা শেষ নয়। ২০২৬ সালে যোগ হওয়া ২০(৯) উপধারায় কেবল ধর্ষণ মামলায় ট্রাইব্যুনাল উপযুক্ত মনে করলে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচার শেষ করতে পারে।[1] আর যেখানে ভুক্তভোগীর সম্মতি দেওয়ার সক্ষমতাই নেই, সেখানে ২৪ক ধারায় ট্রাইব্যুনাল ধরে নিতে পারে যে সম্মতি ছিল না।[1] সম্ভব হলে ঘটনার সময়ের কাপড় না ধুয়ে কাগজের ব্যাগে আলাদা রাখুন।

তদন্ত ও বিচারের সময়সীমা: ২০২৬ সালের নিয়ম
তদন্ত: ১৫ বা ৩০ কার্যদিবস
আসামি অপরাধের সময় হাতেনাতে ধরা পড়লে তদন্ত শেষ করতে হয় ধরা পড়ার পরের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে। হাতেনাতে ধরা না পড়লে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া বা তদন্তের আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসে; আগে এই সময় ছিল ৬০ কার্যদিবস। যুক্তিসংগত কারণে না পারলে তদন্তকারী কর্মকর্তা মেয়াদ শেষের আগেই কেস ডায়েরিসহ লিখিত কারণ দেখিয়ে আরও ১৫ কার্যদিবস পেতে পারেন; ডিএনএ পরীক্ষা লাগলে ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেট ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সময় বাড়াতে পারেন।[1]
তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিলে ট্রাইব্যুনাল নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করতে পারে, যাকে ১৫ কার্যদিবসে তদন্ত শেষ করতে হয়। ধর্ষণ মামলার তদন্ত চলাকালে প্রশাসনিক আদেশে তদন্তকারী কর্মকর্তার বদলি কার্যকর হয় না। সময়মতো তদন্ত না করা কর্মকর্তার অদক্ষতা ও অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে।[1]
বিচার: ১৮০ কার্যদিবস, ধর্ষণে ৯০ কার্যদিবস
শুনানি শুরু হলে প্রতি কর্মদিবসে একটানা চলার কথা। মামলা পাওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসে বিচার শেষ করতে হয়; ধর্ষণ মামলায় অভিযোগ গঠনের তারিখ থেকে ৯০ কার্যদিবসে। ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে ধর্ষণ মামলার বিচার শেষ না হলে বিচারককে পরের তিন কার্যদিবসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে লিখিত ব্যাখ্যা পাঠাতে হয়। শিশু ধর্ষণের বিচারে প্রতিটি জেলা ও মহানগরে "শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল" গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে; গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ ট্রাইব্যুনালই সেই দায়িত্ব পালন করে।[1]
সময়সীমা পেরোলে কী হয়
বাস্তবে সময়সীমা প্রায়ই মানা হয় না। হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৩ সালের এক রায়ে বলেছেন, ১৮০ দিনে বিচার শেষের বিধান বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশনামূলক; সময় পেরোলেও বিচার স্থগিত বা বাতিল হয় না।[8] সময়সীমা পার হওয়া তাই আসামির খালাসের যুক্তি নয়। আর আসামি পলাতক থাকলে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র গ্রহণের পরের ২০ দিনের মধ্যে নোটিশ জারি করে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার চালাতে পারে।[1]
ভুক্তভোগীর সুরক্ষা: পরিচয় গোপন, রুদ্ধদ্বার বিচার ও নিরাপত্তা
১৪ ধারায় ভুক্তভোগী নারী বা শিশুর নাম-ঠিকানা, ছবি বা অন্য কোনো তথ্য সংবাদপত্র, অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ করা যাবে না যাতে তার পরিচয় প্রকাশ পায়; লঙ্ঘনে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয়ই। "বা ছবি" এবং "অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে" শব্দগুলো ২০২৬ সালের সংশোধনীতে যোগ হয়েছে।[1]
ধর্ষণ মামলার বিচার আবেদনে বা ট্রাইব্যুনালের বিবেচনায় রুদ্ধদ্বার কক্ষে হতে পারে, আর দূরের সাক্ষীর সাক্ষ্য তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে নেওয়া যায়। নতুন ৩২খ ধারায় ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগকারী, ভুক্তভোগী বা সাক্ষীর নিরাপত্তার আদেশ দিতে পারেন এবং সাক্ষীদের যাতায়াত ও সময়ের ক্ষতিপূরণও দিতে পারেন।[1]
কাউকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা দরকার হলে ৩১ ধারায় তাকে কারাগারের বাইরে, সরকার নির্ধারিত স্থানে বা উপযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া যায়, আর এমন আদেশের আগে ট্রাইব্যুনালকে ওই নারী বা শিশুর মতামত নিয়ে বিবেচনা করতে হয়।[1] কোনো শিশু অভিযুক্ত বা সাক্ষী হলে যতদূর সম্ভব শিশু আইন, ২০১৩ মেনে চলতে হয়; শিশুদের বিচার ও সুরক্ষার বিস্তারিত দেখুন আমাদের শিশু অপরাধ আইন বিষয়ক বিশ্লেষণে (ইংরেজিতে)।
ক্ষতিপূরণ ও ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তান
ধারা ৪ থেকে ১৪-এর অপরাধে আরোপিত অর্থদণ্ড ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য করতে পারে,, যা দরকার হলে দণ্ডিতের ভবিষ্যৎ সম্পদ থেকেও আদায় হয়।[1] ধর্ষণের কারণে কোনো সন্তান জন্ম নিলে সে মা বা মাতৃকুলের আত্মীয়দের তত্ত্বাবধানে থাকতে পারে, বাবা বা মা বা উভয়ের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার অধিকার পায়, আর তার ভরণপোষণ রাষ্ট্র বহন করে, যা সরকার পরে ধর্ষকের সম্পদ থেকে আদায় করতে পারে।[1]
নারী নির্যাতন মামলায় জামিন
১৯ ধারা জামিনকে কঠোর করেছে। অপরাধে জড়িত মূল ও প্রত্যক্ষ অভিযুক্তকে জামিন দেওয়া হবে না, যদি জামিনের আবেদনে অভিযোগকারী পক্ষকে শুনানির সুযোগ না দেওয়া হয়, এবং যদি ট্রাইব্যুনাল বা এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত সন্তুষ্ট হয় যে তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার যুক্তিসংগত কারণ আছে। অভিযুক্ত নারী, শিশু বা শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হবে না মনে করলে জামিন দেওয়া যায়। মূল আসামি ছাড়া অন্য অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে আদালত কারণ লিখে জামিন দিতে পারে।[1] [12]
বাদীর জন্য এর অর্থ পরিষ্কার: জামিন শুনানির নোটিশ পেলে উপস্থিত থাকুন বা আইনজীবী পাঠান, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও জবানবন্দির কপি নিয়ে আপত্তি জানান। যৌতুকের জন্য সাধারণ জখমের ১১(গ) মামলা এখন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির সাধারণ নিয়মে চলে, তাই সেখানে জামিন ম্যাজিস্ট্রেটের বিবেচনায়।[1] ম্যাজিস্ট্রেট থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত জামিনের সিঁড়ি ও আগাম জামিনের শর্ত জানতে পড়ুন আমাদের জামিনের নিয়ম বিষয়ক লেখাটি।
মিথ্যা মামলার শাস্তি: ধারা ১৭
আইনের কঠোরতার অপব্যবহার ঠেকাতে ১৭ ধারা আছে। কাউকে ক্ষতি বা, ২০২৬ সাল থেকে, মর্যাদাহানির উদ্দেশ্যে ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ নেই জেনেও এই আইনে মামলা করলে বা করালে দায়েরকারী ও যিনি করিয়েছেন দুজনেই সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয়। ট্রাইব্যুনাল লিখিত অভিযোগে বা নিজ উদ্যোগে এই অপরাধ আমলে নিতে পারে।[1]
নতুন ১৭(৩) উপধারায় রায় দেওয়ার সময় অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক প্রমাণিত হলে ট্রাইব্যুনাল বাদীকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে অভিযুক্তকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারে এবং প্রয়োজনে বাদীকে দুই বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দিতে পারে।[1] প্রমাণের অভাবে খালাস হলেই বাদী মিথ্যা মামলাকারী হন না। মিথ্যা মামলায় জড়ানো ব্যক্তিরা হাইকোর্টে ৫৬১এ ধারায় কার্যধারা বাতিলের প্রতিকারও বিবেচনা করতে পারেন; দেখুন আমাদের ৫৬১এ ধারায় ফৌজদারি মামলা বাতিল প্র্যাকটিস।
পারিবারিক সহিংসতা আইন ২০১০: আদালতের সুরক্ষা আদেশ
সব নির্যাতনের প্রতিকার ফৌজদারি মামলায় নয়। ঘরে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশু পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর অধীনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দ্রুত আদেশ চাইতে পারেন। আইনটি শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতি চার ধরনের সহিংসতা স্বীকার করে।[6]
ভুক্তভোগী নিজে বা তার পক্ষে প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, সেবা প্রদানকারী বা অন্য যে কেউ আবেদন করতে পারেন; আবেদন পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে শুনানির তারিখ পড়ে। আদালত একতরফা অন্তর্বর্তী সুরক্ষা আদেশ, সুরক্ষা আদেশ, বসবাস আদেশ, ক্ষতিপূরণ ও ভরণপোষণের আদেশ এবং সন্তানের সাময়িক নিরাপদ হেফাজতের আদেশ দিতে পারেন।[6]
সুরক্ষা আদেশ লঙ্ঘন করলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয়ই, পুনরাবৃত্তিতে দুই বছর বা এক লাখ টাকা পর্যন্ত। এই আইনের অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য, আর আইনটি অন্য আইনের অতিরিক্ত, তাই একই ঘটনায় সুরক্ষা আদেশ ও নারী নির্যাতন মামলা একসঙ্গে চলতে পারে।[6] প্রতিটি আদেশ, সময়সীমা ও আপিলের বিস্তারিত পাবেন আমাদের পারিবারিক সহিংসতা আইন বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণে (ইংরেজিতে)।
যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮: শুধু দাবিও অপরাধ
মারধর ছাড়া শুধু যৌতুক দাবিও অপরাধ। যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারায় বিয়ের এক পক্ষ অপর পক্ষের কাছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌতুক দাবি করলে এক থেকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ৪ ধারায় যৌতুক দেওয়া, নেওয়া, তাতে সহায়তা করা বা চুক্তি করারও একই শাস্তি, আর এমন চুক্তি বাতিল।[5]
দেনমোহর বা মোহরানা এবং বিয়েতে আত্মীয়-বন্ধুর দেওয়া উপহার যৌতুক নয়। এই আইনের অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপসযোগ্য, এবং তদন্ত, বিচার ও আপিলে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য। জেনেশুনে ভিত্তিহীন যৌতুক মামলা করলে ৬ ধারায় পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড।[5] মারধর বা জখম থাকলে মামলা যায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১ ধারায়; শুধু দাবি বা হুমকি থাকলে যৌতুক নিরোধ আইনে। তালাক, দেনমোহর ও ভরণপোষণের প্রশ্ন থাকলে আমাদের তালাকের নিয়ম বিষয়ক লেখাটিও দেখুন।

কোন প্রতিকার কোন আইনে: এক নজরে
অনেক ক্ষেত্রে একাধিক পথ একসঙ্গে নিতে হয়: ফৌজদারি মামলা, সুরক্ষা আদেশ ও পারিবারিক আদালতের দাবি।
| পরিস্থিতি | আইন ও ধারা | আদালত | মূল বিষয় |
|---|---|---|---|
| ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা | নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ধারা ৯ | নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল | বিচার অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসে; রুদ্ধদ্বার বিচার সম্ভব |
| যৌন পীড়ন বা শ্লীলতাহানি | একই আইন, ধারা ১০ | ট্রাইব্যুনাল | তিন থেকে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড |
| যৌতুকের জন্য সাধারণ জখম | একই আইন, ধারা ১১(গ) ও ৩৫ | প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট | দুই থেকে পাঁচ বছর; আপসযোগ্য, জামিন-অযোগ্য |
| শুধু যৌতুক দাবি | যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮, ধারা ৩ | ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (ফৌজদারি কার্যবিধি) | এক থেকে পাঁচ বছর বা অর্থদণ্ড; আপসযোগ্য |
| ঘরে চলমান নির্যাতন | পারিবারিক সহিংসতা আইন ২০১০ | জুডিশিয়াল বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট | সাত কার্যদিবসে শুনানি; সুরক্ষা ও বসবাস আদেশ |
| এসিড বা দহনকারী পদার্থ | নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ধারা ৪ | ট্রাইব্যুনাল | বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, ক্ষতিপূরণ হিসেবে |
ধাপে ধাপে মামলার প্রস্তুতি
প্রতিটি ঘটনা আলাদা, তবে নিচের ক্রমটি বেশির ভাগ মামলায় ভুক্তভোগীর অবস্থান সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষা করে।
নিরাপত্তা আগে
ঝুঁকি থাকলে ৯৯৯ বা ১০৯-এ ফোন করুন এবং নিরাপদ স্থানে যান।
চিকিৎসা ও মেডিক্যাল পরীক্ষা
দেরি না করে সরকারি হাসপাতাল বা ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে যান; ৭২ ঘণ্টার সার্টিফিকেট নিন।
সঠিক আইন ও ধারা
ধর্ষণ, যৌন পীড়ন, যৌতুক দাবি না জখম, পাচার না অপহরণ, তা আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
থানায় এজাহার
তারিখ, স্থান, প্রত্যেক আসামির ভূমিকা ও সাক্ষী লিখে এজাহার দিন; কপি নিন।
থানা ব্যর্থ হলে ট্রাইব্যুনাল
২৫ক ধারা দেখিয়েও না নিলে হলফনামাসহ ট্রাইব্যুনালে নালিশ করুন।
তদন্ত ও জামিনে নজর
সময়সীমা ক্যালেন্ডারে রাখুন, জামিন শুনানিতে আপত্তি জানান, দুর্বল প্রতিবেদনে নারাজি দিন।
বিচার ও আপিল
প্রতিটি তারিখে সাক্ষী হাজির রাখুন; আপিলের সময় ৩০ দিন।
আপস, সালিশ ও মধ্যস্থতা: কোথায় চলে, কোথায় চলে না
পরিবারে প্রায়ই "মীমাংসার" চাপ আসে, কিন্তু ধর্ষণ, এসিড, যৌন পীড়ন বা যৌতুকের জন্য হত্যা বা মারাত্মক জখমের মতো অপরাধ সালিশে মেটানোর বিষয় নয়। আপসযোগ্য কেবল কিছু ক্ষেত্র, যেমন নতুন ৩৫ ধারায় যৌতুকের জন্য সাধারণ জখম এবং যৌতুক নিরোধ আইনের অপরাধ।[1] [5]
২০২৬ সালের আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসকে বিনা খরচে কিছু চলমান মামলায় মধ্যস্থতার ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার মধ্যে আছে যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ও ৪ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারার মামলা; হত্যা, ধর্ষণ ও দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারার মতো গুরুতর অপরাধ এর বাইরে।[11] মধ্যস্থতায় রাজি হওয়া পুরোপুরি ভুক্তভোগীর সিদ্ধান্ত; ঝুঁকি থাকলে আলাদা বৈঠক চান। আপসযোগ্য অপরাধের নিয়ম জানতে দেখুন ফৌজদারি মামলায় আপস বিষয়ক লেখাটি, আর পারিবারিক নিষ্পত্তির জন্য আমাদের পারিবারিক মধ্যস্থতা ও নিষ্পত্তি প্র্যাকটিস।
নারী নির্যাতন মামলায় যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে
মামলার ফল প্রায়ই প্রথম সপ্তাহের সিদ্ধান্তেই ঠিক হয়ে যায়।
- চিকিৎসা ও মেডিক্যাল পরীক্ষায় দেরি: সময় গেলে আলামত নষ্ট হয়, আর ৭২ ঘণ্টার সার্টিফিকেটের সুবিধাও কাজে লাগে না।[1]
- ভুল ধারা বা ভুল আইন: বিয়ের প্রলোভনের ঘটনাকে ধর্ষণ, শুধু যৌতুক দাবিকে ১১ ধারা, বা পাচারকে এই আইনের মামলা বানালে বিচার দুর্বল হয়।
- ঢালাও আসামি করা: পরিবারের সবাইকে আসামি করলে মূল আসামির ভূমিকা ঝাপসা হয় এবং ১৭ ধারার ঝুঁকি তৈরি হয়।
- থানা ফিরিয়ে দিলে হাল ছেড়ে দেওয়া: ২৫ক ধারা দেখান; তারপরও না নিলে হলফনামাসহ ট্রাইব্যুনালে যান।[1]
- জামিন শুনানিতে অনুপস্থিত থাকা: বাদীর শুনানির অধিকার ১৯ ধারার মূল রক্ষাকবচ; অনুপস্থিত থাকলে তা হারায়।
- সামাজিক মাধ্যমে ভুক্তভোগীর ছবি বা পরিচয় প্রকাশ: সহানুভূতি থেকে করা পোস্টও ১৪ ধারায় অপরাধ হতে পারে।
- অনানুষ্ঠানিক "আপস" করে মামলা তুলে নেওয়া: গুরুতর অপরাধ আপসযোগ্য নয়, আর চাপের মুখে নেওয়া সিদ্ধান্ত পরে ফেরানো কঠিন।
- নারাজির সুযোগ হাতছাড়া করা: দুর্বল তদন্ত প্রতিবেদন এলে সময়মতো নারাজি দিন এবং নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা চান।[1]
রায়ের পর: আপিল ও মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন
ট্রাইব্যুনালের আদেশ, রায় বা দণ্ডে সংক্ষুব্ধ পক্ষ আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারেন; ২০২৬ সালের সংশোধনীর আগে এই সময় ছিল ৬০ দিন। ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিলে নথি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারায় হাইকোর্ট বিভাগে পাঠাতে হয়, আর অনুমোদন ছাড়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় না।[1] তাই রায়ের দিনই সার্টিফায়েড কপির আবেদন করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নারী নির্যাতন মামলা কোথায় করতে হয়?
ঘটনাস্থলের থানায় এজাহার দিয়ে, অথবা থানা মামলা না নিলে হলফনামাসহ জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সরাসরি নালিশ করে।[1]
থানা মামলা না নিলে কী করব?
২৫ক ধারার কথা উল্লেখ করুন। তারপরও না নিলে ট্রাইব্যুনালে হলফনামাসহ নালিশ করুন; ট্রাইব্যুনাল সাত কার্যদিবসের অনুসন্ধান করাতে পারে বা অভিযোগটি এজাহার হিসেবে নিতে ওসিকে আদেশ দিতে পারে।[1]
নারী নির্যাতন মামলার তদন্ত কত দিনে শেষ করতে হয়?
আসামি হাতেনাতে ধরা পড়লে ১৫ কার্যদিবসে, অন্যথায় ৩০ কার্যদিবসে। কারণ দেখিয়ে আরও ১৫ কার্যদিবস বাড়ানো যায়।[1]
ধর্ষণ মামলার বিচার কত দিনে শেষ হওয়ার কথা?
মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য কি টাকা লাগে?
না। ভুক্তভোগী নিজে সরকারি হাসপাতালে গেলে বা পুলিশ হাজির করলে ফি লাগে না, আর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিনামূল্যে সার্টিফিকেট দিতে হয়।[1]
যৌতুকের জন্য মারধরের মামলা কোন আদালতে হয়?
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় কি আসামির জামিন হয়?
মূল ও প্রত্যক্ষ আসামির জামিনে বাদীকে শুনানির সুযোগ দিতে হয়, আর দোষী হওয়ার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে জামিন হয় না।[12]
মিথ্যা মামলা করলে শাস্তি কী?
১৭ ধারায় সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। রায়ের সময় ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তকে ক্ষতিপূরণও দিতে পারে।[1]
ভুক্তভোগীর নাম বা ছবি প্রকাশ করলে কী হয়?
সংবাদমাধ্যম, অনলাইন বা সামাজিক মাধ্যমে পরিচয় প্রকাশ পেলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।[1]
সূত্র তালিকা
প্রাথমিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক সূত্র
উপকরণ যাচাইয়ের তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৬। কোনো বিধানের ওপর নির্ভর করার আগে সর্বশেষ সরকারি পাঠ মিলিয়ে নিন।
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, ২০২৬ সনের ৮৫ নং আইনে সংশোধিত — বাংলাদেশ আইন
- BSS, 12 April 2026 — Repression Prevention (Amendment) Bill passed
- প্রথম আলো, ১৭ মার্চ ২০২৫ — অধ্যাদেশের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন
- ডেইলি স্টার বাংলা, ২০ মার্চ ২০২৫ — আইনে যেসব পরিবর্তন আসছে
- Dowry Prohibition Act 2018, Authentic English Text — Bangladesh Gazette
- পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ — বাংলাদেশ আইন
- Naripokkho v Bangladesh, Writ Petition No. 5541 of 2015, 10 SCOB [2018] HCD
- প্রথম আলো — ১৮০ দিনের বিধান বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশনামূলক
- The Daily Star, 24 November 2025 — Where can women turn?
- ডেইলি স্টার বাংলা, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ — আইনগত সহায়তা হেল্পলাইন ১৬৬৯৯
- bdnews24.com, 12 August 2026 — Supreme Court legal aid mediation
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ধারা ১৯ (জামিন) — বাংলাদেশ আইন
TRW-এর সহায়তা
তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপে
TRW নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, যৌতুক নিরোধ আইন ও পারিবারিক সহিংসতা আইনের মামলায় এজাহার ও নালিশি দরখাস্ত তৈরি, জামিন শুনানি, নারাজি, ট্রাইব্যুনালে বিচার, আপিল এবং মিথ্যা মামলায় ৫৬১এ ধারায় প্রতিকারে ভুক্তভোগী, তার পরিবার ও অভিযুক্তদের সহায়তা করে। দেখুন আমাদের ফৌজদারি মামলা বাতিল (৫৬১এ) প্র্যাকটিস ও পারিবারিক মধ্যস্থতা ও নিষ্পত্তি প্র্যাকটিস, অথবা আপনার পরিস্থিতি গোপনে আলোচনা করতে TRW-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।