বাংলাদেশে চুক্তি প্রবলের মামলা: পুরো যাত্রা, ধাপে ধাপে
বাংলাদেশে চুক্তি প্রবলের মামলা (specific performance suit) হলো সেই পথ, যার মাধ্যমে ক্রেতা এমন বিক্রেতাকে বিক্রয় সম্পন্ন করতে বাধ্য করেন, যিনি জমি বিক্রির চুক্তিপত্রে (বায়নানামা) স্বাক্ষর করেও সাফকবলা দলিল রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকার করেছেন; এটি চলে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ১২ ও ২১ক অনুযায়ী।
১ জুলাই ২০০৫ থেকে কার্যকর ২০০৪ সালের সংশোধনী অনুযায়ী মামলাটি কেবল তখনই সফল হয়, যখন বায়নানামা রেজিস্টার্ড এবং ক্রেতা মামলা দায়েরের সময় মূল্যের অপরিশোধিত বাকি অংশ আদালতে জমা দেন; আর মামলা করতে হয় এক বছরের মধ্যে। এই গাইডে ব্যর্থ বিক্রয় থেকে বিচার, আদালতের মাধ্যমে সম্পাদিত সাফকবলা দলিল, দখল ও আপিল পর্যন্ত মামলাটির যাত্রা দেখানো হয়েছে।
- কোথা থেকে শুরু
- জমি যেখানে অবস্থিত সেখানকার প্রথম দেওয়ানি আদালত, বিক্রয়মূল্যের পরিমাণ অনুযায়ী: সিভিল জজ (Civil Judge) (১৫ লাখ টাকা…
- মূল আইন
- সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (ধারা ১২, ১৯, ২১ক, ২২, ২৪, ২৭); সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ (ধারা ৫৪ক); রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮…
- সাধারণ সময়কাল
- ঢাকার সাধারণ চর্চা অনুযায়ী নির্দেশক সময়: বিচারে ২-৫ বছর; আপিল, রিভিশন ও আপিল বিভাগসহ ৫-১২ বছর বা তার বেশি
- কে মামলা করতে পারেন
- রেজিস্টার্ড বিক্রয় চুক্তির অধীন ক্রেতা (বা তাঁর ওয়ারিশ বা স্বত্বনিয়োগী); বিক্রয় সম্পন্ন করতে অস্বীকারকারী ক্রেতার…
চুক্তি প্রবলের মামলা: প্রতিটি পর্যায় ধাপে ধাপে
“পরের” চাপুন, কিবোর্ডের তীর-চিহ্ন ব্যবহার করুন অথবা ম্যাপে কোনো আদালতে ট্যাপ করুন। সোনালি চিহ্ন দেখায় আপনার মামলা এখন কোথায়, আর সবুজ রেখা দেখায় মামলাটি কোন পথে এসেছে। পূর্ণ অভিজ্ঞতার জন্য পূর্ণ স্ক্রিনে চালান।
প্রতিটি ধাপ লেখা আকারে পড়ুন
ধাপ ১ · মামলা দায়েরের আগেবায়নানামা ও সময়সীমা যাচাই করুন
আইনজীবী বিক্রয় চুক্তিটি খুঁটিয়ে পড়েন। বাংলাদেশে চুক্তি প্রবলের মামলা টিকবে কি না, তা তিনটি মৌলিক প্রশ্নে নির্ধারিত হয়। ১ জুলাই ২০০৫ থেকে কার্যকর ২০০৪ সালের সংশোধনীর পর থেকে আইন যেমন চায়, বায়নানামা কি লিখিত ও রেজিস্টার্ড ছিল? ক্রেতা কি দায়েরের সময় পুরো অপরিশোধিত বাকি অংশ আদালতে জমা দিতে পারবেন? সাফকবলা দলিল রেজিস্ট্রির জন্য নির্ধারিত তারিখ থেকে এক বছরের মধ্যে কি দাবিটি করা হচ্ছে?
চুক্তিতে সম্পাদনের কোনো তারিখ না থাকলে ধারা ৫৪ক অনুযায়ী এর রেজিস্ট্রেশন থেকে ছয় মাসকে সময় হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং সাধারণত তখন থেকেই তামাদি গণনা হয়; পুরোনো চুক্তির ক্ষেত্রে গণনা বিক্রেতার অস্বীকৃতি থেকেও হতে পারে।
কোথায়: আইনজীবীর চেম্বার · সময়: ১ সপ্তাহ · আইন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ২১ক; সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ধারা ৫৪ক; রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ধারা ১৭ক; তামাদি আইন, ১৯০৮, প্রথম তফসিল, অনুচ্ছেদ ১১৩ · কাগজপত্র: রেজিস্টার্ড বায়নানামা, প্রদত্ত অগ্রিম (বায়না) অর্থের রসিদ, বিক্রেতার সঙ্গে চিঠিপত্র
পরামর্শ: এক বছরের তামাদি সংক্ষিপ্ত এবং কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। আলোচনার কারণে এই সময় পার হতে দেবেন না।
ধাপ ২ · মামলা দায়েরের আগেসাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশি করুন
আইনজীবী রেজিস্টার্ড বায়নানামার সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করেন এবং সাব-রেজিস্ট্রির বালাম ও সূচি তল্লাশি করে দেখেন চুক্তির পর বিক্রেতা জমিটি অন্য কাউকে বিক্রি, দান বা বন্ধক দিয়েছেন কি না। পরবর্তী যেকোনো হস্তান্তরগ্রহীতাকে বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত করতে হয়। যে হস্তান্তরগ্রহীতা আগের চুক্তির নোটিশ ছাড়াই সরল বিশ্বাসে মূল্য দিয়েছেন, তিনি দাবিটি ব্যর্থ করে দিতে পারেন, তবে রেজিস্টার্ড বায়নানামা থাকলে নোটিশ প্রমাণ করা অনেক সহজ। বিক্রেতার স্বত্ব নিশ্চিত করতে খতিয়ান ও নামজারির রেকর্ডও যাচাই করা হয়।
কোথায়: সাব-রেজিস্ট্রি অফিস · সময়: ১-৩ সপ্তাহ · আইন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ২৭(খ); সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ধারা ৩ (নোটিশ) ও ৫৪ক; রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ধারা ৫৭ · কাগজপত্র: বায়নানামার সার্টিফায়েড কপি, পরবর্তী দলিলের তল্লাশি প্রতিবেদন, খতিয়ান ও নামজারির রেকর্ড
পরামর্শ: পরবর্তী প্রত্যেক ক্রেতাকে বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত করুন; কেবল বিক্রেতার বিরুদ্ধে ডিক্রি তাঁদের ওপর বাধ্যকর হবে না।
ধাপ ৩ · মামলা দায়েরের আগেআইনি নোটিশ ও প্রস্তুতির প্রমাণ
বাধ্যতামূলক না হলেও ক্রেতা সাধারণত রেজিস্টার্ড ডাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে বিক্রেতাকে একটি নির্দিষ্ট তারিখে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাফকবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করতে বলেন এবং জানান যে বাকি টাকা প্রস্তুত। ক্রেতা সেই তারিখে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত থাকতে পারেন। চুক্তিতে কোনো তারিখ না থাকলে অস্বীকৃতি বা নীরবতা থেকেই তামাদি গণনার তারিখ নির্ধারিত হয়, এবং নোটিশটি প্রমাণ করে যে ক্রেতা সবসময় নিজের অংশ পালনে প্রস্তুত ও ইচ্ছুক ছিলেন, যা ডিক্রি দেওয়ার আগে আদালতকে সন্তুষ্ট হতে হয়।
কোথায়: আইনজীবীর চেম্বার · সময়: ২-৪ সপ্তাহ · আইন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ২৪(খ); তামাদি আইন, ১৯০৮, প্রথম তফসিল, অনুচ্ছেদ ১১৩ · কাগজপত্র: আইনি নোটিশ, ডাক রসিদ ও প্রাপ্তিস্বীকারপত্র, অর্থ থাকার প্রমাণস্বরূপ ব্যাংক বিবরণী
পরামর্শ: বাকি টাকা যে সারাক্ষণ হাতে ছিল তার প্রমাণ রাখুন। যে ক্রেতা টাকা দিতে প্রস্তুত ছিলেন না, আদালত তাঁকে প্রতিকার দেন না।
ধাপ ৪ · জমা ও মামলা দায়েরমামলার মূল্যায়ন ও ফি হিসাব করুন
বিক্রয় চুক্তি প্রবলের মামলার মূল্যায়ন হয় বায়নানামায় উল্লিখিত পণের অঙ্কে, এবং কোর্ট ফি আইন অনুযায়ী আইনি সর্বোচ্চ সীমা সাপেক্ষে এর ওপর মূল্যানুপাতিক কোর্ট ফি দিতে হয়। এই মূল্যই আদালত নির্ধারণ করে: জমি যে জেলায় অবস্থিত সেখানে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সিভিল জজ, ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সিনিয়র সিভিল জজ এবং এর বেশি হলে যুগ্ম জেলা জজ। আরজিতে বিকল্প প্রতিকার হিসেবে অগ্রিম অর্থ ফেরত ও ক্ষতিপূরণও দাবি করা উচিত।
কোথায়: আইনজীবীর চেম্বার · সময়: ১ সপ্তাহ · আইন: কোর্ট ফি আইন, ১৮৭০-এর ধারা ৭(১০)(ক); মামলা মূল্যায়ন আইন, ১৮৮৭-এর ধারা ৮; দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭-এর ধারা ১৮-১৯ (২০২১ ও ২০২৬ সালে সংশোধিত); সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ১৯ · কাগজপত্র: মূল্যায়ন বিবরণী, কোর্ট ফি
পরামর্শ: বিকল্প প্রতিকার হিসেবে বায়নার টাকা ফেরত দাবি করলে আদালত চুক্তি প্রবলের প্রতিকার নামঞ্জুর করলেও আপনি সুরক্ষিত থাকেন।
ধাপ ৫ · জমা ও মামলা দায়েরবাকি মূল্য আদালতে জমা দিন
মামলা দায়েরের আগে বা দায়েরের সময় ক্রেতা জমার আবেদনে আদালতের অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত ব্যাংকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে মূল্যের পুরো অপরিশোধিত বাকি অংশ আদালতের হিসাবে জমা দেন। মূল চালান আরজির সঙ্গে দাখিল করা হয়। হাইকোর্ট বিভাগ বারবার বলেছেন যে দায়েরের সময় এই জমা ছাড়া মামলা রক্ষণীয় নয়, এবং সব অধস্তন দেওয়ানি আদালতকে ধারা ২১ক(খ) কঠোরভাবে প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন।
কোথায়: ট্রেজারি ব্যাংক (চালানের মাধ্যমে জমা) · সময়: ১-৩ দিন · আইন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ২১ক(খ) · কাগজপত্র: জমার অনুমতির আবেদন, ট্রেজারি চালান (মূল)
পরামর্শ: বায়নানামায় দেখানো বাকি অঙ্কই হুবহু জমা দিন। কম জমা দেওয়া মামলার জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে এবং পরে সবসময় তা শোধরানো যায় না।
ধাপ ৬ · জমা ও মামলা দায়েরআরজি দাখিল করুন
আইনজীবী রেজিস্টার্ড বায়নানামা, চালান এবং জমির সুনির্দিষ্ট তফসিলসহ আরজি দাখিল করেন। আরজিতে চুক্তি, অগ্রিম পরিশোধ, সম্পাদনের নির্ধারিত তারিখ, ক্রেতার ধারাবাহিক প্রস্তুতি ও ইচ্ছা, বিক্রেতার অস্বীকৃতি এবং জমার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রধান প্রার্থনা হলো বিক্রেতাকে সাফকবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দখল হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়ে ডিক্রি, এবং তিনি ব্যর্থ হলে আদালত নিজেই তা করবেন। আদালত একটি স্বত্ব মামলা নথিভুক্ত করে সব বিবাদীকে সমন দেন।
কোথায়: প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ) · সময়: দায়েরে ১ দিন; সমন জারিতে ১-৩ মাস · আইন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ১২; দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৭ বিধি ১ ও ১৪; দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৫ (২০২৬ সালে সংশোধিত) · কাগজপত্র: জমির তফসিলসহ আরজি, রেজিস্টার্ড বায়নানামা, জমার চালান, ওকালতনামা, কোর্ট ফি
পরামর্শ: প্রস্তুতি ও ইচ্ছার কথা সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করুন; আরজিতে এর অনুপস্থিতি মামলা খারিজের একটি প্রচলিত কারণ।
ধাপ ৭ · আরজি-জবাব ও মধ্যস্থতাবিক্রেতাকে জমি হস্তান্তর থেকে বিরত রাখুন
বিরোধ শুরু হলে বিক্রেতারা কখনো কখনো তৃতীয় কারও কাছে জমি বিক্রির চেষ্টা করেন। লিস পেনডেন্স নীতি অনুযায়ী মামলা চলাকালে করা যেকোনো হস্তান্তর ডিক্রির অধীন থাকে, তবে ক্রেতা সাধারণত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হস্তান্তর নিষিদ্ধ করে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞাও চান। আদালত রেজিস্টার্ড বায়নানামা, জমা এবং হস্তান্তরের ঝুঁকি বিবেচনা করে নিষেধাজ্ঞা দিতে বা স্থিতাবস্থার আদেশ দিতে পারেন।
কোথায়: প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ) · সময়: ২ সপ্তাহ থেকে ৩ মাস · আইন: দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৯ বিধি ১; সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ধারা ৫২ · কাগজপত্র: হলফনামাসহ অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন
পরামর্শ: নিষেধাজ্ঞার আবেদনের আদেশের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৪৩ বিধি ১(r) অনুযায়ী জেলা জজের কাছে আপিল করা যায়।
ধাপ ৮ · আরজি-জবাব ও মধ্যস্থতালিখিত জবাব ও বিচার্য বিষয়
বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চুক্তি প্রবলের মামলায় বিক্রেতা সমন জারির ত্রিশ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিল করেন। প্রচলিত আত্মপক্ষ সমর্থনগুলো হলো: বায়নানামা রেজিস্টার্ড ছিল না, মামলা তামাদি-বারিত, ক্রেতা পরিশোধে খেলাপ করেছেন বা প্রস্তুত ছিলেন না, নির্ধারিত সময় অপরিহার্য ছিল, মূল্য অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ছিল, অথবা পরবর্তী কোনো ক্রেতা নোটিশ ছাড়াই কিনেছেন। এরপর আদালত বিচার্য বিষয় গঠন করেন, সাধারণত চুক্তির বৈধতা, পরিশোধ, প্রস্তুতি ও ইচ্ছা, তামাদি এবং ডিক্রি দিতে আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করা উচিত কি না, এসব বিষয়ে।
কোথায়: প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ) · সময়: ২-৬ মাস · আইন: দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৮ বিধি ১; দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ১৪ বিধি ১; সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ২২ ও ২৪ · কাগজপত্র: লিখিত জবাব, বিচার্য বিষয় গঠনের আদেশ
পরামর্শ: পরবর্তী যে ক্রেতা সরল বিশ্বাসের দাবি করেন, তাঁকেই প্রমাণ করতে হবে যে তিনি মূল্য দিয়েছেন এবং নোটিশ পাননি; প্রমাণের দায় তাঁর।
ধাপ ৯ · আরজি-জবাব ও মধ্যস্থতাআদালত-সংযুক্ত মধ্যস্থতা
আরজি-জবাবের পর আদালত মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন, অথবা পক্ষগুলোকে কোনো মধ্যস্থতাকারী, তাদের আইনজীবী বা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তার কাছে পাঠান। বিক্রয়-সংক্রান্ত অনেক বিরোধ আসলে দাম নিয়ে, তাই প্রচলিত মীমাংসা হলো সমন্বিত মূল্যে বিক্রয় সম্পন্ন করা, অথবা ক্ষতিপূরণসহ অগ্রিম অর্থ ফেরত। মধ্যস্থতা ষাট দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, যা ত্রিশ দিন বাড়ানো যায়। মীমাংসা আপস ডিক্রি হিসেবে লিপিবদ্ধ হয় এবং ধারা ৮৯ক অনুযায়ী কোর্ট ফি ফেরত দেওয়া হয়।
কোথায়: প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ) · সময়: ২-৩ মাস · আইন: দেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ৮৯ক; দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২৩ বিধি ৩ · কাগজপত্র: মধ্যস্থতার প্রতিবেদন, আপসনামা (মীমাংসা হলে)
পরামর্শ: টাকা ফেরতের শর্তে মীমাংসা করলে নিশ্চিত করুন যে আপসনামায় আদালত থেকে আপনার জমা অর্থ দ্রুত ছাড়ের বিষয়টিও আছে।
ধাপ ১০ · বিচারসাক্ষ্য
২০২৬ সালের সংশোধনীর পর থেকে বাধ্যতামূলক হিসেবে ক্রেতা হলফনামায় সাক্ষ্য দেন এবং তাঁকে জেরা করা হয়। তিনি রেজিস্টার্ড বায়নানামা, অগ্রিম পরিশোধ, জমা ও তাঁর ধারাবাহিক প্রস্তুতি প্রমাণ করেন, এবং দলিল সম্পাদন অস্বীকার করা হলে সত্যায়নকারী সাক্ষী বা দলিল লেখককে ডাকেন। এরপর বিক্রেতা সাক্ষ্য দেন। বিরোধপূর্ণ স্বাক্ষর হস্তলিপি বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো যায় বা আদালত নিজেই মিলিয়ে দেখতে পারেন। চূড়ান্ত (পেরেম্পটরি) শুনানির আগে যেকোনো পক্ষের অনুরোধে চারবারের বেশি মুলতবি দেওয়া যায় না; এর বেশি মুলতবিতে খরচ লাগে এবং তা কঠোরভাবে সীমিত।
কোথায়: প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ) · সময়: ১-২ বছর · আইন: দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ১৮ বিধি ১-৪; দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ১৮ বিধি ৪ক (২০২৬ সালের ৩৬ নং আইন দ্বারা সংযোজিত, ৮ মে ২০২৫ থেকে কার্যকর); দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ১৭ বিধি ১(৩) (২০২৬ সালে সংশোধিত); সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ধারা ৪৫, ৪৭ ও ৭৩ · কাগজপত্র: জবানবন্দির হলফনামা, প্রদর্শিত বায়নানামা ও রসিদ, হস্তলিপি বিশেষজ্ঞের প্রতিবেদন (যদি থাকে)
পরামর্শ: বিক্রেতার স্বাক্ষরিত অগ্রিম অর্থের রসিদ শক্তিশালী প্রমাণ; মূল কপিগুলো নিরাপদে রাখুন।
ধাপ ১১ · বিচারযুক্তিতর্ক ও আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা
আইনজীবীরা সাক্ষ্য এবং বাংলাদেশে চুক্তি প্রবলের মামলা-সংক্রান্ত নজিরের ভিত্তিতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। বৈধ চুক্তি ও চুক্তিভঙ্গ প্রমাণিত হলেও চুক্তি প্রবলের প্রতিকার আদালতের বিবেচনামূলক। চুক্তিটি বাদীকে অন্যায্য সুবিধা দিলে, সম্পাদন বিক্রেতার জন্য এমন কষ্টের কারণ হলে যা ক্রেতা আগে ভাবেননি, অথবা ক্রেতার নিজের আচরণ অন্যায্য হলে আদালত তা নামঞ্জুর করতে পারেন। তবে জমির ক্ষেত্রে আইন ধরে নেয় যে টাকা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নয়, তাই আইনি শর্ত পূরণ হলে সাধারণত ডিক্রিই হয়।
কোথায়: প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ) · সময়: ১-৩ মাস · আইন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ১২ (ব্যাখ্যা) ও ধারা ২২; দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ১৮ বিধি ২ · কাগজপত্র: লিখিত যুক্তিতর্ক, উদ্ধৃত রায়সমূহ
পরামর্শ: আদালতের দৃষ্টি ধারা ১২-এর অনুমানের দিকে আকর্ষণ করুন: জমি হস্তান্তরের চুক্তিভঙ্গ টাকায় পূরণযোগ্য নয় বলে ধরে নেওয়া হয়।
ধাপ ১২ · ডিক্রি, সাফকবলা দলিল ও দখলরায় ও ডিক্রি
বাংলাদেশে এই চুক্তি প্রবলের মামলায় ক্রেতা জিতলে আদালত রায় ঘোষণা করে ডিক্রি দেন, যাতে বিক্রেতাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, সাধারণত ত্রিশ থেকে ষাট দিনে, ক্রেতার অনুকূলে সাফকবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দখল হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়, আর জমা দেওয়া বাকি অর্থ বিক্রেতাকে দেওয়া হয়। চুক্তি প্রবলের প্রতিকার নামঞ্জুর হলেও চুক্তিভঙ্গ প্রমাণিত হলে আদালত এর পরিবর্তে অগ্রিম অর্থ ফেরত ও ক্ষতিপূরণ দিতে পারেন। ডিক্রি প্রস্তুত করা হয় এবং সার্টিফায়েড কপি দেওয়া হয়।
কোথায়: প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ) · সময়: একই দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ · আইন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ১২ ও ১৯; দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২০ বিধি ১ ও ৬ · কাগজপত্র: রায়, ডিক্রি, সার্টিফায়েড কপি
পরামর্শ: ডিক্রিতে দেওয়া সময়সীমা লিখে রাখুন। বিক্রেতা তা পালন না করলে অবিলম্বে জারির আবেদন করুন।
ধাপ ১৩ · ডিক্রি, সাফকবলা দলিল ও দখলআদালত সাফকবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করেন
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিক্রেতা দলিল সম্পাদন না করলে ক্রেতা জারির আবেদন করেন, যা ২০২৬ সাল থেকে মূল মামলার মধ্যেই চালানো যায়। ক্রেতা যথাযথ স্ট্যাম্প পেপারে সাফকবলা দলিলের খসড়া জমা দেন; বিক্রেতা খসড়ায় আপত্তি জানাতে পারেন। এরপর বিচারক বা নিযুক্ত কোনো কর্মকর্তা বিক্রেতার পক্ষে দলিলে স্বাক্ষর করেন, এবং আদালত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তা রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করেন। এই দলিলের কার্যকারিতা বিক্রেতার নিজের স্বাক্ষরিত দলিলের মতোই।
কোথায়: সাব-রেজিস্ট্রি অফিস · সময়: ৩-১২ মাস · আইন: দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২১ বিধি ৩২ ও ৩৪; দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২১ বিধি ১০৪ (২০২৬ সালে সংযোজিত); রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ · কাগজপত্র: জারির আবেদন, স্ট্যাম্প পেপারে সাফকবলা দলিলের খসড়া, রেজিস্ট্রেশন ফি ও কর
পরামর্শ: দলিলের স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি ও স্থানীয় করের জন্য বাজেট রাখুন; জমা দেওয়া অর্থে এগুলো অন্তর্ভুক্ত নয়।
ধাপ ১৪ · ডিক্রি, সাফকবলা দলিল ও দখলদখল ও নামজারি
ডিক্রিতে দখল হস্তান্তরেরও আদেশ থাকলে এবং বিক্রেতা বা ডিক্রি দ্বারা আবদ্ধ কেউ জমি ছাড়তে অস্বীকার করলে আদালত দখল হস্তান্তরের পরোয়ানা জারি করেন এবং নির্দেশ থাকলে পুলিশের সহায়তায় আদালতের নাজির ক্রেতাকে দখল বুঝিয়ে দেন। দলিল রেজিস্ট্রি হলে বিক্রেতা জমা দেওয়া বাকি অর্থ উত্তোলন করতে পারেন। এরপর ক্রেতা খতিয়ানের নামজারির জন্য এসি ল্যান্ডের কাছে আবেদন করেন এবং নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করেন।
কোথায়: প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ) · সময়: ২-১২ মাস · আইন: দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২১ বিধি ৩৫; দেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ৯৪ক (২০২৬ সালে সংযোজিত); রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ধারা ১৪৩ · কাগজপত্র: দখল হস্তান্তরের পরোয়ানা, রেজিস্টার্ড সাফকবলা দলিল, নামজারির আবেদন
পরামর্শ: চূড়ান্ত ডিক্রির তিন বছরের মধ্যে জারির আবেদন করতে হয়, আর সার্টিফায়েড কপি রেজিস্ট্রি করা থাকলে ছয় বছরের মধ্যে।
যদি এমন হয়…? চুক্তি প্রবলের মামলা যেভাবে গতিপথ বদলাতে পারে
একটি পরিস্থিতি বেছে নিন। ম্যাপটি দেখাবে মামলা কীভাবে উচ্চ আদালতে ওঠে, আর ফেরত পাঠানো হলে কীভাবে নিম্ন আদালতে নেমে আবার ওপরে যায়।
বিক্রেতা বা ক্রেতা আপিল করলে কী হয়?
- 1জেলা জজ আদালত (বা অতিরিক্ত জেলা জজ)
প্রথম আপিল
হেরে যাওয়া পক্ষ ত্রিশ দিনের মধ্যে ডিক্রির সার্টিফায়েড কপিসহ আপিলের স্মারকলিপি দাখিল করে। সিভিল জজ বা সিনিয়র সিভিল জজের রায়ের আপিল যায় জেলা জজের কাছে। যুগ্ম জেলা জজের রায়ের ক্ষেত্রে মামলার মূল্য ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে আপিল যায় জেলা জজের কাছে, অন্যথায় নব্বই দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে। জেলা জজ প্রায়ই আপিলটি অতিরিক্ত জেলা জজের কাছে পাঠান।
৩০ দিনের মধ্যে দায়েরদেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ৯৬দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭-এর ধারা ২১তামাদি আইন, ১৯০৮, অনুচ্ছেদ ১৫২ ও ১৫৬ - 2জেলা জজ আদালত (বা অতিরিক্ত জেলা জজ)
পুনঃশুনানি ও স্থগিতাদেশ
আপিল আদালত তথ্য ও আইনের পুনঃশুনানি করেন এবং নথি পর্যাপ্ত হলে নিজেই মামলা নিষ্পত্তি করতে বাধ্য। আপিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে দলিল জারি বন্ধ করে না; আপিলকারীকে স্থগিতাদেশের আবেদন করতে হয়, যা শর্তসাপেক্ষে মঞ্জুর হতে পারে। ক্রেতার জমা অর্থ সাধারণত আপিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত আদালতে থাকে।
১-৪ বছরদেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৪১ বিধি ৫, ২৪ ও ৩১
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: আপিল আদালত ডিক্রি বহাল, পরিবর্তন বা রদ করেন, এবং মামলাটি রিভিশনে হাইকোর্ট বিভাগে যেতে পারে।
হাইকোর্ট বিভাগ কি আপিলের ডিক্রি রিভিশন করতে পারেন?
- 1হাইকোর্ট বিভাগ
দেওয়ানি রিভিশন
বাংলাদেশে দ্বিতীয় আপিল নেই। জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা জজের আপিল ডিক্রির বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ ধারা ১১৫(১) অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করে; কোনো আইনে সময় নির্ধারিত নেই, তবে হাইকোর্ট বিভাগ সাধারণত প্রায় নব্বই দিনের মধ্যে দায়ের আশা করেন। বিবেচনাযোগ্য কোনো আইনগত ভুল দেখা দিলে, যেমন ধারা ২১ক-এর জমা ছাড়াই ডিক্রি দেওয়া, আদালত রুল জারি করেন এবং এর মধ্যে জারি স্থগিত করতে পারেন।
প্রায় ৯০ দিনের মধ্যে দায়ের; নিষ্পত্তিতে ১-৫ বছরদেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ১১৫(১)সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ধারা ২১ক
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: রুল চূড়ান্ত বা খারিজ হয়, যাতে নিষ্পত্তি হয় সাফকবলা দলিল সম্পাদন করতে হবে কি না।
বিচারিক আদালত কি নিজের ডিক্রি রিভিউ করতে পারেন?
- 1প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ)
রিভিউর আবেদন
যে পক্ষ আপিল করেনি, সে নব্বই দিনের মধ্যে একই আদালতের কাছে ডিক্রি রিভিউ চাইতে পারে, এই ভিত্তিতে: যথাযথ তৎপরতা সত্ত্বেও আগে পাওয়া যায়নি এমন নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য, নথিতে সুস্পষ্ট ভুল, বা অন্য কোনো পর্যাপ্ত কারণ। একটি সাধারণ উদাহরণ হলো এমন ডিক্রি যা নথিতে থাকা কোনো রেজিস্টার্ড হস্তান্তর বা কম জমা উপেক্ষা করেছে। রিভিউ নামঞ্জুরের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল চলে না।
৯০ দিনের মধ্যে দায়েরদেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ১১৪দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৪৭ বিধি ১ ও ৭তামাদি আইন, ১৯০৮, অনুচ্ছেদ ১৭৩
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: ডিক্রি বহাল থাকে, অথবা আদালত মামলাটি পুনরায় খুলে পুনঃশুনানি করেন।
কোনো আইনগত প্রশ্ন কি হাইকোর্ট বিভাগে রেফারেন্স করা যায়?
- 1হাইকোর্ট বিভাগ
ধারা ১১৩ অনুযায়ী রেফারেন্স
এ ধরনের মামলায় রেফারেন্স বিরল। দাবিটি যে আইনের ওপর নির্ভরশীল তার বৈধতা বা পরিধির মতো কোনো আইনগত প্রশ্নে যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে বিচারিক আদালত হাইকোর্ট বিভাগের মতামতের জন্য বিষয়টি পাঠিয়ে মামলা স্থগিত রাখতে পারেন। হাইকোর্ট বিভাগ উত্তর দেন, এবং এরপর বিচারিক আদালত সেই ভিত্তিতে মামলা নিষ্পত্তি করেন।
৬ মাস থেকে ২ বছরদেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ১১৩দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৪৬ বিধি ১-৩
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: বিচারিক আদালত হাইকোর্ট বিভাগের মতামত অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি করেন।
মামলা বিচারিক আদালতে ফেরত পাঠানো হলে কী হয়?
- 1জেলা জজ আদালত (বা অতিরিক্ত জেলা জজ)
আপিল আদালত কর্তৃক পুনর্বিচারের জন্য নিম্ন আদালতে ফেরত
বিচারিক আদালত কোনো প্রাথমিক প্রশ্নে, যেমন তামাদিতে, মামলা খারিজ করলে এবং আপিল আদালত তাতে একমত না হলে, প্রস্তুতি ও ইচ্ছার মতো বাকি বিচার্য বিষয়গুলোর বিচারের জন্য মামলাটি ফেরত পাঠাতে পারেন। ২০২৬ সাল থেকে সাক্ষ্য পর্যাপ্ত হলে আপিল আদালতকে নিজেই মামলা নিষ্পত্তি করতে হয়, তাই প্রকৃত ঘাটতি থাকলেই কেবল ফেরত পাঠানো হয়। জেলা জজের ফেরত পাঠানোর আদেশের বিরুদ্ধে আপিল চলে না, কারণ আদেশ ৪৩ বিধি ১(u) কেবল তখনই আপিলের সুযোগ দেয় যখন আপিল ডিক্রিটি নিজেই আপিলযোগ্য; বরং হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি রিভিশনের মাধ্যমে এটি চ্যালেঞ্জ করা হয়।
১-৩ মাসদেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৪১ বিধি ২৩-২৫ (বিধি ২৪, ২০২৬ সালে সংশোধিত)দেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ১১৫(১) - 2প্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ)
পুনর্বিচার ও নতুন ডিক্রি
বিচারিক আদালত মামলাটি একই নম্বরে নথিতে পুনরুজ্জীবিত করেন, নির্দেশিত অতিরিক্ত সাক্ষ্যসহ ফেরত পাঠানো বিচার্য বিষয়গুলো শোনেন এবং নতুন ডিক্রি দেন। সেই ডিক্রির বিরুদ্ধে আবার জেলা জজের কাছে আপিল এবং এরপর হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন করা যায়, ফলে মামলাটি যে সিঁড়ি বেয়ে নেমেছিল সেই সিঁড়ি বেয়েই আবার ওঠে।
৬-১৮ মাসদেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৪১ বিধি ২৩দেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ৯৬
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: নতুন ডিক্রি হয় এবং তার বিরুদ্ধে আবার জেলা জজের কাছে আপিল করা যায়।
মামলা কি আপিল বিভাগে যেতে পারে?
- 1সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ
আপিলের অনুমতি চেয়ে পিটিশন (লিভ পিটিশন)
হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে হেরে যাওয়া পক্ষ সাধারণত ষাট দিনের মধ্যে আপিলের অনুমতি চেয়ে দেওয়ানি পিটিশন দাখিল করে। আপিল বিভাগ কেবল গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্নে অনুমতি দেন, যেমন পুরোনো কোনো চুক্তির ওপর ২০০৪ সালের সংশোধনীর প্রভাব। অনুমতি মঞ্জুর হলে দেওয়ানি আপিলের শুনানি হয়।
৬০ দিনের মধ্যে দায়ের; ১-৪ বছরসংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৩আপিল বিভাগ রুলস, ১৯৮৮, আদেশ ১৩ - 2সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ
চূড়ান্ত রায় ও রিভিউ
আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত সব আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। কেবল নথিতে সুস্পষ্ট ভুলের জন্য ত্রিশ দিনের মধ্যে রিভিউ চাওয়া যায়। এরপর মামলাটি বিচারিক আদালতে ফেরত যায়, যা চূড়ান্ত ফল কার্যকর করে: ক্রেতার জন্য সাফকবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি, অথবা ক্রেতা হেরে গেলে জমা দেওয়া বাকি অর্থ ফেরত।
৩০ দিনের মধ্যে রিভিউসংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৫ ও ১১১আপিল বিভাগ রুলস, ১৯৮৮, আদেশ ২৬
শেষ পর্যন্ত যেখানে গড়ায়: আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, এবং বিচারিক আদালত তা কার্যকর করেন।
চুক্তি প্রবলের মামলা যেভাবে আদালতের স্তর বেয়ে ওপরে ওঠে
বাংলাদেশে চুক্তি প্রবলের মামলার মূল্যায়ন হয় বায়নানামায় উল্লিখিত বিক্রয়মূল্যে, এবং দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭ অনুযায়ী সেই অঙ্কই বিচারিক আদালত নির্ধারণ করে: জমি যে জেলায় অবস্থিত সেখানে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সিভিল জজ, ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সিনিয়র সিভিল জজ, এবং এর বেশি হলে যুগ্ম জেলা জজ। প্রথম আপিল যায় জেলা জজের কাছে, তবে ৫ কোটি টাকার বেশি মূল্যের মামলায় যুগ্ম জেলা জজের ডিক্রির আপিল সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে যায়। প্রথম আপিল আদালত তথ্য ও আইন দুই বিষয়েই পুনঃশুনানি করেন, যার মধ্যে ডিক্রি দিতে আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করা উচিত কি না, সেটিও রয়েছে।
দ্বিতীয় আপিল নেই; পরবর্তী ধাপ হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি রিভিশন, যা কেবল ন্যায়বিচার ব্যাহতকারী আইনগত ভুল সংশোধন করে, যেমন ধারা ২১ক-এর শর্ত উপেক্ষা করা। সবশেষে আপিল বিভাগ মামলা শোনেন, এবং কেবল অনুমতি সাপেক্ষে।
- আপিল বিভাগসুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ
- হাইকোর্ট বিভাগহাইকোর্ট বিভাগ
- আপিল পর্যায়জেলা জজ আদালত (বা অতিরিক্ত জেলা জজ)
- প্রথম দফার আদালতপ্রথম দেওয়ানি আদালত (সিভিল জজ / সিনিয়র সিভিল জজ / যুগ্ম জেলা জজ)
- শুরু · আদালতের বাইরেআইনজীবীর চেম্বার · সাব-রেজিস্ট্রি অফিস · ট্রেজারি ব্যাংক (চালানের মাধ্যমে জমা)
আপনার মামলা কোথায় শুনানি হয়
ঠিকানাগুলো ঢাকার। প্রতিটি জেলার নিজস্ব জজশিপে সমমানের আদালত আছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ)
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, শাহবাগ, রমনা, ঢাকা-১০০০হাইকোর্ট বিভাগ (High Court Division) আপিল, রিভিশন (revision), রেফারেন্স, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২-এর অধীন রিট পিটিশন (writ petition), কোম্পানি বিষয় ও ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানি করে; আপিল বিভাগ (Appellate Division) হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতিসাপেক্ষে আপিল শুনানি করে।
দুই বিভাগই সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে বসে; হাইকোর্ট বিভাগের অনেক বেঞ্চ বসে অ্যানেক্স ভবনে। কোন বেঞ্চ ও কোন কোর্ট রুম, তা জানতে দৈনিক কার্যতালিকা (cause list) দেখুন। ডাক যোগাযোগের ঠিকানা: রেজিস্ট্রার জেনারেল, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, রমনা, ঢাকা-১০০০।
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা (ঢাকা জজ কোর্ট)
ঢাকা জজ কোর্ট প্রাঙ্গণ, ১৬ জনসন রোড, সদরঘাট, ঢাকাঢাকার জেলা জজ (District Judge) ও অতিরিক্ত জেলা জজদের আদালত (দেওয়ানি আপিল, প্রোবেট, মহানগর এলাকার বাইরের জেলা পর্যায়ের দেওয়ানি ও দায়রা মামলা), এবং প্রথম দফার দেওয়ানি আদালতসমূহ (যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সিভিল জজ/সিভিল জজ আদালত)।
সরকারি বিচার বিভাগীয় পোর্টালে ঠিকানা দেওয়া আছে "১৬ জনসন রোড, সদরঘাট, ঢাকা"। অনেক দেওয়ানি আদালত (অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত, যুগ্ম জেলা জজ ও সিনিয়র সিভিল জজ আদালত, অর্থঋণ আদালত নং ১, দেউলিয়া আদালত) একই প্রাঙ্গণে নতুন ৮ তলা জেলা জজ আদালত ভবনে বসে। ২০২৬ সালের জাজশিপ তালিকায় প্রথম দফার দেওয়ানি আদালতগুলোর নাম "সিনিয়র সিভিল জজ" / "সিভিল জজ" (আগে সিনিয়র সহকারী জজ / সিভিল জজ); কিছু পাতায় এখনো পুরোনো নাম ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি জেলায় জেলা জাজশিপে এর সমতুল্য আদালত রয়েছে।
আইনজীবীর চেম্বার
এটি কোথায় হবে তা আপনার জেলা বা সংশ্লিষ্ট অফিসের ওপর নির্ভর করে। সঠিক এজলাস ও ঠিকানার জন্য আমাদের জিজ্ঞেস করুন।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিস
এটি কোথায় হবে তা আপনার জেলা বা সংশ্লিষ্ট অফিসের ওপর নির্ভর করে। সঠিক এজলাস ও ঠিকানার জন্য আমাদের জিজ্ঞেস করুন।
ট্রেজারি ব্যাংক (চালানের মাধ্যমে জমা)
এটি কোথায় হবে তা আপনার জেলা বা সংশ্লিষ্ট অফিসের ওপর নির্ভর করে। সঠিক এজলাস ও ঠিকানার জন্য আমাদের জিজ্ঞেস করুন।
প্রতিটি পর্যায়ে কত সময় লাগে
এগুলো ঢাকার সাধারণ চর্চার ভিত্তিতে নির্দেশক সময়সীমা। মুলতবি, মামলাজট ও আপিলের কারণে সময় বাড়তে পারে।
কাগজপত্রের চেকলিস্ট ও মূল পরিভাষা
আপনার কাছে যা আছে টিক দিন। টিকগুলো এই ব্রাউজারে সংরক্ষিত থাকবে। আইনজীবীর সঙ্গে প্রথম বৈঠকে তালিকাটি নিয়ে যান।
- বায়নানামা (Bainanama)
- জমি বিক্রির চুক্তি, যা ২০০৪ সালের সংশোধনী অনুযায়ী লিখিত ও রেজিস্টার্ড হতে হবে (সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ধারা ৫৪ক, রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১৭ক)।
- চুক্তি প্রবল (Specific performance)
- আদালতের এমন আদেশ যা কোনো পক্ষকে চুক্তিটি নিজেই পালনে বাধ্য করে, এখানে সাফকবলা দলিলে স্বাক্ষর ও রেজিস্ট্রি করতে।
- বাকি পণ (Balance consideration)
- সম্মত মূল্যের অপরিশোধিত অংশ, যা মামলা দায়েরের সময় আদালতে জমা দিতে হয় (সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ধারা ২১ক(খ))।
- প্রস্তুতি ও ইচ্ছা (Readiness and willingness)
- অর্থ পরিশোধ ও বিক্রয় সম্পন্ন করার জন্য ক্রেতার ধারাবাহিক সামর্থ্য ও অভিপ্রায়, যা তাঁকে আরজিতে উল্লেখ ও প্রমাণ করতে হয়।
- লিস পেনডেন্স (Lis pendens)
- যে নিয়ম অনুযায়ী সম্পত্তি নিয়ে মামলা চলাকালে করা হস্তান্তর চূড়ান্ত ডিক্রির অধীন থাকে (সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ধারা ৫২)।
- নোটিশবিহীন সরল বিশ্বাসের মূল্যদাতা ক্রেতা (Bona fide purchaser for value without notice)
- পরবর্তী এমন ক্রেতা যিনি আগের চুক্তির কথা না জেনে সরল বিশ্বাসে মূল্য দিয়েছেন; তাঁর বিরুদ্ধে চুক্তি প্রবল কার্যকর করা যায় না (ধারা ২৭(খ))।
- বায়না (Earnest money)
- বায়নানামা স্বাক্ষরের সময় দেওয়া অগ্রিম অর্থ, চুক্তি প্রবল নামঞ্জুর হলে যা ফেরত বা ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে আদায়যোগ্য।
- আদালত কর্তৃক দলিল সম্পাদন (Execution of document by court)
- দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২১ বিধি ৩৪-এর পদ্ধতি, যার মাধ্যমে খেলাপি বিক্রেতার পক্ষে বিচারক সাফকবলা দলিলে স্বাক্ষর করে রেজিস্ট্রি করান।
চুক্তি প্রবলের মামলা: সাধারণ প্রশ্ন
রেজিস্ট্রি না করা বায়নানামা দিয়ে কি বাংলাদেশে চুক্তি প্রবলের মামলা করা যায়?
মামলা করার জন্য কত দিন সময় পাব?
মামলা শুরুর আগে কি সত্যিই পুরো বাকি টাকা জমা দিতে হবে?
বিক্রেতা যদি ইতোমধ্যে জমিটি অন্য কাউকে বিক্রি করে থাকেন?
হেরে যাওয়ার পরও বিক্রেতা স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করলে কী হবে?
সবকিছু প্রমাণ করলেও কি আদালত নামঞ্জুর করতে পারেন?
বাংলাদেশে চুক্তি প্রবলের মামলা শেষ হতে কত সময় লাগে?
কোন আদালত মামলাটি শোনেন?
আইন ও উৎস
- Specific Relief Act 1877
- Transfer of Property Act 1882
- Registration Act 1908
- Limitation Act 1908
- Code of Civil Procedure 1908
- Civil Courts Act 1887
- High Court Division, First Appeal No. 677 of 2019 (deposit under s.21A(b))
- High Court Division, Civil Revision No. 2685 of 2023 (strict compliance with s.21A(b))
- High Court Division, First Appeal No. 706 of 2019 (registered contract and deposit)
এই কেস জার্নি অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের কার্যপ্রণালীর একটি সাধারণ গাইড। এটি আইনি পরামর্শ নয়। কার্যপ্রণালী, ফি ও সময়সীমা বদলায়, আর প্রতিটি মামলা তার নিজস্ব তথ্যের ওপর নির্ভর করে। সময়রেখাগুলো নির্দেশক। নিজের বিষয়ে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।
বাংলাদেশের বাইরে থেকে এই মামলা চালান
সাধারণত দেশে না এসেও এই মামলা শুরু ও পরিচালনা করা যায়। আপনি বিদেশে একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (মোক্তারনামা) সই করবেন, বাংলাদেশ হাইকমিশন বা দূতাবাস তা সত্যায়ন করবে, আর ঢাকায় আপনার প্রতিনিধি ও আইনজীবী আপনার হয়ে কাজ করবেন। সশরীরে সাক্ষ্য দেওয়ার মতো কিছু ধাপে তবু আপনাকে বা একটি কমিশনকে প্রয়োজন হতে পারে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে মামলা কীভাবে চলে দেখুন →
আপনার মামলা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে, জানতে চান?
একটি পরামর্শ বুক করুন। একজন TRW আইনজীবী আপনার বিষয়টি এই ম্যাপে বসিয়ে দেবেন, পরবর্তী ধাপ ও বাস্তবসম্মত সময়রেখা ব্যাখ্যা করবেন এবং কী প্রস্তুত করতে হবে তা জানাবেন।











